Logo

১৮ ভাদ্র ১৪৩৩

×

Follow Us

অপার দানে ঋণী করে গেলে, লিও...

ছবিঃ অনলাইন থেকে সংগৃহীত

দশদিগন্ত

জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা

অপার দানে ঋণী করে গেলে, লিও...

লিমন আহমেদ

Icon

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৫ পিএম

একুশ শতকের ফুটবল বিশ্বকে যে মানুষটি তার বাঁ পায়ের জাদুতে বিমোহিত করে রেখেছিলেন, সেই সবুজ গালিচার রাজপুত্র লিওনেল আন্দ্রেস মেসি অবশেষে থামলেন। একটি ফেসবুক পোস্ট, কয়েকটি লাইন, আর তাতেই থমকে গেল বিশ্ব ফুটবলের হৃদস্পন্দন। ইন্টারনেটের অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়েছে অগণিত অনুরাগীর অশ্রুসিক্ত নিশ্বাস। আন্তর্জাতিক ফুটবলের আঙিনা থেকে মেসির বিদায় যেন একটি মহাযুগের সমাপ্তি।

রোজারিওর অন্ধকার গলি থেকে লুসাইলের স্বপ্নিল আকাশ; লিওনেল মেসির পুরো জীবনটাই যেন একাধারে মহাকাব্যিক বিপ্লব, অমর প্রেম, নির্মম বিদ্রোহ আর অপার ফ্যান্টাসির মেলবন্ধন। সবুজ গালিচায় তিনি যা রচনা করেছেন, তা কেবল ফুটবল ছিল না; ছিল এক কল্পবিজ্ঞান। তা দেখে চোখ কপালে তুলে মানবজাতি বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়েছিল- হ্যাঁ, ঈশ্বরের স্পর্শ এই ধরণীতেই বিদ্যমান।

তার জীবনের প্রথম অধ্যায়টা ছিল প্রকৃতির বিরুদ্ধে এক প্রকাশ্য বিদ্রোহ। শরীরের ভেতর পিটুইটারি গ্রন্থির নিঃশব্দ বিশ্বাসঘাতকতা, গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি আর ওষুধের অসামর্থ্যকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বাবার হাত ধরে সেই যে দূর পরবাসে পাড়ি জমানো, সেটাই ছিল এক বিপ্লবের সূচনা। ফুটবলের ব্যাকরণ ভেঙে দিয়ে বার্সেলোনার সেই নেপকিন পেপারে রচিত হয়েছিল ইতিহাসের এক পরাবাস্তব ফ্যান্টাসি। পেপ গার্দিওলার অধীনে ফলস নাইনের ভূমিকায় যখন তিনি বল নিয়ে ছুটতেন, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদের রক্ষণভাগ শান্ত সুসংহত দুর্গ থেকে ক্ষণিকের মধ্যে ধূলিসাৎ হয়ে যেত। বিশ্বের নামি দামি, অতি মানব ও দানবীয় সব ডিফেন্ডারকে একের পর ছিটকে ফেলে বোতলবন্দি জিনির মতো বল জালে জড়ানো তা তো কোনো সাধারণ মানুষের কাজ হতে পারে না!

ছবিঃ অনলাইন থেকে সংগৃহীত

কিন্তু ফুটবলের বিধাতা বড় নির্দয় চিত্রনাট্যকার। ক্লাবের হয়ে একের পর এক শিরোপার পাহাড় গড়লেও, প্রিয় আর্জেন্টিনা জার্সিতে তিনি দীর্ঘদিন ছিলেন এক ট্র্যাজিক নায়ক। মারাকানার ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনাল কিংবা পরপর দুটি কোপা আমেরিকার ফাইনালে হেরে গিয়ে চোখের জলে ভাসার দৃশ্যগুলো ছিল যেন নিয়তির এক চরম ট্র্যাজেডি। ভক্তদের গালি, সংবাদমাধ্যমের ধারালো সমালোচনা আর একের পর এক হারের যন্ত্রণায় ২০১৬ সালে রাজপথের ধুলোয় লুটিয়ে পড়েছিলেন। ফুটবলকে বিদায় বলে দিয়েছিলেন। কে জানতো৷ তিনিই ফিনিক্স পাখি হয়ে ফিরবেন৷ ঘুচাবেন সব অপবাদ৷

মেসি দেখালেন সত্যিকারের প্রেম কখনো পরাজিত হতে জানে না। দেশের প্রতি, সেই নীল-সাদা ১০ নম্বর শার্টটার প্রতি মেসির ভালোবাসা ছিল এক অমোঘ প্রেম। তিনি ফিরে এলেন। ভাঙা বুক নিয়ে আবার একজোড়া বুট পায়ে বাঁধলেন। রূপকথার সেই ফিনিক্স পাখির মতো ছাইভস্ম থেকে ডানা মেলে উড্ডয়ন করলেন। দুর্বল ক্যাপ্টেন থেকে হয়ে উঠলেন পরশ পাথরের মতো নেতা, যার সংস্পর্শে এলেই সতীর্থরা জ্বলে উঠে। আর্জেন্টিনার জন্য অপয়া উপাধি বিসর্জন দিলেন সর্বজয়ী হয়ে। কোপা জিতে নিলেন পরপর দুইবার৷ চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলের মাটিতে চ্যাম্পিয়ন হয়ে জানান দিয়েছিলেন তার সাফল্যের গল্পের শুরু। সেবার মারাকানায় চ্যাম্পিয়ন হয়ে যখন মেসি আবেগে কাঁদলেন কোটি মানুষের চোখ সমুদ্র হলো আনন্দ-উল্লাসের অশ্রুতে।

২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ ছিল সেই ফ্যান্টাসির চরম পরাকাষ্ঠা। একেকটা ড্রিবলিং, ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে সেই বাঁ পায়ের মায়াজাল আর ফাইনালে ফ্রান্সের সঙ্গে রক্ত হিম করা যুদ্ধ; সবকিছুর পেছনে ছিল একজন নেতার চরম বিপ্লব। যে নেতা সতীর্থদের জন্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়ান, আবার বিপক্ষকে একাই ছারখার করে দেন। ৩৬ বছরের তৃষ্ণা মিটিয়ে যখন সোনালী ট্রফিটায় আলতো চুমু আঁকলেন, সেদিন যেন পৃথিবীর সব পদার্থবিদ্যার নিয়ম ভুল প্রমাণিত হলো। সবকিছু ভেদ করে যখন মেসি সোনালী ট্রফিটাতে প্রথম চুমু খেলেন, বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অযুত নিযুত লক্ষ কোটি ভক্তের জীবনের সব পাওয়া যেন পূর্ণ হয়ে গেছে। ফুটবল খেলাটা সেদিন তার কাছে ঋণমুক্ত হয়েছিল, আর সমর্থকেরা লাভ করেছিলাম এক চিরন্তন মুক্তি।

২০২৬ বিশ্বকাপটা যেন মেসিরই মঞ্চ ছিলো। হয়তো শেষ আয়োজন বলেই এভাবেই নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিলেন তিনি। ড্রিবলিং, পাস, এসিস্ট, গোল- সবখানেই তিনি ছিলেন অনন্য। একেক ক্যাটাগরিতে একেক জন একেকটা পুরস্কার জিতে গেছেন। আর সব মিলিয়ে মেসি হয়ে উঠলেন ২০২৬ বিশ্বকাপের পোস্টার ম্যান! ফাইনালে স্পেনের সঙ্গে পরাজয়ের বেদনাও তাই ভক্তরা গ্রহণ করেছে আনন্দ নিয়ে৷

ছবিঃ অনলাইন থেকে সংগৃহীত

মেসি কেবল ট্রফি জেতেননি; তিনি শিখিয়েছেন কীভাবে ধুলোয় মিশে গিয়েও নক্ষত্র ছোঁয়া যায়। ফুটবল খেলায় কত রাজা-বাদশাহ আসবে, কিন্তু এই বাঁ পায়ের সম্রাটের গল্প লেখা থাকবে প্রেম, বিদ্রোহ আর ফ্যান্টাসির সেই অমর জলছাপে।

অবশেষে তিনি থামলেন। ফেসবুকে একটা বিদায়ী বার্তা লিখে নীল-সাদার পৃথিবীকে এক নিমিষে অভিভাবকহীন করে দিলেন। ভক্তরা বিষাদে আক্রান্ত, সতীর্থরা আবেগী, ফুটবলের বোদ্ধারা ব্যথিত, ফুটবলের কর্তৃপক্ষও মন খারাপ করে ফেলেছে! এরপর থেকে মাঠে যখনই আর্জেন্টিনার জাতীয় সঙ্গীত বাজবে, যখনই আর্জেন্টিনা মাঠে নামবে, ১০ নম্বর জার্সি পরা কাউকে দেখলে আমাদের চোখ দুটো স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুঁজে বেড়াবে সেই চিরচেনা জাদুকরকে। যিনি ম্যারাডোনার লিগ্যাসির আকাশ সমান চাপ ছোট্ট বুকের ভেতর থেকে বয়ে বয়ে দুই কাঁধে নিয়ে সফল হয়েছিলেন। যার বাঁ পায়ে পুরো বিশ্বকে নাচাতে পারতো, শত্রু-মিত্র এক করে মুগ্ধতায় ভাসাতে পারতো।

মন্তব্য করুন

Logo