ছবিঃ অনলাইন থেকে সংগৃহীত
জাহাজভাঙা শিল্পে শ্রমিকের মৃত্যু, দুর্ঘটনার আড়ালে নিরাপত্তাহীন শিল্পব্যবস্থা
প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬, ১০:৪৩ এএম
সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্পে আবারও শ্রমিকের প্রাণ গেল। ভাটিয়ারির ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে পুরোনো এলএনজিবাহী জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাসে নয়জন শ্রমিকের মৃত্যু আমাদের সামনে এমন এক শিল্পব্যবস্থার নির্মম চেহারা তুলে ধরেছে, যেখানে উৎপাদন ও মুনাফার পাশে শ্রমিকের জীবন অনেক সময় ভয়াবহভাবে উপেক্ষিত। সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুসারে, জাহাজটি যথাযথভাবে গ্যাস ও রাসায়নিকমুক্ত না করেই শ্রমিকদের কাজে নামানো হয়েছিল। তাঁদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছিল না বলেও অভিযোগ রয়েছে। আরও উদ্বেগের বিষয়, সকাল সাড়ে আটটার দিকে দুর্ঘটনা ঘটলেও ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হয় প্রায় দুই ঘণ্টা পরে। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত শ্রমিকেরা মৃত্যুর সঙ্গে লড়েছেন।
জাহাজভাঙা পৃথিবীর ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পগুলোর একটি। একটি পুরোনো জাহাজ শুধু লোহা ও যন্ত্রাংশের বিশাল কাঠামো নয়। তার ট্যাংক, পাইপলাইন, বদ্ধ প্রকোষ্ঠ ও যন্ত্রপাতির মধ্যে দাহ্য পদার্থ, বিষাক্ত গ্যাস, তেল, রাসায়নিক বর্জ্যসহ নানা বিপজ্জনক উপাদান থেকে যেতে পারে। বিশেষ করে এলএনজিবাহী জাহাজ কাটার ক্ষেত্রে সামান্য অসতর্কতাও প্রাণঘাতী পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। তাই জাহাজ কাটার আগে গ্যাস পরীক্ষা, বিপজ্জনক রাসায়নিক শনাক্তকরণ, বদ্ধ স্থানের বাতাস পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় পরিষ্কার কার্যক্রম এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা শ্রমিকের জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তার বক্তব্য অনুসারে, দুর্ঘটনা কবলিত জাহাজটি দীর্ঘদিন অব্যবহৃত অবস্থায় ছিল এবং সেটি রাসায়নিকমুক্ত করা হয়নি। শ্রমিকেরা পাইপ কাটতে গেলে কার্বন মনোক্সাইড বেরিয়ে আসে। সামনের শ্রমিকেরা প্রথমে আক্রান্ত হন। তাঁদের উদ্ধার করতে গিয়ে অন্য শ্রমিকেরাও বিষক্রিয়ার শিকার হন। এমন পরিস্থিতিতে একটি মৌলিক বিষয় সামনে আসে। জাহাজের ভেতরে কী ধরনের গ্যাস জমে ছিল, তার ঘনত্ব কত ছিল এবং সেখানে প্রবেশ করা নিরাপদ কি না, কাজ শুরুর আগেই যদি পরীক্ষা করা হতো, তাহলে নয়টি পরিবারকে হয়তো আজ প্রিয়জন হারিয়ে শোক করতে হতো না। এই মৃত্যুর সঙ্গে আরও একটি গুরুতর অভিযোগ যুক্ত হয়েছে। দুর্ঘটনার পর ইয়ার্ডের গেট বন্ধ করে বাইরের মানুষের প্রবেশ ঠেকানো হয়েছিল বলে স্থানীয়দের দাবি। ফায়ার সার্ভিসকে খবর দিতেও প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লেগেছে। এমন অভিযোগ সত্য হলে বিষয়টি কেবল কর্মক্ষেত্রের অব্যবস্থাপনার মধ্যে আটকে থাকে না। তখন দুর্ঘটনার পর উদ্ধার কার্যক্রমে বিলম্বের দায়ও সামনে আসে। বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত একজন মানুষের ক্ষেত্রে কয়েক মিনিটের ব্যবধানও জীবন ও মৃত্যুর ব্যবধান হয়ে উঠতে পারে। সেখানে প্রায় দুই ঘণ্টা অত্যন্ত দীর্ঘ সময়।
স্থানীয় মানুষের অভিযোগ আরও গভীর উদ্বেগ তৈরি করে। তাঁদের মতে, জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে দুর্ঘটনা ঘটলে অনেক মালিকপক্ষ প্রথমে ঘটনা আড়াল করার চেষ্টা করে। শ্রমিকের মৃত্যুর খবর গোপন রাখা, বাইরের মানুষকে ঢুকতে না দেওয়া, লাশ সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। ফেরদৌস স্টিলের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তাঁদের দল পৌঁছানোর আগেই স্থানীয় মানুষ বেশ কয়েকজন শ্রমিককে উদ্ধার করেছিলেন। এর আগে কী ঘটেছে, আরও লাশ সরানো হয়েছিল কি না, সে সম্পর্কে তাঁরা নিশ্চিত হতে পারেননি। ফলে তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত দুর্ঘটনার পর প্রথম দুই ঘণ্টার পূর্ণাঙ্গ ঘটনাক্রম বের করা।
শিল্প দুর্ঘটনার পর আমাদের পরিচিত একটি চিত্র দেখা যায়। তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা আসে, ক্ষতিপূরণের অঙ্ক নির্ধারণ হয়, কয়েক দিন সংবাদমাধ্যমে আলোচনা চলে। তারপর মানুষের মনোযোগ অন্যদিকে সরে যায়। সীতাকুণ্ডের ঘটনায় নিহত প্রত্যেক শ্রমিকের পরিবারকে বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে ১০ লাখ টাকা দেওয়ার ঘোষণা এসেছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তা অবশ্যই জরুরি। কিন্তু ক্ষতিপূরণকে কোনোভাবেই নিরাপত্তাহীন কর্মপরিবেশের বিকল্প হিসেবে দেখা যায় না। একজন শ্রমিকের জীবনের মূল্য একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকায় শেষ হয়ে যেতে পারে না। পরিবারটির উপার্জনক্ষম মানুষ হারানো, সন্তানের ভবিষ্যৎ, চিকিৎসা ব্যয়, দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং মানসিক ক্ষতও বিবেচনায় নিতে হবে।
এখানে রাষ্ট্রীয় তদারকির কার্যকারিতাও গভীর পর্যালোচনার বিষয়। একটি পুরোনো এলএনজিবাহী জাহাজ কোথা থেকে এসেছে, কী অবস্থায় আমদানি করা হয়েছে, কাটার অনুমোদনের আগে কোন সংস্থা পরীক্ষা করেছে, গ্যাসমুক্ত সনদ ছিল কি না, কর্মপরিকল্পনা অনুমোদিত হয়েছিল কি না, শ্রমিকদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম দেওয়া হয়েছিল কি না, জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা প্রস্তুত ছিল কি না, এসব তথ্য তদন্তে প্রকাশ করা দরকার। কাগজে অনুমোদন আর বাস্তব কর্মপরিবেশের মধ্যে ব্যবধান থাকলে দায় শুধু ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যুক্তিসংগত হবে না। দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিদর্শন ও নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার ভূমিকাও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
জাহাজভাঙা শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ। পুরোনো জাহাজ থেকে পাওয়া ইস্পাত দেশের নির্মাণশিল্পে বড় ভূমিকা রাখে। বিপুল সংখ্যক মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। অর্থনৈতিক গুরুত্বের যুক্তি তুলে শ্রমিকের নিরাপত্তায় ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। একটি শিল্প যত বড় অর্থনৈতিক অবদান রাখে, তার কর্মপরিবেশ তত বেশি নিরাপদ ও জবাবদিহিমূলক হওয়া উচিত। শ্রমিকের জীবনকে উৎপাদন ব্যয়ের একটি অদৃশ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বিশেষভাবে নজর দিতে হবে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণে। বদ্ধ জায়গায় প্রবেশ, গ্যাস শনাক্তকরণ, অক্সিজেনের মাত্রা পরীক্ষা, অগ্নিকাণ্ড, বিস্ফোরণ, রাসায়নিক বিষক্রিয়া এবং জরুরি উদ্ধার সম্পর্কে প্রত্যেক শ্রমিককে প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার। প্রয়োজনীয় গ্যাস ডিটেক্টর, রেসপিরেটর, অক্সিজেন সরঞ্জাম, সুরক্ষা পোশাক ও উদ্ধারব্যবস্থা ছাড়া কাউকে ঝুঁকিপূর্ণ জাহাজে প্রবেশ করতে দেওয়া উচিত না। প্রতিটি ইয়ার্ডে প্রশিক্ষিত জরুরি উদ্ধার দল, অ্যাম্বুলেন্স এবং নিকটবর্তী হাসপাতালের সঙ্গে তাৎক্ষণিক যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকা দরকার। বড় দুর্ঘটনার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে দুর্ঘটনার সম্ভাবনাই যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা অধিক কার্যকর।
ফেরদৌস স্টিলের ঘটনার তদন্ত তাই কেবল কারিগরি কারণ অনুসন্ধানের মধ্যে সীমিত রাখা ঠিক হবে না। জাহাজটি গ্যাসমুক্ত না করার দায় কার, কাজ শুরুর অনুমতি কে দিয়েছিলেন, নিরাপত্তা তদারকির দায়িত্বে কে ছিলেন, শ্রমিকদের কী সরঞ্জাম দেওয়া হয়েছিল, দুর্ঘটনার পর গেট কেন বন্ধ ছিল, ফায়ার সার্ভিসকে খবর দিতে এত সময় কেন লাগল, উদ্ধার কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি হয়েছিল কি না, এসবের সুনির্দিষ্ট উত্তর প্রয়োজন। তদন্ত প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করাও জরুরি। দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না হলে তদন্ত কমিটি শেষ পর্যন্ত প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।
নিহত নয়জন শ্রমিকের প্রত্যেকের পরিবার আছে, জীবনের অসমাপ্ত পরিকল্পনা আছে। দুই সহোদরের একই সঙ্গে মৃত্যু একটি পরিবারকে কতটা বিপর্যস্ত করেছে, তা ক্ষতিপূরণের অঙ্ক দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়। তাঁদের মৃত্যু আমাদের শিল্পায়নের একটি কঠিন হিসাব সামনে এনেছে। সস্তা শ্রম, দুর্বল তদারকি এবং নিরাপত্তায় ব্যয় কমিয়ে উৎপাদন চালানোর প্রবণতা বহাল থাকলে এমন মৃত্যুর পুনরাবৃত্তি থামানো কঠিন। সীতাকুণ্ডের এই নয়জন শ্রমিকের মৃত্যু তাই আরেকটি দুর্ঘটনার সংবাদ হয়ে হারিয়ে যেতে দেওয়া উচিত হবে না। তদন্তের ফল প্রকাশ, দায়ীদের শাস্তি, নিহত পরিবারগুলোর দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা, আহতদের পূর্ণ চিকিৎসা, সব শিপইয়ার্ডে স্বাধীন নিরাপত্তা নিরীক্ষা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জাহাজে কাজ শুরুর আগে কঠোর গ্যাসমুক্ত সনদ নিশ্চিত করা দরকার। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার তথ্য গোপনের চেষ্টা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে কঠোরভাবে মোকাবিলা করা প্রয়োজন। শিল্পের সাফল্য শুধু কত টন ইস্পাত পাওয়া গেল, কত টাকা আয় হলো, সেই হিসাবে বিচার করা যায় না। কর্মদিবস শেষে একজন শ্রমিক জীবিত ও সুস্থ অবস্থায় ঘরে ফিরতে পারছেন কি না, শিল্পের মানবিক মূল্য সেখানেই নির্ধারিত হয়।
মন্তব্য করুন

