Logo

৯ ভাদ্র ১৪৩৩

×

Follow Us

আসল মাইর, নকল মাইর

মত-দ্বিমত

আসল মাইর, নকল মাইর

চিররঞ্জন সরকার

চিররঞ্জন সরকার

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৫৮ পিএম

রাজনীতিতে মাইরও এখন আর একরকম নেই। নকল মাইর আছে, আসল মাইর আছে, ডেমো মাইর আছে, ট্রেলার মাইর আছে, আবার মাইর আসছে বলে আগাম প্রেস বিজ্ঞপ্তিও আছে। কোনটা কখন শুরু হয়, আর কোনটা শেষ হয়, তার হিসাব অবশ্য সাধারণ মানুষের পক্ষে করা কঠিন। কারণ জনগণ এত দিন ভেবেছিল রাজনীতিতে মারামারি মানে লাঠি, ঘুষি, চেয়ার, টেবিল, ইটপাটকেল ইত্যাদি। এখন বোঝা যাচ্ছে, মুখের কথাও মাইর। এমন মাইর, শরীরে দাগ পড়ে না, কিন্তু টেলিভিশনের টক শো, ফেসবুক পোস্ট আর ইউটিউবের থাম্বনেইলে দিব্যি দাগ রেখে যায়।

এই নতুন মাইর তত্ত্বের সর্বশেষ অধ্যায় লিখেছেন দিনাজপুর-১ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য মনজুরুল ইসলাম। নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশ কনস্যুলেটের এক সুধী সমাবেশে তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে নিয়ে বলেছেন, পাটওয়ারীর ওপর মার শুরু হয়েছে কেবল, আসল মার তো শুরুই হয়নি। তিনি আরও বলেছেন, একজন এমপি হিসেবেই বলছি, ভবিষ্যৎ অনেক কঠিন তার জন্য।

একজন উঠতি রাজনীতিবিদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন ভবিষ্যদ্বাণী সত্যিই বিরল! বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন জ্যোতিষীর অভাব নেই, কেবল রাশিফল ছাপার কাগজটাই একটু কম। কেউ বলেন সময় কঠিন, কেউ বলেন দিন ঘনিয়ে এসেছে, কেউ বলেন খেলা হবে, কেউ বলেন খেলা শেষ। এখন নতুন সংযোজন, মাইর শুরু হয়েছে, আসল মাইর পরে।

এখানে সাধারণ মানুষের একটা প্রশ্ন থাকতে পারে। ভাই, এই যে মাইর শুরু হয়েছে, সেটা কোন মাইর? আর আসল মাইর বলতে কী বোঝানো হচ্ছে? নাকি রাজনীতিতে মাইরেরও প্যাকেজ আছে? যেমন মোবাইল কোম্পানির মিনিট প্যাকেজ। প্রথমে ১০ মিনিট নকল মাইর ফ্রি, তারপর ১০০ মিনিট আসল মাইর। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ব্যবহার না করলে মাইর বাতিল। আবার প্রিমিয়াম গ্রাহকদের জন্য হয়তো আনলিমিটেড মাইর!

রাজনীতিবিদদের ভাষা আজকাল এমন এক পর্যায়ে গেছে যে অভিধান খুললে অভিধানও লজ্জা পায়। মাইর মানে মার, মার মানে আঘাত, আঘাত মানে চাপ, চাপ মানে রাজনৈতিক চাপ, রাজনৈতিক চাপ মানে জনগণের চাপ, আবার জনগণের চাপ মানে ভোট। সবশেষে দেখা যায়, যার ওপর মাইর পড়ার কথা ছিল, সে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে আর যার ভোট দেওয়ার কথা, সে বাজারে আলুর দাম দেখে নিজের মাথায় হাত দিচ্ছে।

আমাদের রাজনীতিতে কথার মাইর অবশ্য নতুন নয়। আগে বলা হতো, কোমর ভেঙে দেব। পরে বলা হলো, ঘর থেকে বের হতে দেওয়া হবে না। তারপর এলো খেলা হবে। তারও পরে এল কঠিন সময়। এখন মনে হচ্ছে, কঠিন সময়েরও কঠিন সময় আসছে। যেন রাজনৈতিক আবহাওয়ার পূর্বাভাস: আজ আংশিক মেঘলা, কাল মাইরসহ বজ্রপাতের সম্ভাবনা, পরশু আসল মাইর।

কিন্তু মুশকিল হলো, এই আসল মাইরটা আসলে কী, তা কেউ পরিষ্কার করে বলেন না। কারণ পরিষ্কার করে বললে কথার রস কমে যায়। রাজনীতির ভাষায় অস্পষ্টতা একটা বড় সম্পদ। আপনি যদি বলেন, কাল বিকেল চারটায় অমুক জায়গায় অমুক কাজ হবে, তাহলে জনগণ অপেক্ষা করবে। না হলে জিজ্ঞেস করবে। কিন্তু আপনি যদি বলেন, সামনে কঠিন সময়, আসল মাইর এখনো শুরু হয়নি, তাহলে সবাই নিজের মতো করে ভয় পাবে। কেউ ভাববে মামলা হবে, কেউ ভাববে আন্দোলন হবে, কেউ ভাববে নির্বাচন হবে, আর কেউ ভাববে হয়তো আবার বিদ্যুতের বিল বাড়বে। এই শেষ আশঙ্কাটিই অবশ্য সবচেয়ে বাস্তব।

রাজনীতিতে হুমকির একটা অদ্ভুত অর্থনীতি আছে। হুমকি যত অস্পষ্ট, তার বাজারদর তত বেশি। কারণ নির্দিষ্ট হুমকি শুনলে মানুষ তার হিসাব করতে পারে। কিন্তু অস্পষ্ট হুমকি শুনে প্রত্যেকে নিজের ভয় দিয়ে ফাঁকা জায়গাটা পূরণ করে। এ যেন সিনেমার ট্রেলার। পুরো ছবি দেখানো হয় না। শুধু বলা হয়, আসছে ধুন্ধুমার। দর্শক তখন পপকর্ন নিয়ে বসে থাকে। পরে দেখা যায়, তিন ঘণ্টার ছবিতে দেড় ঘণ্টা নায়ক নায়িকার দিকে তাকিয়ে আছে, আর বাকি দেড় ঘণ্টা সবাই বলছে, আসল ঘটনা সামনে আসছে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতেও আমরা বহু বছর ধরে সেই আসল ঘটনার অপেক্ষায় আছি। আসল গণতন্ত্র আসবে, আসল সংস্কার আসবে, আসল জবাবদিহি আসবে, আসল বিচার আসবে, আসল পরিবর্তন আসবে। সবই আসছে। শুধু আসার সময়টা কেউ জানে না।

এখন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর জন্য কঠিন সময় অপেক্ষা করছে বলা হয়েছে। রাজনীতিতে কার জন্য সময় কঠিন নয়, সেটিই বরং গবেষণার বিষয়। জনগণের জন্য সময় কঠিন, ব্যবসায়ীর জন্য সময় কঠিন, চাকরিজীবীর জন্য সময় কঠিন, শিক্ষার্থীর জন্য সময় কঠিন, কৃষকের জন্য সময় কঠিন। এমনকি যে লোক সারাদিন ফেসবুকে রাজনৈতিক স্ট্যাটাস দেয়, তারও সময় কঠিন। কারণ তাকে প্রতিদিন অন্তত পাঁচটা পোস্ট দিতে হয়, তিনটা কমেন্টের জবাব দিতে হয় এবং চারজনকে আনফ্রেন্ড করতে হয়।

তবে রাজনৈতিক নেতাদের কঠিন সময়ের ধরন আলাদা। তাঁদের কঠিন সময় সাধারণত প্রেস কনফারেন্সে শুরু হয় এবং পরবর্তী প্রেস কনফারেন্সে শেষ হয়। মাঝখানে থাকে ফেসবুক লাইভ, টক শো, বিবৃতি, পাল্টা বিবৃতি, প্রতিবাদ, পাল্টা প্রতিবাদ এবং সবশেষে একখানা সমঝোতার ছবি। ছবিতে সবাই হাসছেন। জনগণ তখন ভাবছে, এত দিন তাহলে মাইরটা কার ওপর পড়ল?
আসলে রাজনীতির বড় কৌতুক এখানেই। সবাই মাইর দেওয়ার কথা বলে, কিন্তু কেউ মাইর খাওয়ার কথা স্বীকার করে না। সবাই বিজয়ী, সবাই জনপ্রিয়, সবাই জনগণের পাশে, সবাই মাঠে, সবাই আন্দোলনে, সবাই গণতন্ত্রের সৈনিক। তাহলে হারল কে? এই প্রশ্ন করলে সবাই চুপ। মনে হয় হারছে সেই পুরোনো লোকটি, যার নাম জনগণ।

নিউ ইয়র্কে সুধী সমাবেশে এই মাইর তত্ত্ব উচ্চারিত হওয়ায় বিষয়টির আন্তর্জাতিক গুরুত্বও তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাষা এখন বিশ্ব ছুঁয়েছে। আগে দেশের রাজনীতির হুমকি দেশের গণ্ডিতেই থাকত। এখন নিউ ইয়র্কেও পৌঁছে যায়। পৃথিবী বুঝতে পারছে, বাংলাদেশ শুধু রপ্তানি করে তৈরি পোশাক নয়, রাজনৈতিক বাক্যও রপ্তানি করতে পারে। এমন বাক্য, যার ওজন আছে, অর্থ আছে, কিন্তু অর্থটা ঠিক কী, সেটা বক্তা ছাড়া কেউ জানে না।

আর একজন সংসদ সদস্য যখন বলেন, একজন এমপি হিসেবেই বলছি, তখন ব্যাপারটি আরও মজার হয়ে ওঠে। এমপি হিসেবে বলছেন মানে কি কথাটির সঙ্গে সরকারি সিলমোহর আছে? নাকি এটি ব্যক্তিগত মতামত, কিন্তু এমপি পদটি একটু ভর দিয়ে দেওয়া হয়েছে? আমাদের দেশে পদমর্যাদা দিয়ে বক্তব্যের ওজন বাড়ানোর একটা পুরোনো রীতি আছে। ডাক্তার বললে রোগী ভয় পায়, অধ্যাপক বললে ছাত্র ভয় পায়, পুলিশ বললে সাধারণ মানুষ ভয় পায়, আর এমপি বললে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ভয় পাওয়ার কথা। কিন্তু ভয় পাওয়ারও তো একটা সীমা আছে। জনগণ এত কিছু দেখে ফেলেছে যে এখন হুমকিরও অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে। আগে কেউ বললে কঠিন সময় আসছে, মানুষ ক্যালেন্ডার দেখত। এখন বলে, আচ্ছা, আর কী নতুন?

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর সামনে কঠিন সময় সত্যিই আছে কি না, তা ভবিষ্যৎই বলবে। তবে বাংলাদেশের রাজনীতির সামনে যে কঠিন সময় আছে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ এখানে এখন সবাই আসল মাইর দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, কিন্তু কেউ ভাবছে না, আসল মাইরটা শেষ পর্যন্ত দেশের মানুষকে না খেতে হয়।

রাজনীতিতে নকল মাইর যত খুশি চলুক। কথার ঘুষি, বিবৃতির লাথি, ফেসবুকের চড়, টক শোর ধাক্কা, মঞ্চের হুঙ্কার, সবই চলুক। কিন্তু আসল মাইর যদি সত্যিই দিতে হয়, তবে সেটা যেন দুর্নীতি, দখলদারি, লুটপাট, ক্ষমতার অপব্যবহার আর জনগণের অধিকার হরণের বিরুদ্ধে হয়। তা না হলে আসল মাইর আর নকল মাইরের পার্থক্য থাকবে শুধু মাইকের শব্দে। শেষ পর্যন্ত জনগণ যদি বলে, এত দিন তোমরা একে অন্যকে মাইর দেওয়ার গল্প করেছ, এবার আমাদের একটু শান্তিতে থাকতে দাও, তখন কিন্তু কারও কাছে নকল মাইরেরও লাইসেন্স থাকবে না, আসল মাইরেরও না।

কারণ প্রবাদে আছে, বেশি বাড় ভালো নয়। আর রাজনীতিতে বেশি মাইর মাইর করাও ভালো নয়। কখন যে মাইর ঘুরে ঠিক নিজের দরজায় এসে হাজির হয়, সে খবর আগাম কোনো সুধী সমাবেশে পাওয়া যায় না!

মন্তব্য করুন

Logo