Logo

৯ ভাদ্র ১৪৩৩

×

Follow Us

রাতটা কার?

ছবিঃ অনলাইন থেকে সংগৃহীত

মত-দ্বিমত

রাতটা কার?

আনিয়া খান

Icon

ক্যাম্পাস ডেস্ক

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬, ০৯:২৫ পিএম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের হলের গেট রাত দশটার পর বন্ধ হয়ে যায় কথাটা শুনতে খুবই সাধারণ লাগে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম, নিরাপত্তার জন্য নিয়ম এভাবেই হয়তো আমরা বিষয়টাকে পাশ কাটিয়ে যাই। কিন্তু কিছু নিয়ম আছে, যেগুলো বাইরে থেকে যত সাধারণ মনে হয়, ভেতরে ততটা সাধারণ নয়। একটি গেট কখন বন্ধ হবে, কে কখন ঢুকবে, কে কোন হলে যেতে পারবে এসবের মধ্যেও আসলে একটি সমাজের নারীদের সম্পর্কে ধারণা লুকিয়ে থাকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পড়ে, তারা স্কুলের ছাত্রী নয়। তারা প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ। তারা রাষ্ট্র নিয়ে পড়ে, সমাজ নিয়ে পড়ে, স্বাধীনতা নিয়ে পড়ে, গণতন্ত্র নিয়ে পড়ে। তারা থিয়েটার করে, সিনেমা বানায়, সাংবাদিকতা করে, গবেষণা করে, রাজনীতি করে। তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বয়সে পৌঁছেছে। অথচ একজন নারী কখন হলে ফিরবেন, কখন বাইরে থাকবেন, অন্য কোনো হলে যাবেন কি না এই জায়গায় এসে যেন হঠাৎ তাঁর প্রাপ্তবয়স্কতাটা কোথায় হারিয়ে যায়।

একজন ছেলে রাত করে ফিরলে সে নিজের দায়িত্ব বোঝে। একজন মেয়ে রাত করে ফিরলে তার হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠান দাঁড়িয়ে যায়। কেন? প্রশ্নটা রাত দশটার নয়। প্রশ্নটা হলো একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী নিজের সময় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কতটুকু রাখেন?

হুমায়ূন আজাদের নারী বইয়ে একটা লাইন আছে , “নারীর ওপর এতো অভিভাবকত্ব করা হয় যে তাকে অনেকটা চিরশিশু ক’রে রাখা হয়।” কথাটা আমাদের সমাজের দিকে তাকালে আজও অস্বস্তিকরভাবে সত্যি মনে হয়। আমরা নারীকে শিক্ষিত করি, কিন্তু তাকে নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া বন্ধ করি না। তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাই, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কখন ফিরবে তা ঠিক করে দিই। তাকে রাষ্ট্র নিয়ে কথা বলতে দিই, কিন্তু নিজের শরীর, নিজের সময়, নিজের চলাচল নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে গেলে তাকে আবার পাহারার মধ্যে নিয়ে আসি। এটা শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের সমস্যা নয়। এটা আমাদের সমাজের নারীদের দেখার একটা পুরোনো অভ্যাস।

নিরাপত্তার কথা বলা হয়। অবশ্যই নিরাপত্তা দরকার। রাস্তায় হয়রানি আছে, সহিংসতা আছে, ধর্ষণের ভয় আছে। কিন্তু নিরাপত্তার সমাধান যদি হয় “মেয়েরা রাতে বাইরে থাকবে না”তাহলে আমরা আসলে কী করলাম? অপরাধীকে থামালাম না, রাস্তা নিরাপদ করলাম না, বরং মেয়েটির চলাচল কমিয়ে দিলাম।
যে রাস্তা একজন নারীকে ভয় দেখায়, সেই রাস্তা নিরাপদ করার দায়িত্ব কার? যে পুরুষ একজন নারীকে হয়রানি করে, তাকে থামানোর দায়িত্ব কার? যে প্রতিষ্ঠান অভিযোগ পেয়েও ব্যবস্থা নেয় না, তাকে জবাবদিহির মধ্যে আনার দায়িত্ব কার? নারীর? না। রাষ্ট্রের, প্রতিষ্ঠানের, সমাজের।


ছবিঃ অবরোধবাসিনী ফেইসবুক পেইজ থেকে 

একজন নারীকে ঘরে আটকে রেখে নিরাপদ রাখা খুব সহজ। কঠিন কাজ হলো এমন একটি সমাজ তৈরি করা, যেখানে সে রাতেও বাইরে থাকবে এবং নিরাপদে বাড়ি ফিরবে। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত আটকে থাকে না। থিয়েটারের মহড়া রাতে হয়। চলচ্চিত্রের শুটিং রাতে হতে পারে। সাংবাদিকতার কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। গবেষণারও নেই। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, রাজনৈতিক কর্মসূচি, সংগঠনের কাজ এসবের কোনো ঘড়ি নেই। একজন শিক্ষার্থীর কাজ যদি রাত পর্যন্ত গড়ায়, তাহলে তার নারী পরিচয়টি কেন হঠাৎ তার শিক্ষার চেয়ে বড় হয়ে উঠবে?

একজন থিয়েটারের ছাত্রী রাত পর্যন্ত মহড়া করলে সে কি কম শিক্ষার্থী হয়ে যায়?
একজন সাংবাদিকতার ছাত্রী রাতে সংবাদ সংগ্রহ করলে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকার কি সূর্যাস্তের সঙ্গে শেষ হয়ে যায়? একজন চলচ্চিত্রের ছাত্রী রাতের শুটিং করে ফিরলে তার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কি আর তার থাকে না? আর সবাই তো আবাসিকও নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যখন প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে আবাসন দিতে পারে না, তখন অন্তত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরের জায়গাগুলো কি তাদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে না? একজন অনাবাসিক নারী নিজের পরিচয়পত্র দেখিয়েও নিজের হলে ঢুকতে পারেন না, অন্য হলে যেতে পারেন না; মা বা বোন এসে দেখা করতে গেলেও নানা বিধিনিষেধ। 

দিনের শেষে একটু সাশ্রয়ী খাবার খাওয়ার জন্যও যদি হলের ভেতরে ঢোকা কঠিন হয়, তাহলে আবাসন না দিতে পারার দায়টুকুও কি শিক্ষার্থীর ওপরই পড়ে? কারণ অর্থনৈতিক বাস্তবতাও আছে। বাইরে প্রতিদিন খাওয়া সবার পক্ষে সম্ভব নয়। হলের খাবার তুলনামূলক সাশ্রয়ী। কারও কাছে বাইরে একবেলা খাওয়ার অতিরিক্ত টাকা তেমন কিছু নয়, কারও কাছে সেটাই দিনের হিসাব নষ্ট করে দেয়। ফলে একটি ‘নিরাপত্তার নিয়ম’ কখনো কখনো শ্রেণিগত বৈষম্যও তৈরি করে।

এখানে একটা খুব সাধারণ কথা মনে রাখা দরকার একই নিয়ম সবার ওপর প্রয়োগ করলেই তার প্রভাব সবার ওপর সমান হয় না। কেউ যদি বলে, “রাত দশটার পর হলে না ঢুকলে কী এমন হয়?” তাহলে উত্তরটা খুব সহজ। সবার জীবন এক নয়। সবার কাজ এক নয়। সবার অর্থনৈতিক অবস্থাও এক নয়। বিশ্ববিদ্যালয় যদি সত্যিই সবার হয়, তাহলে সেই বৈচিত্র্যের জায়গাটুকুও তাকে রাখতে হবে। আর feminism-এর জায়গা থেকে প্রশ্নটা আরও সরল।

নারীর হয়ে তার জীবনের সিদ্ধান্ত নেবে কে? Simone de Beauvoir লিখেছিলেন, “One is not born, but rather becomes, a woman.” সমাজ একজন নারীকে প্রতিদিন একটু একটু করে শেখায় কোথায় যাবে, কখন ফিরবে, কী পরবে, কার সঙ্গে থাকবে, কতটা রাত পর্যন্ত বাইরে থাকা তার জন্য ‘উচিত’। একসময় বাইরের পাহারাটা আর দরকার হয় না; নারী নিজেই নিজের চারপাশে দেয়াল তুলতে শুরু করে। এই দেয়ালটাকেই প্রশ্ন করা দরকার।

কেউ রাত দশটায় হলে ফিরতে চাইলে ফিরবেন। কেউ রাত বারোটায় ফিরতে চাইলে ফিরবেন। কেউ রাত করে বাইরে থাকতে না চাইলে থাকবেন না। স্বাধীনতার অর্থ সবাইকে রাত জাগতে বাধ্য করা নয়; স্বাধীনতার অর্থ হলো নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার সুযোগ থাকা। এমনকি কোনো নারী যদি মনে করেন রাত দশটার পর হলে থাকা তাঁর জন্য নিরাপদ বা স্বস্তিকর নয়, তাঁর সেই সিদ্ধান্তও সমানভাবে সম্মান করতে হবে। কারণ নারীবাদ নারীদের জন্য একটি নির্দিষ্ট জীবনযাপন চাপিয়ে দেয় না। নারীবাদ শুধু বলে নারীর জীবনের সিদ্ধান্তে নারীর নিজের কণ্ঠটি থাকতে হবে।

এখানে পুরুষের বিরুদ্ধেও কোনো যুদ্ধ নেই। অনেক পুরুষ এই দাবির পাশে দাঁড়াবেন, অনেক নারীও হয়তো বলবেন যে রাত দশটার পর গেট খোলা রাখার প্রয়োজন নেই। সেটিও তাঁদের মত। কিন্তু একজনের ব্যক্তিগত স্বস্তি অন্যজনের স্বাধীনতার সীমা হয়ে যেতে পারে না। কারণ স্বাধীনতা মানে নিজের পছন্দের জীবন বেছে নেওয়া; অন্যের পছন্দের জীবন বেছে নেওয়া নয়।
জুলাই আমাদের এই প্রশ্নটি আরও তীব্রভাবে মনে করিয়ে দিয়েছে। যে মেয়েরা রাতের রাস্তায় নেমেছিল, মিছিল করেছে, প্রতিবাদ করেছে, ভয়কে অতিক্রম করেছে সেই নারীদের আমরা সাহসী বলেছি। ইতিহাসের অংশ করেছি। কিন্তু আন্দোলনের সময় যে রাত নারীর জন্য সাহসের জায়গা হতে পারে, স্বাভাবিক সময়ে সেই রাতই কেন তার জন্য নিষেধের জায়গা হবে? নারীর সাহস কি শুধু রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দরকার? নিজের জীবনের ক্ষেত্রেও কি তার সেই স্বাধীনতা থাকবে না?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের অন্যতম সর্বোচ্চ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এখানে একজন নারীকে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ হিসেবে দেখাটা কোনো বাড়তি দাবি নয়। সে ভুল করতে পারে, নিজের সিদ্ধান্ত নিতে পারে, ঝুঁকি বুঝতে পারে, নিজের জন্য সতর্ক হতে পারে। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার অর্থ ঝুঁকিহীন হয়ে যাওয়া নয়; নিজের সিদ্ধান্তের দায়িত্ব নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করা। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ সেই সক্ষমতাকে অস্বীকার করা নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ মানুষকে স্বাধীন চিন্তার মানুষ করে তোলা। তাই নারীর নিরাপত্তা চাই অবশ্যই। কিন্তু সেই নিরাপত্তার নামে তার পৃথিবী ছোট করে দিতে চাই না। 

আলো চাই, নিরাপদ রাস্তা চাই, নিরাপদ পরিবহন চাই, কার্যকর নিরাপত্তা চাই, যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চাই, অভিযোগের জবাবদিহি চাই, আবাসন চাই। কিন্তু এর কোনোটি নারীর চলাচল বন্ধ করার বিকল্প হতে পারে না। কারণ নারীকে ঘরে রেখে নিরাপদ রাখা যায়। কিন্তু তাকে স্বাধীন রাখা যায় না।

আমরা এমন নিরাপত্তা চাই না, যেখানে নিরাপদ থাকার একমাত্র শর্ত হলো কম বের হওয়া। আমরা এমন একটা বিশ্ববিদ্যালয় চাই, যেখানে একজন নারী রাত দশটায় ফিরতে চাইলে ফিরবেন, আবার রাত বারোটায় ফিরতে হলেও তাঁর পথ বন্ধ থাকবে না। যেখানে দরজা খোলা থাকবে, কিন্তু নিরাপত্তাও থাকবে। যেখানে একজন নারীকে রক্ষা করার নামে তাকে ছোট করা হবে না। যেখানে তাকে বলা হবে না "তুমি মেয়ে, তাই সাবধানে থেকো।”বরং রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠান বলবে“তুমি মানুষ। তোমার চলার অধিকার আছে। তোমাকে নিরাপদ রাখার দায়িত্ব আমাদের।”কারণ রাতটা কোনো পুরুষের সম্পত্তি নয়।

মন্তব্য করুন

Logo