গাছপাথর এক বুড়োখোকার গল্প
আফরোজা সোমা
প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬, ১০:১৫ পিএম
১.
আজ ৮ই শ্রাবণ। শাহেদ কামাল স্যারের জন্মদিন।
গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার নয়, স্যার সবসময় বাংলা পঞ্জিকা অনুসারে জন্মদিন মনে রাখতেন।
তা-ও বাংলাদেশী কায়দার একদিন এগিয়ে আনা অধুনা বাংলা দিনপঞ্জিকা নয়।
স্যার অনুসরণ করতেন আদি খাঁটি বাংলা পঞ্জিকা।
সেই পাঁজি বাংলাদেশের পরিবর্তিত বাংলা বর্ষের দিন গণনার হিসেবের চেয়ে একদিন পিছিয়ে থাকে।
ফলে, আমাদের কাছে আজ ৮ই শ্রাবণ স্যারের জন্মদিন হলেও স্বর্গের খোলা বারান্দায় বসে স্যার কড়া সিগেরেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে নিজের জন্মদিন পালন করবেন আগামীকাল।
একটা মহাপ্রাচীন বটবৃক্ষ, লোকালয় থেকে বহু দূরে দাঁড়িয়ে থেকে যে প্রায় গাছপাথর— ঠিক সেই রকম একটা স্থির চিত্র হয়ে শাহেদ কামাল স্যার আমার মনের মধ্যে আছেন।
স্যারের সাথে আমার সম্পর্কটা ব্যক্তিগত পর্যায়ে শুরু হয় ২০১৪ বা ২০১৫ সালে।
তারপর থেকে কত গল্পমুখর বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত্রির দিকে গেছে।
দারুণ গপ্পোবাজ ছিলেন তিনি।
মহাভারতের বিদুর বা ভীষ্মের সাথে বসে গল্প করা গেলে কেমন লাগতো, জানি না। তবে, তার খানিকটা আমেজ যেনো পাওয়া গেছে স্যারের সাথে গল্প করে।
জগতের অদ্ভুত সব বিষয়ে তার আগ্রহ।
আর পড়ার ভীষণ অভ্যেস।
না পড়লে উনার পক্ষে বাঁচা প্রায় অসম্ভব।
স্যারের অন্যতম প্রিয় আগাথা ক্রিস্টি।
লম্বা আলাপে ঘুরে-ফিরে ঘুরে-ফিরে আগাথা ক্রিস্টির কথা আসবেই।
স্যার দ্বারপরিগ্রহ না করা মানুষ।
২.
স্যারের সবচেয়ে ভালো বন্ধু ছিলো তার পোষা কুকুর।
ওর নাম ক্রিস্টোফার।
ক্রিস্টোফারকে দিয়েই আমার কুকুরভীতি কাটানোর হাতেখড়ি।
ক্রিস্টোফারের সাথে যখন আমার প্রথম দেখা তখনো কুকুর দেখলে ১০ ফিট দূর থেকেই আমার শরীর ভয়ে সাময়িকভাবে প্যারালাইজ হয়ে যায়।
পথে-ঘাটে কুকুর দেখলে অপরিচিত লোকেদের শার্টের হাতা ধরে বা তাদের পেছনে পেছনে শার্ট বা গেঞ্জি ধরে কুকুরের রেডিয়াস পাড় হই।
আমার শ্বশুরালয়েও এক পোষা কুকুর ছিলো। তার নাম বুনো।
বছরে দুই-তিন বার দুই-চার দিনের জন্যে যে শ্বশুরালয়ে বেড়াতে যেতাম, সেই দিনগুলো আমার জন্য কিছুটা বেকায়দার হয়ে গেলো বুনোর আগমনের পর।
বাড়ির বউ আর বাড়ির কুকুরের একটা ভয়ানক শীতল সম্পর্ক।
বউ বাড়িতে ঢোকার আগেই বাড়ির সবচে' আদরের সদস্য বুনোকে বাথরুমে নিয়ে কিছুক্ষণ লক করে রাখতে হয়।
এই সুযোগে বাড়ির বউ রুমে ঢুকে যায়। তারপর একা একা কখনোই যেনো বুনোর সামনে ভুলেও পরে না যেতে হয়, সেভাবে চলতে হয় বেড়ানোর দিনগুলো!
সেই দিনগুলোতে আমার যে কী মনোপীড়া হতো এই ভীতুর ডিম আমাকে নিয়ে! কী করে যে বোঝাই!
আমি খুব করে চাইতাম, আমার এই ভয়টা কেটে যাক।
কিন্তু যেই-না বাচ্চাদের মতন তিড়িংতিড়িং করে লাফিয়ে বুনো কোলে উঠতে চাইতো, নিজের অজান্তেই আমার আর্ত-চিৎকারে বাড়ি মাথায় উঠতো!
বুনো মরে গেছে সেই কবে।
আমার কুকুরভীতিও গেছে আজ কয়েক বছর।
কিন্তু বুনোর সাথে ভাব না হবার দুঃখ আমার আজও রয়ে গেছে।
আজও যে কোনো কুকুরকে আদর করতে-করতে বুনোর আত্মার কাছে মাফ চাই!
এহেন কুকুরভীতিমাখা দিনে আমার জীবনে দেখা দিলেন আমার ভয় ভাঙানিয়া শিক্ষক ক্রিস্টোফার।
স্যারের বাসায় প্রথম দিন গেলাম।
গিয়ে তো কুকুর দেখেই আমার দশা হয়েছে, হায়! হায়! কী করি! কী করি! কই যাই! কই লুকাই!
আমার ভয়ার্ত মুখ দেখেই স্যার ক্রিস্টোফারকে কয়েকবার দূরে সরে যেতে বললেন।
স্যার সরতে বললে ক্রিস্টোফার দুই ইঞ্চি সরে বসেন।
কয়েক মিনিট পরে সে আরো তিন ইঞ্চি আমার দিকে এগিয়ে আসে।
ভয়ে প্রথম দিন সন্ধ্যায় পানি আর চা ছাড়া স্যারের বাসায় আর কিছুই আমার গলা দিয়ে নামেনি।
এরপরে স্যারের বাসায় যাবার আগেই মনকে অটোসাজেশন দিতাম— ক্রিস্টোফার থাকবে, ভয়ের কিছু নেই।
ভয়ে ভেতরে কাষ্টবৎ হয়ে থাকলেও তখন নিজেকে বলেছি, ক্রিস্টোফার যদি বুনোর মতন আনপ্রেডিক্টেবল ওয়েতে লাফালাফি ঝাঁপাঝাঁপি না করে, তাহলে ভয় নেই।
চুপচাপ কাছে আসলে আমি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দেবো।
ক্রিস্টোফার মনে হয় আমার মনের কথা শুনেছিলো।
শান্ত এক লক্ষী ছেলের মতন গুটি গুটি পায়ে তাড়াহীনভাবে একদিন সে আমার দিকে এসেছে।
এগুতে এগুতে সে প্রথমে আমার পায়ের কাছে ঘেষে বসেছে।
একদিকে ভয়ে জমে যাচ্ছি।
আরেকদিকে, কাছিমের ধীরে বাড়ানো গলার মতন হাত বাড়িয়ে আমি সাহস করে ওর মাথায় এক-দুই বার হাত বুলিয়ে দিয়েছি।
এভাবে ধীরে ধীরে ভয় ভাঙার শুরু।
তারপর কোনো একদিন পায়ের কাছে গায়ে গা এলিয়ে থাকার দূরত্বও দূর করে ক্রিস্টোফার আরো এগিয়ে এসে আমার কোলে মাথা রেখে বসেছে!
সেই প্রথম কোনো সারমেয়কে আমার গায়ের ওপর উঠে গিয়ে ওম নিতে ও দিতে দেখা!
ফিলিংটা ছিলো অদ্ভুত— আদুরে, উষ্ণ আবার ভয়মাখা।
ক্রিস্টোফারকে প্রথমবার আমার কোলে মাথা রেখে বসে থাকতে দেখে স্যার বলেন, দেখো না! তার আহ্লাদ কতো! আদর খেতে সে এখন কোলে উঠে গেছে!
ওই সন্ধ্যায় গল্পের পুরোটা সময় ক্রিস্টোফার আমার কোলেই মাথা দিয়ে রইলো!
স্যারও অবাক হলেন ওর এই কাণ্ড দেখে।
আমি বেতের চেয়ারে বসা।
আমার পরনে একটা লাল পেড়ে কালো সুতি শাড়ি!
ওর মাথায় হাত বুলাতে-বুলাতে অদ্ভুত রকমভাবে হঠাৎ টের পেলাম কাপড় ও পেটিকোটের নিচ দিয়ে হাঁটুর উপর আমার ত্বকে কেমন ভেজা-ভেজা ঠেকছে!
কিছুক্ষণ সময় নিয়ে বুঝলাম, ক্রিস্টোফারের চোখের পানি।
স্যারকে বললাম, স্যার, ওর চোখ দিয়ে অনেক পানি পড়ছে।
জানা গেলো, ওর চোখে ছানি। পানি পড়ে।
আমার ত্বকে ওর চোখের জলের স্পর্শে আমার মধ্যে হয়তো কিছু একটা বিক্রিয়া ঘটেছিলো।
চোখের জল— তা হোক মানুষের বা অন্য প্রাণীর, তা হোক চোখের ছানির বা আকুলতার, এর সংস্পর্শে হয়তো মানুষের মধ্যে বদল ঘটে।
স্যারের সাথে গল্প করতে-করতে আর আমার কোলে থাকা ক্রিস্টোফারের মাথায় আদর করতে-করতে কখন যে ভয় কেটে গিয়ে আমি সহজ হয়ে গেলাম, নিজেও জানি না।
এ যেনো শেষ রাতের অন্ধকারের মতন।
আঁধারের ঘনত্ব ফিকে হতে হতে কখন যে চারিপাশ আলোয় ভরে যায় তা প্রত্যক্ষ করা যায়, অনুভব করা যায়। কিন্তু নির্দিষ্ট সীমানারেখা নির্ধারণ করা যায় না।
সেই থেকে শুধু স্যার নন, স্যারের কুকুর ক্রিস্টোফারও আমার শিক্ষক, আমার ভয় ভাঙানিয়া!
তাই, আমার জীবনের সিনেমায় ক্যামিও কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে আছেন ক্রিস্টোফার।
ক্রিস্টোফার গত হয়েছে স্যার বিদায় নেবার বেশ কয়েক বছর আগে।
৩.
যখন স্টুডেন্ট ছিলাম স্যারকে সবাই খুবই 'রাগী' হিসেবে জানতাম।
রেগে গিয়ে স্যার একবার ক্লাসে ডাস্টার ছুঁড়ে মেরেছিলেন!
তাও আমাদেরই ক্লাসে! আমাদেরই বন্ধু নবীনের দিকে!
নবীনও এতো দুষ্টু !
ছুঁড়ে মারা সেই ডাস্টার সে ক্রিকেট বল ক্যাচ ধরার মতন করে লুফে নিয়েছে!
এরপরে আর যায় কই!
স্যার তো রেগে অগ্নিশর্মা!
রেগে গেলে স্যার বলতেন, ড্যাম! DAMN it!
ওইদিন স্যার নাকি নবীনকে বলেছিলেন, আপনি তো ডাবল ড্যাম!
এই তথ্য নবীনই আমাকে দিয়েছে, আমার খেয়াল ছিলো না।
ওইদিন ক্লাসে শয়তানির পুরস্কার হিসেবে নবীন ক্লাস থেকে আউট।
অবশ্য, নবীনের শয়তানির শেষ নাই।
এমনকি আহাদ স্যারের ক্লাসেও সে শয়তানি করে ধরা খেয়ে ক্লাস থেকে আউট হয়েছে!
বিভাগের সিনিয়িরদের মুখে শুনেছি, স্যার রাগী পুরুষ!
স্যারের আনকনভেনশনাল এপিয়ারেন্স, লম্বা জুলফি, একটু ভিন্নভাবে কথা বলা এবং ভাব-ভঙ্গি দেখে আমাদের ক্লাসও বেশ তটস্থই থাকতো।
অতো যার রাগের কথা শুনেছি, ক্লাসে তার হাসিটাই কিনা আমার খুব ভালো লেগে গেলো!
স্যার বড় একটা হাসতেন না ক্লাসে।
কখনোবা মুচকি হাসতেন। ভারী মিষ্টি সেই হাসি।
রাগী মানুষের মুখে মিষ্টি হাসি।
স্টুডেন্ট থাকার সময় ক্লাসের বাইরে কোনোদিন কথা হয়নি স্যারের সাথে।
তাঁর সাথে ব্যক্তিগত পরিসরে কথা বলার সুযোগ হলো পড়ালেখা শেষ করার কয়েক বছর পর।
ততদিনে আমিও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।
২০১৪ বা ১৫ সাল হবে। সেদিন ছিল নাঈমুল ইসলাম খানের বাসায় আমার সাবেক কর্মস্থলের সব সহকর্মীর রাতের আহার গ্রহণের দাওয়াত।
আমি তখন স্ট্যাট ইউনিভার্সিটিতে সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক।
আমাদের বিভাগের উপদেষ্টা অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌসসহ আমরা সকলে সেদিন দাওয়াতে গেলাম ধানমণ্ডির এক বাসায়।
সন্ধ্যেয় গিয়ে দেখি, মধ্যমণি হয়ে আশর আলো করে বসে আছেন শাহেদ কামাল স্যার।
এক কথায় দুই কথায় স্যারের সাথে গল্প জমে গেলো।
গল্পের এক ফাঁকে সাহস করে বলি, স্যার, আপনার হাসিটা খুব মিষ্টি।
আমার কথায় স্যার লাজুক হাসেন।
কী অমল হাসি! যেনো একটা বুড়োখোকা!
৪.
গত ক'বছর ধরেই স্যারের শরীর আর বাগে ছিলো না। তাঁকে তখন সার্বক্ষণিক ডায়াপার পড়িয়ে রাখতে হয়।
সহায়তাকারীর সাহায্যে উঠতে-বসতে হয়। খাবারে একটু উনিশ-বিশ হলে বমি হয়ে যায়, বিছানা ভিজে যায়।
কিন্তু হাসিটা ঠিক আগের মতই। মুখে লেগে আছে।
স্যারের সঙ্গে আমার মুখোমুখি শেষ দেখা ২০২৩ এর মে মাসে।
এরপর আর কোনোদিন বাসায় যাইনি।
ইচ্ছে করেই এই না-যাওয়া। স্যারকে দেখে খুব খারাপ লাগতো।
তবে, স্যারের খবর আমি নিতাম বাদল ভাইয়ের কাছ থেকে। তিনি স্যারের বাসার সহকারী।
ধানমণ্ডি পাড়ায় স্যারের বাসার আশপাশ দিয়ে গেলেই মনটা এমন আকুলি-বিকুলি করে ওঠতো!
তখন বাদল ভাইকে ফোন করলে বেশির ভাগ দিনেই উত্তর আসতো, স্যার তো ঘুমাইতেছে!
আমি বলতাম, ওহ আচ্ছা! স্যারকে আমার সালাম দিয়েন। বইলেন, আমি ফোন করছিলাম।
স্যারের সাথে যেদিন শেষ দেখা, সেদিন বিছানায় আধশোয়া হয়ে হেলান দিয়ে আছেন স্যার।
তাঁর হাঁটুর কাছে আমি বেতের মোড়া টেনে বসি।
স্যার নিজেই আলাপের সুতো বের করেন।
করোনা-ঘূর্ণিঝড় মোখা-জ্যাম-তাকে দেখতে আসা মানুষদের ব্যস্ততা-নতুন বই আসছে না কয়েক দিন- গায়ের জোর আর ফিরবে না ইত্যাদি ইত্যাদি নানান আলাপ ঘুরে আলাপ এসে থিতু হয় মহেঞ্জোদারো-হরপ্পায়।
এই সেমিস্টারে কী কী কোর্স পড়াও?
এর উত্তরে অন্যান্য কোর্সের সাথে বাংলাদেশ স্টাডিজও ছিলো।
সিলেবাসে কী কী আছে?
সারসংক্ষেপ বলতে গিয়ে ইন্ডাজ ভেলি সিভিলাইজেশন প্রসঙ্গে আসা।
মহেঞ্জোদারো-হরপ্পা নিয়ে তার বিশেষ আগ্রহ।
মহেঞ্জোদারোতে যে সেই সময় ড্রেনেজ সিস্টেম ছিলো, সেই ড্রেনেজের 'ময়লাগুনো' কোথায় যেতো? এই হলো স্যারের গভীর জিজ্ঞাসা।
স্যার সাধারণত 'গুনো' বলতেন, 'গুলো' নয়।
স্যার বলেন, এই নিয়ে অনেক বই তিনি ঘাঁটাঘাঁটি করেছেন। কিন্তু কোনো স্পষ্ট উত্তর পাননি।
আমি তাঁকে বলি, স্যার আমারও তো এই বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা নেই। মনে হয়, এখনকার সেপ্টিক ট্যাংকের মতন কিছু থাকলেও থাকতে পারে।
স্যার আবার তার নিজের একটা অনুমান তুলে ধরেন।
বলেন, আমার কী ধারণা জানো? এগুনো মনে হয় খোলা জায়গায় ছেড়ে দিতো। মানে আমরা যেমন এখন ড্রেনেজের ময়লা নদীতে দিয়ে দিই, ওই রকম।
স্যার হেলান দিয়ে আধবসা ছিলেন।
স্যারের ডায়াপার পাল্টাতে হবে। ওভার ফ্লো হচ্ছিলো। সহকারী স্যারকে গোসল করাতে নিয়ে যাবেন।
আমি স্যারের রুম ছেড়ে এসে বসলাম স্যারের বারান্দায়।
এর আগে যতবার এই বাসায় এসেছি, বারান্দায় বসেই স্যারের সাথে সব গল্প হয়েছে।
৪.
বারান্দার সামনে একটা বিরাট টেরাস। টেরাস ভরা দুনিয়ার গাছ-গাছালির ঝোপ।
সুস্থ্য থাকতে স্যার ছিলেন নকটার্নাল। একেবারে রাতজাগা পাখি।
আমার বাবাও রাত জাগতেন। তবে, স্যারের মতন না।
দেশের মানুষের যখন সন্ধ্যে হয়, স্যারের তখন সকাল। তিনি সারারাত জেগে থেকে ঘুমোতে যান ভোর বেলায়।
বিকেলে ঘুম থেকে উঠে চায়ের ফ্লাস্ক, পত্রিকা আর সিগেরেটের প্যাকেট নিয়ে স্যার বসতেন বারান্দার কোণার চেয়ারে।
সেখানে বসে একটার পর একটা সিগেরেট টানতেন।
আক্ষরিক অর্থেই একটার আগুন দিয়ে আরেকটা সিগেরেট ধরাতেন। ননস্টপ এমনি চলতো।
এটাও এক্কেবারে আমার আব্বির মতন।
আব্বিও তাই করতো। একটা বিড়ির আগুন দিয়ে প্রায় সময়ই আরেকটা বিড়ি ধরাতো।
স্যারের লাগতো কড়া তামাক। বারান্দার কোণার চেয়ারে বসে সস্তা কড়া সিগেরেট ফুকতেন।
স্যারের সামনে থাকতো ক্রিস্টোফার।
ক্রিস্টোফারও ততদিনে বুড়ো। ওর এক চোখে ছানি।
ক্রিস্টোফার ছাড়া স্যারের সংসারে সদস্য বলতে ছিলো কয়েকজন পোষ্য।
ঠিক কাজের মানুষ তাদের বলা যায় না।
পোষ্যদের একজনকে স্যার নাতনির স্নেহে আগলে রাখতেন।
ছোট্ট মেয়ে। সেও ডাকতো নানাভাই।
খুব খুনসুটি চলতো তাদের দু'জনের।
অসুখে অশক্ত হয়ে বিছানায় পড়ে যাবার পর থেকে স্যারের আর সিগেরেট টানার সামর্থ্য নেই।
বিছানাবন্দী হয়ে তিনি মাঝে মাঝে পাইপ টানেন। এর বহু আগেও তাঁর পাইপ টানার অভ্যেস ছিলো।
বারান্দায় বসে আমি একা একা স্মৃতি হাতড়াই।
৫.
স্মৃতি-রোমন্থন করতে-করতেই স্যারকে গোসল করিয়ে সহকারী আবার আমাকে ডাকলো।
গোসলের পর স্যারের গায়ে অনেক পাউডার মেখে দিয়েছে।
এখন আর স্যার শুয়ে নেই। বসিয়ে দেয়া হয়েছে হাতলওয়ালা বেতের চেয়ারে।
খালি গা। পরনে লুঙ্গি।
সুস্থ্য থাকতেও এভাবেই বসতেন বারান্দায়।
এখন খুব শুকিয়ে গেছেন, এই যা ফারাক।
আবারো মোড়াটা টেনে স্যারের মুখোমুখি বসি।
জিজ্ঞেস করি, স্যার কী পড়ছেন এখন?
কত কিছু পড়ি!
পড়া ছাড়া তো আর কোনো কাজ নেই।
চোখ তো একদম ঠিক আছে। রোজ পত্রিকা পড়ি। পুরনো বইগুনো কিছু পড়ছি। নতুন বই আসছে না। আগাথা পড়ছি।
পত্রিকা ছাড়া স্যারের চলে না।
যখন সুস্থ ছিলেন, নিয়ম করে পত্রিকার পাতায় ক্রস-ওয়ার্ড পাজল মেলাতেন। স্যারের অন্যতম পছন্দের কাজ এটা।
গল্প মোড় নিতে নিতে কেমন করে যেনো খাবার-দাবার প্রসঙ্গে আসে। এই প্রসঙ্গে আবার অনেকক্ষন যায়।
খাবার-দাবারের প্রসঙ্গ এলেই স্যার তাঁর মায়ের কথা তোলেন। তাঁর মা কবি বেগম সুফিয়া কামাল।
মায়ের প্রসঙ্গ এলেই স্যার একেবারে শিশুর মতন বলতে থাকেন, মা এটা করতেন... মা ওটা করতেন... মা এটা রাঁধতেন... মা এভাবে রাঁধতেন... মা মা মা...
স্যার বলে চলেন, ঝাল তো এখন খেতেই পারি না। পছন্দের খাবারগুনোর কথা যখন মনে পড়ে, তখন ভাবি আর মনে মনেই স্বাদ নিই।
লোনা ইলিশ দিয়ে ঝাল করে মুখিকচু। শুটকি টমেটো দিয়ে... আটার রুটি দিয়ে বুটের ডাল... স্যার বলে চলেন।
একবার আমাকে রাতের আহারের নিমন্ত্রণ দিলেন। জানতে চাইলেন, কী খাবে, বলো?
আমি বলেছিলাম, স্যার আপনার পছন্দের যে কোনো আইটেম।
আমন্ত্রণ কি কোনো একটা পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে ছিলো কিনা খেয়াল নেই।
তবে, এক পয়লা বৈশাখেও স্যার ডাকলেন। বললেন, এসো, বাড়ির গাছের কাঁচা পোড়া আমের শরবত খেয়ে যাও।
স্যারের পয়লা বৈশাখ হতো ১৫ই এপ্রিল। ১৪ই এপ্রিল হলো স্যারের হিসেবে চৈত্র সংক্রান্তি।
স্যারের জন্ম পশ্চিম বাংলায়। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর স্যারের পরিবার এপাড়ে আসেন।
বর্ধিষ্ণু নয়া ঢাকার কত গল্প স্যার করেছেন।
ধানমণ্ডি নাম কিভাবে হলো, জানো?
না, স্যার।
মণ্ডি মানে বাজার। এখানে আশেপাশে আগে ধানের বাজার বসতো। সেই থেকে এই নাম।
আর এগুলো তো ছিলো সব ক্ষেত, জমি! পরে একটু একটু করে প্লট করে বাসাবাড়ি ওঠলো।
৬.
আলাপে বসলে কথা কত দিকে যায়!
সেদিন আলাপে আলাপে স্যার বলেন, শরীরটা খারাপ হওয়ায় শুধু একটা কাজ শেষ করতে পারলাম না।
কী কাজ, স্যার?
মা'র একটা কাজ। মায়ের একাত্তরের ডায়রীটা ইংরেজী করছিলাম। ওটা শেষ হলো না।
আগেই বলেছি, বাংলা তারিখের বিষয়ে স্যার ভীষণ সংবেদনশীল। নিজের জন্মতারিখ সব সময় বাংলায় বলেন।
সেদিনের আড্ডাতেও দেশভাগ প্রসঙ্গে আলাপ করতে গিয়ে একবার স্যারকে তাঁর জন্মসাল জিজ্ঞেস করলাম।
স্যার বললেন, ৮ই শ্রাবন ১৩৪৭।
-স্যার, ইংরেজী কত সাল?
-১৯৪০।
স্যারের এক জন্মদিনে স্যারকে উপহার দিতে গিয়ে কী বই দিবো, কী বই দিবো ভাবতে-ভাবতে দিলাম অমিতাভ ঘোষ-এর অটোবায়োগ্রাফিকেল 'ইন এন এন্টিক ল্যান্ড'।
ঘোষ মশাই ভারতীয় এক ক্রীতদাসের শেকড় খুঁজতে মিশরে গিয়েছিলেন।
সেই অভিজ্ঞতা জ্ঞান আর প্রজ্ঞার মিশেলে বড় সরস করে তুলে ধরেছেন এই বইয়ে।
বইটা আমার খুব পছন্দের।
স্যারও বইটা আগে পড়েননি। তাই, এটাই তাকে দিলাম।
উপহার দেয়ার বেশ কিছুদিন পর বই পড়ে স্যার আমাকে ফোন করে নিজের মন্তব্য জানালেন।
স্যার ফোন করতেন মাঝ রাত্তিরে। ল্যান্ড ফোন থেকে।
স্যার জানেন আমার রাত জাগা হয়।
বিশেষ করে, বিবিসি বাংলায় রাতের শিফটের ডিউটি সপ্তাহে যে কয়দিন থাকতো, আমার জন্য অফিসের সেইসব রাত হতো দিন সমতুল।
ফলে, স্যারের খবর নিতে হলে আমিও রাতেই কল করতাম। ল্যান্ড ফোনে। স্যার মোবাইল ব্যাবহার করতেন না।
তো সেদিন স্যার অমিতাভ ঘোষের বই পড়ে মন্তব্য জানাতে ফোন করলেন।
আমি এইটুকু জেনেই আনন্দিত হলাম যে, বইটা স্যারের 'খারাপ লাগেনি'!
৭.
স্যারের বাড়ির প্রধান ফটক কোনোদিন বন্ধ পাইনি।
ভেজানো পকেট গেট ঠেলে ঢুকতেই খোলা আঙিনা। আঙিনার পর কলাপসিবল। সেখানেও তালাচাবি নেই।
নিজে ভেতরে ঢুকে কলাপ্সিবলটা আবার টেনে দিলেই হলো।
তারপর সিঁড়ি বেয়ে তিনতলায় গেলেই সদর দুয়ার খোলা!
বলতে গেলে প্রায় সবসময়।
কখনো হাট করে মেলে রাখা। কখনো ভেজিয়ে রাখা।
কিন্তু খোলা।
যেদিন স্যারের সাথে মুখোমুখি শেষ দেখা, সেদিনও একই কায়দায় ঢুকেছি।
সদর দুয়ার খোলা।
স্যার বিদায় নিলেন। এই অবিশ্বাসের শহরে, অন্তত আমার জন্য, দ্বারখোলা এক বাড়ির রূপকথাও ফুরলো!
শুভ জন্মদিন, স্যার।
মন্তব্য করুন

