যে নৈতিকতা শিশুকে রক্ষা করে না, কিন্তু নারীর পোশাক পাহারা দেয়, সেটি নৈতিকতা নয়—ক্ষমতার ভাষা
শরৎ চৌধুরী
প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬, ১২:২০ এএম
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া জামায়াত নেতা ও সাতক্ষীরা–৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত ভিডিওটি আমি শেয়ার করব না। কারও সম্মতি ছাড়া ব্যক্তিগত মুহূর্ত ধারণ ও প্রচার করা ডিজিটাল সহিংসতা। কিন্তু সেই ভিডিওকে ঘিরে তৈরি হওয়া ব্যাখ্যার রাজনীতি অবশ্যই জনপরিসরের আলোচনার বিষয়।
২১ জুলাই ২০২৬ প্রকাশিত সংবাদে দেখা যায়, দল-সংশ্লিষ্ট একটি প্ল্যাটফর্ম প্রথমে ভিডিওটিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি বলে দাবি করে। পরে গাজী নজরুল ইসলাম ভিডিওতে থাকা নারীকে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী বলে দাবি করেন এবং ঘটনাটিকে ব্ল্যাকমেইল ও চাঁদাবাজির অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। অন্য প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও প্রকাশিত নথির মধ্যে অসংগতির কথাও এসেছে। এসব দাবির সত্যতা স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু ব্যাখ্যার দ্রুত পরিবর্তনটি নিজেই রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
অন্যের ক্ষেত্রে অভিযোগই প্রায়শই রায়; নিজের ক্ষেত্রে রায়ের আগেই তৈরি হয় ব্যাখ্যার দুর্গ
এই দ্বৈততা নতুন নয়। ২০২১ সালের সোনারগাঁ রিসোর্টের ঘটনায় মামুনুল হক তাঁর সঙ্গে থাকা নারীকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। পরে ওই নারী তাঁর বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা করেন। ২০২৪ সালের ২৪ অক্টোবর আদালত মামুনুল হককে সেই মামলা থেকে খালাস দেন। আইনি সত্য তাই সম্পূর্ণভাবে বলতে হবে: অভিযোগ হয়েছিল, বিচার হয়েছিল এবং তিনি খালাস পেয়েছেন।
কিন্তু প্রশ্ন কোনো নেতার ব্যক্তিগত যৌনজীবন নয়। প্রশ্ন হলো—যে রাজনীতি অন্যের সম্পর্ক, পোশাক, শরীর ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে জনতার বিচারের বিষয় বানায়, নিজের নেতার ক্ষেত্রে কেন হঠাৎ গোপনীয়তা, প্রেক্ষাপট ও প্রমাণের প্রয়োজন অনুভব করে?
এখানেই উন্মোচন ও জবাবদিহিতার ব্যবধান। আমি আগের লেখায় একে “Exposure Without Collapse” বলেছি: তথ্য বের হয়, ক্ষোভ তৈরি হয়, আর্কাইভ বড় হয়; কিন্তু দায়িত্ব ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ, অন্যদিকে স্থানান্তরিত অথবা অস্পষ্ট করে প্রতিষ্ঠান নিজের নৈতিক কর্তৃত্ব অক্ষত রাখে। উন্মোচন তখন কাঠামো বদলায় না; বরং কয়েক দিনের ডিজিটাল দৃশ্যে পরিণত হয়।
উন্মোচন বাড়ে, আর্কাইভ বড় হয়; কিন্তু ক্ষমতার কাঠামো বদলায় না
এই নির্বাচিত নৈতিকতা বোঝার জন্য মাদ্রাসায় শিশু যৌন নিপীড়নের দিকে তাকানো জরুরি। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে মাদ্রাসায় অন্তত ৫২ জন শিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে; তাদের মধ্যে তিনজন মারা গেছে। এটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় জরিপ নয়, বরং নথিভুক্ত ঘটনার হিসাব। তাই প্রকৃত ব্যাপ্তি এই সংখ্যা দিয়ে নিশ্চিত করা যায় না। কিন্তু নথিভুক্ত ৫২টি শিশুও কি জাতীয় নৈতিক ক্ষোভ তৈরির জন্য যথেষ্ট নয়?
নারীর পোশাক, গান, নাটক, উৎসব, ভাস্কর্য কিংবা একটি ফেসবুক পোস্ট নিয়ে যে মোরাল মব মুহূর্তে তৈরি হয়, মাদ্রাসার শিশুর জন্য সেই জনতা কোথায়? কোথায় বাধ্যতামূলক শিশু সুরক্ষা নীতি, শিক্ষক ও আবাসিক তত্ত্বাবধায়কের অতীত যাচাই, স্বাধীন পরিদর্শন, নিরাপদ অভিযোগব্যবস্থা এবং অপরাধ আড়ালকারী কর্তৃপক্ষের জবাবদিহিতা?
যে নৈতিকতা শিশুকে রক্ষা করে না, কিন্তু নারীর পোশাক পাহারা দেয়, সেটি নৈতিকতা নয়—ক্ষমতার ভাষা
একই কাঠামো মাজার ভাঙার ঘটনাতেও দৃশ্যমান। সুফি ঐতিহ্যবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান মাকামের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে পরবর্তী ১৭ মাসে ৯৭টি মাজারে হামলার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় তিনজন নিহত ও ৪৬৮ জন আহত হয়েছেন। প্রতিবেদনে ৫৯টি হামলার কারণ হিসেবে ধর্মীয় মতবিরোধ চিহ্নিত করা হয়েছে এবং অন্তত ২৩টি ঘটনায় ধর্মীয় স্লোগান দিয়ে হামলার তথ্য পাওয়া গেছে।
দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে সিরাতে মুস্তাকিম পরিষদের ব্যানারে বের হওয়া মিছিল থেকে শত শত মানুষ একটি মাজারে ঢুকে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালায়। ওরসের জন্য আনা জিনিসপত্র ও পশুও লুট করা হয়। আগুনে জ্বলতে থাকা মাজারের সামনে নামাজ পড়ার দৃশ্যও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
মাজার ভাঙা শুধু একটি স্থাপনা ভাঙা নয়; এটি বিশ্বাসের বহুত্ব এবং কার ইসলাম জনপরিসরে বৈধ হবে—সেই প্রশ্নে বলপ্রয়োগ
ওয়াজ, খুতবা বা ধর্মীয় সমাবেশকে সামগ্রিকভাবে দায়ী করা যাবে না। অধিকাংশ ধর্মীয় বক্তব্য ব্যক্তিগত সংশোধন, শান্তি ও নৈতিক শিক্ষার ভাষা বহন করে। কিন্তু কিছু জনপ্রিয় ওয়াজে নারী, শিল্পী, মাজারের অনুসারী, ভিন্নমতাবলম্বী কিংবা সাংস্কৃতিক চর্চাকে বারবার ‘অশ্লীল’, ‘শিরক’, ‘ফিতনা’ বা ‘ইসলামবিরোধী’ হিসেবে নামকরণ করা হয়। ওয়াজে নারীদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক বক্তব্য নতুন নয়; বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের বক্তব্য নিয়ে জাতীয় বিতর্কও হয়েছে।
এই ভাষা সব সময় সরাসরি হামলার নির্দেশ দেয় না। কিন্তু হামলার নৈতিক পূর্বশর্ত তৈরি করে। একটি জনগোষ্ঠী বা সাংস্কৃতিক চর্চাকে প্রথমে ভুল, পরে অপবিত্র এবং শেষে সামাজিকভাবে শাস্তিযোগ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। তখন মবের অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের অপরাধী নয়, বরং নৈতিক দায়িত্ব পালনকারী হিসেবে কল্পনা করতে পারেন।
মব রাস্তায় জন্মায় না; তার জন্ম হয় ভাষায়, বক্তৃতায়, ওয়াজে, পোস্টে এবং পুনরাবৃত্ত নৈতিক অনুমোদনে
অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এই প্রক্রিয়াকে বহুগুণ দ্রুত করে। একটি কাটা ভিডিও, স্ক্রিনশট, অসম্পূর্ণ বক্তব্য বা অভিযোগ কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হাজারো মানুষের নৈতিক রায়ে পরিণত হয়। ‘চরিত্রহীন’, ‘নাস্তিক’, ‘ফিতনা’, ‘দালাল’—এই শব্দগুলো শুধু অপমান নয়; এগুলো কাউকে সমষ্টিগত শাস্তির জন্য প্রস্তুত করে।
আমার “Language as Violence” প্রবন্ধের ভাষায়, ডিজিটাল মব প্রথমে নাম দেয়, তারপর অপরাধ নির্ধারণ করে, শেষে অন্যদের শাস্তিতে অংশ নিতে আহ্বান জানায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রসঙ্গ বিচ্ছিন্ন করে, দর্শক বাড়ায়, অপমানের পুনরাবৃত্তি ঘটায় এবং রাগ ও নৈতিক আতঙ্ককে পুরস্কৃত করে। ফলে সংযত ব্যাখ্যার চেয়ে শত্রু তৈরির ভাষাই বেশি দূর যায়।
অননুমোদিত ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও ও তথ্য প্রচার নারীর ক্ষেত্রে বিশেষভাবে হয়রানি, মর্যাদাহানি এবং অভিযোগ করতে ভয় পাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করে। অ্যালগরিদমিক ব্যবস্থায় নেতিবাচক কনটেন্ট দ্রুত ছড়ায়, অথচ প্রতিকার ও ভুক্তভোগী সহায়তার ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে দুর্বল থাকে।
এই পরিস্থিতি জুলাই-পরবর্তী নৈতিক পুনর্বিন্যাসের সঙ্গেও সম্পর্কিত। রাষ্ট্র ও পুরোনো রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা ভেঙে পড়লে মানুষ নৈতিক নির্ভরযোগ্যতার নতুন উৎস খোঁজে। ‘ভালো মুসলমান’ তখন শুধু ধর্মতাত্ত্বিক পরিচয় নয়; সামাজিক বিশ্বাসযোগ্যতা, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বৈধতার একটি শ্রেণিতে পরিণত হয়।
কল্যাণমূলক নেটওয়ার্ক, ক্যাম্পাস সংগঠন, ওয়াজ, ধর্মীয় ভাষা, ডিজিটাল বাণিজ্য ও অনলাইন প্রভাব—সব মিলিয়ে মোরাল ইকোনমি রাষ্ট্রের দুর্বল জায়গা দখল করে। কিন্তু নৈতিক মূলধন যখন রাজনৈতিক ক্ষমতায় রূপ নেয়, তখন জবাবদিহিতাও বাড়তে হয়—কম নয়।
সমস্যা ধর্ম নয়; সমস্যা নৈতিকতার একচেটিয়া মালিকানা
আমি কোনো ব্যক্তির শোবার ঘরে জনতার ক্যামেরা বসাতে চাই না। কোনো মাজারের সব চর্চাকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখতেও চাই না। কোনো মাদ্রাসাকে শুধু তার পরিচয়ের কারণে অপরাধী বলাও উচিত নয়।
কিন্তু ধর্মীয় বা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান যখন সমাজের নৈতিক অভিভাবক হওয়ার দাবি করে, তখন তার জন্য মানদণ্ড আরও কঠোর হতে হবে। নিজের ও প্রতিপক্ষের জন্য একই নীতি, অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত, শিশুদের নিরাপত্তা, বিশ্বাসের বহুত্ব এবং অনলাইন-অফলাইন সহিংসতার বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান—এসব ছাড়া নৈতিকতার দাবি বিশ্বাসযোগ্য নয়।
নির্বাচিত ক্ষোভ ন্যায়বিচার আনে না। এটি শুধু নির্ধারণ করে—কার অপরাধ দৃশ্যমান হবে, কারটি ব্যাখ্যায় ঢাকা পড়বে এবং কার কান্না নীরবতার মধ্যে হারিয়ে যাবে।
মন্তব্য করুন

