Logo

১০ ভাদ্র ১৪৩৩

×

Follow Us

চারটি মৃত্যু, নাগরিকের জীবনের অধিকার কতটা সুরক্ষিত

ছবিঃ অনলাইন থেকে সংগৃহীত

কাভার স্টোরি

চারটি মৃত্যু, নাগরিকের জীবনের অধিকার কতটা সুরক্ষিত

শাহেদ কায়েস

শাহেদ কায়েস

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৩৩ পিএম

একটি পরিবারের চারজন মানুষ নিজেদের ঘরের ভেতর নিহত হলে মৃত্যু শুধু চারটি জীবনের সমাপ্তি ঘটায় না। চারপাশে ছড়িয়ে দেয় আতঙ্ক, অবিশ্বাস আর অসংখ্য জিজ্ঞাসা। আরও গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়, যখন তদন্তের একেবারে শুরুতেই হত্যার একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা জনসমক্ষে হাজির করা হয়, অথচ ঘটনার সম্ভাব্য অন্য দিকগুলো নিয়ে মানুষের মনে সংশয় থেকে যায়। রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী ও কিশোর ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তীর হত্যাকাণ্ড এখন এমনই এক ঘটনার সামনে আমাদের দাঁড় করিয়েছে। চারটি মৃত্যু ঘিরে আবেগ আছে, ক্ষোভ আছে, ভয় আছে। সবকিছুর ঊর্ধ্বে দরকার নির্ভুল, স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত।

পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস একে একে পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করেছে। তদন্তে পুলিশ যে তথ্য পেয়েছে, তার আইনি মূল্য শেষ পর্যন্ত আদালতেই নির্ধারিত হবে। তবে তদন্ত চলমান থাকা অবস্থায় একটি ব্যাখ্যাকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি। কারণ হত্যার ধরন, একটি পরিবারের চার সদস্যকে পর্যায়ক্রমে হত্যা, ঘটনার পেছনে সম্ভাব্য আর্থিক স্বার্থ, চাঁদাবাজির অভিযোগ, সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধসহ প্রতিটি প্রাসঙ্গিক দিক সমান গুরুত্বে অনুসন্ধান করা দরকার।

কথাসাহিত্যিক জাকির তালুকদার পুলিশের বক্তব্য নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া তাঁর পোস্টে লিখেছেন, “আমি এই বক্তব্য অবিশ্বাস করি। ঘটনা এমন সরল বলে মনে হয় না।” অর্থনীতিবিদ, শিক্ষক ও লেখক আনু মুহাম্মদের শেয়ার করা একটি পোস্টেও চাঁদাবাজির প্রসঙ্গ সামনে এসেছে। সেখানে জানতে চাওয়া হয়েছে, গণপতি চক্রবর্তীর কাছে কারা চাঁদা চেয়েছিল, তাদের পরিচয় কেন সামনে আসছে না, সেই প্রসঙ্গ আড়াল হয়ে যাচ্ছে কি না। একই সঙ্গে ধর্মীয় পরিচয় ঘিরে দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো এবং পুরো ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের উপকরণে পরিণত করার প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

এই সংশয়গুলোর সত্যতা তদন্তেই যাচাই হওয়া দরকার। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বক্তব্য তদন্তের বিকল্প হতে পারে না। আবার জনপরিসরে উত্থাপিত গুরুতর অভিযোগ উপেক্ষা করাও গ্রহণযোগ্য তদন্তপ দ্ধতি হতে পারে না। গণপতি চক্রবর্তীর কাছে চাঁদা চাওয়ার কোনো ঘটনা ঘটে থাকলে কারা চেয়েছিল, কখন চেয়েছিল, এ নিয়ে থানায় অভিযোগ, সাধারণ ডায়েরি, ফোনকল, বার্তা, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য কিংবা অন্য কোনো তথ্য আছে কি না, সবকিছু অনুসন্ধানের আওতায় আনা দরকার। সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ থাকলে তার দলিলপত্র, পারিবারিক লেনদেন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগাযোগও পরীক্ষা করা জরুরি।

রংপুরের ঘটনা মনে করিয়ে দেয় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নিদারাবাদের বহু পুরোনো এক হত্যাকাণ্ডের কথা। ১৯৮৭ সালে দরিদ্র মুড়ির মোয়া বিক্রেতা শশাঙ্ক দেবনাথ পরিচিত তাজুল ইসলামের সঙ্গে বাড়ি থেকে বেরিয়ে নিখোঁজ হন। পরিবারকে বলা হয়েছিল, তিনি জমি বিক্রি করে ভারতে চলে গেছেন। স্ত্রী বিরজাবালা সেই বক্তব্য মেনে নেননি। তিনি আইনের আশ্রয় নিয়েছিলেন। দুই বছর পর বিরজাবালা ও তাঁর পাঁচ সন্তানও নিখোঁজ হন। তখনও ছড়িয়ে পড়েছিল একই গল্প, পুরো পরিবার ভারতে চলে গেছে।

পরে ধুপাজুড়ি বিল থেকে দুটি ড্রাম উদ্ধার করা হয়। সেখানে পাওয়া যায় ছয়টি মরদেহ। তদন্তে সম্পত্তি দখলের ষড়যন্ত্র সামনে আসে। আদালতে বিচার শেষে দোষীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। নিদারাবাদের ঘটনার সঙ্গে রংপুরের হত্যাকাণ্ডকে সরাসরি মিলিয়ে ফেলার সুযোগ নেই। দুই ঘটনার সময়, চরিত্র, পরিস্থিতি আলাদা। তবু নিদারাবাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা বহন করে। কোনো পরিবারের ওপর ধারাবাহিক আঘাতের পেছনে দৃশ্যমান ঘটনার চেয়ে গভীর স্বার্থ কাজ করতে পারে। প্রথমে প্রচারিত গল্পের আড়ালে সম্পূর্ণ ভিন্ন অপরাধও লুকিয়ে থাকতে পারে।

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু পরিবারের সম্পত্তি দখল, চাঁদাবাজি, হুমকি, দেশত্যাগে চাপ সৃষ্টি এবং ধর্মীয় পরিচয়কে ব্যবহার করে ভীতি তৈরির অভিযোগ বহুদিনের। একই সময়ে প্রতিটি অপরাধকে শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের সূত্রে ব্যাখ্যা করাও তদন্তকে ভুল পথে নিতে পারে। রংপুরের ঘটনায় নিহত পরিবার হিন্দু হওয়ায় সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের সম্ভাবনা অনুসন্ধান করা যেমন জরুরি, তেমনি আর্থিক স্বার্থ, ব্যক্তিগত বিরোধ, চাঁদাবাজি, সম্পত্তি, মাদকসংক্রান্ত যোগাযোগসহ অন্য সম্ভাব্য উদ্দেশ্যগুলোকেও তদন্তের আওতায় রাখতে হবে। কোনো একটি সম্ভাবনাকে আগেই বাদ দেওয়া তদন্তের পরিসর সংকুচিত করবে।

এখানে আরেকটি বিপদ সামাজিক মেরুকরণ। অভিযুক্ত ব্যক্তির ধর্মীয় পরিচয় দেখে একদল যদি সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যের সম্ভাবনা সরাসরি নাকচ করে দেয়, অন্যদল যদি নিহতদের পরিচয় দেখে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই সাম্প্রদায়িক হত্যাকাণ্ড ঘোষণা করে, দুই অবস্থানই সত্য অনুসন্ধানের পথে বাধা তৈরি করতে পারে। অপরাধের পরিচয় নির্ধারিত হবে উদ্দেশ্য, পরিকল্পনা, আলামত, যোগাযোগ, অর্থের প্রবাহ, পূর্বশত্রুতা ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের মাধ্যমে। অভিযুক্ত ও নিহত ব্যক্তিদের নাম দেখে অপরাধের চরিত্র নির্ধারণ করা যায় না।

এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে গভীর প্রভাব পড়ে মানুষের নিরাপত্তাবোধে। একটি পরিবার নিজের বাড়ির মধ্যেও নিরাপদ থাকতে না পারলে প্রতিবেশী মানুষ নিজের জীবন নিয়েও শঙ্কিত হয়ে পড়েন। সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে সেই ভয় আরও তীব্র হতে পারে। কারণ ব্যক্তিগত অপরাধের পাশাপাশি জমি দখল, হুমকি, সাম্প্রদায়িক হামলা ও দেশত্যাগে চাপ সৃষ্টির অভিজ্ঞতা তাদের সামাজিক স্মৃতিতে বহন করতে হয়। ফলে রংপুরের চার মৃত্যু শুধু একটি ফৌজদারি মামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; নাগরিক নিরাপত্তার প্রতি মানুষের আস্থার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে যায়।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব এখানে বহুমাত্রিক। পুলিশের প্রথম কাজ অপরাধী শনাক্ত করা, আলামত সংরক্ষণ করা, উদ্দেশ্য নির্ণয় করা এবং এমন তদন্ত সম্পন্ন করা, যা আদালতের কঠোর পরীক্ষায় টিকে থাকবে। একই সঙ্গে তদন্তকারী সংস্থাকে নিজের প্রাথমিক ধারণার বন্দী হওয়া থেকে মুক্ত থাকতে হবে। যে তথ্য প্রথমে পাওয়া গেছে, পরবর্তী আলামত তার বিপরীত দিকে নিয়ে গেলে সেই নতুন পথ অনুসরণ করার পেশাগত সাহস থাকতে হবে। ফরেনসিক পরীক্ষার ফল, ময়নাতদন্ত, মৃত্যুর সম্ভাব্য সময়, হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র, আঙুলের ছাপ, ডিএনএ, মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড, ডিজিটাল যোগাযোগ, আর্থিক লেনদেন, সিসিটিভি ফুটেজ, প্রতিবেশীদের বক্তব্য এবং নিহত পরিবারের সাম্প্রতিক বিরোধগুলো একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা দরকার। অভিযুক্তদের স্বীকারোক্তি থাকলেও কেবল তার ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট হবে না। স্বীকারোক্তির সঙ্গে বস্তুগত আলামতের সামঞ্জস্য বিচার করতে হবে। চারজনকে কীভাবে, কোন ক্রমে, কত সময়ের ব্যবধানে হত্যা করা হয়েছে, অভিযুক্তরা একাই পুরো ঘটনা ঘটাতে সক্ষম ছিল কি না, হত্যার আগে ও পরে অন্য কারও সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ছিল কি না, প্রতিটি দিক পরিষ্কার হওয়া জরুরি।

চাঁদাবাজির অভিযোগ যদি আগে থেকেই উঠে থাকে, তাহলে তদন্তে সেই বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে অনুসন্ধান করা দরকার। কারা অর্থ চেয়েছিল, নিহত ব্যক্তি কাউকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন কি না, কোনো হুমকি পেয়েছিলেন কি না, সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর আচরণে ভীতি কিংবা উদ্বেগের চিহ্ন ছিল কি না, পরিবারের সদস্যরা কাউকে কিছু বলেছিলেন কি না, এসব তথ্য সংগ্রহ করা দরকার। একইভাবে সম্পত্তির মালিকানা, জমি নিয়ে বিরোধ, বিক্রির চাপ, দখলের চেষ্টা কিংবা আর্থিক লেনদেনের ইতিহাসও অনুসন্ধান করা উচিত। 

মাদক সেবনে বাধা দেওয়াই যদি হত্যার প্রকৃত কারণ হয়ে থাকে, পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষে তথ্য ও আলামতের ধারাবাহিকতা সেই ব্যাখ্যাকে প্রতিষ্ঠিত করবে। আর যদি এর পেছনে অন্য কোনো স্বার্থ, পরিকল্পনাকারী, সহায়তাকারী কিংবা প্ররোচনাকারী থেকে থাকে, তাদেরও বিচারের আওতায় আনতে হবে। এখানেই তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ধারিত হবে। পুলিশকে একটি গল্প প্রতিষ্ঠা করতে হবে না; পুলিশকে ঘটনার সত্য আবিষ্কার করতে হবে।
নিদারাবাদের ঘটনার সবচেয়ে ভয়ংকর অংশ শুধু ছয়টি হত্যাকাণ্ড ছিল না। আরও ভয়ংকর ছিল হত্যার চারপাশে নির্মিত মিথ্যা গল্প। একটি মানুষ হারিয়ে গেলেন, বলা হলো ভারতে চলে গেছেন। পরে স্ত্রী ও পাঁচ সন্তান হারিয়ে গেলেন, আবারও একই গল্প ছড়ানো হলো। শেষ পর্যন্ত দুটি ড্রাম সেই গল্পের ভেতরের বিভীষিকা প্রকাশ করেছিল। রংপুরে একই ঘটনা ঘটেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কোনো সুযোগ নেই। তবে অতীতের সেই অভিজ্ঞতা আমাদের সতর্ক হতে বলে, অপরাধের প্রথম ব্যাখ্যাকেই শেষ কথা ধরে নেওয়া বিপজ্জনক।

গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা, মেয়ে প্রার্থী ও কিশোর ছেলে প্রীয়ম এখন আর নিজেদের কথা বলতে পারবেন না। তাঁদের হয়ে কথা বলবে আলামত, ফরেনসিক তথ্য, ডিজিটাল রেকর্ড, প্রতিবেশীর স্মৃতি, পূর্বের হুমকি এবং তদন্তকারীদের পেশাগত সততা। সেই কণ্ঠ যেন কোনো প্রভাবশালী মহলের চাপ, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, সামাজিক মাধ্যমের উত্তেজনা কিংবা তদন্তের তাড়াহুড়োর নিচে হারিয়ে না যায়।

চারটি মৃত্যুর বিচার মানে শুধু কয়েকজন অভিযুক্তকে আদালতে দাঁড় করানো নয়। কারা হত্যা করেছে, কেন করেছে, কার নির্দেশে করেছে, কারা সহায়তা করেছে, হত্যার আগে পরিবারটি কোনো হুমকির মধ্যে ছিল কি না এবং কোনো স্বার্থ রক্ষায় ঘটনার প্রকৃত কারণ আড়াল করার চেষ্টা চলছে কি না, সবকিছুর নির্ভুল উত্তর খুঁজে বের করা দরকার।

রংপুরের একটি বাড়িতে চারটি জীবন নিভে গেছে। এখন রাষ্ট্রের সামনে একটাই দায়িত্ব, মৃত্যুর চারপাশে আর কোনো অন্ধকার জমতে না দেওয়া। দ্রুত সমাপ্তির জন্য তৈরি কোনো সহজ গল্প মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনবে না। সত্য যত জটিলই হোক, তদন্তকে তার শেষ প্রান্ত পর্যন্ত যেতে হবে। কারণ একটি পরিবারকে দ্বিতীয়বার হত্যা করা হয় তখনই, যখন তাদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণও চাপা পড়ে যায়।

মন্তব্য করুন

Logo