ছবিঃ অনলাইন থেকে সংগৃহীত
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জিতল কে—বিএনপি না ৭০ অনুচ্ছেদ?
প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬, ১০:৪২ এএম
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়ে গেল। সরকারি দলের প্রার্থী মির্জা ফখরুল পেয়েছেন ২৫৫ ভোট, বিরোধী দলের প্রার্থী অলি আহমেদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে অভিনন্দন। ফলাফল দেখে খুব বেশি চমকে ওঠার কারণ নেই। এটি বাংলাদেশের সেই বিশেষ ধরনের নির্বাচন, যেখানে ভোট দেওয়ার আগেই ফলাফল মোটামুটি জানা থাকে, আর ভোটের পরে জানা যায়, ফলাফলটি ঠিক আগেই যেমন অনুমান করা হয়েছিল, তেমনই হয়েছে। নির্বাচন হয়েছে, গণতন্ত্রও হয়েছে, শুধু চমকটা পথে হারিয়ে গেছে।
এবারও তাই হয়েছে। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংসদ সদস্যদের দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দেওয়ার স্বাধীনতা এমনভাবে সীমিত করে রেখেছে যে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে নিজের দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া মানে নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের সঙ্গে কুস্তি লড়তে নামা। ফলে সরকারি দলের ২৫৫ জনের ২৫৫ ভোট এবং বিরোধী দলের ৮৮ জনের ৮৮ ভোট পাওয়া দেখে বিস্মিত হওয়ার বদলে বরং কৌতূহল জাগে, একজনও কি ভুল করে অন্য বাক্সে ভোট দিয়েছিলেন? সম্ভবত করেননি। আমাদের সংসদে স্বাধীন ভোটার পাওয়া কঠিন, দলীয় সৈনিক পাওয়া সহজ। বিবেক আছে, কিন্তু সেটি ব্যবহারের আগে দলের অনুমতি লাগে!
এই নির্বাচন ৩৫ বছর আগের আরেক রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের কথাও মনে করিয়ে দেয়। তখনও বিএনপি ক্ষমতায় ছিল। বিরোধী দলে ছিল আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা। সেবার বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে হারিয়েছিলেন। এবার দৃশ্যপট বদলেছে। বিএনপি ক্ষমতায়, বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও তাদের মিত্ররা। ইতিহাসের চরিত্র বদলায়, মঞ্চের সাজসজ্জা বদলায়, কিন্তু নাটকের অনেক সংলাপ একই থাকে।
বিরোধী দলের আপত্তির জায়গাটিও গুরুত্বপূর্ণ। তাদের বক্তব্য, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করে নির্বাচন হলে উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার কথা ছিল। উচ্চকক্ষ গঠিত হয়নি। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।
এখানেই বাংলাদেশের রাজনীতির চমৎকার বৈশিষ্ট্য আবার সামনে আসে। আমরা আগে নিয়ম বানাই, পরে নিয়ম নিয়ে ঝগড়া করি। তারপর নিয়ম বদলানোর জন্য কমিটি করি। কমিটিতে কে থাকবে তা নিয়ে ঝগড়া করি। কমিটির সুপারিশ নিয়ে আবার ঝগড়া করি। শেষে সবাই ক্লান্ত হলে নতুন নির্বাচন এসে বলে, ভাই, আমাকে নিয়ে একটু ব্যস্ত হন!
তবে এত সাংবিধানিক কচকচির মধ্যেও বৃহস্পতিবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন একটি ভালো দৃশ্য উপহার দিয়েছে। নির্বাচন শেষে সরকারি ও বিরোধী দলের নেতারা নতুন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কোলাকুলি করেছেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই দৃশ্য প্রায় বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির পাখির মতো। সংসদে এমন দৃশ্য দেখে পুরোনো অনেক সদস্য হয়তো চোখ কচলে নিশ্চিত হয়েছেন, সত্যিই কি ঘটছে, নাকি কোনো পুরোনো ভিডিও ভুল করে চালু হয়েছে!
আমাদের রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে মানুষ হিসেবে দেখার সংস্কৃতি ভয়াবহভাবে দুর্বল। এখানে বিরোধী দল মানেই দেশের শত্রু, সরকার মানেই গণতন্ত্রের শত্রু। দুই পক্ষের ভাষণ শুনলে মনে হয়, দেশের সব ভালো কাজ করেছে তারা নিজেরা, আর সব খারাপ কাজ করেছে অপর পক্ষ। মাঝখানে সাধারণ নাগরিক দাঁড়িয়ে ভাবেন, তাহলে দেশের বন্ধু আসলে কে? বৃহস্পতিবারের কোলাকুলি অন্তত এক দিনের জন্য মনে করিয়ে দিয়েছে, রাজনীতির ওপাশে বসা লোকটিও মানুষ।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে আরেকটি মজার হিসাব আছে। ৫৫ বছরে ২৩ জন রাষ্ট্রপতি! সংবিধান বলছে, রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর। কিন্তু বাংলাদেশে পাঁচ বছর মানে পাঁচ বছর—এমন ধারণা করা রাজনৈতিকভাবে বেশ সরলমনা হওয়ার লক্ষণ। আমাদের রাষ্ট্রপতির মেয়াদ অনেকটা বাসের সময়সূচির মতো। কাগজে একটি সময় লেখা থাকে, বাস্তবে কখন আসবে তা নির্ভর করে ভাগ্য, যানজট এবং চালকের মর্জির ওপর।
এই জায়গায় নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আলাদা চরিত্র। ছাত্রজীবনে ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতি, পরে শিক্ষকতা, এরপর মূলধারার রাজনীতিতে প্রবেশ, তৃণমূল থেকে উঠে এসে বিএনপির মহাসচিব হওয়া—তার রাজনৈতিক যাত্রা আমাদের প্রচলিত ক্ষমতার শর্টকাট সংস্কৃতির তুলনায় দীর্ঘ পথের গল্প। অনেকে লিফটে উঠে ওপরতলায় যান, মির্জা ফখরুল সিঁড়ি বেয়ে উঠেছেন।
বিএনপির সবচেয়ে কঠিন সময়েও তিনি দলের মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। খালেদা জিয়া কারাগারে, তারেক রহমান লন্ডনে—এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে দলের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক চাপ সামলানো সহজ কাজ ছিল না। দীর্ঘদিন তিনি দলের মুখপাত্র এবং রাজনৈতিক মুখ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
তার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সম্পদ সম্ভবত ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি। সাদামাটা জীবনযাপন, অপেক্ষাকৃত সংযত ভাষা, কর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং প্রতিপক্ষকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করার প্রবণতা তুলনামূলক কম থাকা তাকে অনেক রাজনীতিকের থেকে আলাদা করেছে। যেখানে অনেক নেতা ক্ষমতায় যাওয়ার আগে সাধারণ মানুষ এবং ক্ষমতায় যাওয়ার পরে অসাধারণ মানুষ হয়ে যান, সেখানে মির্জা ফখরুলকে দীর্ঘদিন তুলনামূলক সহজ-সরল মানুষ হিসেবেই দেখা হয়েছে।
এখন আসল পরীক্ষা হলো, রাষ্ট্রপতি ভবনে গিয়ে তিনি কতটা মির্জা ফখরুল থাকেন। কারণ রাষ্ট্রপতি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার দলীয় পরিচয় সাংবিধানিকভাবে পেছনে রাখতে হবে। আজ তিনি বিএনপির মহাসচিব, কাল তিনি রাষ্ট্রপতি। আজ তিনি দলের পক্ষে কথা বলেন, কাল তাকে কথা বলতে হবে রাষ্ট্রের পক্ষে।
রাষ্ট্রপতি পদটি ক্ষমতার দিক থেকে সীমিত হলেও সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়ের দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি দলের সমর্থনে নির্বাচিত হলেও শপথ নেওয়ার পর তিনি আর কোনো দলের রাষ্ট্রপতি নন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এখানেই অনেক রাষ্ট্রপতি হোঁচট খেয়েছেন। দলীয় আনুগত্য আর সাংবিধানিক নিরপেক্ষতার সীমারেখা গুলিয়ে ফেলেছেন। ফলে কখনো কখনো বঙ্গভবন রাষ্ট্রের ভবনের চেয়ে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক আবহাওয়া অফিসের মতো মনে হয়েছে।
মির্জা ফখরুলের সামনে তাই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখানেই। বিশেষ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর ভবিষ্যৎ জাতীয় নির্বাচন এবং ক্ষমতার পালাবদলের সময়ে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হবে। তখন তাকে প্রমাণ করতে হবে, তিনি বিএনপির সাবেক মহাসচিব নন, তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি।
এখানেই ৭০ অনুচ্ছেদের আসল কৌতুক। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ২৫৫ জন সরকারি দলের সদস্যের ২৫৫ ভোট পাওয়া গেল। কেউ দলীয় লাইনের বাইরে গেলেন না। এখন রাষ্ট্রপতি হয়ে মির্জা ফখরুলের সামনে প্রশ্ন—তিনি কি প্রয়োজনে সেই দলীয় লাইনের বাইরে সংবিধানের লাইন দেখতে পারবেন?
রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর তাকে নিজের দলকেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে না বলতে হতে পারে। যে দল তাকে রাষ্ট্রপতি বানিয়েছে, সেই দলই কোনো একদিন তার কোনো সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হতে পারে। তখন তিনি যদি দলের কথা শোনেন, রাষ্ট্রপতির নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। আর যদি সংবিধানের কথা শোনেন, দল হয়তো মুখ ভার করবে। রাষ্ট্রপতির চেয়ার যত নরম দেখায়, বসার পর কাঁটা তত বেশি।
নতুন রাষ্ট্রপতির সামনে আরেকটি তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক হিসাবও আছে। রাষ্ট্রপতি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিএনপির মহাসচিবের পদ শূন্য হবে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও নতুন কারও হাতে যাবে। ঠাকুরগাঁও-১ আসনেও তৈরি হবে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা। একজন মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হয়েছেন, কিন্তু বিনিময়ে বিএনপিকে একসঙ্গে কয়েকটি গর্ত ভরাট করতে হবে। ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে রুহুল কবীর রিজভীর নাম এসেছে। এখন দেখার বিষয়, বিএনপি দলীয় উত্তরাধিকার, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং রাজনৈতিক ভারসাম্যের সমীকরণ কীভাবে মেলায়।
তবে এসব হিসাবের বাইরেও সবচেয়ে বড় প্রশ্ন অন্য জায়গায়। মির্জা ফখরুল কি সত্যিই জাতির অভিভাবক হতে পারবেন? বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি হওয়া হয়তো তুলনামূলক সহজ, কিন্তু নিরপেক্ষ রাষ্ট্রপতি হওয়া কঠিন। কারণ দল আপনাকে ভোট দিয়ে রাষ্ট্রপতি বানায়, কিন্তু রাষ্ট্র আপনাকে প্রতিদিন পরীক্ষা নেয়।
তিনি যেন বঙ্গভবনে গিয়ে দলীয় অফিসের চেয়ার না খোঁজেন, রাষ্ট্রের চেয়ারটি খুঁজে পান। বাংলাদেশের মানুষ এমন একজন রাষ্ট্রপতি দেখতে চায়, যিনি সরকারকে সরকার বলবেন, বিরোধী দলকে বিরোধী দল বলবেন, ভুলকে ভুল বলবেন এবং প্রয়োজনে নিজের রাজনৈতিক অতীতের বিরুদ্ধেও সংবিধানের পক্ষে দাঁড়াতে পারবেন।
কারণ আমরা দল অনেক দেখেছি, দলাদলি আরও বেশি দেখেছি, ক্ষমতার খেলা দেখেছি, ক্ষমতার জন্য কান্নাকাটি দেখেছি, ক্ষমতায় গিয়ে সব ভুলে যাওয়ার অসাধারণ প্রতিভাও দেখেছি। এবার একটু রাষ্ট্র দেখাই যাক।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে অভিনন্দন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে এবার তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে—প্রয়োজনে কম কথা বলা, কিন্তু ঠিক সময়ে ঠিক কথা বলা। এটি ছোট কোনো গুণ নয়। বরং বলা যায়, এটাই দুর্লভ রাষ্ট্রীয় সম্পদ।
মন্তব্য করুন

