Logo

৮ ভাদ্র ১৪৩৩

×

Follow Us

কলম্বিয়া ফিরে যাচ্ছে মার্কিন-ইসরায়েল বলয়ে

ছবিঃ সংগৃহীত

দশদিগন্ত

বামপন্থী পেত্রোর বিদায়

কলম্বিয়া ফিরে যাচ্ছে মার্কিন-ইসরায়েল বলয়ে

সাঈদ হাসান

সাঈদ হাসান

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৪০ পিএম

৭.৪ মাত্রার ভূমিকম্পে লণ্ডভণ্ড কলম্বিয়ার একাংশ। আমেরিকা-ইসরায়েল উভয়ে সাহায্য নিয়ে উদারহস্ত হয়েছে৷ কারণ তারাই দীর্ঘদিনের বামপন্থী প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোকে সরিয়ে তাকে মমতায় বসিয়েছে। নতুন প্রেসিডেন্ট এমনকি মেক্সিকো, ব্রাজিল, চীন ও জাতিসংঘের সহায়তা প্রস্তাবে, না করে দিয়েছেন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ভিডিও বার্তায় বলেছেন- আমরা কলম্বিয়ার পাশে আছি। কারণ কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গোলান মালভূমির ওপর ইসরায়েলের সার্বভৌমত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছেন।

কলম্বিয়ার তুমুল জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো বিদায় নিয়েছেন। কলম্বিয়ার দুইশো বছরের ইতিহাসে প্রথম বামপন্থী প্রেসিডেন্ট। দুই হাজার তেইশ সালের আট অক্টোবর গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যা শুরুর পরমুহূর্তে ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণা দেওয়া প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান। প্রেসিডেন্ট পেত্রো এবার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি। অন্যরা করেছেন এবং বিপুল কারচুপি ও সুবিধামতো বিধিবিধান টেম্পারিং করে বিজয়ী ঘোষিত হয়েছে ইসরায়েলের অনুগত, মার্কিন মদদপুষ্ট আলভারো আবেলফারদো। আলভারো আবুল ইতোমধ্যে দায়িত্ব নিয়েছেন। তার আগে ইসরায়েল সফর করে এসেছেন। নিজের শপথ অনুষ্ঠানে ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিয়ন সারের উপস্থিতি নিশ্চিত করেছেন। 

আলভারো বা আবেলফোরদো দে লা এস্প্রিয়েল্লা বোগোতাকে আবারও তাদের পুরোনো পরিচিত কৌশলে ফিরিয়ে নিতে মোটেও সময় নষ্ট করছে না। তাঁর পূর্বসূরি গুস্তাভো পেত্রোর নীতি থেকে সরে এসেছেন। পেত্রো ইসরায়েলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক সম্পূর্ণ  বিচ্ছিন্ন করেছিলেন। এস্প্রিয়াল্লো পুনরায় সেই সম্পর্ক পুনর্বহাল, কলম্বিয়ার দূতাবাস জেরুজালেমে স্থানান্তর, আইসিজে-তে দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা গণহত্যার মামলা থেকে কলম্বিয়াকে প্রত্যাহার এবং বাণিজ্য, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করার পরিকল্পনা করছেন।

বিষয়টি হতাশাজনক? অবশ্যই। কিন্তু বিস্ময়কর? একেবারেই নয়।

ঐতিহাসিকভাবে পেত্রো ছিলেন ব্যতিক্রম। কলম্বিয়ার দীর্ঘ ও অত্যন্ত রক্তক্ষয়ী অভ্যন্তরীণ সংঘাতের পটভূমিতে কলম্বিয়া এবং ইসরায়েল বহু দশক ধরে এক নিবিড় নিরাপত্তা সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল:

ক. ব্যাপক সামরিক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক: ইসরায়েল কলম্বিয়ার কাছে ছোট হালকা অস্ত্র (গালিল রাইফেল, উজি সাবমেশিন গান) থেকে শুরু করে কফির যুদ্ধবিমান, এমএক্স মিসাইল, অ্যাটমোস কামান, স্পাইক এটিজিএম এবং ড্রোন পর্যন্ত বিক্রি করেছে। আশির দশক থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পর ইসরায়েল ধারাবাহিকভাবে কলম্বিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অস্ত্র সরবরাহকারী ছিল, যা ২০১০-এর দশকের মাঝামাঝি নাগাদ কলম্বিয়ার মোট সামরিক ক্রয়ের প্রায় ৪০ শতাংশে গিয়ে পৌঁছেছিল।

খ. প্রশিক্ষণে ইসরায়েলি ভূমিকা: কলম্বিয়ার সেনাবাহিনী, স্পেশাল ফোর্স এবং চরম ডানপন্থী আধা-সামরিক বাহিনীকে ইসরায়েল প্রশিক্ষণ প্রদান করে। এর পাশাপাশি ফার্ক গেরিলাদের চিহ্নিত ও নির্মূল করতে গ্লোবাল সিএসটি-র মতো ইসরায়েলি পরামর্শক সংস্থাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয় কলম্বিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।

গ. ডেথ স্কোয়াড ও কার্টেল সংযোগ: ইয়ার ক্লেইনের মতো আইডিএফ-সংযুক্ত অপারেটররা মেডেলিন কার্টেলসহ বিভিন্ন ডেথ স্কোয়াডকে প্রশিক্ষণ দেয়। সেখানে ড্রাইভিং থেকে গুলি চালানো, বোমা হামলা, স্নাইপিং এবং ঘরে ঘরে ঢুকে হত্যার মতো কৌশল শেখানো হতো। সিআইএ এবং কলম্বিয়ান গোয়েন্দা সংস্থার সাথে যুক্ত এই গোষ্ঠীগুলো সেগোভিয়া (১৯৮৮), মাপিরিপান (১৯৯৭) এবং এল সালাদো (২০০০)-সহ পুরো শহর ও গ্রামে ভয়াবহ গণহত্যা চালায়। এর মধ্যে ছিল শারীরিক নির্যাতন, শিরচ্ছেদ, গুলি করে হত্যা, চেইনস দিয়ে কুপিয়ে হত্যা এবং নারী ও শিশুদের ওপর নির্মম নির্যাতন।

ঘ. অস্ত্র পাচার: আধা-সামরিক বাহিনী ও ড্রাগ কার্টেলগুলোর কাছে ইসরায়েলি অস্ত্র পাচারের ঘটনা ঘটেছিল, যার মধ্যে ১৯৮৯ সালে লিবারেল পার্টির প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী লুইস কার্লোস গালানকে হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্রও অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা অ্যান্টিগুয়া অ্যাফেয়ার নামে পরিচিত।

ঙ. গোয়েন্দা সহযোগিতা: আশির দশকে ফার্ক নির্মূল করতে বার্কো সরকার মোসাদের প্রাক্তন এজেন্ট রাফায়েল ইতানিকে নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেয়। ইতানির পরামর্শ ছিল প্যাট্রিয়োটিক ইউনিয়নের সদস্যদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা-যেটি ফার্ক-সংযুক্ত একটি রাজনৈতিক দল ছিল এবং কলম্বিয়ার রাজনীতিতে বামপন্থীদের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে গৃহযুদ্ধ শেষ করতে চেয়েছিল। কলম্বিয়ার স্পেশাল জুরিসডিকশন ফর পিস-এর হিসাব অনুযায়ী, ১৯৮৪ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে এই দলের ৫,৭৩৩ জন সদস্যকে হত্যা বা জোরপূর্বক গুম করা হয়।

চ. এইউসি আধা-সামরিক বাহিনীকে সহায়তা: কার্লোস কাস্তানিও হিলের এইউসি আধা-সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সরবরাহে ইসরায়েলের ব্যাপক ভূমিকা ছিল। এই বাহিনী প্রায় ১ লাখ বেসামরিক মানুষকে হত্যা করেছে বলে ধারণা করা হয়। কাস্তানিও নিজেই ১৯৮৩-৮৪ সালে ইসরায়েলে প্রশিক্ষণ নেন। পরবর্তীতে তাঁর বাহিনী কলম্বিয়ার অবৈধ মাদক রফতানির প্রায় ৪০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করত এবং রাষ্ট্র, ধনী ভূম্যধিকারী (যার মধ্যে প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ও এস্প্রিয়েল্লার মিত্র আলভারো উরিবে অন্তর্ভুক্ত) এবং কোকা-কোলা ও চিকিতার মতো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রশাসনিক ও আর্থিক সমর্থন পেত।

অন্য কথায়, এস্প্রিয়েল্লার এই ইসরায়েল নীতির পুনর্বিন্যাস কোনো নতুন ঘটনা নয়, বরং পুরনো সামরিক কৌশলেই ফিরে যাওয়া। আর এতে ওয়াশিংটন দৃশ্যত অত্যন্ত সন্তুষ্ট: এস্প্রিয়েল্লা দায়িত্ব গ্রহণ করতে না করতেই ট্রাম্প প্রশাসন তার সরকারের জন্য ১ বিলিয়ন ডলারের নিরাপত্তা সহায়তা ঘোষণা করেছে।

কলম্বিয়া ও তার ডানপন্থী সরকার, ডেথ স্কোয়াড এবং ড্রাগ কার্টেলগুলো লাতিন আমেরিকার সেই অস্থির অঞ্চলগুলোর একটিমাত্র উদাহরণ যেখানে ইসরায়েল ব্যাপকভাবে বিনিয়োগ করেছে। অন্যান্য দেশের মধ্যে রয়েছে আর্জেন্টিনা (১৯৭৬-১৯৮৩ সালের মধ্যে সামরিক শাসনের কাছে ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি অস্ত্র বিক্রি), গুয়াতেমালা (আদিবাসী সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে পরিচালিত অভিযান পরিচালনায় সহায়তা), নিকারাগুয়া (প্রথমে সোমোজা এবং পরবর্তীতে কনট্রাসদের সহায়তা), এল সালভাদর, পিনোশের চিলি এবং প্যারাগুয়ে।

মন্তব্য করুন

Logo