Logo

৯ ভাদ্র ১৪৩৩

×

Follow Us

বাসমতি নিয়ে ত্রিমুখী লড়াই

খোঁজ-খবর

বাসমতি নিয়ে ত্রিমুখী লড়াই

সাঈদ হাসান

সাঈদ হাসান

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬, ০৪:২৮ পিএম

একটা চালের নাম এবং জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন রাইটস (জিআই) নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে লড়াই কত জমজমাট রূপ নিতে পারে সেটা দেখিয়ে দিচ্ছে বাসমতি! আমরা জানি, বাসমতি চালের মালিকানা বা জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন রাইটস নিয়ে আসল লড়াইটা মূলত ইন্ডিয়া আর পাকিস্তানের মধ্যে। তবে এই পুরানো দ্বন্দ্বে এখন নতুন করে যোগ দিয়েছে নেপাল।

বাসমতি চালকে নিজস্ব সম্পদ দাবি করার এই আইনি যুদ্ধের ইতিহাসটা কিন্তু বেশ পুরানো। লড়াইটা বড় আকারে শুরু হয়েছিল ১৯৯৭ সালে। সেসময় টেক্সাসের কোম্পানি 'রাইসটেক' মার্কিন প্যাটেন্ট ও ট্রেডমার্ক অফিসে বাসমতি রাইসের পেটেন্ট নিয়ে সেটার নাম দিয়েছিল ‘টেক্সমাটি’। ওই ঘটনার পরেই লড়াইটা বৈশ্বিক রূপ নেয়। ইন্ডিয়া তখন এপিডিএ-এর মাধ্যমে ওই দাবির তীব্র বিরোধিতা করে, এমনকি দিল্লিতে মার্কিন দূতাবাসের সামনে বিশাল প্রতিবাদও হয়। চাপের মুখে পেটেণ্টের প্রায় ১৫টা দাবি তুলে নিতে বাধ্য হয়েছিল ওই আমেরিকান কোম্পানি।

এরপর থেকে শুরু হয় ইউরোপীয় ইউনিয়নের দরবারে আসল লড়াই। ইন্ডিয়া চায় ইইউ-তে বাসমতি চালের একক জিআই ট্যাগ বা স্বত্ব নিজেদের নামে নিতে। কিন্তু পাকিস্তান স্বাভাবিকভাবেই এটার বিরোধিতা করে। তারা নিজেদের দাবি শক্ত করতে ২০২১ সালে আলাদা জিআই আইন পাস করে এবং ২০২৩ সালের ২৪ আগস্ট ইইউ-তে নিজেদের আবেদন জমা দেয়।

ঠিক এই জায়গায় নেপালের এন্ট্রি! ২০২০ সালের ৯ ডিসেম্বর নেপাল ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে ইন্ডিয়ার দেওয়া একক জিআই আবেদনের বিরুদ্ধে অফিশিয়াল আপত্তি বা অবজেকশন ফাইল করে। তাদের মূল বক্তব্য খুব পরিষ্কার— হিমালয়ের পাদদেশের এই অঞ্চলে বাসমতি চাল বহু শতাব্দী ধরে চাষ হয়ে আসছে। নেপালের তরাই অঞ্চলে বিশেষ করে কপিলাবস্তুর মতো জায়গায় ঐতিহ্যবাহী সুগন্ধি বাসমতি ও কালানমক ধানের চাষের ইতিহাস অনেক পুরানো। তাই বাসমতির ওপর শুধুমাত্র ইন্ডিয়া বা পাকিস্তানের একক অধিকার থাকতে পারে না, নেপালেরও এতে সমান দাবি আছে।

তবে নেপালের দাবির জায়গায় কিছু শক্তির পাশাপাশি বড় ধরনের দুর্বলতাও রয়েছে। ইতিহাস ও ভৌগোলিক অবস্থান তাদের বড় শক্তি। নেপালের দক্ষিণাঞ্চলের সমতল ভূমিতে বাসমতির ঐতিহ্যবাহী জাতগুলো প্রাকৃতিকভাবেই জন্মায় এবং স্থানীয় সংস্কৃতি ও কৃষির সাথে এটা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অন্যদিকে নেপালের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো তাদের নিজস্ব কোনো শক্ত জিআই আইন এতদিন ছিল না। ফলে তারা আন্তর্জাতিকভাবে নিজেদের দেশের কৃষিপণ্যগুলোর বাণিজ্যিক সুরক্ষা দিতে বা নথি দিয়ে প্রমাণ উপস্থাপন করতে পিছিয়ে পড়ছে। তবে এই খামতি মেটাতে নেপাল এখন তাদের প্রথম জাতীয় জিআই আইন তৈরি করার কাজ চালাচ্ছে— যাতে বাসমতি থেকে শুরু করে ইলাম টি-র মতো নিজস্ব পণ্যগুলোকে আন্তর্জাতিক আইনি সুরক্ষা দেওয়া যায়।

একটা চালের আন্তর্জাতিক স্বত্ব বা ব্র্যান্ড ভ্যালু ধরে রাখার জন্য যে ধরনের কূটনৈতিক আর আইনি লড়াই চলছে, পুরো ব্যাপারটা আসলেই খুব চমকপ্রদ। দেখা যাক, নেপালের এই নতুন পদক্ষেপে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাসমতির ভৌগোলিক স্বত্ব নিয়ে শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেয়! 

মন্তব্য করুন

Logo