Logo

১ ভাদ্র ১৪৩৩

×

Follow Us

সৌদি নিরাপত্তা জোটে বাংলাদেশ

কাভার স্টোরি

সৌদি নিরাপত্তা জোটে বাংলাদেশ

বড় ঝুঁকির পথে আমরা

Icon

লুবনা ফেরদৌসি

প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০২৬, ০৯:১৫ পিএম

বাংলাদেশ কি সমুদ্রপথ পাহারা দিতে যাচ্ছে, নাকি ধীরে ধীরে মধ্যপ্রাচ্যের এক সংঘাতের ভেতরে পা রাখছে? এখান থেকে বের হওয়ার সিদ্ধান্তটা পরে আর পুরোপুরি বাংলাদেশের হাতে নাও থাকতে পারে।

সৌদি আরবের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সহ ১৪টি দেশ নিয়ে একটা নতুন সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠিত হয়েছে। ঘোষিত উদ্দেশ্য শুনলে আপত্তির কিছু নেই। লোহিত সাগর, বাব আল-মানদেব এবং এডেন উপসাগর দিয়ে জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখা, বাণিজ্যিক নৌপথ রক্ষা করা এবং ভারত মহাসাগর থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ সচল রাখা।

আলজাজিরার তথ্যমতে,  ৫১টি দেশ ও সংস্থাকে আলোচনায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, ৪৩টি দেশের প্রতিনিধি অংশ নেয়, কিন্তু প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশসহ ১৪টি দেশ জোটে যুক্ত হয়েছে। সুতরাং এটা ছোটখাটো সাময়িক নৌ-সহায়তা নয়; বরং একটি নতুন বহুজাতিক নিরাপত্তা কাঠামো দাঁড় করানোর চেষ্টা।

কাগজে-কলমে সমুদ্র নিরাপত্তা মনে হলেও ভূ-রাজনীতিতে কোন সামরিক জোটকে আপনি প্রেস বিজ্ঞপ্তি করে বুঝতে পারবেন না। বুঝতে হলে জিজ্ঞেস করতে হবে জোটটি এখন কেন তৈরি হলো, এখনই কেন? কাকে ঠেকাতে জোটটি তৈরি হলো? কার কৌশলগত নিরাপত্তা সবচেয়ে বেশি রক্ষা করবে? আগে থেকে একই অঞ্চলে নিরাপত্তা কাঠামো থাকা সত্ত্বেও নতুন জোট কেন? এবং সদস্য হওয়ার পর বাংলাদেশের অঙ্গীকার কোথায় গিয়ে শেষ হবে? উত্তর গুলো খুঁজলেই সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে৷ 

বর্তমান সংঘাতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ফলে সৌদি আরব তার তেল রপ্তানির জন্য লোহিত সাগরের ওপর আরো বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। কিন্তু সেখানেও সমস্যা।

ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত হুতি গোষ্ঠী সৌদি জাহাজের বিরুদ্ধে নৌ-অবরোধ ঘোষণা করেছে এবং সৌদির সাথে সম্পর্কযুক্ত জাহাজকে আক্রমণের লক্ষ্য বানিয়েছে। মানে হচ্ছে সৌদি আরব যে বিকল্প পথ দিয়ে নিজের জ্বালানি রপ্তানি বাঁচাতে চাইছে, সেই পথটিও এখন নিরাপদ না। তাই নতুন জোটের জন্ম কোন শূন্যস্থান পূরণের জন্য হয়নি। মূলত এমন এক মুহূর্তে এটা ঘটেছে যখন সৌদি আরবের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সমুদ্র নিরাপত্তা প্রায় একই জিনিস হয়ে গেছে।

আর এ কারণে বিষয়টা জাহাজ পাহারা দেওয়া থেকে ভূ-রাজনীতিতে ঢুকে পড়েছে।  কেননা বাব আল-মানদেব কোনো সাধারণ সমুদ্র পথ না। লোহিত সাগরকে আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক চেকপয়েন্ট এটা।

আলজাজিরার খবর থেকে জানা যায় সবচেয়ে সরু জায়গায় এটা ২৯কিলোমিটার। অথচ বিশ্বের সামুদ্রিক বাণিজ্যের আনুমানিক ১০-১২ শতাংশ এই পথ দিয়ে যায়। 

রাস্তার একটা সরু সেতু দিয়ে যদি পুরো শহরের ১০ শতাংশ ট্রাফিক যাতায়াত করে, আর সেই সেতুই যদি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে কী হবে? বাব আল-মানদেব বন্ধ হলে  জাহাজকে ঘুরে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত দিয়ে যেতে হবে। সময় বাড়বে, জ্বালানি খরচ বাড়বে। শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি খরচ কে দেবে? আমরাই। বাংলাদেশের আমদানি, জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামাল, ইউরোপমুখী বাণিজ্য,  সবকিছুর ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। তাই লোহিত সাগর নিরাপদ থাকা বাংলাদেশের বাস্তব ও জাতীয় স্বার্থ। এই জায়গায় জোট এ যোগ দেয়ার যুক্তি আছে।

কিন্তু সমস্যা শুরু হয় অন্য জায়গায়। নিজের বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষা করা এবং অন্য রাষ্ট্রের সামরিক কৌশলের অংশ হয়ে যাওয়া এক বিষয় না। আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো লোহিত সাগরে আগে থেকেই একটি নিরাপত্তা পরিকাঠামো আছে। ৪৭টি দেশ মিলে এটি পরিচালনা করে৷ ইউরোপীয় ইউনিয়নও এর সঙ্গে আছে।

এখন কথা হচ্ছে, একই সমুদ্রে যখন আগে থেকেই একটি বহুজাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা আছে, তখন সৌদির আলাদা জোট কেন প্রয়োজন হলো? এই প্রশ্নের উত্তর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একটা সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো কৌশলগত মালিকানা। রিয়াদ হয়তো এমন একটা আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো চাইছে যেখানে পশ্চিমাদের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে হবে না। এটা সৌদি আরবের বৃহত্তর নিরাপত্তা কৌশলের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ- নিজেকে মার্কিন নিরাপত্তার ছায়াতল থেকে বের করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রদানকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।

কিন্তু বাংলাদেশের জন্য এখানে হিসাবটা আরো জটিল। আপনি যদি শুধু একটা আন্তর্জাতিক সমুদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থায় থাকেন, সেটা এক ধরনের অঙ্গীকার। আর যদি একটা নির্দিষ্ট আঞ্চলিক শক্তির নেতৃত্বাধীন নিরাপত্তা কাঠামোতে প্রবেশ করেন, সেটা কিন্তু অন্য ধরনের ভূ-রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করতে পারে। এখনই বলা যাবে না যে বাংলাদেশ ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দিয়েছে। সেটা প্রমাণের তুলনায় অনেক বেশি শক্ত দাবি হবে।

কিন্তু এটাও বলা যাবে না যে এর কোন ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি নেই। জোট আনুষ্ঠানিকভাবে বলছে এটা কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রকে টার্গেট করছে না। কিন্তু যে পরিস্থিতিতে এটা তৈরি হয়েছে, সেখানে ইরান সমর্থিত হুতিদের হুমকি কেন্দ্রীয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অন্য রাষ্ট্র আপনাকে কীভাবে দেখে তার সাথে নিরাপত্তা সম্পর্কিত। তেহরান যদি এটাকে সৌদি নেতৃত্বাধীন কনটেইনমেন্ট আর্কিটেকচার এর অংশ হিসেবে দেখে, তাহলে বাংলাদেশের উদ্দেশ্য রক্ষণাত্মক হলেও ইরান সেভাবে নাও দেখতে পারে।

কার পাশে দাঁড়াব, কেন দাঁড়াব, কোন বিষয়ে দাঁড়াব, এবং ঠিক কতদূর পর্যন্ত দাঁড়াব, এই সীমাটা নিজের জাতীয় স্বার্থ দিয়ে ঠিক করতে হয়। সেই সীমা যদি ঢাকা ঠিক করে, তবে এটা কৌশলগত সার্বভৌমত্ব। কিন্তু সেই সীমা যদি অন্য কেউ তার ঝুঁকি চিন্তা করে ঠিক করে, তাহলে সমুদ্র নিরাপত্তা রক্ষা করতে গিয়ে বাংলাদেশ নিজের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদটাই হারাতে পারে। 

মন্তব্য করুন

Logo