ছবিঃ সংগৃহীত
প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬, ১২:০৮ এএম
একটা রাষ্ট্রে বোমা বিস্ফোরণের দিন সন্ত্রাসবাদ শুরু হয় না। বোমাটা আসলে শেষ দৃশ্য। তার বহু আগে গল্প শুরু হয়ে যায়, উগ্রপন্থায় দীক্ষিত হওয়া, নতুন সদস্য সংগ্রহ, অর্থের প্রবাহ, গোপন যোগাযোগ, ছোট ছোট সন্ত্রাসী চক্র তৈরি, প্রচারণা এবং এমন একটি নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠার মধ্য দিয়ে, যা রাষ্ট্রের চোখে পড়ার আগেই কাজ শুরু করে দেয়।
বাংলাদেশের জন্য এই অভিজ্ঞতা অবশ্য নতুন নয়। ২০০৫ সালে ৬৩ জেলায় প্রায় একযোগে বোমা বিস্ফোরণের দিন জেএমবি হঠাৎ আকাশ থেকে পড়েনি। ২০১৬ সালের হলি আর্টিজান হামলাকারীরাও এক সকালে ঘুম থেকে উঠে জঙ্গি হয়ে যায়নি। দুই ঘটনাই আমাদের একই শিক্ষা দিয়েছে, সন্ত্রাসী হামলা একদিনে দৃশ্যমান হয়, কিন্তু তার অবকাঠামো তৈরি হয় অনেক আগে। ২০১৩-১৬ সময়ের ব্লগার ও প্রকাশক হত্যাকাণ্ড দেখিয়েছে মতাদর্শিক বিমানবায়ন কীভাবে সুনির্দিষ্ট সহিংসতায় পৌঁছায়।
জাতিসংঘ যখন সতর্ক করছে যে আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট (একিউআইএস) বাংলাদেশে সন্ত্রাসী চক্র বা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে, আমাদেরকে এখন বের করতে হবে, বাংলাদেশকে সদস্য সংগ্রহ, অর্থায়ন, রসদ, অনলাইন প্রচারণা কিংবা আঞ্চলিক যাতায়াতের নিরাপদ ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ তারা পাচ্ছে কি না।
এখানে একটু ভূরাজনীতির মানচিত্র খুলে বসা দরকার। একদিকে আফগানিস্তান-পাকিস্তান অঞ্চল, তালেবান, টিটিপি, আইএস-খোরাসান, আল-কায়েদাসহ বিভিন্ন আন্তঃরাষ্ট্রীয় জঙ্গি নেটওয়ার্কের দীর্ঘ উপস্থিতি। অন্যদিকে মিয়ানমারের ভেঙে পড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা। মাঝখানে ভারত, বাংলাদেশ এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বঙ্গোপসাগর। মানে, বাংলাদেশ এমন একটা অঞ্চলের মধ্যে বসে আছে, যেখানে সন্ত্রাসবাদকে পাশের দেশের সমস্যা বলে পাশ কাটানোর সুযোগ নাই।
এ কারণে দিল্লি, ঢাকা কিংবা ইসলামাবাদের মধ্যে রাজনৈতিক সম্পর্ক যদি খারাপও হয়, সন্ত্রাসবিরোধী গোয়েন্দা সহযোগিতাকে সেই বিরোধের জিম্মি করা যাবে না। জঙ্গি সংগঠন পাসপোর্ট দেখে সহযোগী নির্বাচন করে না; রাষ্ট্রও পাসপোর্ট দেখে গোয়েন্দা তথ্যের আদান-প্রদান বন্ধ করতে পারে না।
আরেকটা বড় ভুল হবে ২০২৬ সালের একিউআইএসকে ২০০৫ সালের জেএমবির চেহারায় খোঁজা। আধুনিক সন্ত্রাসবাদের জন্য বিশাল প্রশিক্ষণশিবির, শত শত সদস্য কিংবা সদর দপ্তরের সামনে সাইনবোর্ড লাগে না। কয়েকজন উগ্রপন্থায় দীক্ষিত ব্যক্তি, গোপন ডিজিটাল যোগাযোগ, একজন সংগঠক, ছোট একটি অর্থায়নের পথ এবং অনলাইনে মতাদর্শ ছড়ানোর পরিবেশ, একটা বিপজ্জনক চক্র তৈরির জন্য এতটুকুই যথেষ্ট হতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, উচ্চশিক্ষিত কিংবা মধ্যবিত্ত পেশাজীবী "জঙ্গি হতে পারে না", এই ধারণাটা এখন বিপজ্জনকভাবে পুরোনো। হলি আর্টিজান আমাদের নির্মমভাবে শিখিয়েছে, সন্ত্রাসবাদের কোনো পোশাক, শ্রেণি কিংবা শিক্ষাগত জীবনবৃত্তান্ত নেই।
বাংলাদেশের এখন আতঙ্ক না, প্রতিরোধ দরকার। কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট, অ্যান্টি-টেররিজম ইউনিট, গোয়েন্দা সংস্থা, বিজিবি, সাইবার গোয়েন্দা ব্যবস্থা এবং বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের তথ্যকে একটা স্থায়ী সমন্বিত হুমকি-পর্যবেক্ষণ কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে।
সন্ত্রাসে অর্থায়ন, হুন্ডি, ক্রিপ্টোকারেন্সি, সন্দেহজনক আন্তঃসীমান্ত লেনদেন কিংবা দাতব্য প্রতিষ্ঠানের অপব্যবহার নজরদারিতে আনতে হবে, সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে।
কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া জঙ্গি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও শুধু নজরদারি যথেষ্ট না। ঝুঁকি মূল্যায়ন, উগ্রপন্থা থেকে বিচ্ছিন্নকরণ, মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা, বিশ্বাসযোগ্য ধর্মীয় পরামর্শ, কর্মসংস্থান ও সামাজিক পুনর্বাসন এবং আইনসম্মত পর্যবেক্ষণ, সবগুলো একসঙ্গে প্রয়োজন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের অ্যাসাইলাম এজেন্সির ২০২৫ প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সম্পর্কে বলা হয়েছিল, ২০২৪ সালের আগস্টের পর দেশে উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর সাংগঠনিক তৎপরতা বৃদ্ধির অভিযোগ উঠেছে। একই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য উদ্ধৃত করে জানানো হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ৫ ডিসেম্বরের মধ্যে জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১৭৪ জন বন্দি জামিনে মুক্তি পান।
সন্ত্রাসবিরোধী নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে এতসংখ্যক উচ্চঝুঁকিপূর্ণ বা আগে থেকেই নিরাপত্তা সংস্থার নজরে থাকা ব্যক্তি সমাজে ফিরে এলে আইনসম্মতভাবে মুক্তি-পরবর্তী ঝুঁকি মূল্যায়ন, প্রয়োজন ও আইনি ভিত্তি থাকলে নজরদারি, পুনর্বাসন ও উগ্রবাদ থেকে বিচ্ছিন্নকরণ কর্মসূচি এবং তারা পুরোনো বা নতুন কোনো নেটওয়ার্কের সঙ্গে পুনরায় যুক্ত হচ্ছেন কি না, তার কার্যকর পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেটা অন্তবর্তী সরকার কিংবা বর্তমান সরকার করেছেন কিনা আমার জানা নেই।
সবচেয়ে জরুরি হলো আঞ্চলিক গোয়েন্দা সহযোগিতা। আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশ হয়ে মিয়ানমার পর্যন্ত নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আলাদা আলাদা বাক্সে রেখে দেখলে চলবে না। একিউআইএস যদি বিকেন্দ্রীভূত আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক হিসেবে কাজ করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধও আন্তঃরাষ্ট্রীয় হতে হবে।
তবে আরেকটি রাজনৈতিক সতর্কতা সমান জরুরি। সন্ত্রাসবাদের ভয় দেখিয়ে নির্বিচার গ্রেপ্তার, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমন কিংবা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে সন্দেহ তৈরি করলে সন্ত্রাসবিরোধী নীতিই উল্টো নতুন ক্ষোভও উগ্রপন্থার জমি তৈরি করতে পারে।
সন্ত্রাসবাদের সবচেয়ে ভয়ংকর শব্দ বিস্ফোরণের শব্দ না। সবচেয়ে ভয়ংকর সময়টা হলো বিস্ফোরণের আগের নীরবতা, যখন নেটওয়ার্ক তৈরি হচ্ছে, চরমপন্থী মতাদর্শ স্বাভাবিক হচ্ছে, রাষ্ট্র সতর্কবার্তা পাচ্ছে, আর সবাই ভাবছে: "এখনো তো কিছু হয়নি।”
মন্তব্য করুন

