Logo

৮ ভাদ্র ১৪৩৩

×

Follow Us

বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে কি শুধুই ক্ষমতার পালাবদল?

প্রতীকী ছবিঃ সংগৃহীত

কাভার স্টোরি

মব থেকে তালিকা

বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে কি শুধুই ক্ষমতার পালাবদল?

সিরাজুল ইসলাম আবেদ

সিরাজুল ইসলাম আবেদ

প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৪২ পিএম

২০২৪ সালের পটপরিবর্তনের পর শিক্ষকদের হেনস্তা, পদত্যাগে বাধ্য করা ও ‘দোসর’ আখ্যা দেওয়ার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, সেটারই নতুন রূপ কি এখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তদন্ত, তালিকা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে ফিরে আসছে?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শুধু একটি সরকারের পতনের দিন নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতার সম্পর্ক পুনর্বিন্যাসেরও একটি মুহূর্ত। দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে একদিকে যেমন জবাবদিহি ও ন্যায়বিচারের দাবি জোরালো হয়, অন্যদিকে বহু ক্ষেত্রে সেই জবাবদিহির জায়গা দখল করে নেয় তাৎক্ষণিক প্রতিশোধ, সামাজিক হেনস্তা এবং মব-সন্ত্রাস। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ছিল এর অন্যতম বড় ক্ষেত্র।

সরকার পতনের পর দেশের বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক, অধ্যক্ষ, উপাচার্যসহ নানা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠতে থাকে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার, দুর্নীতি, আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বিরোধিতা, আবার কারও বিরুদ্ধে কেবল ক্ষমতাসীন সরকারের সময়ে পদে থাকার অভিযোগ সামনে আসে। কোথাও শিক্ষার্থীদের দিয়ে পদত্যাগের দাবি করানো হয়েছে; কোথাও বহিরাগতরা এসে শিক্ষকদের ঘেরাও করেছে,  প্রকাশ্যে অপমান করে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানো হয়েছে।

২০২৪ সালের আগস্টের শেষ নাগাদ দ্য ডেইলি স্টার-এর একটি হিসাব অনুযায়ী, ৫ আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অন্তত ১৫০ শিক্ষককে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল। আরও কয়েকশ শিক্ষক শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে পদ ছেড়েছিলেন এবং ২০ জনের বেশি শিক্ষককে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছিল। পত্রিকাটি একই সঙ্গে জানিয়েছিল, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছিল যে তৎকালীন শিক্ষা ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ প্রকাশ্যেই শিক্ষকদের পদত্যাগে বাধ্য করা ও হয়রানি বন্ধের আহ্বান জানান। ২৫ আগস্ট তিনি বলেছিলেন, বৈধ অভিযোগ থাকলে যথাযথ প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে; কিন্তু কাউকে জোর করে পদত্যাগ করানো যাবে না। ৩ সেপ্টেম্বরও তিনি একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, শিক্ষকদের জোর করে পদত্যাগ করানো ও হয়রানি ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’।

প্রশ্ন হলো, সেই সময়কার মব-সংস্কৃতির কি সত্যিই অবসান হয়েছে? নাকি মবের ভাষা বদলে এখন সেটি ঢুকে পড়ছে প্রাতিষ্ঠানিক অভিযোগ, তালিকা, তথ্যানুসন্ধান কমিটি এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ভেতর? সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ অন্তত এই প্রশ্নটি জোরালো করে তুলেছে।

২০২৪: অভিযোগ থেকে অপমান, অপমান থেকে পদত্যাগ

৫ আগস্টের পরপরই দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যে দৃশ্য দেখা যায়, তার মধ্যে একটি ছিল—একদল শিক্ষার্থী বা স্থানীয় মানুষের সামনে একজন শিক্ষক বা অধ্যক্ষকে দাঁড়িয়ে নিজের পদত্যাগের ঘোষণা দিতে হচ্ছে। কেউ কেউ হয়তো আগের সরকারের সময় রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ছিলেন। কেউ হয়তো প্রশাসনিক পদে থেকে ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। কারও বিরুদ্ধে নিয়োগে অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগও থাকতে পারে। এসব অভিযোগের তদন্ত প্রয়োজন ছিল, এখনও আছে। কিন্তু অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা আর কাউকে গণমানুষের সামনে দাঁড় করিয়ে অপমান-অপদস্ত করে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা—দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।

চাঁদপুরের মতলবের মুন্সিরহাট কলেজের অধ্যক্ষ এম এ মালেকের ঘটনা তখন ব্যাপক আলোচনায় আসে। ১৫ আগস্ট শিক্ষার্থীদের পদত্যাগ দাবির কথা শুনে তিনি ক্যাম্পাসে যান। পরে একদল মানুষ ও শিক্ষার্থী তাঁর অফিসে ঢুকে স্লোগান দিয়ে তাঁকে একটি পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করে। তিনি পরে জানান, আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ তিনি পাননি এবং ৩২ বছরের শিক্ষকজীবনে এমন অপমানের মুখোমুখি হননি। সেই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

এই একটি ঘটনা আসলে পরবর্তী কয়েক মাসের একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছিল—কোনো শিক্ষক অপরাধী হলে তাঁকে বিচার করার দায়িত্ব কার? শিক্ষার্থীর, স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীর, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোনো গ্রুপের, নাকি রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত আইনগত কর্তৃপক্ষের? ২০২৪ সালের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, এই সীমারেখা বহু জায়গায় অস্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আর সেই অস্পষ্টতার সুযোগ নিয়েছিল এমন কিছু গোষ্ঠী, যাদের কাছে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়ে উঠেছিল প্রতিষ্ঠান দখল, পদ পুনর্বণ্টন কিংবা ব্যক্তিগত প্রতিপক্ষকে সরিয়ে দেওয়ার সুযোগ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজিমউদ্দিন খান সে সময় দ্য ডেইলি স্টার-কে বলেছিলেন, গত ১৬ বছরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যাপক রাজনীতিকরণ হলেও শিক্ষকদের অপমান ও জোর করে পদত্যাগ করানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি মনে করেছিলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়ে কিছু গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অস্থিতিশীল করছে।

অর্থাৎ, ২০২৪ সালের সংকটের ভেতরেই একটি সতর্কবার্তা ছিল। ক্ষমতা বদলালেই যদি বিচারপ্রক্রিয়ার পরিবর্তে ‘বিক্ষুব্ধ জনতা’র নামে ‘পরিকল্পিত মব’ বিচারকের ভূমিকা নেয়, তাহলে এক ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে অন্য ধরনের ক্ষমতাচর্চার জন্ম হতে পারে।

মবের চরিত্র বদলায়, যুক্তি কি বদলায়?

মব-সন্ত্রাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো—এটি অভিযোগ ও অপরাধের মাঝখানের দূরত্বটি মুছে দেয়। মবের কাছে অভিযোগই হয়ে যায় রায়। কারও বিরুদ্ধে বলা হলো তিনি ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’—এই পরিচয়ই যথেষ্ট হয়ে যায় তাঁকে অপমান-অপদস্থ করার জন্য। কাউকে বলা হলো তিনি ‘জুলাইবিরোধী’—তাহলেই তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু হয়ে যায়। ‘আওয়ামী লীগপন্থি শিক্ষক সংগঠনের সদস্য’ ছিলেন—এটিই অনেক সময় হয়ে ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রধান ভিত্তি।

কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয়, রাজনৈতিক সমর্থন, কোনো দলের সঙ্গে সাংগঠনিক সম্পর্ক, আর কোনো অপরাধে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ—এক বিষয় নয়। এই পার্থক্যটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একজন শিক্ষক যদি কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক হন, সেটি তাঁকে জনপ্রিয় বা অজনপ্রিয় করতে পারে; কিন্তু শুধু সেই পরিচয় তাঁকে অপরাধী বানায় না। আবার কোনো শিক্ষক যদি রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় উসকানি দেন, সহিংসতা সংগঠিত করেন, প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে নিপীড়ন করেন বা অপরাধে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নেন, তাহলে তাঁর জবাবদিহি অবশ্যই হতে হবে। অর্থাৎ, প্রশ্নটি—তিনি কোন দলের ছিলেন সেটা নয়। প্রশ্নটি হওয়া উচিত—তিনি কী করেছেন? এই জায়গাটিই সাম্প্রতিক তালিকা-রাজনীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষার জায়গা।

২০২৬: মবের জায়গায় তদন্ত কমিটি?
২০২৬ সালের আগস্টে এসে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নতুন এক প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে। অভিযোগ উঠছে। তারপর তদন্ত কমিটি হচ্ছে।  তৈরি করা হচ্ছে তালিকা । কোথাও আবার শত শত শিক্ষকের নাম প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়া হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সাময়িক বরখাস্তও করেছেন। কাউকে-কাউকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে।

সাম্প্রতি দেশের ২২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ শিক্ষকের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ ও সাংগঠনিক তৎপরতার অভিযোগের কথা এসেছে। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বেগম রোকেয়া, ইসলামী , জগন্নাথ ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে তদন্ত কমিটি গঠন কারা হয়েছে।  এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা জরুরি—তদন্ত শুরু হওয়া মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়।  এই পার্থক্যটি না রাখলে তদন্ত নিজেই শাস্তিতে পরিণত হয়।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬৮ শিক্ষক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৪ শিক্ষক এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৩০০ শিক্ষকের তালিকার কথা এসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও ২৩১ শিক্ষকের একটি তালিকা প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো—একজন একজন করে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত হচ্ছে, নাকি প্রথমে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে তালিকা তৈরি হচ্ছে এবং পরে সেই তালিকা থেকে অভিযোগ খোঁজা হচ্ছে? দুটি প্রক্রিয়ার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে। প্রথমটি বিচারপ্রক্রিয়ার কাছাকাছি, আর দ্বিতীয়টি রাজনৈতিক শুদ্ধি অভিযানের কাছাকাছি চলে যেতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: তালিকা থেকে শাস্তি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাটি এই নতুন প্রবণতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে আমরা বিবেচনা করতে পারি। ২৮ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাদেকা হালিমসহ তিন শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করে এবং আরও চার শিক্ষককে একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়। তাঁদের বিরুদ্ধে ‘অশিক্ষকসুলভ আচরণ’, ‘নৈতিক স্খলন’সহ বিভিন্ন অভিযোগের কথা বলা হয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আওয়ামী লীগপন্থি হিসেবে পরিচিত অন্তত ৬৮ শিক্ষককে পাঠদান থেকে বিরত রাখা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, জুলাই আন্দোলনের সময় তারা শিক্ষার্থীদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন এবং কেউ কেউ ছাত্রলীগের হামলায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। আবার, জুলাই আন্দোলনে হামলার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ১২৮ শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে।
অন্যদিকে বিএনপি-জামায়াতপন্থি শিক্ষক সংগঠন সাদা দল আওয়ামী লীগপন্থি নীল দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে। এরপর নীল দলের ২৩১ শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি সামনে আসে।

প্রতিবাদে নীল দল দাবি করেছে, এই উদ্যোগ রাজনৈতিক প্রতিহিংসাপ্রসূত। তাদের বক্তব্য, ১৯৭৩ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ অনুযায়ী শিক্ষকরা রাজনৈতিক দর্শন ধারণ ও সংগঠন করার অধিকার রাখেন। 
একদিকে, দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে শিক্ষকদের একাংশের যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, তার জবাবদিহি প্রয়োজন।  অন্যদিকে, সেই জবাবদিহির নামে কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের সব সদস্যকে একই অপরাধে অভিযুক্ত করা আর যাই হোক ন্যায়বিচার নয়।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের প্রতিবাদলিপিতেও এই দ্বৈত অবস্থানটি স্পষ্ট। তারা একদিকে স্বীকার করেছে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাংশ শিক্ষক দলীয় লেজুড়বৃত্তি ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে জড়িয়েছিলেন এবং শিক্ষার্থীদের ওপর সহিংসতা বা নিপীড়নে কেউ যুক্ত থাকলে তাঁদের জবাবদিহি প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে তারা বলেছে, রাজনৈতিক মত বা পরিচয়কে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যায় না এবং তালিকাভিত্তিক সমষ্টিগত শাস্তি যথাযথ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। জবাবদিহি এবং প্রতিহিংসা—দুটিকে আলাদা না করতে পারলে দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আইন কী বলে?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রতিষ্ঠানটি ১৯৭৩ সালের বিশেষ আদেশের অধীনে পরিচালিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ, ১৯৭৩-এর ৫৬(২) ধারায় শিক্ষকদের চাকরির শর্ত নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাঁদের রাজনৈতিক মত পোষণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে বৈধ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার স্বাধীনতার কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। একই ধারার ৫৬(৩)-এ শিক্ষককে বরখাস্তের ক্ষেত্রে নৈতিক স্খলন বা অদক্ষতার মতো নির্দিষ্ট ভিত্তি এবং অভিযোগের তদন্তের কথা বলা হয়েছে; তদন্ত কমিটিতে অভিযুক্ত শিক্ষক নিজের মনোনীত প্রতিনিধির মাধ্যমে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাবেন—এ কথাও সেখানে আছে।

অর্থাৎ, আইনের দর্শনটি হলো—রাজনৈতিক পরিচয় এক জিনিস, পেশাগত অপরাধ আরেক জিনিস। এখানে একটি মৌলিক নীতি রয়েছে। কেউ আওয়ামী লীগ সমর্থন করতেন—এটি রাজনৈতিক পরিচয়। কিন্তু তিনি যদি কোনো শিক্ষার্থীকে হামলার নির্দেশ দিয়ে থাকেন—সেটি আচরণগত ও সম্ভাব্য ফৌজদারি অভিযোগ। একই ভাবে কেউ আওয়ামী লীগপন্থি শিক্ষক সংগঠনের সদস্য ছিলেন—এটি সাংগঠনিক পরিচয়। কিন্তু তিনি যদি প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে কাউকে বেআইনিভাবে চাকরিচ্যুত বা অপরাধমূলক কিছু করে থাকেন—সেটি আলাদা অভিযোগ।
কেউ জুলাই আন্দোলনের সমালোচনা করেছেন—এটি মতপ্রকাশ। কিন্তু আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন—এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। এই পার্থক্যটি হারিয়ে গেলে বিচার আর বিচার থাকে না।
আজকের ডিজিটাল বাস্তবতায় একটি তালিকা মুহূর্তেই হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। নামের পাশে ‘ফ্যাসিস্ট’, ‘দোসর’, ‘জুলাইবিরোধী’, ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ ইত্যাদি শব্দ বসে গেলে একজন ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা, নিরাপত্তা ও পেশাগত ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—অভিযোগের তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই। অর্থাৎ, তালিকা নিজেই হয়ে উঠতে পারে এক ধরনের বিচার-পূর্ব শাস্তি।


রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়: শিক্ষার্থীদের হাতে তালিকা

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ঘটনাও এই প্রবণতার আরেকটি দৃষ্টান্ত। সেখানে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ প্রায় ৩০০ আওয়ামী লীগপন্থি শিক্ষকের একটি তালিকা উপাচার্যের কাছে জমা দিয়েছে। অভিযোগ হিসেবে এসেছে জুলাই আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান, হুমকি, চাপ প্রয়োগ এবং সামাজিক মাধ্যমে আন্দোলনবিরোধী প্রচারণা। তালিকা তৈরির ভিত্তি হিসেবে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে সম্পৃক্ততা, সামাজিক মাধ্যমের কর্মকাণ্ড এবং আন্দোলনের সময় মাঠে অবস্থানের মতো বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানে আবারও একই প্রশ্ন ফিরে আসে। একজন শিক্ষক কোনো হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ছিলেন—এটি কি অপরাধ? কোনো রাজনৈতিক মতের সামাজিক মাধ্যমের পোস্ট শেয়ার করেছেন—এটি কি অপরাধ? আন্দোলনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন—কীভাবে?

তিনি কি কেবল রাজনৈতিক মত প্রকাশ করেছেন, নাকি শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় ভূমিকা রেখেছেন? কোনো শিক্ষক যদি সত্যিই শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় সহায়তা করে থাকেন, তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত অবশ্যই হওয়া উচিত। কিন্তু সেই তদন্তের প্রাথমিক উপাদান হওয়া উচিত নির্দিষ্ট ঘটনা, সময়, স্থান, সাক্ষ্য, নথি ও প্রমাণ। শুধু ‘অমুক আওয়ামী লীগপন্থি’—এটি তদন্তের ফল নয়; এটি সর্বোচ্চ তদন্তের একটি সূত্র হতে পারে।

জগন্নাথ, ইসলামী ও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬৮ শিক্ষকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড, শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর উদ্যোগে সহযোগিতা এবং জুলাই আন্দোলন দমনে ভূমিকার অভিযোগ তদন্তে কমিটি গঠনের কথা এসেছে।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪৪ শিক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি হয়েছে। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে কমিটি হয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্র ও জনশৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত শিক্ষকদের শনাক্ত করতে তথ্য-অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হয়েছে।
অর্থাৎ, তদন্ত কমিটি বা তথ্য অনুসন্ধান কমিটি এখন আর  বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি জাতীয় প্রবণতার মতো করে বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ছে। তবে এর মধ্যেও একটি ইতিবাচক দিক আছে। তদন্ত কমিটি হওয়া কোনো অন্যায় নয়। অভিযোগ থাকলে তদন্ত হওয়াই উচিত।  সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন তদন্তের আগেই সামাজিক রায় হয়ে যায়।  তালিকাটিকেই আমরা অপরাধের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করি। রাজনৈতিক পরিচয়কে অপরাধের বিকল্প হিসেবে দাঁড় করাই এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অভিযুক্তকে নিজের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পর্যন্ত দেই না

জাহাঙ্গীরনগর ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়: শাস্তির নজির

এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাকে একই কাতারে রাখা যাবে না। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলাসহ বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে ১৩ শিক্ষক ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে আমরা জানতে পারি। একজন শিক্ষককে বাধ্যতামূলক অবসর, নয়জন শিক্ষক ও একজন কর্মকর্তাকে পদাবনতি বা বেতন অবনমন এবং দুই শিক্ষককে সতর্ক করা হয়েছে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘শেখ হাসিনাতেই আস্থা’ শীর্ষক মিছিলে অংশগ্রহণ এবং জুলাই আন্দোলনের সময় নির্যাতনের অভিযোগে ১৩৩ শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো সিদ্ধান্তও আমরা দেখেছি। ৫৭ শিক্ষকের মধ্যে ৬ জন বরখাস্ত, ১২ জন অপসারিত, আটজন পদাবনতি এবং ৩১ জনকে তিরস্কার করা হয়েছে বলে সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে।

জবাবদিহির প্রয়োজন অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই শাস্তিগুলো কি ব্যক্তির নির্দিষ্ট অপরাধের ভিত্তিতে হয়েছে? নাকি সংগঠনের সদস্যপদ, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা কোনো মিছিলে উপস্থিতিই শাস্তির মূল ভিত্তি? এ বিষয়ে অস্পষ্টতা স্পষ্ট। প্রথমটি হলে সেটি জবাবদিহি; আর দ্বিতীয়টি হলে সেটি রাজনৈতিক শুদ্ধি অভিযান হয়ে ওঠার ঝুঁকি রাখে।

মব-সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় বিপদ: বিচারকে অপ্রাতিষ্ঠানিক করে ফেলা

মব-সন্ত্রাস কেবল কয়েকজন মানুষকে অপমান করার ঘটনা নয়। এটি একটি প্রতিষ্ঠানের বিচারক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া। যখন শিক্ষার্থীরা সিদ্ধান্ত নেয় কে ক্যাম্পাসে ঢুকবেন, কে ঢুকবেন না, কোন শিক্ষক পদে থাকবেন, কে ‘দোসর’, কে ‘ফ্যাসিস্ট’—তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, এই সংস্কৃতি যদি পরে প্রশাসনের ভেতরেও ঢুকে পড়ে, তখন আর মবের প্রয়োজন পড়ে না। তালিকা, অভিযোগ বা সামাজিক চাপই যথেষ্ট। প্রশাসন তখন সেই চাপকে বৈধতার পোশাক পরিয়ে দেয়। এই কারণেই মব-সংস্কৃতির বিরুদ্ধে লড়াই মানে শুধু রাস্তার মব ঠেকানো নয়; বরং মবের যুক্তিকে প্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দেওয়া।

তালিকা কেন এত জনপ্রিয়?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও নৃবিজ্ঞানী জোবাইদা নাসরীন তাঁর মতামতে এই তালিকা-রাজনীতির একটি বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে তালিকা রাজনৈতিক ক্ষমতার দীর্ঘদিনের একটি হাতিয়ার। প্রশাসনের ভিন্নমতাবলম্বীদের ওএসডি, বদলি বা চাকরিচ্যুতির মতো ব্যবস্থা আগেও দেখা গেছে; ২০২৪ সালের পর তালিকা, অভিযোগ এবং মব-চাপের সংস্কৃতি প্রকটভাবেই চলমান। বিশ্ববিদ্যালয়ও এই তালিকা-রাজনীতি থেকে মুক্ত নয়।

এই পর্যবেক্ষণটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তালিকা ক্ষমতাকে সহজ করে।  একজন একজন করে মানুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করতে সময় লাগে।  কিন্তু একটি তালিকা বানাতে সময় লাগে খুব কম। তালিকায় ২৩১ জনের নাম বসানো যায়। তারপর বলা যায়—এরা সবাই একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর। এরপর তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তোলা যায়, সামাজিক চাপ তৈরি করা যায়, প্রশাসনকে বলা যায়—‘জনগণের দাবি’। আর এভাবেই রাজনৈতিক ক্ষমতার পুরোনো কৌশল নতুন ভাষা পেয়ে যায়।

তাহলে কি আগের অন্যায়ের বিচার হবে না?

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা হলো—যথাযথ প্রক্রিয়ার কথা বলার অর্থ কখনোই অতীতের অন্যায় অস্বীকার করা নয়। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘদিন ধরে দলীয়করণ ছিল।  শিক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক পদে দলীয় আনুগত্য, ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে ক্ষমতার বিস্তার, বিরোধী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ ইত্যাদি অভিযোগ নতুন নয়।

২০২৪ সালের আন্দোলন এই বাস্তবতার বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল। ফলে যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন, তাঁদের জবাবদিহি হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু জবাবদিহির অর্থ সবার বিরুদ্ধে একই শাস্তি নয়।  
একজন শিক্ষক ক্ষমতাসীন দলের সংগঠনের সদস্য ছিলেন—আরেকজন একই সংগঠনের সদস্য হয়েও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় অংশ নিয়েছেন; দুজনের দায় এক হতে পারে না। একজন মিছিলে দাঁড়িয়েছেন, আরেকজন প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে শিক্ষার্থীকে নির্যাতন করেছেন; এই দুজনের দায়ও এক নয়। একজন সামাজিক মাধ্যমে রাজনৈতিক পোস্ট দিয়েছেন আরেকজন সহিংসতা সংগঠিত করেছেন; বিচারের মাপকাঠি দুজনের ক্ষেত্রে  করা যায় না। এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটি হারিয়ে গেলে প্রকৃত অপরাধীর বিচারও দুর্বল হয়। তখন অপরাধী ও নির্দোষ দুজনই একই রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে ঢুকে যায়।

বিশ্ববিদ্যালয় কি রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ হবে?

এখানেও একটি ভুল ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। বিশ্ববিদ্যালয় রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ কোনো নির্বিকার প্রতিষ্ঠান নয়। শিক্ষকরা নাগরিক। তাঁদের রাজনৈতিক মত থাকতে পারে। তাঁরা রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন—যতক্ষণ তা আইন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধির সীমার মধ্যে থাকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ, ১৯৭৩-এর ভাষাও শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের বৈধ রাজনৈতিক মত ও বৈধ সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার স্বাধীনতাকে স্বীকার করে।  সমস্যা রাজনৈতিক মত নয়। সমস্যা হলো রাজনৈতিক ক্ষমতার বিনিময়ে একাডেমিক স্বাধীনতা বিসর্জন দেওয়া।

শিক্ষক নিয়োগে যোগ্যতার চেয়ে দলীয় পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা, ছাত্রের ওপর হামলা করে তাকে রাজনৈতিকভাবে শায়েস্তা করা বা প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে সহকর্মীকে হয়রানি করার মতো ঘটনা যদি ঘটে, সেটি অপরাধ। কিন্তু শুধু আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত, বাম কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক মতের সঙ্গে যুক্ত থাকা নিজে থেকেই অপরাধ হতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়কে এই সীমারেখা রক্ষা করতে হবে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট: ভয় কোথায় পৌঁছেছে?

সাম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট অধিবেশন এই সংকটের আরেকটি দিক সামনে এসেছে। সংবাদ মাধ্যমের ভাষ্য অনুযায়ী, জুলাই আন্দোলনে নেতিবাচক ভূমিকার অভিযোগে কয়েকজন আওয়ামীপন্থি শিক্ষকের সিনেট অধিবেশনে অংশগ্রহণ ঠেকানোর দাবিতে ছাত্রদল, ছাত্রশিবির ও ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ করে। নির্বাচিত ২০ শিক্ষক প্রতিনিধি ক্যাম্পাসে এসেও শেষ পর্যন্ত অধিবেশনে যোগ দেননি; তাঁরা নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়েছেন। অন্যদিকে উপাচার্য বলেছেন, তাঁদের সরাসরি ও অনলাইনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল এবং নিরাপত্তার ঘাটতি ছিল না।

এখানে অভিযোগের সত্য-মিথ্যা নিয়ে আলাদা তদন্ত হতে পারে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের এই বাস্তবতাও উপেক্ষা করার উপায় নেই। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচিত শিক্ষক প্রতিনিধি যদি রাজনৈতিক বিরোধ বা বিক্ষোভের কারণে সভায় অংশ নিতে না পারেন, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল হতে বাধ্য। আজ যদি একদল শিক্ষককে ভয় দেখিয়ে সরিয়ে দেওয়া হয়, কাল অন্য দল একই যুক্তি ব্যবহার করতে পারে। ক্ষমতার এই চক্রই সবচেয়ে বিপজ্জনক।

আজকের বিজয়ী আগামী দিনের অভিযুক্ত

রাজনৈতিক প্রতিশোধের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—এর কোনো স্থায়ী বিজয়ী নেই। আজ যারা তালিকা তৈরি করছেন, কাল তাঁদের নামও তালিকায় উঠতে পারে। আজ যারা অন্যের বিরুদ্ধে ‘দোসর’ শব্দ ব্যবহার করছেন, কাল অন্য কেউ তাঁদের ‘দোসর’ বলবে।  মবকে ব্যবহার করে একদল শিক্ষককে ক্যাম্পাস থেকে সরিয়ে দিতে যারা চাইছেন, ক্ষমতার সমীকরণ বদলালে একই মব অন্য গোষ্ঠীকে সরাতে পারে।  আর আইনের শাসনের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো, এটি বন্ধুর জন্য যেমন প্রযোজ্য, শত্রুর জন্যও তেমনই।

‘ফ্যাসিবাদবিরোধিতা’ কি নতুন কর্তৃত্ববাদ তৈরি করতে পারে?

বর্তমান সময়ে এটি সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্ন। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর অর্থ যদি হয়—ভিন্ন মতকে নিশ্চিহ্ন করা; তাহলে সেই অবস্থান নিজের মধ্যেই কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠে। কেউ যখন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে কথা বলে, কিন্তু একই সঙ্গে নিজের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে বিচার ছাড়াই শাস্তি দিতে চায়, তখন সে যে মূল্যবোধের জন্য লড়াই করছে, সেটিই দুর্বল হয়ে যায়।

ষড়যন্ত্র তত্ত্বের হিসাব-নিকাশ একদিকে সরিয়ে রেখে আমরা যদি সাদা চোখে তাকাই— দেখতে পাবো ২০২৪ সালের আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এটি যে, কোনো একটি দলের একক কর্মসূচি হিসেবে এ আন্দোলন শুরু হয়নি। এটি রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, বৈষম্য, দমন ও কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে একটি বৃহত্তর সামাজিক প্রতিরোধে রূপ নেয়। সেই আন্দোলনের উত্তরাধিকার যদি সত্যিই ধারণ করতে হয়, তাহলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার হওয়া উচিত ন্যায়বিচার। প্রতিশোধ নয়।

তদন্ত হোক, কিন্তু তদন্ত যেন শাস্তি না হয়

বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে হলে সামনের দেয়াল অতিক্রমের সিঁরিরে ধাপগুলো স্বচ্ছ্বতার সঙ্গে পেরুতে হবে। আর সেই ধাপগুলো হলো—
প্রথমত, অভিযোগ থাকলে তদন্ত হবে।
দ্বিতীয়ত, অভিযোগ হতে হবে সুনির্দিষ্ট।
তৃতীয়ত, অভিযুক্তকে অভিযোগ জানাতে হবে।
চতুর্থত, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে।
পঞ্চমত, তদন্ত হবে নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের মাধ্যমে।
ষষ্ঠত, রাজনৈতিক পরিচয়কে অপরাধের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
সপ্তমত, প্রমাণিত অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী শাস্তি নির্ধারণ করতে হবে।
অষ্টমত, তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে সামাজিকভাবে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
এবং নবমত (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ)—তালিকা দিয়ে তদন্ত শুরু না করে অভিযোগ দিয়ে তদন্ত শুরু করতে হবে।

অর্থাৎ, ‘এই ৪০৪ জন আওয়ামী লীগপন্থি, তাই তদন্ত করো’—এই দুর্বল পদ্ধতি চলবে না। ‘এই শিক্ষক এই তারিখে এই ঘটনা ঘটিয়েছেন, এর সাক্ষ্য ও নথি রয়েছে—তদন্ত করো’—এটাই ন্যায়বিচারের পথ।

ব্যক্তির দায় বনাম সমষ্টির দায়

রাজনীতির একটি সুবিধাজনক কৌশল হলো ব্যক্তির দায়কে সমষ্টির ওপর চাপিয়ে দেওয়া। একজন শিক্ষক অপরাধ করেছেন। কাজেই তাঁর সংগঠনের সবাই অপরাধী। একজন কর্মকর্তা দুর্নীতি করেছেন। কাজেই একই সময়ে নিয়োগ পাওয়া সবাই সন্দেহভাজন। একজন শিক্ষক আন্দোলনবিরোধী পোস্ট দিয়েছেন, সুতরাং সেই রাজনৈতিক মতাদর্শের শত শত শিক্ষক তদন্তের আওতায়। এই পদ্ধতি প্রশাসনিকভাবে সহজ হতে পারে, কিন্তু ন্যায়বিচারের জন্য বিপজ্জনক। কারণ অপরাধ ব্যক্তির। শাস্তিও ব্যক্তির হওয়া উচিত—যদি না কোনো সংগঠনের বিরুদ্ধে আলাদা করে প্রমাণিত সাংগঠনিক অপরাধ থাকে।

এই জায়গায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো, সমষ্টিগত রাজনৈতিক পরিচয় এবং ব্যক্তিগত অপরাধের মধ্যে দেয়াল তৈরি করা।

সবচেয়ে বড় ক্ষতি শিক্ষার্থীদের

এই পুরো প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা শিক্ষার্থীদেরই। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় যদি বারবার শিক্ষক বদল, বরখাস্ত, তদন্ত, মিছিল, তালিকা ও রাজনৈতিক সংঘাতের মধ্যে থাকে, তাহলে শিক্ষা ও গবেষণা পিছিয়ে যায়। একজন শিক্ষক আজ ক্লাস নিচ্ছেন। কাল তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ। পরদিন তদন্ত কমিটি। তারপর সাময়িক বরখাস্ত। তারপর নতুন শিক্ষক নিয়োগ। এই প্রক্রিয়া বছরের পর বছর চলতে পারে। একটি বিশ্ববিদ্যালয় তখন জ্ঞান চর্চার জায়গা না হয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার পরীক্ষাগারে পরিণত হয়।

শিক্ষার্থীরাও শিখে যায়—যোগ্যতা দিয়ে নয়, সংগঠনের শক্তি দিয়ে সিদ্ধান্ত আদায় করা যায় এবং এই শিক্ষাটি ভয়াবহ। মব-সংস্কৃতি শুধু একজন শিক্ষককে অপমান করে না; এটি পরবর্তী প্রজন্মকে শেখায় যে প্রতিষ্ঠিত নিয়মের বাইরে গিয়েও দাবি আদায় করা যায়।

২০২৪-এর শিক্ষা কি আমরা ভুলে যাচ্ছি?

২০২৪ সালের আগস্টে শিক্ষকদের জোর করে পদত্যাগ করানোর ঘটনায় তখনকার শিক্ষা উপদেষ্টা যে অবস্থান নিয়েছিলেন, তার মূল কথা ছিল—অভিযোগ থাকলে তদন্ত হবে, কিন্তু কাউকে জোর করে পদত্যাগ করানো যাবে না এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ নষ্ট করা যাবে না।

দুই বছর পর একই নীতিকে আরও শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এখন পরিস্থিতির ধরন বদলেছে। তখন মব-সন্ত্রাস ছিল রাস্তায়, এখন সেটা অবস্থান নিয়েছে তালিকায়। তখন ছিল পদত্যাগের দাবি, এখন তদন্তের। তখন ছিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপমান, এখন সেটা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। আর এই দুয়ের ভেতরে একটি অভিন্ন যুক্তি কাজ করছে, ‘আগে শাস্তি, পরে অভিযোগের বিচার’। সমস্যার মূলটি সেখানেই।  মবের পোশাক বদলালেই ‘মব-সহিংসতা’র সংস্কৃতি বদলায় না।

জবাবদিহি দরকার, কিন্তু প্রতিশোধ নয়

এই মুহূর্তে সবচেয়ে দায়িত্বশীল অবস্থান হলো দুই ধরনের চরম অবস্থান প্রত্যাখ্যান করা। ঢালাও ভাবে বলা যাবে না, সব শিক্ষকই নির্দোষ, কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। আবার এটাও বলা যাবে না যে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এমন সবাই অপরাধী।

দুটিই ভুল। প্রকৃত অপরাধীর বিচার হতে হবে। শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, সহিংসতা, নির্যাতন, বেআইনি প্রশাসনিক চাপ, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার—যে অভিযোগই থাকুক, প্রমাণিত হলে শাস্তি হতে হবে। কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয়, দলীয় সমর্থন কিংবা কোনো সংগঠনের সদস্যপদকে অপরাধের বিকল্প বানানো যাবে না। আজকের রাজনৈতিক বিজয় যদি আগামী দিনের প্রতিহিংসার ভিত্তি তৈরি করে, তাহলে ২০২৪-র পটপরিবর্তনের নৈতিক অর্থই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

ক্ষমতার মুখ বদলেছে, সংস্কৃতি কি বদলেছে?

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের সামনে একটি ঐতিহাসিক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল—রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় আনুগত্যের বাইরে এনে আইনের শাসন, জবাবদিহি ও নাগরিক মর্যাদার ভিত্তিতে পুনর্গঠন করার। কিন্তু সেই সম্ভাবনা বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সেই পুরোনো ক্ষমতার সংস্কৃতিই। শুধু মুখগুলো বদলে গেছে।

একসময় ক্ষমতাসীন দলের অস্ত্র ছিল নিরাপত্তা ইস্যু। এখন বিপরীত রাজনৈতিক পরিচয় কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ অস্ত্র হয়ে উঠছে। তখন তালিকা তৈরি করে মানুষকে চিহ্নিত করা হতো, ভিন্নমতের শিক্ষককে প্রশাসনিকভাবে চাপে রাখা হতো। এখনও তালিকা প্রস্তুত হচ্ছে, তৈরি হচ্ছে সেই পুরনো আশঙ্কাও । ক্যাম্পাসে মিছিল করে প্রতিষ্ঠানকে প্রভাবিত করা প্রবণতাও প্রবল থেকে প্রবলতর। ছাত্র-সংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধি অস্ত্র হাতে পৌঁছে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি পর্যন্ত।

তাহলে পরিবর্তন কোথায়? ক্ষমতার মানুষ বদলানোর পাশাপাশি ক্ষমতা প্রয়োগের নিয়মও যদি না বদলায় তাহলে সেটাকে আর যাই হোক পরিবর্তন বলা যাবে না। জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা যদি হয়—কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। সেই নীতি বিএনপি, জামায়াত, বাম কিংবা অন্য কোনো মতের শিক্ষকের ক্ষেত্রে যেমন সত্য আওয়ামী পন্থি শিক্ষকের ক্ষেত্রেও তেমেই সত্য। জবাবদিহি যদি প্রয়োজন হয়, তা হবে প্রমাণের ভিত্তিতে, নিরপেক্ষভাবে, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এবং অপরাধের মাত্রার ভিত্তিতে ।

আর বিশ্ববিদ্যালয় কোনো দলের দখলদারির জায়গা নয়। সেখানে একজন শিক্ষক সরকারের সমালোচনা করতে পারবেন, সরকারের প্রশংসাও করতে পারবেন; একজন শিক্ষার্থী শিক্ষকের সঙ্গে দ্বিমত করতে পারবে; একটি রাজনৈতিক মত অন্য রাজনৈতিক মতের সঙ্গে বিতর্ক করবে—কিন্তু কারও জীবিকা, মর্যাদা ও নিরাপত্তা কেবল একটি তালিকার ওপর নির্ভর করবে না। এই নীতি প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে ২০২৪ সালের পরিবর্তন কেবল ক্ষমতার পালাবদল হয়ে থাকবে। রাষ্ট্র ও সমাজের কোনো পরিবর্তন আনবে না।

মন্তব্য করুন

Logo