Logo

১৮ ভাদ্র ১৪৩৩

×

Follow Us

চীনের মরুভূমিতে ৫০ হাজার গাছের মরুদ্যান

ছবিঃ অনলাইন থেকে সংগৃহীত

ফিচার

বন্ধুত্বের গল্প, বিশ্বাসের গল্প

চীনের মরুভূমিতে ৫০ হাজার গাছের মরুদ্যান

Icon

কাভার স্টোরি ডেস্ক

প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৩৪ পিএম

যেখানে এক ফোঁটা পানির জন্য মানুষের হাহাকার, যেখানে মাটির বুকে প্রাণের চিহ্ন খুঁজে পাওয়াই কঠিন—সেখানেই আজ দাঁড়িয়ে আছে হাজার হাজার সবুজ গাছ। এই অসম্ভব কাজের শুরু হয়েছিল মাত্র ৫ হাজার ডলার দিয়ে। আর সেই গল্পের পেছনে ছিলেন দুই দেশের দুই সাধারণ মানুষ। একজন মার্কিন শিক্ষক, আর অন্যজন চীনের এক নারী, যিনি মরুভূমিকে সবুজ করার স্বপ্ন দেখেছিলেন।

গল্পটা শুরু নব্বইয়ের দশকে।যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক রোনাল্ড স্যাকলোভস্কি তখন একটি এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামের আওতায় ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে চীনে কাজ করছিলেন। হেনান প্রদেশের একটি স্কুলে পড়াতেন তিনি। একদিন টেলিভিশনের পর্দায় তার চোখ আটকে যায় এক নারীর গল্পে। নারীটির নাম ইন ইউঝেন। চীনের ইনার মঙ্গোলিয়ার মু উস মরুভূমিতে স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি লড়াই করছিলেন মরুকরণের বিরুদ্ধে। চারপাশে শুধু বালি আর বালি। কিন্তু সেই বালুর মধ্যেই ইউঝেনের স্বপ্ন ছিল—একদিন এখানে গাছ জন্মাবে, সবুজ হবে মরুভূমি। রোনাল্ড সেই স্বপ্নে বিশ্বাস করেছিলেন। নিজের জমানো টাকা এবং কয়েকজন বন্ধুর কাছ থেকে সংগ্রহ করা অর্থ মিলিয়ে তিনি ইউঝেনকে তুলে দেন ৫ হাজার মার্কিন ডলার। উদ্দেশ্য ছিল একটাই—মরুভূমির বুকে গাছের মরুদ্যান গড়ে তোলা। ইউঝেন সেই অর্থ থেকে নিজের জন্য একটি পয়সাও খরচ করেননি। টাকার প্রতিটি অংশ চলে যায় চারা গাছ, পানি আর মরুভূমির মাটির সঙ্গে লড়াইয়ে। একটি গাছ। তারপর আরেকটি। এভাবে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর।

আর ২৭ বছর পর? সেই ৫ হাজার ডলারের সহযোগিতায় শুরু হওয়া উদ্যোগ আজ দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজারেরও বেশি গাছে। মরুভূমির বুকে তৈরি হয়েছে বিশাল এক সবুজ প্রতিরক্ষা দেয়াল।
যেখানে একসময় শুধু বালি উড়ত, সেখানেই এখন বাতাসে দুলছে গাছের সবুজ পাতা। এই গল্পটা শুধু গাছ লাগানোর নয়। এটা বিশ্বাসের গল্প। ভিন্ন দু’দেশের দু’জন মানুষের বন্ধুত্বের গল্প। ২০০০ সালে রোনাল্ড যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যান। তারপর দুজনের আর কোনো যোগাযোগ ছিল না। বছর পেরিয়েছে। দশক পেরিয়েছে। দূরত্ব তৈরি করেছে মহাসাগর আর সীমান্ত। কিন্তু ইউঝেন ভুলে যাননি সেই মানুষটিকে—যিনি একদিন তার স্বপ্নে বিশ্বাস করে ৫ হাজার ডলার দিয়েছিলেন। তিনি নিজের কাজ চালিয়ে গেছেন। প্রতিদিন। বছরের পর বছর।

আর অবশেষে, যখন সেই ছোট্ট স্বপ্ন একটি বিশাল সবুজ অরণ্যে পরিণত হলো, ইউঝেন চাইলেন—এই গল্পটা সেই মানুষটিকে জানাতে। ইন্টারনেট আর বিভিন্ন মাধ্যমের সাহায্যে শুরু হলো খোঁজ।
অবশেষে খুঁজে পাওয়া গেল রোনাল্ড স্যাকলোভস্কিকে। ২৭ বছর পর আবার যোগাযোগ। আর তারপর—আবার দেখা করার সিদ্ধান্ত। প্রায় ৩০ ঘণ্টার বিমানযাত্রা শেষে রোনাল্ড আবার পা রাখলেন চীনের মাটিতে। এবার তার গন্তব্য কোনো শহর নয়। গন্তব্য সেই মরুভূমি। যেখানে ২৭ বছর আগে তিনি রেখে গিয়েছিলেন মাত্র ৫ হাজার ডলারের একটি স্বপ্ন।আজ সেখানে দাঁড়িয়ে আছে হাজার হাজার গাছ। ইউঝেনও প্রস্তুত ছিলেন। নিজের হাতে জন্মানো গাছের ফল সংগ্রহ করে রেখেছিলেন পুরোনো সেই বন্ধুর আপ্যায়নের জন্য।

ভাবুন তো—
একজন মানুষ অন্য একজন মানুষের স্বপ্নে বিশ্বাস করেছিলেন। সেই বিশ্বাস থেকে জন্ম নিয়েছিল কয়েক হাজার চারা। আর সেই চারাগাছ একদিন বদলে দিয়েছে মরুভূমির একটি বিশাল অংশ।
এই গল্প কোনো দেশের নয়। কোনো রাজনীতির নয়। কোনো প্রচারণারও নয়। এটা দুইজন সাধারণ মানুষের গল্প। একজনের দেওয়া অর্থ, আর অন্যজনের বছরের পর বছর ধরে চালিয়ে যাওয়া সংগ্রাম। সবচেয়ে বড় কথা—এটা প্রমাণ করে, মানুষের আন্তরিকতা সীমান্তে সীমাবদ্ধ নয়। ২৭ বছর আগে তাদের দেখা হয়েছিল অল্প সময়ের জন্য। ২৭ বছর পর তারা আবার মুখোমুখি।
কিন্তু মাঝখানের এই দীর্ঘ সময়টা তাদের আলাদা করেনি। বরং তাদের সেই ছোট্ট সাক্ষাৎকে পরিণত করেছে একটি বড় গল্পে। একটি মরুভূমিকে সবুজ করার গল্প।

একটি বন্ধুত্বের গল্প। আর মানুষের প্রতি মানুষের বিশ্বাসের গল্প।
৫ হাজার ডলার থেকে ৫০ হাজার গাছ—কখনো কখনো একটি ছোট্ট বিশ্বাসই অসম্ভবকে সম্ভব করার জন্য যথেষ্ট।

মন্তব্য করুন

Logo