Logo

১৮ ভাদ্র ১৪৩৩

×

Follow Us

মাইনি নদীর কান্না ও আমাদের দায়

বন্যায় তলিয়ে গেছে দীঘিনালার বহু ঘরবাড়ি, ছবি-সংগৃহীত

ফিচার

মাইনি নদীর কান্না ও আমাদের দায়

দীঘিনালার বর্তমান সংকটের নেপথ্যে

Icon

চাঙমা নয়ন

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ১২:৫৬ এএম

আমাদের দীঘিনালা পানিতে ভাসছে। বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে গ্রামের পর গ্রাম, ফসলের জমি, রাস্তা-ঘাট এবং মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। অনেকেই এটিকে শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলে মনে করছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই বন্যার পেছনে শুধু অতিবৃষ্টি দায়ী নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ড এবং প্রকৃতির প্রতি অবহেলা।

দীঘিনালা একটি সুন্দর পাহাড়ি উপত্যকা। এই উপত্যকার প্রাণ ছিল মাইনি নদী। আজুনানুদের মুখে শোনা যায়, একসময় মাইনি নদীর পানি ছিল স্বচ্ছ, গভীরতা ছিল অনেক, আর স্রোত ছিল প্রাণবন্ত। বর্ষাকালে নদী তার স্বাভাবিক নিয়মে প্রবাহিত হতো, আবার শুষ্ক মৌসুমেও নদীতে পর্যাপ্ত পানি থাকত। সেই পানিতে পাওয়া যেত সকল ধরনের সুস্বাদু মাছ। নদী ছিল মানুষের জীবন, জীবিকা ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু আজ সেই নদী তার আগের রূপ হারিয়েছে। কোথাও নদী ভরাট হয়ে গেছে, কোথাও পানির প্রবাহ কমে গেছে, আবার কোথাও সামান্য বৃষ্টিতেই নদী উপচে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়ছে।

এর প্রধান কারণগুলোর একটি হলো পাহাড়ের প্রাকৃতিক বন ধ্বংস। পাহাড়ের বন শুধু গাছের সমষ্টি নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন্ত পরিবেশব্যবস্থা। বড় বড় গাছ, ঝোপঝাড়, লতাগুল্ম, ঘাস এবং মাটির নিচে বিস্তৃত শিকড়ের জাল বৃষ্টির পানি শোষণ করে ধীরে ধীরে মাটির ভেতরে প্রবেশ করায়। ফলে পাহাড় থেকে হঠাৎ করে বিপুল পরিমাণ পানি নিচে নেমে আসে না। একই সঙ্গে শিকড় মাটিকে শক্তভাবে ধরে রাখায় ভূমিক্ষয়ও কম হয়।

কিন্তু গত কয়েক দশকে প্রাকৃতিক বন উজাড় করে সেখানে সেগুন, রাবার, আকাশমণি কিংবা বিভিন্ন একক প্রজাতির বাণিজ্যিক বাগান গড়ে তোলা হয়েছে। বাইরে থেকে সবুজ দেখালেও এগুলো কখনোই প্রাকৃতিক বনের বিকল্প নয়। এসব বাগানে জীববৈচিত্র্য কম থাকে এবং মাটির পানি ধারণ করার ক্ষমতাও অনেক কম। ফলে ভারী বৃষ্টি হলেই অধিকাংশ পানি সরাসরি পাহাড় বেয়ে নিচে নেমে আসে। সেই প্রবল স্রোতের সঙ্গে পাহাড়ের উর্বর মাটি ধুয়ে নদীতে চলে যায়। বিজ্ঞানীরা এই প্রক্রিয়াকে ভূমিক্ষয় বা Soil Erosion বলে থাকেন।

এই মাটি, পলি ও বালু গিয়ে জমা হয় মাইনি নদীর তলদেশে। বছরের পর বছর ধরে এভাবে নদী ধীরে ধীরে ভরাট হয়েছে। নদীর গভীরতা কমে যাওয়ায় এখন আর পাহাড়ি ঢলের পানি ধারণ করার ক্ষমতা তার নেই। আগে যে পানি সহজেই নদী দিয়ে নেমে যেত, এখন সেই পানি নদীর দুই তীর উপচে গ্রাম, রাস্তা ও কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে অল্প সময়ের ভারী বৃষ্টিও বড় ধরনের বন্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ বন্যার একটি বড় কারণ শুধু বেশি বৃষ্টি নয়, বরং নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া এবং পাহাড়ের পানি ধারণক্ষমতা হ্রাস পাওয়া।

এই সংকটকে আরও তীব্র করেছে পাহাড়ে ব্যাপক হারে তামাক চাষ। তামাক পাতা শুকানোর জন্য প্রচুর জ্বালানি কাঠ লাগে। সেই কারণে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ গাছ কাটা হয়। পাশাপাশি তামাক চাষ মাটির উর্বরতা কমিয়ে দেয় এবং রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার নদী ও জলাশয়ের পানিকেও দূষিত করে। ফলে ক্ষতি হয় মানুষ, কৃষি, নদী এবং পুরো পরিবেশের।

শুধু বন উজাড় বা তামাক চাষই নয়, ইট ভাটার কারণেও অপরিকল্পিত পাহাড় কাটা ও বনজঙ্গল ধ্বংস , অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, নদীর তীর দখল এবং পরিবেশের প্রতি উদাসীন মনোভাবও এই সংকটকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। আমরা যখন পাহাড় ধ্বংস করি, তখন শুধু একটি পাহাড় নয়, একটি নদী, একটি উপত্যকা এবং একটি জনপদের ভবিষ্যৎও ধ্বংস করি। 

আমাদের এখনই সচেতন হওয়া দরকার। কারণ আজকের এই বন্যা কেবল একটি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়; এটি প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার একটি সতর্কবার্তা। আমরা যদি এখনই পাহাড়, বন ও নদীর প্রতি দায়িত্বশীল না হই, তাহলে ভবিষ্যতে দীঘিনালাকে এর চেয়েও ভয়াবহ দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হতে পারে।

মন্তব্য করুন

Logo