Logo

১ ভাদ্র ১৪৩৩

×

Follow Us

আরশোলার কাছে হার মানল সিংহাসন

মত-দ্বিমত

আরশোলার কাছে হার মানল সিংহাসন

চিররঞ্জন সরকার

Icon

চিররঞ্জন সরকার

প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬, ০৯:৪২ এএম

গণতন্ত্রের ইতিহাসে বাঘ, সিংহ, ঈগল, হাতি, পদ্ম, হাতুড়ি, কাস্তে—সবই ছিল। কিন্তু আরশোলা? সেটাই বোধহয় একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ব্যঙ্গ। কারণ ক্ষমতা যাদের মানুষ বলে গণ্য করতে চায় না, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাদেরই নায়ক বানিয়ে দেয়। দিল্লির যন্তরমন্তরে যারা আরশোলার মুখোশ পরে দাঁড়িয়েছিল, তারা জানত, শাসকের অভিধানে তারা ‘পোকামাকড়’ ছাড়া কিছু নয়। তাই তারা অপমানকেই অস্ত্র বানাল। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিদ্রূপগুলো এমনই হয়। যে গালি দিয়ে অপমান করা হয়, একদিন সেটাই পতাকা হয়ে ওড়ে।

এই উপমহাদেশে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা খুব একটা আলাদা নয়। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান নেপাল, শ্রীলঙ্কা সবখানে বহুদিন ধরে শেখানো হয়েছে, রাষ্ট্র মানেই সরকার, সরকার মানেই শাসকদল, আর দল মানেই সর্বময় নেতা। নেতৃত্বের সিদ্ধান্তই নাকি একমাত্র চূড়ান্ত সত্য। এর বাইরে সরকারের কোনো ভুল তুলে ধরা, প্রশ্ন তোলা বা দ্বিমত পোষণ করা মানেই সে ‘দেশবিরোধী’, ‘টুকড়ে-টুকড়ে গ্যাং’ কিংবা বিদেশি এজেন্টের প্রেসক্রিপশনে চলা ষোড়শপদী চক্রান্তকারী।

কিন্তু ইতিহাসের একটি পুরোনো বদভ্যাস আছে। সে কোনো রাজনৈতিক দলের তৈরি ন্যারেটিভ বা সরকারি প্রেসনোট পড়ে পরিচালিত হয় না; ইতিহাস পথ চলে দেশের সাধারণ মানুষের জমতে থাকা ক্ষোভ আর নীরব দীর্ঘশ্বাস পড়ে।

জুনের এক সকালে যন্তরমন্তরে ভিড় ছিল অল্প। কয়েকজন ছাত্র, কিছু প্ল্যাকার্ড, কয়েকটি ক্যামেরা, কিছু কৌতূহলী মানুষ। দূর থেকে দেখে মনে হতে পারে, এও বুঝি আর পাঁচটা প্রতিবাদের মতো কয়েক দিনের মধ্যে মিলিয়ে যাবে। ক্ষমতার করিডোরেও নিশ্চয় তখন চায়ের কাপে ঝড় উঠেছিল, ‘কয়েকটা ছেলে-মেয়ে, দুদিন চিৎকার করবে, তারপর পরীক্ষার কোচিংয়ে ফিরে যাবে।’

শাসকেরা পৃথিবীর সব দেশেই একই ভুল করেন। তাঁরা মনে করেন, জনগণের ধৈর্যের মেয়াদ দুধের প্যাকেটের মতো। দুদিন পরে এক্সপায়ারি হয়ে যাবে। তারপর আবার সব আগের মতো। কিন্তু মানুষের ক্ষোভ পাস্তুরিত দুধ নয়, আগ্নেয়গিরি। বাইরে থেকে ঠান্ডা, ভেতরে লাভা।
সাত সপ্তাহ পর একই যন্তরমন্তর আর আগের জায়গা নেই। ব্যারিকেডের ফাঁক গলে দেখা গেল শুধু মানুষ আর মানুষ। এত তরুণ মুখ, যেন ভোটার তালিকার বয়সসীমাও তাদের ধরে রাখতে পারছে না। দিল্লি পুলিশ ব্যারিকেড বসিয়ে ভেবেছিল রাস্তা আটকে দেবে। তারা বুঝতে পারেনি, রাস্তা আটকালেও সময়কে আটকানো যায় না।

ক্ষমতার আরেকটি মজার রোগ আছে। চারপাশে কেবল করতালির মানুষ জড়ো করতে করতে একসময় করতালিকেই জনগণ মনে হতে থাকে। গোয়েন্দারা বলেন, ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে।’ আমলারা বলেন,‘কোনো সমস্যা নেই।’ দলীয় নেতারা বলেন, ‘সবাই খুশি।’ টেলিভিশনের পর্দায় দেখানো হয় কেবল উন্নয়ন, উন্নয়ন আর উন্নয়ন। তারপর একদিন হাজার হাজার ছাত্র রাস্তায় নেমে প্রশ্ন করে, ‘আমাদের ভবিষ্যৎ কোথায়?’ তখন শাসকের চেহারা এমন হয়, যেন বর্ষাকালে বৃষ্টি দেখে তিনি প্রথম অবাক হয়েছেন।

বাংলাদেশেও আমরা এই দৃশ্য বহুবার দেখেছি। বিরোধী নেতাদের কেউ দলে এলেন, কেউ চুপ করলেন, কেউ সুবিধা পেলেন। তখন মনে হলো, রাজনীতি শেষ। অথচ ইতিহাস হাসল। কারণ ইতিহাস জানে, নেতা কেনা যায়, প্রজন্ম কেনা যায় না। সংসদকে নীরব করা যায়, ক্যাম্পাসকে নয়। সংবাদপত্রকে ভয় দেখানো যায়, স্বপ্নকে নয়।

এডওয়ার্ড থম্পসন নামে এক ইতিহাসবিদ বলেছিলেন, মানুষ কেবল অভাবের জন্য বিদ্রোহ করে না। মানুষ বিদ্রোহ করে যখন বিশ্বাস করে, তার সঙ্গে প্রতারণা হয়েছে। এই কথাটিই ভারতের নিট আন্দোলনের প্রাণ। প্রশ্নফাঁস শুধু একটি পরীক্ষা নষ্ট করেনি; ভেঙে দিয়েছে ন্যায্যতার ধারণা। কোটি কোটি তরুণ বিশ্বাস করেছিল, রাত জেগে পড়লে জীবনে এগোনো যায়। হঠাৎ তারা দেখল, প্রশ্ন আগেই বিক্রি হয়ে গেছে। তখন ক্ষোভ শুধু পরীক্ষার বিরুদ্ধে থাকে না; রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়।

একটি লোককথা আছে। গ্রামের মেলায় এক জাদুকর প্রতিদিন ঘোষণা দিতেন,’আমার ঝুলিতে অলৌকিক পাখি আছে।" সবাই সেই অলৌকিক পাখি দেখতে টিকিট কাটত। কিন্তু জাদুকর নানা টালবাহানা করে সময় পার করে দিত। পাখি আর দেখাতো না। একদিন এক শিশু শুরুতেই জেদ ধরে বলল,‘ঝুলিটা খুলুন। পাখি দেখান আগে!’ জাদুকর রেগে গেলেন। কারণ প্রশ্নটাই ছিল বিপজ্জনক। ক্ষমতার সবচেয়ে বড় শত্রু প্রশ্ন। উত্তর নয়।
নরেন্দ্র মোদি সরকারের দুর্ভাগ্য, ছাত্ররা প্রশ্ন করতে শিখে গেছে।

আর বাংলাদেশের প্রতিটি শাসকেরও মনে রাখা উচিত, ছাত্ররা যখন প্রশ্ন করতে শেখে, তখন ইতিহাসের ক্যালেন্ডার বদলাতে বেশি সময় লাগে না।
সবচেয়ে নির্মম ব্যঙ্গটি ধর্মেন্দ্র প্রধানকে ঘিরে। যিনি একসময় প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদে ছাত্রনেতা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন, তিনিই প্রশ্নফাঁসের দায়ে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করলেন। যেন আগুন নেভাতে গিয়ে নিজের জামাতেই আগুন লেগে গেল। ইতিহাসের রসবোধ সত্যিই অসাধারণ।

এই আন্দোলনের আরেকটি সৌন্দর্য ছিল তার নির্ভীক হাসি। পুলিশের লাঠি উঠছে, আর ছাত্ররা স্লোগান দিচ্ছে। কাঁদানে গ্যাস ছোড়া হচ্ছে, তারা ব্যঙ্গ করছে। ভয়কে বিদ্রূপে পরিণত করার এই ক্ষমতা পৃথিবীর কোনো স্বৈরশাসক কখনো বোঝেনি। কারণ ভয় দিয়ে মানুষকে চুপ করানো যায়, কিন্তু হাসিকে নয়। যে জনগণ শাসককে নিয়ে হাসতে শুরু করে, তাকে আর খুব বেশি দিন ভয় দেখানো যায় না।

বাংলাদেশের জুলাইও আমাদের এই পাঠই দিয়েছে। একসময় মনে হয়েছিল সব শেষ। রাজপথ নীরব। বিরোধী দল ক্লান্ত। সমালোচকেরা নিশ্চুপ। তারপর হঠাৎ দেখা গেল, নীরবতা আসলে জমে থাকা বজ্রপাত। যে তরুণকে এতদিন’অরাজনৈতিক" বলা হয়েছিল, সেই-ই রাজনীতির নতুন সংজ্ঞা লিখতে শুরু করল।
ক্ষমতার আরেকটি অদ্ভুত প্রবণতা হলো, সে আয়না অপছন্দ করে। তার দরকার শুধু প্রতিকৃতি। তাই চারদিকে এমন মানুষ রাখা হয়, যারা বলে,‘আপনি ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ নেতা।’ ‘আপনার বিকল্প নেই।’ ‘দেশ আপনার হাতেই নিরাপদ ‘ এই প্রশংসার নেশা আফিমের থেকেও ভয়ংকর। কারণ আফিম শরীর ঘুম পাড়ায়, প্রশংসা বিবেক ঘুম পাড়ায়।

তারপর একদিন দেখা যায়, ব্যারিকেডের ওপারে হাজার হাজার তরুণ। তখন পুলিশ আসে। লাঠি আসে। কাঁদানে গ্যাস আসে। মামলা আসে। কিন্তু হারিয়ে যায় একটি জিনিস—নৈতিক উচ্চতা। রাষ্ট্রের হাতে বন্দুক থাকতে পারে। কিন্তু নৈতিকতা না থাকলে সেই বন্দুকের শব্দও ফাঁপা লাগে।
শেলির 'ওজিম্যান্ডিয়াস'-এর কথা মনে পড়ে। মরুভূমির বুকে ভাঙা মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। নিচে লেখা, ‘আমার ক্ষমতা দেখো, হে মহাশক্তিমানরা, এবং হতবাক হও ‘চারদিকে শুধু বালি। ক্ষমতার সব অহংকারের শেষ ঠিকানাও এমনই। প্রাসাদ থাকে না, পোস্টার থাকে না, প্রচার থাকে না। থেকে যায় মানুষের স্মৃতি।
বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল কিংবা ভারতের অভিজ্ঞতা আজ একই সতর্কবার্তা দিচ্ছে। তরুণদের অবহেলা করবেন না। বিরোধী দলকে ম্যানেজ করা সহজ। কয়েকজন নেতা বদলানো সহজ। কয়েকটি নির্বাচন জেতাও সম্ভব। কিন্তু একটি প্রজন্ম যদি বিশ্বাস করে রাষ্ট্র তার সঙ্গে প্রতারণা করেছে, তাহলে পৃথিবীর কোনো গোয়েন্দা সংস্থা সেই ক্ষোভের গোয়েন্দাগিরি করতে পারে না।

রাজনীতির সবচেয়ে বড় ভুল হলো মনে করা, সংখ্যাই সবকিছু। সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ, সামাজিক মাধ্যমে দুই কোটি অনুসারী, টেলিভিশনে দুইশো প্রশংসক—এসবই এক মুহূর্তে অর্থহীন হয়ে যায়, যদি রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা বিশ বছরের একটি ছেলে বলে,‘আমার ভবিষ্যৎ কে চুরি করল?’
শেষ পর্যন্ত আরশোলারাই জিতল প্রথম রাউন্ড।

শুনতে হাস্যকর লাগে। কিন্তু ইতিহাস হাস্যকর জিনিস খুব পছন্দ করে। ডেভিড গোলিয়াথকে হারায়। খরগোশ কচ্ছপের কাছে হারে। লবণের মুঠো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে কাঁপায়।

আর কখনো কখনো কয়েকটি 'আরশোলা' একটি দুর্ভেদ্য ক্ষমতাকেও মনে করিয়ে দেয়—গণতন্ত্রে শেষ কথা সিংহ বলে না, জনগণ বলে। 
আর জনগণের বয়স যদি কুড়ির কাছাকাছি হয়, তাহলে ক্ষমতার ঘড়িতে তখন সতর্কবার্তা বেজে ওঠে। কারণ পৃথিবীর প্রতিটি বড় পরিবর্তনের শুরু হয়েছিল এমন কিছু তরুণের হাত ধরে, যাদের দেখে অভিজ্ঞ রাজনীতিকেরা প্রথমে হেসেছিলেন। ইতিহাসের নিষ্ঠুরতা হলো, শেষ হাসিটা তারা কখনোই হাসতে পারেননি।

মন্তব্য করুন

Logo