Logo

৮ ভাদ্র ১৪৩৩

×

Follow Us

স্মৃতির নকশী কাঁথা বুনে রেখে, মানুষ চলে যায়

ছবিঃ রঞ্জন কর্মকার, সংগৃহীত

ফিচার

শ্রদ্ধা

স্মৃতির নকশী কাঁথা বুনে রেখে, মানুষ চলে যায়

সমাজকর্মী, মানবাধিকার কর্মী ও সংখ্যালঘু অধিকার নেতা রঞ্জন কর্মকার গত ১২ আগস্ট ৭২ বছর বয়সে চলে গেলেন না-ফেরার দেশে। দীর্ঘ কর্মজীবনে সহকর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন দায়িত্বশীল, আন্তরিক ও মানবিক একজন মানুষ। কাছ থেকে পাওয়া দুই সহকর্মী ফারহানা হাফিজ ও লুৎফর রহমানের স্মৃতিতে উঠে এসেছে রঞ্জন কর্মকারের কর্মজীবন, ব্যক্তিত্ব ও মানুষ হিসেবে তাঁর নানা দিক।

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬, ১০:১৪ পিএম

লুৎফর রহমান

সেই কবেকার কথা, কত বছর হবে? কত স্মৃতি যে রঞ্জন দা-র সাথে। দাদা তখন রায়ের বাজার থাকতেন। তার স্নেহের পাল্লাটা বরাবরই আমার দিকে ভারি ছিল। বলতেন আজ খাসির মাংস রান্না হবে- বাসায় এসো। আমি চলে যেতাম। লোটাস (দাদার ছোট বোন) তখন ছোট। খাওয়া দাওয়ার পর দরজার পাশ দিয়ে ইশারায় টাকা চাইছে কোক কেনার জন্য, দাদা মাথা নাড়াতো-হবে না। দুজনের মুখেই হাসি থাকতো। অনেকক্ষণ চলতো এই যুদ্ধ। আমিও হাসতাম আর ভাবতাম ভাই-বোন কি সুন্দর সম্পর্ক। বৌদির মুখের হাসিটা তখন আরও যেন চওড়া ছিল। কি যে সুখের দিনগুলো। 

দাদা একসময় ছাত্র ইউনিয়ন করতেন; তারপর উদীচী, খেতমজুর সমিতি। তখন থেকেই দাদার সাথে আমি। তারপর সিডিএল-এ। আমাকে বগুড়ার মডেল সেন্টার করার দায়িত্ব দিলেন। সেই শুরু একসাথে কাজ করা।

সুদিন যেমন থাকে দুর্দিনও তেমনি আসে। দাদা আর চাকরিটা করতে পারছেন না আবার ছাড়তেও পারছেন না। চাকরি না থাকলে চলবেন কিভাবে? কয়েকটা প্রজেক্ট নিয়ে দৌড়ঝাঁপ করছেন কিন্তু দেরি হচ্ছে। চাকরি নিয়ে প্রতিদিন ঝক্কি-ঝমেলা হচ্ছে। এদিকে দাদার খুব তাড়াতাড়ি দরকার। ফ্যাপ নিয়ে একটা প্রকল্পের কাজ তখন রেডি, তখনই শুরু করা যায়। আমি দাদার কথাই দাদাকে ফেরত দিলাম, বললাম আপনিই তো বলতেন লং টার্ম চিন্তা করতে। দাদা আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। পরিস্থিতি যখন খুব খারাপ তখন দাদা হঠাৎ অশকা ফেলোশিপ পেলেন। ফেলোশিপে তখন প্রতি মাসে বেশ কিছু টাকা দিত। সাহস বেড়ে গেল। এর মধ্যে হঠাৎ একদিন দাদা জরুরি তলব করলেন। চাকরি তখন ছেড়ে দিয়েছেন। আমি গেলে বললেন রেডি হউ, ফ্যাপের কাজটা মনে হয় করতেই হবে, ওরা খুব করে ধরেছে। আমি খুব কনফিডেন্টের সাথে বললাম-দূর এইসব ফ্যাপ ট্যাপ বাদ দেন তো, জেন্ডার নিয়েই আমরা কাজ করবো। আর এ কাজটা আপনি পাবেনই। তার প্রতি আমার আত্মবিশ্বাস দেখে তিনি অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। কিছুক্ষণ ভাবলেন, তারপর বললেল- চল বের হই। তখন আমরা প্রায়ই এমন এ অফিস ও অফিস ঘুরতাম, জুতার তলা ক্ষয় হতো। আমরা দুজন এক অফিসে গেলাম, আমার সামনেই তিনি ফ্যাপের কাজ না করে দিলেন। বের হওয়ার পর আমরা হাঁটতে থাকলাম, দাদার সাথে থাকার মানে হল বিভিন্ন রকম আইডিয়া নিয়ে আলোচনা। কিছুদূর গিয়ে বললেন চল চা খাই। আমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চা খেতে লাগলাম। জানিনা না, না বলতে পারার সাফল্যে কিনা। 

কত কত আইডিয়া যে জেনারেট হল আবার তা হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। দাদা শূন্য আইডিয়া থেকে মুহূর্তেই দারুণ দারুণ আইডিয়া তৈরি করতে পারতেন, আমি খুব অবাক হয়ে যেতাম। তার সব আইডিয়াই আমার কাছে তখন এক্সিলেন্ট মনে হত। এরও মাস কয়েক পর প্রজেক্ট টা হয়ে গেল। ১৯৯৫ সাল। দাদা গড়ে তুললেন-স্টেপস টুয়ারডস ডেভেলপমেন্ট। শুরু হল জেন্ডার নিয়ে কর্মযজ্ঞ। 
  
স্টেপসের প্রথম পাঁচ বছর রঞ্জন দা ছিলেন রিয়াল অর্থে লিডার। সহকর্মীদের দিতেন অসাধারণ স্বাধীনতা। এই পাঁচ বছরে তার কোন দোষত্রুটি আমি দেখিনি। অভাবনীয় একটা কর্ম পরিবেশ গড়ে তুলতে পেরেছিলেন। এই সময় তার সব চাইতে বিচক্ষণতা ছিল -তিনি মানুষ চিনতে পারতেন, খুঁজে খুঁজে এমন মানুষগুলোকে জড় করেছিলেন যে স্টেপসের এগিয়ে যাওয়া ছাড়া কোন বিকল্প ছিল না।  
 
তার গুণের শেষ ছিল না। এম হাবিবুর রহমান ছিলেন তখন রিফ্লেক্টের প্রধান। সেই প্রজেক্টের সব সহকর্মীদের জন্য ৫ দিনের জেন্ডার ট্রেনিং করানো হচ্ছে। হাবিব ভাইসহ সবাই উপস্থিত থাকেন। আমি, শাহিন ভাই আর রঞ্জনদা ট্রেইনার। ৫টার পর ফিরে গিয়ে হাবিব ভাইসহ আমরা বসি আজকের দিনটা কেমন গেল। সেদিন আমি খুব কড়া ভাষায় রঞ্জনদার সেশনের সমালোচনা করলাম। হাবিব ভাই খুব অবাক হলেন। পরে একদিন আমাকে বললেন—তুমি সেদিন যে ভাষায় রঞ্জনের সমালোচনা করলে আর রঞ্জন সেটা হজম করলো। বাংলাদেশের আর কোন ইডি এটা সহ্য করতো কিনা জানিনা। আমি হাবিব ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম এবং রিয়ালাইজ করলাম এটা তাহলে ডেভেলমেন্ট ফিল্ডের কালচার না, রঞ্জনদার ব্যাক্তিগত গুণ। আমি কথা বলায় সংযত হতে থাকলাম। দাদার প্রতি আমার শ্রদ্ধাবোধ আরও বেড়ে গেল। 
       
দ্বিতীয় পাঁচ বছরে তিনি দোষে-গুণে মানুষ হয়ে উঠতে থাকলেন। নেম-ফেমের কারণে তার আশেপাশে তোষামোদকারীদের আনাগোনা শুরু হয়ে গেল, তিনি ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে লাগলেন। আগে বাবুর জন্ম দিনে আমরা সহকর্মীরা সবাই ভিড় করতাম, এখন খবরই পাইনা। অফিসেও গ্রেট লিডার থেকে গুড ম্যানেজার হতে শুরু করলেন। সব কিছুতে যত বেশি নাক গলাতে শুরু করলেন, স্টেপসের গতিটা তত বেশি স্লো হতে থাকলো।  

একদিন যেসব কারণে রঞ্জনদাকে চাকরি ছেড়ে দিতে হয়েছিল, ঠিক প্রায় একই রকম কারণে আমাকেও রঞ্জনদাকে ছেড়ে আসতে হল। আমাদের একটা স্বপ্নের মৃত্যু হল। আমি স্টেপস ছেড়ে আসলেও কখনো দাদাকে ভুলে যেতে পারিনি। তাকে ভুলে যাওয়া সহজ ছিল না। কিছু দোষের কারণে মানুষের সারাজীবনের গুণগুলোকে অস্বীকার করা এটা কোন কাজের কথা নয়। আমি তার সমস্ত গুণগুলোতে ফোকাস করতে থাকি, তার সাথে আমার যোগাযোগ সচল থাকে।   

মানুষকে অসম্ভব ভালবাসতেন তিনি। কৃতজ্ঞতাবোধ ছিল ওনার মধ্যে। একদিন ছাদে এলেন, তখন সবাই চলে গেছে। আমার বসার রুম ছিল চিলেকোঠায়, সামনের খোলা ছাদ, মাথার উপর টালি দেয়া। তখন আমরা প্রায়ই এখানটাতে বসতাম গল্প করার জন্য। নিজেই চা বানিয়ে নিয়ে এলেন। বললেন—আসো চা খাই। মাঝে মাঝেই এভাবে বসতেন। কথায় কথায় বললেন দেখ, এই মানুষগুলো আমাদেরকে কত ভালোবাসে। আমরা তাদের কিছুই দিতে পারি না, তারপরও তারা আমাদেরকে নিঃশর্ত ভালোবাসে। সবাই-ই ভালোবাসে, তারপরও না এদের ভালোবাসায় আমি মুগ্ধ হয়ে যাই। আমরা কতগুলো নাম বলতে থাকলাম। যেমন চিটাগাঙের নাজের ভাই, খুলনার স্বপনদা-রফিক ভাই, গাইবান্ধার সালাম ভাই, নোয়াখালীর আওয়াল ভাই-মনুদা, বগুড়ার সাইদ ভাই, ঠাকুরগাঁর রবিউল ভাই, সিরাজগঞ্জের আলাউদ্দিন ভাই, চুয়াডাঙ্গার মহসিন ভাই-পিনু ভাই-বেলাল ভাই, জামালপুরের মাসুদ ভাই, ঢাকার মাহমুদ ভাই-নিরু আপা-রেবা আপা, বরিশালের রঞ্জিতদা-জাহিদ ভাই, পটুয়াখালীর মনসুর ভাই-হাবিব ভাই, বরগুনার আজাদ ভাই-মতি ভাই, বাবুগঞ্জের আবুল ভাই আরও কত কত সুহৃদের নাম আসলো, জাতীয় পর্যায়ের অনেকের নাম আসলো। এনাদের প্রতি সত্যই তিনি কৃতজ্ঞ ছিলেন। আমাকে বললেন এদেরকে কখনো ভুলে যেও না। বলেই বললেন অবশ্য তোমাকে একথা বলার প্রয়োজন নেই, তুমিই তো আমাকে মনে করিয়ে দাও। আমরা প্রায় দশটা বাজিয়ে দিলাম কথা বলতে বলতে। এমন কৃতজ্ঞ মানুষ আমি কম দেখেছি।
         
আমি তার প্রতিটা জন্ম দিনে ফুল নিয়ে হাজির হই, দাদা খুব খুশি হতেন। এক জন্মদিনে তিনি দুঃখ মিশ্রিত কণ্ঠে বললেন—একমাত্র তুমি মনে রেখেছো, আর কেউ মনে রাখেনি। আমার বলতে ইচ্ছা করলো কিন্তু বলা হয়নি। বেঁচে থাকতে আমরা বলতে পারি না। বহুকাল আগে, স্টেপসের চিন্তা তখন মাথাতেও আসেনি। রঞ্জনদা আর আমি আমার বাসায় খেতে বসেছি, আমার মা দুজনকে বসিয়ে খাওয়াচ্ছেন। আমার মা সবাইকে খুব আপন করে ফেলতে পারতেন। রঞ্জনদা খুব ইমোশনাল হয়ে গেলেন। হঠাৎ খুব ধরা গলায় বললেন—খালাম্মা আমাকে আপনার ছেলে মনে করবেন, আমি লুৎফরের দাদা। তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো। রঞ্জনদা আপনাকে কিভাবে মন থেকে মুছে ফেলি? এইসব মুহূর্তগুলো আমাদের জীবনে ছিল এবং তা আজও জীবন্ত। কিন্তু হায় কিছুই বলা হয়নি। 

বরাবরের মত গত জন্মদিনেও গেছি একগোছা জলপদ্ম নিয়ে। এটা তার খুব পছন্দের, সেদিন কেমন করে যেন পেয়ে গেলাম। মানুষ যে হারিয়ে যাবেন তা কি সে আগে থেকে বুঝতে পারেন? তিনি উঠে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন আমি জানতাম তুমি আসবা। সঞ্জিত এসে ফুলগুলো একটা ফ্লাওয়ার ভাসে দিয়ে গেল। তিনি সেটা নিয়ে নিজের মত করে সাজালেন, বললেন তুমি এই ফুলের কথা মনে রেখেছ দাদা? গেলেই দাদা এবং সামসুল খাওয়ার জন্য জোরাজুরি করতেন। সেদিন একটু ব্যাস্ততা ছিল, বললাম আজ আর খাব না। তিনি সিঁড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিতে আসলেন। বললেন—আমি সার্থক অন্তত একজন আমাকে মনে রেখেছে আর সবাই ভুলে গেছে। আমি নিজেও আবেগকে খুব গুরুত্ব দেই। দাদার কথা শুনে আমি বহুবছর আগে ফিরে গেলাম। আমার তখন বিয়ের কথাবার্তা চলছে। আমি ট্যুরে গেছি। আমার শ্বশুর রঞ্জনদার কাছে এসেছেন আমার সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিতে। তারা একই এলাকার। আমি ফিরে এলে বললেন তোমার সম্পর্কে জানতে এসেছিল আমার কাছে। আমি বলে দিয়েছি আমারা এক মায়ের পেটের না, কিন্তু ও হলো আমার ছোট ভাই। রঞ্জনদা আমি এই কথা কিভাবে ভুলে যাই? আমি সমস্ত মান-অভিমান ভুলে যেতে পারি, আমি মত-দ্বিমত সমস্ত মতদ্বৈততা ভুলে যেতে পারি, আমি আদর্শিক দ্বন্দ্ব ভুলে যেতে পারি, আমি সমস্ত দেনা-পাওনা ভুলে যেতে পারি কিন্তু আপনার এই কথা আমি কিভাবে ভুলে যাবো? 

আপনাকে কেউ ভুলে যেতে পারেনি, চেয়ে দেখেন, আজ ছেয়ে গেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওয়ালগুলো ছবি আর আপনারই স্মৃতিচারণে। আপনার কর্মের কারণেই আপনাকে কেউ ভুলে যেতে পারেনি, ভুলে যেতে পারেনা। 

রঞ্জন দা— একটি প্রশ্ন থেকে যে পাঠের শুরু

ফারহানা হাফিজ

সময়টা ১৯৯৯ সালের মে মাস। স্টেপস্ এর তৃতীয় তলার টালি দেওয়া বারান্দাটিতে ইন্টার্নশিপ করতে এক ধরনের ইন্টারভিউ দিতে অনেকেই গিয়েছিলাম। আমার পালা যখন এলো, রঞ্জনদা প্রথমেই জানতে চাইলেন, ‘নিজেকে এখন কীভাবে দেখো, কী পরিচয়ে ভাবো, আর ১০ বছর পরে নিজের পরিচয়টা কেমন দেখতে চাও?’

সেই প্রশ্নের মধ্য দিয়েই রঞ্জনদার সাথে আমার পরিচয়ের শুরু। কিন্তু পরে জেনেছি, তাঁর সাথে আমার পরিবারের যোগসূত্র অনেক পুরোনো। আমার মেজো চাচা ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের বরিশাল জেলার সেক্রেটারি এবং রঞ্জনদার সমসাময়িক। কাজ শুরু করার পর একবার আমরা রাজশাহী যাচ্ছি। গাড়িতে কথায় কথায় রঞ্জনদা জানতে চাইলেন, বরিশালে আমাদের বাসা কোথায়। বললাম, কলমীলজ। দেখলাম, তাঁর চোখ যেন হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বললেন, ‘তুমি মাসুদের কী হও?’ পুরো পরিচয় জানার পর হেসে বললেন, ‘তুমি জানো, তোমাদের বাসার সামনের ঘরে আমাদের কত গোপন বৈঠক হতো?’

সেই থেকে রঞ্জনদার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা যেন অন্যরকম হয়ে গেল। আমাদের পারিবারিক ও রাজনৈতিক স্মৃতির সঙ্গে তাঁর ছাত্রজীবন, রাজনৈতিক জীবন এবং পরবর্তীতে স্টেপস্ গড়ে তোলার গল্পগুলো মিশে গেল। প্রায়ই স্টেপস্-এর নিচতলার আমাদের অফিসকক্ষে বসে তিনি তাঁর সেই সময়গুলোর ঝাঁপি খুলে বসতেন।

একদিন এমনই এক আলোচনায় আমরা গ্রামশি আর পাওলো ফ্রেইরিকে কিছুটা পড়েছি বলাতে রঞ্জনদা যেন হঠাৎ উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন। তখন বুঝিনি, কেন এই দুই চিন্তকের নাম শুনে তাঁর এত আনন্দ। পরে বুঝেছি, তিনি শুধু তাঁদের তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করতে চাইছিলেন না; তিনি আমাদের শেখাচ্ছিলেন তত্ত্বকে কীভাবে জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হয়।

ফ্রেইরির কথায়—শিক্ষা মানে কারও মাথায় জ্ঞান ঢেলে দেওয়া নয়; শিক্ষা হলো মানুষকে নিজের বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন করতে, সেই বাস্তবতাকে বুঝতে এবং প্রয়োজন হলে তা বদলানোর ক্ষমতা অর্জন করতে সাহায্য করা।
রঞ্জনদার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে এই জায়গাটা আমি খুব গভীরভাবে বুঝতে শিখেছি। তিনি কখনো কোনো বিষয়কে শুধু ‘এটাই উত্তর’ বলে সামনে রাখতেন না। বরং প্রশ্ন করতেন— কেন এমন হচ্ছে? এর পেছনে ক্ষমতার সম্পর্ক কী? কারা সিদ্ধান্ত নিচ্ছে? কার কথা শোনা যাচ্ছে না? আমরা যে সমস্যাটাকে দেখছি, সেটিকে অন্যভাবে দেখা যায় কি না? ফলে আলোচনার শেষে হয়তো কোনো নির্দিষ্ট উত্তর পাওয়া যেত না, কিন্তু আরও অনেক প্রশ্ন নিয়ে আমরা বের হতাম। আর সেই প্রশ্নগুলোই পরবর্তী চিন্তার দরজা খুলে দিত।

আমরা তখন সমাজবিজ্ঞান থেকে সদ্য পাশ করা চারজন স্টেপসের সাথে চাকরিতে চুক্তিবদ্ধ হলাম।আমাদের অনেক কিছুই স্পষ্ট জানা ছিল না, কিন্তু জানার আগ্রহ ছিল। রঞ্জনদা সেই আগ্রহটাকে সম্মান দিয়েছেন। আমাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ও প্রশ্নকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনায় আমরা শিখেছি—শুধু বইয়ের জ্ঞান নয়, মানুষের জীবনও জ্ঞানের উৎস।

আজ মনে হয়, রঞ্জনদার কাছ থেকে আমরা আসলে এই ধারাটিই শিখেছিলাম—প্রশ্ন করা, ভাবা, আলোচনা করা, মানুষের কাছ থেকে শেখা এবং সেই চিন্তাকে সংগঠিত কাজে রূপ দেওয়া।
রঞ্জনদার মধ্যে বাম রাজনীতির সামাজিক বিশ্লেষণ, মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা এবং সংগঠিত রাজনৈতিক কাজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে এনজিও ও উন্নয়নকাজের বাস্তবতা, গবেষণা, যোগাযোগ, এ‍্যাডভোকোসি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনাকে মিলিয়ে নেবার এক অসাধারণ ক্ষমতা ছিল। ফলে কাজ তাঁর কাছে কখনো শুধু দাতাসংস্থার প্রকল্পে সীমাবদ্ধ ছিল না। একটি কাজের পেছনে কেন সেই কাজ, কার জন্য, কী পরিবর্তন চাই এবং সেই পরিবর্তনে মানুষের ভূমিকা কী—এই প্রশ্নগুলো সবসময় সামনে থাকত।

রঞ্জনদার কাছ থেকে আমি আরও একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শিখেছি—একটি কাজ শুরু করা এবং সেটিকে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখা দুটো ভিন্ন দক্ষতা। একটি ধারণা কীভাবে কাজে পরিণত হয়, মানুষকে কীভাবে সঙ্গে নিতে হয়, কাজকে কীভাবে সংগঠিত করতে হয় এবং শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তার দায়িত্ব কীভাবে ধরে রাখতে হয়, সেই সাংগঠনিক দীক্ষাটা আমি স্টেপসে পেয়েছি।

আরেকটি শিক্ষা আমার কাছে আজও সমান গুরুত্বপূর্ণ—অগ্রজদের সম্মান করা। পদমর্যাদা, সুযোগ বা কোনো একটি সময়ে অর্জিত সাফল্যে হয়তো আমরা অনেকেই আমাদের অগ্রজদের ছাড়িয়ে যেতে পারি। কিন্তু তাঁদের অভিজ্ঞতা, তাঁদের পথ পেরিয়ে আসার শিক্ষা এবং তাঁদের কাছ থেকে শেখার মূল্য কখনো শেষ হয় না।

তাহলে কি রঞ্জনদা দোষ-গুণের ঊর্ধ্বে ছিলেন? মোটেই না। কোনো মানুষই তা নন। এমনকি মহান নেতৃত্বেরও কখনো কখনো ছন্দপতন হয়; একসময় তাঁর মধ্যেও হয়েছে। কোনো কোনো সিদ্ধান্ত, আচরণ নিয়ে প্রশ্নও থাকতে পারে। কিন্তু সেই একটি ছন্দপতন দিয়ে রঞ্জনদাকে মাপলে, আমার মনে হয়, তাঁর প্রতি সুবিচার করা হবে না। একজন মানুষকে তাঁর কোন কোন ভুল বা কোন একটি ব্যর্থতা দিয়ে নয়, তাঁর সামগ্রিক জীবন, চিন্তা, কাজ, অবদান এবং অসংখ্য মানুষের ওপর তাঁর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের মধ্য দিয়ে দেখতে হয়।

গতকাল থেকে বারবার একটি কথাই মনে হচ্ছে—আমরা কি সেই সামগ্রিক দেখাটা হারিয়ে ফেলেছি? সেই সামগ্রিকভাবে না দেখার কারণেই কি রঞ্জনদা একসময় একা হয়ে গিয়েছিলেন? নাকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমরা তাঁকে একা করে দিয়েছিলাম? এই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই। হয়তো এর উত্তর সহজও নয়। কিন্তু প্রশ্নটা আমাকে ভাবাচ্ছে।

আজকের সময়ে যখন অগ্রজদের ‘পুরোনো’ বলে বাতিল করে দেওয়ার একটা প্রবল প্রবণতা দেখি, তখন রঞ্জনদাসহ আমার জীবনের অনেক অগ্রজের কথা মনে পড়ে। তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা আমার নিজের পথ চলার ভিত তৈরি করেছে। তাই তাঁদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা আজীবনের। তাঁদের প্রতি আমার শ্রদ্ধাও আজীবন থাকবে।
রঞ্জন দা প্রশিক্ষণে সবসময় একটা কথা বলতেন, সবার কাছে নানারকম ফুল আছে, প্রশিক্ষকের কাজ সেই ফুলগুলো দিয়ে রঙিন মালা তৈরীর গাঁথুনির কাজ করা। দাদা আপনি সত্যিই অসংখ্য গুণসম্পন্ন মানুষগুলোকে একত্রিত করে একটি রঙিন বাংলাদেশ গড়ার কাজটিই সারাজীবন করে যেতে চেয়েছেন। এর বিস্তারিত অনুজদের জানা দরকার। প্রত্যাশা রাখি দাদার কাজ নিয়ে একটি স্মারকগ্রন্থ হবে।

রঞ্জন দা, আপনি ভালো থাকুন তা যেখানেই থাকুন। আপনাকে ভোলা কখনও সম্ভব না। 

মন্তব্য করুন

Logo