Logo

১ ভাদ্র ১৪৩৩

×

Follow Us

রাষ্ট্রপতির ‘জ্বর’ ও বঙ্গভবনের ছুটির দরখাস্ত

মত-দ্বিমত

রাষ্ট্রপতির ‘জ্বর’ ও বঙ্গভবনের ছুটির দরখাস্ত

চিররঞ্জন সরকার

Icon

চিররঞ্জন সরকার

প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬, ০৯:১৪ এএম

আমাদের দেশে রাষ্ট্রপতির পদটা এমন এক অদ্ভুত পদ, যার ক্ষমতা নিয়ে যত কম বলা যায়, ততই নিরাপদ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বইয়ে এই পদকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ বলা হলেও বাস্তবের সঙ্গে বইয়ের সম্পর্ক অনেকটা বাংলা সিনেমার নায়কের সঙ্গে বাস্তব জীবনের প্রেমের মতো। কাগজে-কলমে সবই আছে, বাস্তবে একটু কম দেখা যায়।

রাষ্ট্রপতির প্রধান দায়িত্ব কী? জাতীয় দিবসে ফুল দেওয়া, শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো, সামরিক কুচকাওয়াজে স্যালুট নেওয়া, বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের পরিচয়পত্র গ্রহণ করা, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দীর্ঘ বক্তৃতা পড়ে শোনানো এবং মাঝেমধ্যে জাতির উদ্দেশে এমন কিছু বলা, যা জাতি পরদিন সকালেই ভুলে যায়। এর বাইরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে। দেশের যেকোনো সংকটে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা। তবে উদ্বেগটা এতটাই গভীর যে সেটি সাধারণ মানুষের চোখে ধরা পড়ে না।

বাকি সময়? বঙ্গভবনের সবুজ লনে হাঁটা, অতিথিদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ, ফাইলে সই করা এবং দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে নীরবে চিন্তা করা। সেই চিন্তার ফলাফল অবশ্য জনগণ সচরাচর জানতে পারে না। সম্ভবত সেগুলো বঙ্গভবনের বাগানের বিরল গাছপালার মতোই সংরক্ষিত থাকে।

কিন্তু ইদানীং সেই শান্ত-শিষ্ট পদটিকেও যেন নজর লেগেছে। হঠাৎ খবর ছড়িয়ে পড়েছে, রাষ্ট্রপতি নাকি পদত্যাগ করতে পারেন। আর কারণ? আমাদের রাজনৈতিক অভিধানের সবচেয়ে জনপ্রিয়, সর্বজনগ্রাহ্য এবং সর্বকালের পরীক্ষিত দুই শব্দ: ‘শারীরিক অসুস্থতা’।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিধানে এই দুটি শব্দের আলাদা মর্যাদা আছে। চাকরি ছাড়বেন? অসুস্থ। আপনাকে প্রতিষ্ঠান রাখতে চাচ্ছে না, চলে যেতে বলেছে? তারাই পদত্যাগের কারণ বাতলে দেন: অসুস্থ! দায়িত্ব পালন করতে চাইছেন না? অসুস্থ। বিতর্ক বাড়ছে? অসুস্থ। একটু আড়ালে যেতে চান? অসুস্থ। যেন রাষ্ট্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের পাশে একটি অদৃশ্য চিকিৎসক বসে আছেন। তিনি প্রেসক্রিপশনে শুধু একটি বাক্যই লেখেন, ‘রোগী আপাতত দায়িত্ব পালনে অপারগ।’

এই অসুস্থতা আবার খুবই ভদ্র। কারও সামনে কাশি দেয় না, জ্বর মাপে না, হাসপাতালে ভর্তি হতে চায় না। শুধু ঠিক সেই সময় হাজির হয়, যখন রাজনৈতিক ক্যালেন্ডারের পাতায় নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে।

এমন খবর শুনে আমার ছোটবেলার একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল।

আমরা তখন স্কুলে পড়ি। পরিবার ঠিক করল, সবাই মিলে বেড়াতে যাব। কিন্তু বিপদ হলো, স্কুলে তো আর ‘পিকনিকের জন্য ছুটি’ বলে কোনো নিয়ম নেই। সেখানে দুটি কারণই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য, মারা যাওয়া অথবা অসুস্থ হওয়া। প্রথম কারণটি ব্যবহার করার ঝুঁকি ছিল, দ্বিতীয়টি অনেক নিরাপদ।

তাই আগের দিন সাহস করে প্রধান শিক্ষকের কক্ষে ঢুকে বললাম, ‘স্যার, কাল আমি স্কুলে আসতে পারব না।’

তিনি চশমার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে বললেন, ‘কেন?’

আমি বিন্দুমাত্র ইতস্তত না করে বললাম, ‘স্যার, কাল আমার জ্বর আসবে।’

আজও ভাবি, এত আত্মবিশ্বাস কোথা থেকে এসেছিল! ভবিষ্যদ্বাণীও এত নিখুঁত হয় না।

প্রধান শিক্ষক একটু হেসে বললেন, ‘বেশ। তবে ছুটি এক দিনের বেশি দেওয়া যাবে না। আর খেয়াল রেখো, জ্বর যেন বেশি বাড়াবাড়ি না করে।’

আমিও নিশ্চিন্ত মনে বেরিয়ে এলাম। পরদিন যথারীতি বেড়াতে গেলাম। জ্বরও এলো, তবে কেবল ছুটির খাতায়।

এখন প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রপতির অসুস্থতাও কি সেই স্কুলজীবনের আগাম জ্বরের মতো?

যখন বঙ্গভবনের সামনে বিক্ষোভ হচ্ছিল, যখন পদত্যাগের দাবিতে স্লোগানে চারপাশ মুখর ছিল, যখন রাজনৈতিক উত্তাপ থার্মোমিটারের পারদকেও হার মানাচ্ছিল, তখন শরীর বেশ ভালোই ছিল। এখন হঠাৎ করে সেই শরীরের আপত্তি কেন?

এ কি সেই বিশেষ ধরনের অসুস্থতা, যার লক্ষণ সাধারণ চিকিৎসাবিজ্ঞানের বইয়ে নেই?

হয়তো কোনো বিশেষ চিকিৎসা প্রতিবেদনে লেখা ছিল, ‘রোগীকে আপাতত সুস্থ রাখা প্রয়োজন। রাজনৈতিক তাপমাত্রা কমে এলে হঠাৎ দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। প্রয়োজনে পদত্যাগ-উপযোগী ক্লান্তি সৃষ্টি করা হবে।’

আজকাল চিকিৎসাবিজ্ঞানও অনেক এগিয়েছে। আগে রোগ হতো শরীরে, এখন সময় দেখে হয়। আগে মানুষ জ্বরে পড়ে ছুটি নিত, এখন ছুটি নেওয়ার জন্য জ্বর আসে। এটাকেই হয়তো আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের নতুন আবিষ্কার বলা যায়।

তবে এ ক্ষেত্রে আমাদের দেশের জনগণও কম অভিজ্ঞ নয়। তারা বহু বছর ধরে একই নাটকের নতুন নতুন সংস্করণ দেখে আসছে। শুধু অভিনেতা বদলায়, সংলাপ বদলায় না।

এক সময় কেউ বলতেন, ‘পারিবারিক কারণে দায়িত্ব ছাড়ছি।’

আরেকজন বলতেন, ‘ব্যক্তিগত কারণে সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

এখন সেই জায়গা দখল করেছে ‘শারীরিক অসুস্থতা’।

মনে হয় দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্য বিভাগ নয়, বরং রাজনৈতিক অসুস্থতা নির্ণয় বিভাগ। সেখানে এমন সব রোগের নাম পাওয়া যায়, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এখনো শোনেনি।

যেমন: দায়িত্বকালের শেষ জ্বর।

পদত্যাগ-পূর্ব রক্তচাপ।

সাংবিধানিক মাথাব্যথা।

রাজনৈতিক শ্বাসকষ্ট।

আর সবচেয়ে জটিল রোগ: ‘পরিস্থিতির চাপে দুর্বলতা’।

অবশ্য এসব রোগের চিকিৎসাও খুব সহজ। পরিস্থিতি বদলালেই রোগী অনেক সময় আশ্চর্যজনকভাবে সুস্থ হয়ে ওঠেন। যে মানুষটি গতকাল পর্যন্ত হাঁটতেই পারছিলেন না, তিনিই কয়েক দিন পর অনুষ্ঠানে হাসিমুখে অতিথিদের সঙ্গে করমর্দন করছেন। চিকিৎসাবিজ্ঞান একে কী বলে জানি না, তবে রাজনীতিবিজ্ঞান একে বলে ‘সময়ের চিকিৎসা’।

আসলে আমাদের দেশের মানুষ এখন এতটাই অভিজ্ঞ হয়ে গেছে যে তারা সরকারি ঘোষণার ভাষা আর আক্ষরিক অর্থে পড়ে না। তারা বাক্যের ভেতরের বাক্য পড়তে শিখেছে। ‘শারীরিক অসুস্থতা’ শুনলেই অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, আসল রোগটা শরীরে, নাকি পরিস্থিতিতে?

তবে রাষ্ট্রপতির প্রতি সুবিচার করাও জরুরি। সত্যিই তিনি অসুস্থ হতে পারেন। মানুষ হিসেবে তাঁর অসুস্থ হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু সমস্যা হলো, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা কারও মুখে ‘অসুস্থতা’ শব্দটি শুনলেই মানুষ আগে চিকিৎসকের কথা ভাবে না, রাজনৈতিক হিসাবের খাতা খুলে বসে।

সবশেষে সেই স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কথাই আবার মনে পড়ে। তিনি যদি আজ বেঁচে থাকতেন, হয়তো বঙ্গভবনের উদ্দেশে একটি ছোট্ট নোট লিখতেন: ‘ছুটি মঞ্জুর করা যেতে পারে। তবে একটি শর্ত আছে। যে অসুস্থতার কারণে ছুটি নেওয়া হচ্ছে, পদ ছাড়ার পর যেন সেই অসুস্থতা অলৌকিকভাবে উধাও না হয়ে যায়। আর যদি খুব দ্রুত সেরে ওঠেন, তাহলে ধরে নিতে হবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নয়, রাজনীতিতেই সবচেয়ে বড় অলৌকিক ঘটনা ঘটে।’

আমরাও সেই নোট পড়ে শুধু মিটিমিটি হেসে বলতাম, ‘স্যার, আপনার ছাত্ররা বড় হয়েছে। এখন তারা আর আগাম জ্বরের গল্পে সহজে বিশ্বাস করে না। তবে গল্পটা শুনতে এখনো খুব মজা লাগে!’


মন্তব্য করুন

Logo