ছবি: ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
ইরান–মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি হামলা
সাঈদ হাসান
প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬, ১০:৪৩ এএম
ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। দক্ষিণ ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোতে যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও জ্বালানি স্থাপনায় ব্যাপক পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইরান। একই সঙ্গে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কেশম দ্বীপ ও বন্দর আব্বাস এলাকায় নতুন করে বিস্ফোরণ ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর পাওয়া গেছে।
বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে দক্ষিণ ইরানের বিভিন্ন বেসামরিক অবকাঠামোতে ব্যাপক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর অভিযোগ ওঠে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের দাবি, হরমুজগান প্রদেশ ও চাবাহার এলাকায় ছয়টি বেসামরিক সেতু, একটি প্রধান রেলওয়ে স্টেশন, একটি টেলিযোগাযোগ টাওয়ার এবং একটি বেসামরিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। এতে বেসামরিক নাগরিক হতাহত হয়েছেন এবং বন্দর আব্বাসের আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বন্দর খামিরে বন্দর আব্বাস থেকে প্রায় ২০০ মাইল অভ্যন্তরে লার শহরের সঙ্গে সংযোগকারী একটি ওভারপাসে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। হামলার সময় সেতু দিয়ে যানবাহন চলাচল করছিল। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, এই হামলায় অন্তত সাতজন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। দক্ষিণ উপসাগরীয় উপকূলে কেশম দ্বীপের কাছাকাছি অবস্থিত বন্দর খামির ইরানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর শহর।
দক্ষিণ ইরানের গারিবেহ সেতুতেও হামলা চালানো হয়। এতে অন্তত একজন নিহত এবং কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। পাহাড়ি দক্ষিণাঞ্চলে মানুষ, জ্বালানি ও রসদ পরিবহনের জন্য সেতুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বন্দর আব্বাস শহরের পশ্চিমে অবস্থিত একটি রেলওয়ে জংশনেও হামলা চালানো হয়। এই রেলপথটি হরমুজ প্রণালীর তীরে অবস্থিত ইরানের বৃহত্তম কনটেইনার বন্দর শহীদ রাজায়ি বন্দরের সঙ্গে সংযুক্ত। হামলায় অন্তত দুজন আহত হন।
ফাইটার জেট থেকে নিক্ষেপ করা ক্ষেপণাস্ত্র বন্দর আব্বাসের একটি টেলিযোগাযোগ টাওয়ারে আঘাত হানে। এতে টাওয়ারটির পাশাপাশি আশপাশের আবাসিক এলাকাও ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বেসামরিক হতাহতের ঘটনা ঘটে।
পাকিস্তান সীমান্তসংলগ্ন সিস্তান ও বেলুচিস্তান প্রদেশের ইরানশহর বেসামরিক বিমানবন্দরেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর পাওয়া গেছে।
এদিকে শনিবার দিবাগত রাত স্থানীয় সময় ৩টা ৩৮ মিনিটের দিকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কেশম দ্বীপের উপকণ্ঠে অন্তত ছয়টি স্থানে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, দ্বীপটির বিভিন্ন এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। তবে নিরাপত্তা কর্মকর্তা বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি এবং সম্ভাব্য হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির তথ্যও প্রকাশ করা হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দারা তাসনিমকে জানিয়েছেন, কেশম দ্বীপের উপকণ্ঠে তিন থেকে পাঁচটি স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। অন্যদিকে ইরানি সংবাদমাধ্যম মেহেরের দাবি, কেশম দ্বীপের একটি স্থানে মার্কিন বাহিনী হামলা চালালেও সেখানে কোনো বেসামরিক হতাহত কিংবা আবাসিক বা বাণিজ্যিক অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
একই সময়ে বন্দর আব্বাসের বিভিন্ন এলাকায়ও একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। সরকারি সংবাদ সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, বিস্ফোরণের ঘটনাগুলোর তদন্ত শুরু হয়েছে। তবে প্রাদেশিক কর্মকর্তাদের বরাতে তাসনিম জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত সেখানে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত বা মার্কিন যুদ্ধবিমানের হামলার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
হরমুজ প্রণালীর কাছে কেশম দ্বীপ, সিরিক, বুশেহর এবং আরও পশ্চিমে তেলসমৃদ্ধ খুজেস্তান প্রদেশের আহভাজ, বেহবাহান, হামিদিয়াহ, সুসাঙ্গের্দ ও কারুন এলাকাসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরণের খবরও পাওয়া গেছে।
মার্কিন হামলার পরপরই ইরান পাল্টা অভিযান শুরু করে। ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তু হয় বাহরাইনের বাপকো তেল শোধনাগার। একই সময়ে কাতার, বাহরাইন, কুয়েত, জর্ডান ও ইরাকে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক গণমাধ্যম জানিয়েছে।
খবরে বলা হয়েছে, কুয়েতে একটি প্রায় ৫০ লাখ মার্কিন ডলার মূল্যের হাইমার্স রকেট লঞ্চার একটি ইরানি ড্রোন হামলায় ধ্বংস হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সমঝোতা স্মারক ভেঙে যাওয়ার পর এটি তেহরানের সবচেয়ে বড় সমন্বিত পাল্টা হামলা।
হামলার পর কুয়েতে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে আগুন জ্বলতে দেখা গেছে বলেও খবর প্রকাশিত হয়েছে।
কাতারে দোহার উপকণ্ঠে অবস্থিত আল দুহাইল ক্যাম্পে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে রাজধানী দোহাজুড়ে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।
বাহরাইনে হামালা ক্যাম্পসহ মার্কিন সেনাবাহিনীর আরও একটি সামরিক স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। ড্রোন হামলার সময় বাহরাইনের আকাশে দুটি মার্কিন এএইচ-৬৪ অ্যাপাচি হেলিকপ্টারকে টহল দিতে দেখা গেছে।
আরবি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, বাহরাইন ও সৌদি আরবকে সংযোগকারী কিং ফাহাদ কজওয়েতেও একটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। এর পরপরই ঘটনাস্থলে অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরি উদ্ধারকারী দল মোতায়েন করা হয়।
এই হামলার কয়েক ঘণ্টা আগেই ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) সতর্ক করে জানিয়েছিল, ইরানের অবকাঠামোতে যেকোনো মার্কিন হামলার জবাবে এই অঞ্চলের ‘প্রতিটি অবকাঠামো’ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। একই সময়ে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরাও বাব আল-মান্দাব প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি পুনর্ব্যক্ত করে।
উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বন্দর আব্বাস ও কেশম দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক বিমান হামলার খবর প্রকাশিত হয়েছে। এসব হামলা ও পাল্টা হামলাকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের আশঙ্কা আরও বেড়েছে।
মন্তব্য করুন

