ছবিঃ অনলাইন থেকে সংগৃহীত
প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৪৭ পিএম
গুমের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও মানবাধিকার আন্দোলনের পর রাষ্ট্রের কাছে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশাগুলোর একটি ছিল—আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বা নিরাপত্তা বাহিনীর হেফাজতে কোনো ব্যক্তি নিখোঁজ হলে তার দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকবে না। কিন্তু সুন্দরবনসংলগ্ন মোংলায় জেলে মিরাজ শেখের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা সেই প্রত্যাশার সামনে বড় প্রশ্ন তুলেছে।
৩০ বছর বয়সী মিরাজ শেখ গত ১০ এপ্রিল সন্ধ্যায় বাগেরহাটের মোংলার জয়মণির ঠোঁটা এলাকায় একটি চায়ের দোকান থেকে কয়েকজনের হাতে আটক হন। পরিবারের দাবি, তাঁকে কোস্টগার্ডের সদস্যরা ধরে নিয়ে যান। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যও সেই দাবিকেই সমর্থন করে; যা গণমাধ্যমের একাধিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কিন্তু চার মাস পরও মিরাজ কোথায়, তিনি আদৌ জীবিত আছেন কি না, কিংবা তাঁকে কোনো আইনগত প্রক্রিয়ায় আটক করা হয়েছিল কি না—এর কোনো সুস্পষ্ট উত্তর নেই।
কোস্টগার্ড অবশ্য মিরাজকে আটক বা নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, ২২ এপ্রিল যৌথ বাহিনীর অভিযানে মিরাজকে খোঁজা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। বাহিনী আরও বলছে, সুন্দরবনের একটি বনদস্যু চক্রের সঙ্গে মিরাজের যোগাযোগ ও সহযোগিতার অভিযোগ ছিল এবং তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। একই সঙ্গে বনদস্যুদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের সাথে তাঁর নিখোঁজ হওয়ার সম্ভাবনাও তদন্তে বিবেচনায় রয়েছে।
একদিকে পরিবারের অভিযোগ—কোস্টগার্ড তাঁকে ধরে নিয়ে গেছে; অন্যদিকে কোস্টগার্ড বলছে—তাঁকে তারা আটক করেনি। এই দুই দাবির মধ্যবর্তী জায়গাতেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—মিরাজ শেখ কোথায়?
আটকের অভিযোগ থেকে নিখোঁজ
ঘটনার সূত্রপাত ১০ এপ্রিল সন্ধ্যায়। জয়মণির ঠোঁটা এলাকার একটি চায়ের দোকানে মিরাজ শেখ বসে ছিলেন। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, কোস্টগার্ডের হারবাড়িয়া স্টেশন থেকে আসা নৌকায় দুজন সাদাপোশাকধারী ব্যক্তি এসে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করেন এবং তাঁকে জোর করে ধরে নিয়ে যান। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিরাজকে মারধর করা হয় এবং পরে তাঁকে জেটিতে নিয়ে কালো কাপড় বা কম্বল দিয়ে ঢেকে কোস্টগার্ডের স্পিডবোটে করে মোংলার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁর স্ত্রী মুক্তা খাতুন ঘটনাস্থলে গিয়ে এই দৃশ্য দেখেছিলেন বলে দাবি করেছেন।
এই বর্ণনা সত্য হলে, ঘটনাটি নিছক একজন ব্যক্তির নিখোঁজ হওয়া নয়। কোনো ব্যক্তিকে রাষ্ট্রীয় বাহিনী আটক করে থাকলে তাঁর আটকস্থল, আটকের কারণ, আইনগত ভিত্তি এবং পরবর্তী অবস্থান সম্পর্কে রাষ্ট্রের নথিবদ্ধ তথ্য থাকতে হবে। কিন্তু পরদিন, ১১ এপ্রিল, মিরাজের পরিবার যখন দিগরাজ কোস্টগার্ড কার্যালয়ে যায়, তখন প্রথমে তাঁকে আটক করার বিষয়টি অস্বীকার করা হয়। পরে তাঁর স্ত্রীকে বলা হয়, মিরাজকে নিয়ে অপারেশনে যাওয়া হয়েছে এবং বিকেলে গেলে তাঁকে দেখা যেতে পারে।
মিরাজের স্ত্রী দাবি করেছেন, কোস্টগার্ড কার্যালয়ের গেটে দাঁড়িয়ে তিনি সংশ্লিষ্ট সদস্যদের কথোপকথনেও শুনেছিলেন—মিরাজকে খাবার দিতে এবং তাঁকে নিয়ে অভিযানে যাওয়ার কথা বলা হচ্ছিল। কিন্তু বিকেলে পরিবার আবার গেলে, মিরাজকে আটকের কথা পুরোপুরি অস্বীকার করা হয়।
ঘটনা পরম্পরায় দেখতে গেলে এখানেই বড় খটকা। স্ত্রীর কাছে যদি কোস্টগার্ড বাহিনীর কার্যালয় থেকে বলা হয়ে থাকে মিরাজকে অভিযানে নেওয়া হয়েছে, তাহলে পরবর্তী সময়ে সেই বক্তব্যের কোনো নথি বা ব্যাখ্যা থাকা উচিত। আর যদি প্রথম বক্তব্যটি ভুল বা অসত্য হয়ে থাকে, তাহলে কে, কেন এবং কীভাবে পরিবারকে এমন তথ্য দিয়েছিল—সেটিও তদন্তের বিষয় হওয়া প্রয়োজন।
জিডিতে মিরাজ নিজের অজান্তে হারিয়ে গেছেন
মিরাজের পরিবার এরপর পুলিশের কাছে যায়। পরিবারের দাবি, প্রথমে সাধারণ ডায়েরি নেওয়া হয়নি। এর জন্য চারবার তাদেরকে থানায় যেতে হয়। শেষ পর্যন্ত ২৩ এপ্রিল জিডি গ্রহণ করা হয়। কিন্তু জিডির ভাষ্যতেও রয়েছে অসঙ্গতি। পরিবারের অভিযোগ, সেখানে কোস্টগার্ডের প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে লেখা হয় যে মিরাজ ‘নিজ বসতবাড়ির নিচে নিজের অজান্তে হারিয়ে গেছেন’। পুলিশের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হয়েছে, জিডিতে ‘অপহরণ’ বা ‘গুম’ শব্দ লেখা যায় না বলেই ভাষাটি এমন হয়েছে এবং পরিবারকে জোর করে এমন কিছু লিখতে বাধ্য করা হয়নি।
এখানে আইনগত ভাষার প্রশ্নের চেয়েও বড় বিষয় হলো—নিখোঁজ ব্যক্তির পরিবারের অভিযোগের মূল বক্তব্য কি জিডিতে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়েছে কি-না। যদি পরিবার নির্দিষ্টভাবে কোনো বাহিনী বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে সন্দেহ প্রকাশ করে থাকে, তাহলে সেটি তদন্তকারী সংস্থার নথিতে থাকার কথা। অভিযোগটি সত্য কি মিথ্যা, তা পরবর্তী তদন্তে নির্ধারিত হতে পারে। কিন্তু অভিযোগটিই যদি নথিতে না থাকে, তাহলে তদন্তের প্রাথমিক গতিপথই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
আর চারবার থানায় যাওয়ার পর জিডি গ্রহণের অভিযোগ সত্য হলে, সেটারও স্বাধীন তদন্ত হওয়া উচিত। একজন নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজে বের করার প্রথম ধাপই হলো দ্রুত অভিযোগ গ্রহণ এবং অনুসন্ধান শুরু করা; পরিবারে ভাষ্য অনুসারে যা এখানে লঙ্ঘিত হয়েছে।
মোটরসাইকেল: আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র
২১–২২ এপ্রিলের ঘটনা রহস্যকে আরও ঘনীভূত করেছে। মিরাজের মোটরসাইকেল যে দোকানে রাখা ছিল, সেখান থেকে কোস্টগার্ড পরিচয়ে একজন এসে সেটি নিয়ে যান এবং পরদিন ফেরত দেওয়া হয় বলে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদনসূত্রে আমরা জানতে পারি। এই ঘটনার সঙ্গে মিরাজের নিখোঁজ হওয়ার সরাসরি সম্পর্ক আছে কি না, তা এখনো প্রমাণিত নয়। কিন্তু তদন্তের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি সূত্র হতে পারে।
কে মোটরসাইকেলটি নিয়ে গিয়েছিল? তিনি সত্যিই কোস্টগার্ডের সদস্য ছিলেন কি না? কোনো লিখিত নির্দেশ বা জব্দতালিকা ছিল কি না? মোটরসাইকেলটি কেন নেওয়া হয়েছিল এবং কেনই বা পরদিন ফেরত দেওয়া হলো? এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে ১০ এপ্রিলের ঘটনার পর মিরাজের গতিবিধি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলতে পারে।
পরিবারের প্রতিবাদে নতুন সংকট
মিরাজকে খুঁজে না পাওয়ার পর পরিবার বিষয়টি প্রকাশ্যে আনার চেষ্টা করে। ৮ মে মোংলা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করা হয়। ১৪ মে তাঁর স্ত্রী মুক্তা খাতুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, কোস্টগার্ডের মহাপরিচালক, পুলিশ মহাপরিদর্শকসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে চিঠি পাঠান। ১৬ ও ১৭ মে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র সরেজমিনে তথ্যানুসন্ধান চালায়। পরিবার, প্রত্যক্ষদর্শী, পুলিশ ও কোস্টগার্ড কর্মকর্তাদের বক্তব্য নেওয়ার পর সংস্থাটি নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানায়।
৯ জুন মিরাজের সন্ধানের দাবিতে পরিবার ও গ্রামবাসী মানববন্ধন করেলে পরিস্থিতি নতুন করে জটিল হয়ে ওঠে। পরিবারের অভিযোগ, ওই সময় মিরাজের স্ত্রী ও বোন কোস্টগার্ডের হাতে মারধরের শিকার হন। এর দুই দিন পর, ১১ জুন স্থানীয় কিছু বাসিন্দা কোস্টগার্ডের হারবাড়িয়া স্টেশনে ঢুকে ভাঙচুর চালায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কোস্টগার্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে। কোস্টগার্ডের দাবি, এই হামলার পেছনে বনদস্যু ও তাদের সহযোগীদের সম্পৃক্ততা ছিল।
১২ জুন কোস্টগার্ডের করা মামলায় ৪৪ জনের নামসহ প্রায় ৩০০ জনকে আসামি করা হয়। মামলার প্রথম তিন আসামির মধ্যে ছিলেন মিরাজের স্ত্রী মুক্তা খাতুন, বোন লিজা ইসলাম ও মা তাসলিমা বেগম। তাঁদেরসহ ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ২৭ দিন কারাভোগের পর ৯ জুলাই তাঁরা জামিনে মুক্তি পান।
এখানে একটি বিষয় লক্ষ্য করার মতো, নিখোঁজ ব্যক্তির পরিবার যখন তাঁর সন্ধান চেয়ে প্রতিবাদ করছে, তখন সেই পরিবারের সদস্যরাই আরেকটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যাচ্ছেন। অর্থাৎ, নিখোঁজ মিরাজের সন্ধান প্রক্রিয়ায় পরিবারের ভূমিকাকে দুর্বল করে ফেলা হচ্ছে। অবশ্য কোস্টগার্ড স্টেশনে হামলা হয়ে থাকলে তার তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও নিশ্চিত করা জরুরি যে, নিখোঁজ মিরাজ শেখের পরিবার যেন উদেশ্যমূলকভাবে হয়রানি বা প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থার শিকার না হয়।
আদালতের হস্তক্ষেপ
২২ জুন মিরাজের বাবা মো. মোস্তফা শেখ হাইকোর্টে রিট করেন। তাঁর আবেদনের মূল উদ্দেশ্য ছিল—মিরাজকে বেআইনিভাবে আটক রাখা হয়নি, তা নিশ্চিত করতে তাঁকে আদালতে হাজির করা। ১২ জুলাই হাইকোর্ট স্বরাষ্ট্রসচিব, কোস্টগার্ডের মহাপরিচালক, পুলিশ মহাপরিদর্শক, র্যাবের মহাপরিচালক, বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারসহ নয়জন বিবাদীকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে মিরাজ শেখকে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেন। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও মিরাজকে আদালতে হাজির করা হয়নি। ফলে আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নের প্রশ্নটিও সামনে এসেছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার উদ্বেগ
২০ জুলাই হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মিরাজ শেখের ঘটনাকে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের প্রথম ‘সম্ভাব্য জোরপূর্বক গুমে’র ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিরাজ নিখোঁজ হওয়ার আগে সর্বশেষ কোস্টগার্ডের হেফাজতে দেখা গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাই তারা একই সঙ্গে স্বাধীন তদন্ত এবং জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিছে।
কোস্টগার্ডের বক্তব্যও তদন্তে আনতে হবে
মিরাজের পরিবারের অভিযোগের বিপরীতে কোস্টগার্ড বলছে, ২১ এপ্রিল তারা সামাদ নামে একজন কথিত বনদস্যুকে আটক করে। জিজ্ঞাসাবাদে সে পাঁচজনের নাম বলে, যাদের মধ্যে মিরাজের নাম ছিল। ২২ এপ্রিল যৌথ বাহিনীর অভিযানে ওই পাঁচজনের মধ্যে দুজনকে আটক করা হয় এবং মিরাজকেও খোঁজা হয়, কিন্তু তাঁকে পাওয়া যায়নি।
কোস্টগার্ড আরও দাবি করেছে, মিরাজ একটি বনদস্যু চক্রের সহযোগী হিসেবে যোগাযোগ, রসদ ও লজিস্টিক সহায়তা, কোস্টগার্ডের গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য আদান-প্রদান এবং জেলেদের কাছ থেকে মুক্তিপণের অর্থ সংগ্রহে যুক্ত ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কথাও তারা বলেছে। অভিযোগ সত্য হলে মিরাজের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কিন্তু সেখানেও মৌলিক আইনি প্রশ্ন একই: অভিযোগ থাকলে তাঁকে গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করা হলো না কেন? একজন অভিযুক্ত অপরাধী হলেও তার আইনগত অধিকার শেষ হয়ে যায় না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব তাকে গ্রেপ্তার করা, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উপস্থাপন করা এবং আদালতের মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত করা। নিখোঁজ হয়ে যাওয়া কোনোভাবেই আইনের বিকল্প হতে পারে না।
যে প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি
পুরো ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে বেশ কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসে।— ১০ এপ্রিল মিরাজকে আসলে কারা তুলে নিয়ে গিয়েছিল? তাঁকে যদি কোস্টগার্ড আটক না করে থাকে, তাহলে প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় কোস্টগার্ডের উপস্থিতির ব্যাখ্যা কী? ১১ এপ্রিল পরিবারকে কেন বলা হয়েছিল যে মিরাজকে নিয়ে অপারেশনে যাওয়া হয়েছে—যদি সত্যিই এমন কোনো আটক না হয়ে থাকে? ২১ এপ্রিল তাঁর মোটরসাইকেল কোস্টগার্ড পরিচয়ে কে নিয়ে গিয়েছিল? জিডিতে পরিবারের মূল অভিযোগ যথাযথভাবে লেখা হলো না কেন? কোস্টগার্ডের দাবি অনুযায়ী মিরাজের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপের নথি কোথায়? ২২ এপ্রিলের যৌথ অভিযানের সরকারি নথিতে মিরাজ সম্পর্কে কী তথ্য রয়েছে? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—মিরাজ শেখ এখন কোথায়?
এটি সাধারণ কোনো নিখোঁজের ঘটনা নয়
মিরাজ শেখের ঘটনা শুধু একজন জেলের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নয়। এটি রাষ্ট্রীয় বাহিনীর জবাবদিহি, আইনের শাসন এবং গুমবিরোধী রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতির একটি পরীক্ষাও। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে গুমের অভিযোগ একটি গভীর রাজনৈতিক ও মানবাধিকার সংকট তৈরি করেছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের পর নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল—আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ করা এবং নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করা। এই প্রেক্ষাপটে মিরাজ শেখের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নতুন করে শঙ্কা তৈরি করে। আর যদি অভিযোগটি সত্য না হয়, তাহলেও সেটি দ্রুত প্রমাণ করা সরকারের দায়িত্ব। অর্থাৎ, দুই ক্ষেত্রেই স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন।
প্রয়োজন স্বচ্ছ ও স্বাধীন তদন্ত
মিরাজ শেখের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখন পর্যন্ত যে তথ্যগুলো সামনে এসেছে, তাতে একাধিক পরস্পরবিরোধী বক্তব্য রয়েছে। পরিবার এক ধরনের দাবি করছে, কোস্টগার্ড আরেক ধরনের বক্তব্য দিচ্ছে। পুলিশি নথি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। আদালত মিরাজকে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছেন। মানবাধিকার সংস্থাগুলো স্বাধীন তদন্ত দাবি করেছে। এই অবস্থায় ১০ এপ্রিলের পুরো ঘটনা, মিরাজকে আটক করার অভিযোগ, কোস্টগার্ডের সংশ্লিষ্ট সদস্যদের পরিচয়, নৌযান চলাচলের রেকর্ড, অভিযানের নথি, থানায় পরিবারের যাতায়াত, জিডি গ্রহণের প্রক্রিয়া, ২১–২২ এপ্রিল মোটরসাইকেল নেওয়ার ঘটনা এবং ১১ জুনের কোস্টগার্ড স্টেশনে হামলার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ তদন্তের আওতায় আনা জরুরি।
একই সঙ্গে মিরাজের বিরুদ্ধে কোস্টগার্ড যে অভিযোগ করেছে, সেগুলোরও স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন। তাঁর বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকলে সেগুলোর নথি প্রকাশ এবং তিনি কেন আদালতে হাজির হননি—তার ব্যাখ্যাও প্রয়োজন। মিরাজ শেখ অপরাধী হলে তাঁকে আইনের আওতায় এনে বিচার করতে হবে। কিন্তু তার আগে তাঁকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। আর যদি তিনি রাষ্ট্রীয় হেফাজতে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে থাকেন, তাহলে দায়ীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে বর্তমান সরকারের নৈতিক দায়িত্ব।
মন্তব্য করুন

