ছবিঃ অনলাইন থেকে সংগৃহীত
শিশুর প্রতি সহিংসতার সংস্কৃতি
প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬, ১২:২০ এএম
‘চোরের অপবাদ দিয়া গাছের সঙ্গে বাঁইধা আমারে মারধর করছে। মুখে গামছা প্যাঁচাইয়া সেখানে গরম পানি ঢাইলা আমারে নির্যাতন করে।’ গত ১১ আগস্ট, মঙ্গলবার, চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণের গোবিন্দপুরে ১৭ বছর বয়সের তারেকের মুখ থেকে বের হওয়া এই কথাগুলো কেবল একজন কিশোরের নির্যাতনের বর্ণনা নয়, এই কথাগুলো আমাদের সমাজে শিশুর প্রতি গড়ে ওঠা ভয়ংকর মানসিকতার প্রতিচ্ছবি। চুরির অভিযোগে তারেককে বাড়ি থেকে ডেকে এনে গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর করা হয়েছে। তার মুখে গামছা পেঁচিয়ে মধ্যযুগীয় বর্বরতায় গরম পানি ঢালা হয়েছে এবং জোর করে তারেকের কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তারেকের মা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে ছেলেকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য অনুনয়-বিনয় করলেও নির্যাতন থামেনি। পরে অসুস্থ হয়ে পড়লে তারেককে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
এই ঘটনার ভয়াবহতা শুধু মুখে গামছা পেঁচিয়ে গরম পানি ঢালার মধ্যে নয়। ভয়াবহতা হলো- একজন কিশোরকে অপরাধী মনে হলেই আমরা তাকে মানুষ হিসেবে দেখার অধিকার হারিয়ে ফেলি। আদালত আছে, পুলিশ আছে, আইন আছে, কিন্তু আমরা তার বদলে গাছকে আদালত, দড়িকে হাতকড়া আর নির্যাতনকে জিজ্ঞাসাবাদের পদ্ধতি বানিয়ে ফেলি। অভিযোগ সত্য হলেও কোনো শিশুকে এভাবে শাস্তি দেওয়ার অধিকার কারও নেই। আর অভিযোগ মিথ্যা হলে এই নির্যাতন হয়ে ওঠে আরও ভয়ংকর অন্যায়।
দুঃখজনক হলো, তারেকের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। চলতি বছরই চট্টগ্রামের আনোয়ারায় মাল্টা চুরির অভিযোগে ১০ আর ১৫ বছর বয়সের দুইজন শিশুকে গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর করা হয়েছে এবং সেই নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করে সোস্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছে। তাতে একবার তারা শারীরিকভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছে আবার ওই একই ঘটনায় তাদের সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়েছে। অপমান করে মানসিকভাবে পর্যুদস্ত করে ফেলেছে। একইভাবে নেত্রকোনার মদনে মুঠোফোন চুরির অভিযোগে দুইজন শিশুকে নারকেলগাছে বেঁধে নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু সহিংসতার স্থান শুধু রাস্তা, গাছতলা কিংবা কথিত ‘চোর ধরার’ জায়গা নয়। শিশুর সবচেয়ে কাছের নিরাপদ স্থান- ঘরও অনেক সময় তার জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। নরসিংদীতে দুই মাস বয়সী একজন শিশুর পা মুচড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার চাচির বিরুদ্ধে। শিশুর মা গোপনে ভিডিও ধারণ না করলে ঘটনাটি হয়তো জানাই যেত না। পারিবারিক বিরোধের সঙ্গে শিশুর ওপর নির্যাতনের সম্পর্কের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জয়পুরহাটে ১১ বছরের একজন মাদ্রাসাছাত্রীর শরীরজুড়ে কালশিটে দাগ নিয়ে থানায় যাওয়ার ঘটনা আমাদের আরেকটি বাস্তবতা মনে করিয়ে দেয়। মাদ্রাসার পরিচালকের বিরুদ্ধে বেত্রাঘাতের অভিযোগ ওঠে এবং সেই শিশু বাবাকে বলেছে, "আমাকে আর ওই মাদ্রাসায় পাঠিয়ো না।" আবার শিশু গৃহকর্মীদের ক্ষেত্রেও নির্যাতনের চিত্র ভয়াবহ। কোথাও গরম খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়ার অভিযোগ, কোথাও দীর্ঘদিন মারধরের অভিযোগ, কোথাও নির্যাতনের পর মৃত্যুর অভিযোগ পর্যন্ত পাওয়া গেছে। এসব ঘটনা সংবাদপত্রের বিচ্ছিন্ন শিরোনাম নয়, এগুলো বৃহত্তর সংকটের ছোট ছোট খোপ।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (ASK) ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত হিসাব সেই সংকটের বিভীষিকাময় চিত্র সামনে আনে। এই ছয় মাসে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও নিজস্ব অনুসন্ধানের ভিত্তিতে শিশুদের ওপর সহিংসতার ৪৯০টি ঘটনা নথিভুক্ত করেছে ASK, এসব ঘটনায় ২৮২টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের ঘটনা ১৯২টি, ধর্ষণের চেষ্টা ১০৫টি, শিক্ষকের হাতে শিক্ষার্থী নির্যাতনের ঘটনা ৩৪টি, শারীরিক নির্যাতন ২৫টি, ছেলেশিশু ধর্ষণ ৩৪টি এবং যৌন হয়রানির ঘটনা ২৭টি।
এই হিসাবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- এগুলো কোনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি জরিপ নয়। সংবাদপত্র ও অন্যান্য উৎসে প্রকাশিত ঘটনা ধরে ASK হিসাব করেছে। অর্থাৎ প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশংকাই প্রবল। কারণ শিশুর ওপর সহিংসতার বড় অংশ ঘটে ঘরের ভেতরে, পরিচিত মানুষের হাতে এবং সামাজিক চাপ, ভয়, লজ্জা কিংবা পারিবারিক সম্পর্ক রক্ষার অজুহাতে তা প্রকাশ্যে আসে না।
জাতীয় পর্যায়ের তথ্যও আমাদের স্বস্তি দেয় না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের ২০২৫ সালের Multiple Indicator Cluster Survey বা MICS অনুযায়ী, ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী ৮৫ দশমিক ৭ শতাংশ শিশু গত এক মাসে কোনো না কোনো ধরনের সহিংসতার অভিজ্ঞতা পেয়েছে। অর্থাৎ প্রায় প্রতি ১০ জন শিশুর ৮ জনের বেশি মারধর, মানসিক আগ্রাসন বা অন্য কোনো সহিংস ঘটনার মুখোমুখি হয়েছে। একই জরিপে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের ৯ দশমিক ২ শতাংশ শিশুশ্রমে যুক্ত এবং ২০-২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭ দশমিক ২ শতাংশ ১৮ বছরের আগে বিয়ে হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, শিশুর প্রতি আমাদের এই সহিংসতা আসে কোথা থেকে!
প্রথম কারণ, আমরা এখনো সহিংসতাকে শাসন মনে করি। ‘মার না দিলে মানুষ হবে না’, ‘একটু পিটিয়েছি’, ‘ভয় দেখালে কথা শুনবে’- এ ধরনের বাক্য আমাদের সামাজিক ভাষার অংশ। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্পষ্ট করে বলছে, শারীরিক শাস্তির কোনো ইতিবাচক ফল নেই। বরং এর সঙ্গে আচরণগত সমস্যা, আগ্রাসন, মানসিক অসুস্থতা, শিক্ষায় পিছিয়ে পড়া এবং পরবর্তী জীবনে সহিংস আচরণের সম্পর্ক আছে। এমনকি হালকা শারীরিক শাস্তিও আরও গুরুতর নির্যাতনে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
দ্বিতীয় কারণ, ক্ষমতার অসম সম্পর্ক। শিশু ছোট, নির্ভরশীল এবং প্রতিবাদ করার ক্ষমতা কম। ফলে যে প্রাপ্তবয়স্ক জানে সে শিশুর চেয়ে শারীরিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে শক্তিশালী, সে সহজেই সেই ক্ষমতার অপব্যবহার করতে পারে। WHO-এর বিশ্লেষণেও শিশুর ওপর নির্যাতনের ঝুঁকির সঙ্গে অভিভাবকের নিজের শৈশবে নির্যাতিত হওয়ার অভিজ্ঞতা, শিশুর বিকাশ সম্পর্কে অজ্ঞতা, অবাস্তব প্রত্যাশা, অর্থনৈতিক চাপ, মাদকাসক্তি, পারিবারিক সহিংসতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও সহিংসতাকে স্বাভাবিক মনে করার সংস্কৃতির সম্পর্ক পাওয়া যায়।
তৃতীয় কারণ, দারিদ্র্য ও সামাজিক বৈষম্য। দারিদ্র্য নিজে কাউকে নির্যাতনকারী বানায় না, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী আর্থিক চাপ, অনিরাপত্তা, শিশুশ্রম, গৃহকর্মে শিশুর ব্যবহার এবং পরিবারে মানসিক চাপ সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ায়। সবচেয়ে অসহায় শিশুরাই তখন সবচেয়ে কম সুরক্ষা পায়।
চতুর্থ কারণ, নীরবতা। দুই মাস বয়সের শিশুর ক্ষেত্রে গোপন ক্যামেরা না থাকলে হয়তো নির্যাতন ধরা পড়ত না। মাদ্রাসার সেই শিশু নিজে বাবাকে না বললে ঘটনা প্রকাশ পেত না। গৃহকর্মী শিশুরা তো প্রায়ই এমন পরিবারে থাকে যেখানে তাদের নিজের বাবা-মায়ের কাছেও অভিযোগ পৌঁছানো কঠিন। UNICEF বলছে, শিশুর ওপর সহিংসতার বৃহৎ অংশ অদৃশ্য থেকে যায়, কারণ অনেক সময় তা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য ‘শাসন’ হিসেবে বিবেচিত হয় এবং শিশুরা ভয় বা বয়সের কারণে ঘটনাটি প্রকাশ করতে পারে না। তাই সমাধানও শুধু অপরাধী গ্রেপ্তারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।

প্রথমত, শিশুকে মারধর বা অপমান করাকে শাসন হিসেবে গ্রহণ করার সামাজিক সংস্কৃতি বদলাতে হবে। বাবা-মা, শিক্ষক, মাদ্রাসাশিক্ষক, গৃহকর্তা- সবার জন্য ইতিবাচক ও অহিংস শিশুবিকাশ, শিশুর যত্ন ও লালনপালন প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। WHO বলছে, আইন করার পাশাপাশি অভিভাবক ও শিক্ষকদের ইতিবাচক শাসনপদ্ধতি শেখানো এবং সামাজিক মূল্যবোধ পরিবর্তনের উদ্যোগ নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, স্কুল ও মাদ্রাসায় Child Safeguarding Policy বাধ্যতামূলক করতে হবে। কোনো শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠান শিশুকে মারধর করলে ‘প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বিষয়’ হিসেবে তা মিটিয়ে ফেলার সুযোগ থাকা উচিত নয়। অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত, শিশুর নিরাপত্তা, অভিভাবককে অবহিত করা এবং প্রয়োজনে পুলিশের কাছে পাঠানোর সুস্পষ্ট ব্যবস্থা থাকতে হবে।
তৃতীয়ত, শিশু নির্যাতনের অভিযোগে স্থানীয় সালিশ বন্ধ করতে হবে। তারেকের মতো কোনো শিশুকে চোর মনে হলে তার বিচার করার অধিকার এলাকাবাসীর নেই। অভিযোগ তদন্ত করবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিচার করবে আদালত। সামাজিক বিচার বা গণপিটুনি কোনো বিচারব্যবস্থা নয়।
চতুর্থত, প্রত্যেক ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে কার্যকর শিশু সুরক্ষা নেটওয়ার্ক ও প্রশিক্ষিত সমাজকর্মী প্রয়োজন। শুধু ঢাকায় বা জেলা শহরে সেবা থাকলে হবে না। যে শিশু নির্যাতিত হচ্ছে, তার বাড়ির কাছেই যেন এমন একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি থাকেন যিনি জানেন কোথায় অভিযোগ করতে হবে, কোথায় চিকিৎসা করাতে হবে এবং কীভাবে শিশুকে নিরাপদে সরিয়ে নিতে হবে।
পঞ্চমত, ১০৯৮ নম্বর চাইল্ড হেল্পলাইনকে আরও পরিচিত ও সহজলভ্য করতে হবে। এটা বিনা মূল্যের ও গোপনীয় সেবা, প্রশিক্ষিত কাউন্সেলরের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সুরক্ষা ও অন্যান্য সেবায় রেফার করার ব্যবস্থা রয়েছে। সবশেষে দরকার সবচেয়ে কঠিন পরিবর্তন- আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন।
চুরি করেছে কিনা, কথা শুনেছে কিনা, পড়া পারেনি কিনা, দুষ্টুমি করেছে কিনা- কোনো কারণেই শিশুকে গরম পানি ঢেলে দেওয়া যায় না, গাছে বেঁধে রাখা যায় না, বেত দিয়ে পেটানো যায় না, খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়া যায় না। কারণ শিশু অপরাধ করলেও সে মানুষ, আর অপরাধ না করলেও সে মানুষ। তার অধিকার কোনো অভিযোগ, কোনো রাগ, কোনো পারিবারিক বিরোধের কাছে বন্ধক রাখা যায় না।
গোবিন্দপুরে গাছের সঙ্গে বাঁধা তারেকের শরীরের ক্ষত হয়তো একদিন শুকিয়ে যাবে। কিন্তু আমরা তাকে যে ভয় দেখিয়েছি, যে অপমান করেছি, যে সমাজের হাতে তাকে অসহায় করে দিয়েছি- সেই স্মৃতি যদি তার ভেতরে থেকে যায়, তাহলে ক্ষত শুকোলেও সহিংসতার দাগ থেকে যাবে। একজন শিশুকে নিরাপদ রাখা কেবল তার পরিবারের দায়িত্ব নয়। রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব, বিদ্যালয়ের দায়িত্ব, সমাজের দায়িত্ব- সবশেষে আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব। শিশু সুরক্ষার অর্থ শুধু একজন শিশুকে বাঁচানো নয়, সহিংসতার উত্তরাধিকার থেকে পুরো সমাজকে বাঁচানো। শিশুর প্রতি সহিংসতার সংস্কৃতি পুরোপুরি বন্ধ করা। শিশুবান্ধব সমাজ গড়ে তুলতে সর্ব অবস্থায় শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
মন্তব্য করুন

