Logo

১ ভাদ্র ১৪৩৩

×

Follow Us

অভিবাসনের আড়ালে জিব্রাল্টারের লড়াই

দশদিগন্ত

চিউতা সংকট

অভিবাসনের আড়ালে জিব্রাল্টারের লড়াই

Icon

সাঈদ হাসান

প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৬, ০৩:৩৩ পিএম

এটা কোনো অভিবাসন সংকট নয়। এটা মোসাদ ও সিআইএর সুপরিকল্পিত বহুমুখী একটি যুদ্ধ, যা মরক্কো পরিচালনা করছে এমন একটি জাতির বিরুদ্ধে, যারা সাম্রাজ্যবাদের অনুগত হতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

এটা অভিবাসনের কোনো সাধারণ ঢল নয়; বরং অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সাজানো একটি ভূরাজনৈতিক আক্রমণ। চিউতা সীমান্ত অতিক্রম করা মানুষগুলো কেবল শরণার্থী নয়। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের কাছে মাথা নত করতে অস্বীকৃতি জানানো স্পেন সরকারকে শাস্তি দিতেই এসব মানুষকে ‘হিউম্যান ব্যাটারিং রাম’ (মানবীয় অস্ত্র) হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। স্পেন যেহেতু ইরানের ওপর মার্কিন হামলার জন্য নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তাই ওয়াশিংটন, তেল আবিব ও রাবাত যৌথভাবে উত্তর আফ্রিকার সীমান্তকে স্পেনের বিরুদ্ধে একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

আসল লক্ষ্য অভিবাসীরা নয়, স্পেন। কারণ স্পেন ‘না’ বলেছিল। প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ দক্ষিণ স্পেনের দুটি সামরিক ঘাঁটি—মোরোন ও রোতা—ইরানে হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যবহার করতে দেননি। শুধু তা-ই নয়, স্পেন ইজরায়েলের অস্ত্রবাহী জাহাজকে নিজেদের বন্দরে নোঙর করতেও বাধা দেয়। দেশটি ইজরায়েল থেকে রাষ্ট্রদূত ফিরিয়ে আনে এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়। সংক্ষেপে, স্পেন সাম্রাজ্যের অনুগত পুতুলের ভূমিকা পালন করতে অস্বীকৃতি জানায়।

এর শাস্তি হিসেবে মরক্কো সীমান্ত খুলে দিয়ে স্পেনমুখী অভিবাসনের ঢল নামিয়ে দেয়। ২০২১ সালেও একই ঘটনা ঘটেছিল। তখন সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ শিথিল করে মরক্কো স্পেনের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল, যার ফলে প্রায় আট হাজার মানুষ চিউতায় প্রবেশ করে। এবারও সেই একই চিত্রনাট্য আরও বড় পরিসরে এবং আরও পরিশীলিত উপায়ে মঞ্চস্থ হচ্ছে।

মরক্কোর সীমান্ত নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সহায়ক বাহিনীগুলো সীমান্ত চৌকি থেকে স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ায়। বিভিন্ন শহর থেকে ট্রাক ও ডাম্পারে করে মানুষ এনে সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় নামিয়ে দেয় মরক্কোর পুলিশ। এটা কোনো নিয়ন্ত্রণহীন পরিস্থিতি নয়; বরং সুসংগঠিত ও সমন্বিত একটি অভিযান। এটাও কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। স্পেনে নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। একটি অভিবাসন সংকট বর্তমান সরকারকে দুর্বল করার কার্যকর অস্ত্র। নির্বাচনের আগে অপছন্দের সরকারকে চাপে ফেলতে মোসাদ ও সিআইএর বহু ব্যবহৃত কৌশলগুলোর মধ্যে এটিও একটি।

তবে গল্পটা শুধু চিউতা বা স্পেনের নির্বাচনেই শেষ হবে না। আসল খেলা জিব্রাল্টার প্রণালীর আধিপত্য নিয়ে।
স্পেনের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এই অভিবাসন সংকট তুলনামূলক অনেক বড় একটি ভূরাজনৈতিক খেলার মাত্র একটি চাল। জিব্রাল্টার প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ১০ শতাংশ এবং বছরে প্রায় এক লাখ জাহাজ এই পথ দিয়ে চলাচল করে।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে ইজরায়েল ও মরক্কো একটি যৌথ সামরিক কর্মপরিকল্পনা স্বাক্ষর করে। বর্তমানে মরক্কোর অন্তত ৬১ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করে ইজরায়েল। ইজরায়েলের সহায়তায় মরক্কো ব্যাপকভাবে ড্রোন উৎপাদন বাড়াচ্ছে। তারা ইজরায়েলি ‘স্পাইডার’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে এবং স্থানীয়ভাবে ইজরায়েলি ‘স্পাইক’ প্রযুক্তিনির্ভর আত্মঘাতী ড্রোন তৈরি করছে। একই সঙ্গে মরক্কোর উত্তর উপকূলে একটি যৌথ সামুদ্রিক নজরদারি কেন্দ্রও স্থাপন করা হচ্ছে।

একটি মার্কিন প্রতিবেদনে ইজরায়েল-মরক্কো অস্ত্রচুক্তিকে জিব্রাল্টার প্রণালীর শক্তির ভারসাম্যে মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মরক্কো ট্রাম্প প্রশাসনের কাছেও প্রস্তাব দিয়েছিল, মোরোন ও রোতার মার্কিন (ন্যাটো) ঘাঁটিগুলো স্পেন থেকে মরক্কোতে স্থানান্তর করা হোক। স্পেনের এক জেনারেলও সম্প্রতি স্বীকার করেছেন, ‘আজ হোক বা কাল, মোরোন বিমানঘাঁটি মরক্কোতে স্থানান্তরিত হবে।’
ওয়াশিংটন, তেল আবিব ও রাবাত সমন্বিতভাবে কাজ করছে—স্পেনকে জিব্রাল্টার প্রণালীর কৌশলগত অবস্থান থেকে সরিয়ে সেখানে মরক্কোকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে।

এদিকে গাযযা নিয়ে ইজরায়েলের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিকল্পনা বাস্তবায়নেও মরক্কো প্রধান ভূমিকায় আবির্ভূত হয়েছে। প্রথমবারের মতো মরক্কো একটি বহুজাতিক সামরিক মহড়ার আয়োজন করতে যাচ্ছে, যেখানে প্রায় ২০ হাজার সেনা অংশ নেবে বলে আশা করা হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে প্রাথমিক অনুসন্ধানের জন্য মরক্কোর ৩০ জন সামরিক কর্মকর্তা ইতোমধ্যে গাযযায় প্রবেশ করেছেন—যা কয়েক দিন আগেই লিখেছি। ধারণা করা হচ্ছে, গাযযায় মরক্কো প্রায় ৫০০ সেনা মোতায়েন করবে। ইজরায়েলি কর্মকর্তারা এখন মরক্কোকে আফ্রিকায় ইজরায়েলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে বর্ণনা করছেন। মরক্কো যতই ইজরায়েলের ঘনিষ্ঠ অংশীদারে পরিণত হবে, ততই নিজ অঞ্চলে এবং বৃহত্তর বিশ্বে ইজরায়েলের ভূরাজনৈতিক ভূমিকার সম্প্রসারিত রূপে আবির্ভূত হবে।

মন্তব্য করুন

Logo