Logo

১০ ভাদ্র ১৪৩৩

×

Follow Us

৫ আগস্টের সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন: শিশুদের জন্য কী বদলাল!

মত-দ্বিমত

৫ আগস্টের সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন: শিশুদের জন্য কী বদলাল!

দীপু মাহমুদ

Icon

দীপু মাহমুদ

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬, ১২:১৭ পিএম

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসে শুধু একটি রাজনৈতিক সংকটের সময় নয়, এটা ছিল শিশুদের জন্যও এক বিভীষিকাময় অধ্যায়। রাজপথে, বাড়ির বারান্দায়, জানালার পাশে, এমনকি ঘরের ভেতরেও গুলিতে প্রাণ হারিয়েছে শিশু। আন্তর্জাতিক তদন্তে উঠে এসেছে, ওই সময়কার সহিংসতায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যু হয়, যাদের মধ্যে একশরও বেশি শিশু ছিল। একের পর এক শিশুর নিথর দেহ, স্বজনদের আহাজারি আর রক্তাক্ত মুখের ছবি শুধু পরিবারগুলোকেই নয়, পুরো জাতির বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। সেই নির্মম বাস্তবতা অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনমতকে আরও প্রবল করেছিল এবং নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশাকে আরও তীব্র করে তুলেছিল।
 
আজ ৫ আগস্টে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি রাজনৈতিক সদিচ্ছার বা মানবিক। যে শিশুদের জীবন এই পরিবর্তনের ইতিহাসের সঙ্গে চিরদিনের জন্য জড়িয়ে গেছে, সেই শিশুদের জন্য বাংলাদেশ কী বদলেছে! শিশু কি আজ আগের চেয়ে বেশি নিরাপদ? তাদের জীবন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মর্যাদা এবং ন্যায়বিচারের অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্র কি নতুন কোনো ভিত্তি নির্মাণ করতে পেরেছে? নাকি আমরা কেবল ক্ষমতার পালাবদল দেখেছি, কিন্তু শিশুর জীবনের বাস্তবতা এখনো আগের মতোই অনিশ্চিত রয়ে গেছে?
 
৫ আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ দিন। এই দিনকে কেউ রাজনৈতিক পরিবর্তনের দিন বলেন, কেউ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দিন, আবার কেউ এটাকে আত্মত্যাগের স্মারক হিসেবে দেখেন। ইতিহাস একদিন এর চূড়ান্ত মূল্যায়ন করবে। কিন্তু আবারও জোর দিয়ে বলি, একটি প্রশ্নের উত্তর ইতিহাস নয়, আমাদেরই দিতে হবে- যে পরিবর্তনের পথে এতগুলো প্রাণ ঝরে গেল, যাদের মধ্যে ছিল শিশুরাও, সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে ছোট নাগরিকেরা আজ কী পেয়েছে!
 
প্রতিটি গণআন্দোলন ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি নিয়ে জন্ম নেয়। মানুষ রাজপথে নামে শুধু বর্তমান বদলানোর জন্য নয়, আগামী প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ার স্বপ্নে। সেই কারণে ৫ আগস্টকে মূল্যায়নের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড রাজনৈতিক লাভ-লোকসান নয়, এই সময়ে বাংলাদেশের শিশুরা কতটা নিরাপদ হয়েছে, কতটা মর্যাদা পেয়েছে এবং তাদের অধিকার কতটা সুরক্ষিত হয়েছে- সেই প্রশ্ন।
 
শিশুর কাছে গণতন্ত্রের সংজ্ঞা খুব সহজ। সে সংবিধানের ধারা বোঝে না, ক্ষমতার ভারসাম্য বোঝে না, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষাও জানে না। সে শুধু এমন এক সমাজ প্রত্যাশা করে, যেখানে স্কুলে যাওয়ার পথে তাকে ভয় পেতে হবে না; শিক্ষক, আত্মীয় বা প্রতিবেশীর কাছ থেকে নির্যাতনের শিকার হতে হবে না; সড়ক পার হওয়া মৃত্যুঝুঁকিতে পরিণত হবে না; হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে আসতে হবে না।শিশু গণতন্ত্রকে অনুভব করে তার নিরাপত্তায়, তার শিক্ষায়, তার হাসিতে এবং তার স্বপ্নে।
 
কিন্তু গত এক বছরে সংবাদপত্রের পাতা অন্য গল্প বলেছে। কোথাও শিশু ধর্ষণের ঘটনায় জনমনে ক্ষোভ ছড়িয়েছে, কোথাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। সড়ক দুর্ঘটনায় অকালেই নিভে গেছে অনেক শিশুর জীবন। বর্ষা এলেই ডুবে মৃত্যুর মিছিল আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করেছে। অনেক শিশুই এখনো অপুষ্টি, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ ও শিক্ষাবঞ্চনার মতো পুরোনো সংকটের সঙ্গে লড়ছে। প্রযুক্তির বিস্তার নতুন সুযোগ এনে দিলেও, একই সঙ্গে অনলাইন হয়রানি, সাইবার বুলিং ও ডিজিটাল শোষণের মতো নতুন বিপদও তৈরি করেছে। অর্থাৎ সময় বদলেছে, কিন্তু শিশুকে ঘিরে ঝুঁকির পরিধি কমেনি; বরং অনেক ক্ষেত্রে আরও জটিল হয়েছে।
 
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি উঠে আসে। যদি গণতন্ত্র মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার নাম হয়, তবে সেই অধিকারের প্রথম দাবিদার কি শিশুরা নয়" যে রাষ্ট্র নিজের সবচেয়ে দুর্বল নাগরিককে নিরাপদ রাখতে পারে না, সেই রাষ্ট্রের উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি কিংবা রাজনৈতিক অর্জন কতটা অর্থবহ! অর্থনৈতিক অগ্রগতি অবশ্যই জরুরি, কিন্তু শিশুর জীবন হারানোর মূল্য কোনো প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে পূরণ করা যায় না। শিশুর চোখের ভয় কোনো উন্নয়ন সূচকে ধরা পড়ে না, অথচ সেটাই রাষ্ট্রের মানবিকতার সবচেয়ে নির্ভুল পরিমাপ।
 
আমরা প্রায়ই বলি, শিশুরাই দেশের ভবিষ্যৎ। কিন্তু এই বাক্যটি এত বেশি উচ্চারিত হয়েছে যে অনেক সময় এর ভেতরের দায়িত্ববোধ হারিয়ে যায়। ভবিষ্যৎকে ভালোবাসার দাবি করার আগে বর্তমানের শিশুকে রক্ষা করতে হবে। শিশুদের দেশের ভবিষ্যৎ নয়, বর্তমান ভাবতে হবে। যে শিশু আজ নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, সে আগামী দিনের আত্মবিশ্বাসী নাগরিক হয়ে উঠতে পারে না। যে শিশু নিরাপদ শৈশব পায় না, তার কাছে গণতন্ত্র বিমূর্ত শব্দ ছাড়া আর কিছু নয়।
 
তাই ৫ আগস্ট আমাদের জন্য কেবল স্মৃতিচারণের দিন হতে পারে না। এটা হওয়া উচিত আত্মসমালোচনার দিন। কারণ যারা জীবন দিয়েছে, বিশেষ করে যেসব শিশু আর কখনো তাদের পরিবারের কাছে ফিরে আসেনি, তাদের প্রতি প্রকৃত সম্মান জানানো হবে তখনই, যখন আমরা এমন বাংলাদেশ গড়তে পারব, যেখানে কোনো শিশুর নিরাপত্তা রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় নয়, রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য দায়িত্ব হবে।
 
প্রশ্নটি তাই এখনো আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে- ৫ আগস্টের পর আমরা কি শুধু নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা করেছি, নাকি সত্যিই এমন রাষ্ট্র নির্মাণের পথে এগিয়েছি, যেখানে প্রত্যেক শিশু নির্ভয়ে বড় হতে পারে! এই প্রশ্নের উত্তরই আগামী বাংলাদেশের চরিত্র নির্ধারণ করবে।
 
রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা কেবল নির্বাচন, সংসদ কিংবা ক্ষমতার ভারসাম্য দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। তার প্রকৃত শক্তি প্রকাশ পায় তখন, যখন সেই রাষ্ট্র তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করতে পারে। শিশুরাই সেই পরীক্ষার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মানদণ্ড। কারণ তারা ক্ষমতার অংশ নয়, তারা কেবল রাষ্ট্রের সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল।
 
বাংলাদেশের সংবিধান প্রতিটি নাগরিকের জীবন, নিরাপত্তা ও মর্যাদার নিশ্চয়তার কথা বলে। বাংলাদেশ জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদও অনুমোদন করেছে। অর্থাৎ প্রত্যেক শিশুর বেঁচে থাকা, নিরাপদে বেড়ে ওঠা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সব ধরনের সহিংসতা থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের আইনগত ও নৈতিক দায়িত্ব। তবে বাস্তবতা বলছে, এই অঙ্গীকারের সঙ্গে শিশুদের প্রতিদিনের জীবনের ব্যবধান এখনো অনেক বড়।
 
শিশুদের জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে হলে বিচ্ছিন্ন ঘটনার পর ক্ষোভ প্রকাশ করলেই হবে না। প্রতিরোধের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর শিশু সুরক্ষা নীতি, অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা, নির্যাতনের দ্রুত তদন্ত ও বিচার, শিশুবান্ধব আদালত, নিরাপদ সড়ক, ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে স্থানীয় উদ্যোগ, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি নিশ্চিতকরণ এবং ডিজিটাল নিরাপত্তাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং রাষ্ট্র- সবার মধ্যে অভিন্ন বার্তা প্রতিষ্ঠা করতে হবে: শিশুর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের সহিংসতার কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই।
 
আমাদের আরও একটি মানসিক পরিবর্তন প্রয়োজন। শিশুদের আমরা প্রায়ই ভবিষ্যতের নাগরিক বলি। অথচ তারা শুধু ভবিষ্যৎ নয়, তারা বর্তমানেরও পূর্ণাঙ্গ নাগরিক। তাই তাদের অধিকার কোনো বিনিয়োগ নয়, কোনো দয়া নয়, কোনো উন্নয়ন প্রকল্পও নয়; এটা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। যে রাষ্ট্র আজ তার শিশুদের নিরাপদ রাখতে ব্যর্থ হয়, সে রাষ্ট্র আগামী দিনের দক্ষ, মানবিক ও গণতান্ত্রিক নাগরিকও হারায়।
 
৫ আগস্ট আমাদের একটি শিক্ষা দিয়ে গেছে- অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষ এক হতে পারে। এখন সেই ঐক্যের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো, আমরা কি প্রত্যেক শিশুর জীবন রক্ষার প্রশ্নেও একইভাবে এক হতে পারি? কোনো শিশু যখন নির্যাতনের শিকার হয়, যখন সড়কে প্রাণ হারায়, যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, যখন চিকিৎসার অভাবে মারা যায়- তখন সেটাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়া মানে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎকেই দুর্বল করে দেওয়া।
 
যেসব শিশুর জীবন এই দেশের পরিবর্তনের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে, তাদের আমরা আর ফিরিয়ে আনতে পারব না। কিন্তু তাদের আত্মত্যাগ অর্থবহ করতে পারি। সেটা সম্ভব হবে তখনই, যখন আমরা এমন বাংলাদেশ গড়ব, যেখানে কোনো শিশুর মৃত্যু আর জনবিক্ষোভের কারণ হবে না; কারণ রাষ্ট্র তার দায়িত্ব আগেই পালন করবে। যেখানে শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মানুষের রাজপথে নামতে হবে না; কারণ সেটা হবে রাষ্ট্রের স্বাভাবিক, নিয়মিত এবং অটুট দায়িত্ব।
 
৫ আগস্টের সবচেয়ে বড় শিক্ষা তাই ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, দায়িত্বের পরিবর্তন। যদি সেই দায়িত্ববোধ আমাদের প্রতিষ্ঠান, আইন, নীতি এবং সামাজিক আচরণে প্রতিফলিত না হয়, তবে ইতিহাসের এই দিনটি কেবল স্মৃতির পাতায় সীমাবদ্ধ থাকবে। যদি আমরা শিশুদের নিরাপত্তাকে রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসতে পারি, তবে ৫ আগস্ট সত্যিই শিশুদের জন্য আশার দিন হয়ে উঠবে। যে শিশুর মৃত্যু একদিন মানুষকে রাজপথে নামিয়েছিল, সেই শিশুর নিরাপত্তাই আজ গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
 
কারণ শেষ পর্যন্ত ইতিহাস একটি প্রশ্নই বারবার করে- একটি জাতি তার শিশুদের সঙ্গে কেমন আচরণ করেছিল? সেই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে, ৫ আগস্ট শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের দিন ছিল, নাকি ৫ আগস্ট সত্যিকার অর্থে একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও শিশুবান্ধব বাংলাদেশের সূচনা!

মন্তব্য করুন

Logo