Logo

১০ ভাদ্র ১৪৩৩

×

Follow Us

পেছন ফিরে তাকাতে ভয়

মত-দ্বিমত

পেছন ফিরে তাকাতে ভয়

রাহুল আনন্দ

Icon

রাহুল আনন্দ

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬, ১০:৩৭ পিএম

ছোটবেলা থেকে অনেক শুনেছি, "পেছনে না তাকিয়ে সামনে আগাও!" কিন্তু, আমি আমার জীবন দিয়ে জেনেছি, সামনে দুই কদম আগাতে হলে বারবার পেছনে তাকাতে হয়। তাই জীবনে যতবার আটকে গেছি চোরাবালিতে, ততবার আমি ডুব দিয়েছি আমার শৈশব আর কৈশোরে... পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখেছি, কতটা পথ এলাম? ছায়াটা কি একটু দীর্ঘ হলো? বিরুদ্ধ স্রোতে কার বাড়ানো হাতটা টেনে তুলে আনল? কার ছায়ায় আর মায়ায় বেড়ে উঠলাম... আমার পূর্বপুরুষের ঠিকানা কি শুধুই -

সাং : কটারকোণা, ডাকঘর : মনু ?

কিন্তু, গত দু'বছর পেছনে তাকাতে খুব ভয় পাই। তোমাদের তাণ্ডবনৃত্য আর হিংস্র-বীভৎস-কদাকার চেহারাগুলো দেখতে পাই। এর আগে এই চেহারা চোখে দেখিনি, দুঃস্বপ্নেও না! হলফ করে বলতে পারি, আমি তোমাদের লালেও ছিলাম না, নীলেও ছিলাম না। শিল্পচর্চায় ব্রতী ছিলাম। আর ভালোবাসা ছড়াতাম - বুক উজাড় করে। কখনোই এ-ভবন বা ও-ভবনে যাইনি। কারও কোনো অন্যায্য আনুকূল্য গ্রহণ করিনি। আমার সন্তানের শরীরে একবিন্দু রক্তকণাও চোরাপথে আসা অর্থের বিনিময়ে নির্মিত হয়নি। সে সন্তানের গায়ে যখন তোমরা হাত তুলেছো, আঘাত করেছো এবং সে খালি পায়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে আমার কাঁধে ভর দিয়ে হাঁটছিল ঢাকা শহরের খুব চেনা, কিন্তু ভীষণ অচেনা রাস্তায়, ঠিক তখনই আমার মৃত্যু ঘটেছে। মৃত্যু শুধুই শরীরের হয় না রে... আত্মাও মরে, পুড়ে ছাই হয়। সেই জ্যান্তে-মরা মানুষটাকে তোমরা কত-শত তকমা দিয়েছো... আজও দিচ্ছো। যার একটারও একবিন্দু প্রমাণ তোমাদের কারও কাছেই নেই।

ভাগ্যিস, স্রষ্টা সে সময়টায় আমার কথা বলার ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিলেন শ্বাসনালীতে প্রদাহ দিয়ে। তাতে মঙ্গল হয়েছে, নাহলে সে আগুন আরও দ্বিগুণ হতো... কে জানে, এখনো হয়তো তুষের আগুন নীরবে-অদৃশ্যে জ্বলেই চলেছে!

এক আগুন থেকে বেড়িয়ে দ্বিতীয়বার আগুনে পড়েছি। কোনো কথা বলিনি, একটা শব্দও না, দেশি-বিদেশি কারও সঙ্গেই না। তাই বলে কখনো বলবো না, তা নয়। কিন্তু এই ফেসবুক আদালতে নয়। যা বলার বা প্রকাশ করার, তা শিল্পের ভেতর দিয়েই জানান দেবো। ফেসবুক শুধুই যোগাযোগের মাধ্যম। আমার ক্ষরণ বোঝার সাধ্য যদি তোমার থাকে, তাহলে বুঝবে। না হলে অকারণে, প্রমাণহীন আরও একটা তকমা দিয়ে, একটা ফালতু-অশ্লীল মন্তব্য লিখে উদাও হবে নামহীন কোনো সুদূরে... জেনে বুঝেও আমার নিকটজনেরা প্রতিবাদটুকুও করবে না। উল্টো ঠোঁটে আঙ্গুল দিয়ে ফিস-ফিসিয়ে বলবে -"চুপ! চুপ!!!"

 হাস্যকর এই ফেসবুক দুনিয়া!

আমি কোনো গণ-জন-মন ভবনে যাইনি কোনদিন, তবে আমি গিয়েছি বাংলার কৃষকের আঙিনায়। বাউলের আখড়ার মাটিতে পাতা বিছানায় ছিল আমার সুখস্বপ্ন। আমি বাংলার আলপথ ধরে বহুদূর হেঁটেছি। সখ্য হয়েছে হাজারো ফুল-পাখি আর নদীর সঙ্গে। কত অচিন মানুষ আমাকে পরম আদরে সেবা দিয়েছে দু'মুঠো অন্ন-ব্যঞ্জন। কতো "মা" আমাকে নিজের সন্তান বলে পরিচয় দিয়েছেন। কী করে বলি তোমাকে, বাংলাকে... বাংলার মানুষকে আমি কতটা ভালোবেসেছি... শুধুই গান গাইতে চেয়েছি বাংলায়... কথা কইতে চেয়েছি... স্বপ্ন দেখেছি... বাংলায় !

পেছন ফিরে তাকাতে ভয় হয়... কদাকার সব কথা আর কাহিনী ভেসে ওঠে... তোমাদের আন্দোলনের স্লোগান ছিল -

 "দাবায়া রাখতে পারবা না", "বঙ্গবন্ধুর বাংলায়—বৈষম্যের ঠাঁই নাই।"

সেই তোমরাই ৫ আগস্ট পাশবিক উল্লাসে আগুন দিয়েছো বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে !খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মুছে ফেলেছো মুক্তিযুদ্ধের সব স্মৃতিচিহ্ন! তখনই আমি জেনে গেছি... বুঝে গেছি... পেয়ে গেছি আমার প্রাপ্যটুকু! আমার, নাকি তোমার প্রাপ্য? কে জানে? আজ তোমার সুখের দিন হলেও, আমার জন্য বেদনার... শোকের... শক-এর... সব হারানোর... সত্যের মুখোমুখি হওয়ার...

কারও প্রতি কোনো অভিযোগ করিনি। বিচার চাইনি...ক্ষতিপূরণ দাবী করিনি। কোনো দুঃখ নেই। বলিনি ন্যায় কিংবা অন্যায়ের কথা। সবকিছু সামলে উঠতেই সময় লেগেছে ঢের! এখনো পোড়া ঘা-এর জমে উঠা হলদে-সাদা পুঁজের দুর্গন্ধে নিজেরই বমি পায়। যা হারিয়েছি, তাও শুধুই আমার নয়। দুষ্প্রাপ্য হাজারো অচেনা বাদ্যযন্ত্রগুলো তোমারও ছিল। শাহ আব্দুল করিম আর উকিল মুন্সী, অবিনাশ শীলের দোতারা ফেরত আসবে না আর কোনদিন! আমার শিক্ষক আইয়ুব বাচ্চুর দেয়া Korg Karma কিবোর্ডটা, আমার গুরু বারী সিদ্দিকীর নিজের হাতের বানানো বাঁশিগুলো...আরো কতো কি... ! সংগ্রহটা বাংলাদেশের ছিল। আগামী প্রজন্ম ছিল এর উত্তরাধিকারী। সারাজীবনের সব সংগ্রহ বা সঞ্চয়, যা হারিয়েছি, তাতে কোনো দুঃখ নেই আর... আছে শুধু অভিমান। আমার গানেও আছে...

"শিরার শিরায় স্বপ্ন আমার-

ভীষণ অভিমান"

৭ আগস্ট ২৪-এ এক গীতিকবি বড়ভাইয়ের মেসেজের উত্তরে লিখেছিলাম, "তবু শান্তি আসুক আমার সোনার দেশে, যেকোনো মূল্যে। সে মূল্য যদি হয় আমার সোনার সংসারের পোড়া ছাই অথবা বাদ্যযন্ত্র পোড়া কয়লার বিনিময়ে, তাতেও দুঃখ নেই।"

একই কথা আজও জারি রইল।

"আমার বসত অন্ধকারে— 

তোরা থাকিস ভালো।"

আমার পরিচয় আমার গানের পরতে পরতে আছে। কোনো আজগুবি তকমায় না ভেবে, আমার গানেই খুঁজে নিও। আমার গানের লাইনগুলো কীভাবে যেন আমার জীবনের সঙ্গে মিলে গেল! মানুষ কি আগেই জানতে পায়, তার পরবর্তী সময় ও গন্তব্য? টের পায় কিছু? তোমরা টের পাও? টের পাচ্ছো? 

খুব জানতে ইচ্ছে হয়।

আজ দুই বছর পূর্ণ হলো, সংসার আর পাতিনি। ভবঘুরে জীবন, পাখির মতোই উড়ছি... আমি পাখির মতো... উড়ছি কেন? কেউ জানে না... বন্ধু, আমি পাখি হলেও, আমার একটা ডানা ভাঙা! ঘর বাঁধিনি আর। পরের জায়গা, পরের জমিতে, ঘর বানাইয়া আমি রই... বৃক্ষতলে শুয়ে... সুখের সুতায় গাঁথি মালা, আগুনে পুড়িয়া ছাই... স্বপ্ন জুড়ে দৈত্য ভাসে মাগো, ঘুম আমার চোখে আসে না... জগৎ ভরমিয়া দেখি - শুন্য-টাই যে খুঁটি... ও গাঁয়ে আর যাবো না মাগো তোমার চরন ছুঁয়ে কই...এই কথাগুলো নানান গানে ছড়িয়ে আছে। গান হলেও সত্যি! এই আমার পরিচয়।

তবুও, সাহস করে পেছন ফিরে তাকাই! তাকাতে হয়... না তাকালে নিজের কৃতজ্ঞতার জায়গাগুলো ভুলে যাব। যে বৃক্ষগুলো আশ্রয় দিয়েছিল ঝড়ো হাওয়ার দিনে, তাদের ভুলে যাব। যে মাটি আমাকে দাঁড়াতে শেখাল, তারে ভুলে যাব। সব ভুলে যেতে নেই। সব ভুলতে হয় না। সব ভুলে গেলে শব হয়ে যেতে হবে। শব হয়ে গেলে শ্বাস উড়ে যাবে পাখি হয়ে ! পাখি উড়ে গেলে গাছগুলো খুব নিঃসঙ্গ দেখাবে। নিঃসঙ্গ গাছে ফুল ফুটবে না। গাছেদের মন খারাপ হলে অক্সিজেনের বড্ড অভাব হবে। অক্সিজেনের অভাবে আমার সন্তানের মুখ কেমন ফ্যাকাশে নীল হয়, তা আমি দেখেছি! তাই পেছন ফিরে তাকাতে ভয় হয়!!!

বেয়াড়া আমি, বেহায়া আমার মন, তবুও ফিরে তাকাই। দেখি বিবর্ণ পাতায় ঝুলে ঝুলে আছে স্বপ্ন-সময় আর সুর। আমি সে বর্ণ-গন্ধহীন ছবিতে পেছন ফিরে তাকাই... দুখের ভাঁজে ভাঁজে সুখ খুঁজি। ছাইয়ের ঢিবি উড়িয়ে খুঁজে ফিরি আপন আগুনমুখ। আর গাই -

"ও ঝরা পাতা গো— তোমার সাথে আমার দিন কাটানোর কথা গো..."

"প্রিয়তমা,ভালো আছি... ভালো থেকো..."

সব ভালো হোক। পৃথিবী সুন্দর হোক। 

এই পাগলের ভালোবাসাটুকু নিও...

মন্তব্য করুন

Logo