Logo

১৮ ভাদ্র ১৪৩৩

×

Follow Us

সবুজ গালিচা থেকে স্মৃতির আকাশে মেসি

ছবিঃ অনলাইন থেকে সংগৃহীত

দশদিগন্ত

জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা

সবুজ গালিচা থেকে স্মৃতির আকাশে মেসি

চিররঞ্জন সরকার

চিররঞ্জন সরকার

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৩৮ এএম

ফুটবলের ঈশ্বরেরও একদিন অবসর নিতে হয়। এটাই বোধহয় পৃথিবীর সবচেয়ে নির্মম সত্যগুলোর একটি। যে মানুষটির পায়ে বল থাকলে কোটি কোটি মানুষ বিশ্বাস করত, অসম্ভব বলে পৃথিবীতে কিছু নেই, সেই লিওনেল মেসিও শেষ পর্যন্ত বলে দিলেন, সময় হয়ে গেছে। কী আশ্চর্য! সময় নাকি তাঁর হয়ে গেছে। আমাদের তো সময়ই হয় না! আমরা বছরের পর বছর ফুটবল দেখি, রাত জাগি, পতাকা ওড়াই, জার্সি গায়ে দিই, ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিই, চায়ের দোকানে তর্ক করি, ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার জন্য আত্মীয়তার সম্পর্ক পর্যন্ত নষ্ট করি; কিন্তু নিজের দেশের ফুটবলের জন্য পাঁচ মিনিট সময় বের করতে পারি না। মেসি অবসর নিচ্ছেন, অথচ আমাদের ফুটবল এখনও যেন শৈশবের মাঠে হারিয়ে যাওয়া সেই ফুটবলটাই খুঁজছে।

সংখ্যার ভাষাতেও মেসি এক বিস্ময়। বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে এখন পর্যন্ত ১,১৭১টি ম্যাচ খেলে করেছেন ৯২৭টি গোল; ৪৫৪টির বেশি ম্যাচে হয়েছেন ম্যাচসেরা। ৬২টি হ্যাটট্রিক তাঁর গোলের ক্ষুধা আর ধারাবাহিকতার আরেক বিস্ময়কর দলিল। এর মধ্যে ক্লাবের হয়ে ৫১টি এবং আর্জেন্টিনার জার্সিতে ১১টি হ্যাটট্রিক। এক ম্যাচে চার গোল করেছেন ছয়বার, পাঁচ গোলের কীর্তিও আছে দুবার। অথচ এই বিপুল সংখ্যার আড়ালেই লুকিয়ে আছে আসল মেসি—যিনি শুধু গোলের হিসাব বাড়াননি, ফুটবলকে পরিসংখ্যানের খাতা থেকে তুলে এনে শিল্পের ক্যানভাসে বসিয়েছেন। তাঁর প্রতিটি গোল যেন সংখ্যার চেয়ে বড় কোনো গল্প, প্রতিটি হ্যাটট্রিক যেন সবুজ গালিচায় লেখা আরেকটি কবিতা। তাই মেসিকে শেষ পর্যন্ত কত গোলের মানুষ দিয়ে মাপা যাবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়; কারণ কিছু মানুষ রেকর্ড গড়েন, আর কিছু মানুষ রেকর্ডেরও ওপারে গিয়ে একটি সময়কে সংজ্ঞায়িত করেন। 

মেসির শরীর ছিল ছোট। স্বপ্নটা ছিল বিশাল। পৃথিবী সাধারণত বড় স্বপ্নের জন্য বড় শরীর খোঁজে। মেসি এসে সেই হিসাবটাই গুলিয়ে দিলেন। তিনি দেখিয়ে দিলেন, উচ্চতা দিয়ে মানুষ বড় হয় না; কখনও কখনও একটি ছোট শরীরের ভেতরেই মহাদেশসমান প্রতিভা বাস করতে পারে। তাঁর পায়ে ফুটবল যেন বল নয়, কবিতা। অন্যরা যেখানে পাস দেয়, মেসি সেখানে গল্প শুরু করেন। অন্যরা যেখানে ড্রিবল করে, তিনি সেখানে ছন্দ লেখেন। কয়েকজন প্রতিপক্ষ তাঁকে ঘিরে ধরলে মনে হয়, শিকারিকে ঘিরে ফেলেছে শিকারিরা। তারপর হঠাৎ দেখা যায়, শিকারি নেই, বল নেই, শুধু মেসি চলে গেছেন সামনে।

ছবিঃ অনলাইন থেকে সংগৃহীত

এমন জাদু অবশ্য বিনা মূল্যে আসে না। মেসির জীবনে এসেছে চিকিৎসার সংগ্রাম, এসেছে ব্যর্থতা, এসেছে সমালোচনা। জাতীয় দলের হয়ে তাঁর প্রথম ম্যাচেই লাল কার্ড। তারপর একের পর এক বড় ফাইনালে পরাজয়। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনাল, ২০১৫ কোপা আমেরিকা, ২০১৬ কোপা আমেরিকা—বারবার তিনি দরজার সামনে গিয়ে ফিরে এসেছেন। শেষ পর্যন্ত ২০১৬ সালে ক্লান্ত মেসি বলেছিলেন, জাতীয় দলের হয়ে আর খেলবেন না।

সেই সময় পৃথিবী তাঁকে নিয়ে বিচার বসিয়েছিল। কেউ বলেছিল, ক্লাবের মেসি আর আর্জেন্টিনার মেসি এক নয়। কেউ বলেছিল, বড় ম্যাচে তিনি ব্যর্থ। কেউ বলেছিল, তিনি নেতা নন। কেউ কেউ তো এমনভাবে সমালোচনা করেছিলেন, যেন দেশের সব ব্যর্থতার দায় এই এক লোকের। এটাই মানুষের স্বভাব। দল জিতলে আমরা এগারোজনের কথা ভুলে গিয়ে একজনকে ঈশ্বর বানাই। দল হারলে সেই ঈশ্বরকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করাই।

আমাদের দেশে অবশ্য এই রোগটি একটু বেশি। ফুটবলে দল হারলে কোচ দোষী, গোলরক্ষক দোষী, স্ট্রাইকার দোষী। কিন্তু মাঠ নেই, প্রশিক্ষণ নেই, বয়সভিত্তিক ফুটবল নেই, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেই—এসবের জন্য দায়ী কে? এই প্রশ্নের উত্তর সাধারণত কেউ জানে না। কারণ এগুলো নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়া যায় না। এগুলোতে রাত জেগে পতাকা ওড়ানো যায় না। এগুলো নিয়ে প্রেমিকার সঙ্গে ঝগড়া করা যায় না। তাই আমরা মেসিকে নিয়ে ব্যস্ত থাকি।

মেসি অবশ্য আমাদের এসবের তোয়াক্কা করেননি। তিনি ফিরে এসেছেন। আর ফিরে এসে যা করেছেন, তা প্রায় রূপকথা। কোপা আমেরিকা। ফাইনালিসিমা। তারপর কাতার। কাতার বিশ্বকাপ ছিল যেন মেসির জীবনের মহাকাব্যের শেষ অধ্যায়। আর সেই মহাকাব্যের শেষ দৃশ্যটি যেন কোনো হলিউডের চিত্রনাট্যকারও লিখতে সাহস পেতেন না।

ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ফাইনাল। ৩-৩। মেসি দুই গোল করেছেন। এমবাপ্পে হ্যাটট্রিক করেছেন। আর্জেন্টিনা এগিয়েছে, ফ্রান্স ফিরেছে। আবার আর্জেন্টিনা এগিয়েছে, আবার ফ্রান্স সমতায় ফিরেছে। শেষে টাইব্রেকার। মার্তিনেজ দাঁড়িয়ে আছেন গোলপোস্টে। কোটি মানুষের বুক ধড়ফড় করছে। তারপর আর্জেন্টিনা জিতল। মেসির হাতে উঠল বিশ্বকাপ। সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, পৃথিবীর কোনো গল্প আর এর চেয়ে সুন্দর হতে পারে না।

ছবিঃ অনলাইন থেকে সংগৃহীত

যে ট্রফির অভাব দেখিয়ে মেসিকে সর্বকালের সেরা বলতে অনেকে আপত্তি করেছিলেন, সেই ট্রফিই একদিন তাঁর হাতে এসে উঠল। যেন দীর্ঘদিনের অপবাদ নিজেই এসে ক্ষমা চাইল। কিন্তু জীবন বড় নিষ্ঠুর। জীবন কাউকে চিরকাল নায়ক থাকতে দেয় না।

এবারের বিশ্বকাপেও বয়সকে যেন নিছক একটি সংখ্যা বানিয়ে দিয়েছিলেন মেসি। ৩৯-এর শরীরে আগের সেই দুরন্ত গতি হয়তো নেই, কিন্তু বুদ্ধি, পাস, দৃষ্টি আর গোলের ক্ষুধায় তিনি এখনও তরুণদের সঙ্গে পাল্লা দিয়েছেন। বিশ্বকাপের পাঁচটি ম্যাচে টানা গোল করে শেষ পর্যন্ত টুর্নামেন্টে ৮ গোল করেছেন, পাশাপাশি সৃষ্টিশীলতায়ও ছিলেন আর্জেন্টিনার প্রাণ; প্রায় ২৫টি সুযোগ তৈরি করে সতীর্থদের সামনে গোলের দরজা খুলে দিয়েছেন বারবার। এ যেন সত্যিই ‘বুড়ো হাড়ের ভেল্কি’—শরীর যখন অবসরের কথা বলে, তখন ফুটবল-বুদ্ধি আর প্রতিভা বলে, ‘আরেকটু খেলি!’ 
শেষ পর্যন্ত ৩৯ বছর বয়সে মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায়ের ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁর নিজের কথায়, সিদ্ধান্তটি নিতে তাঁর কষ্ট হয়েছে, কিন্তু সময় এসে গেছে। নতুন প্রজন্মকে জায়গা করে দেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি। এখানেই মেসির মহত্ত্ব। তিনি আঁকড়ে ধরে থাকতে চাননি। তিনি জানেন, প্রত্যেক নায়কেরই একদিন মঞ্চ ছাড়তে হয়। আলো অন্য কারও ওপর পড়তে দিতে হয়।

কিন্তু আমাদের সমস্যা হলো, আমরা কাউকে মঞ্চ ছাড়তে দিতে চাই না। আমরা মৃত নায়ককে জীবিত রাখি, জীবিত নায়ককে দেবতা বানাই, দেবতাকে পতিত করি, তারপর আবার নতুন দেবতা খুঁজি। মেসিও এই পূজার শিকার।

বাংলাদেশে তাঁর জনপ্রিয়তা তো প্রায় ধর্মীয় পর্যায়ের। আর্জেন্টিনার পতাকা কত বাড়ির ছাদে উঠেছে, তার হিসাব হয়তো কোনো সরকারি দপ্তরের কাছে নেই। বিশ্বকাপের সময় এমন দৃশ্য দেখা যায়, মনে হয় আর্জেন্টিনা বুঝি লাতিন আমেরিকায় নয়, নারায়ণগঞ্জের পাশেই কোথাও। মেসি আমাদের। আর্জেন্টিনা আমাদের। মার্তিনেজ আমাদের। এমবাপ্পে হারলে আমাদের আনন্দ। কিন্তু বাংলাদেশের ফুটবলার গোল করলে আমরা কতজন তাঁর নাম মনে রাখি?

মেসি আমাদের প্রায় দুই যুগ ধরে অভাব-অনটন সমস্যা-জর্জরিত বাস্তবতা থেকে পালানোর দরজা খুলে দিয়েছিলেন। দেশের অর্থনীতি খারাপ? মেসি আছে। দাম বাড়ছে? মেসি আছে। রাজনীতিতে অস্থিরতা? মেসি আছে। জীবনে প্রেম নেই? মেসি আছে। বেতন কম? মেসি আছে। বউ রাগ করেছে? আর্জেন্টিনা জিতলে সব ঠিক! একটি গোল কখনও কখনও একটি দেশের মানুষের কয়েক ঘণ্টার দুঃখ ভুলিয়ে দিতে পারে। মেসি সেই কাজটি অসংখ্যবার করেছেন।

তাই তাঁর প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। তবে মেসির বিদায়ের দিনে তাঁকে ভালোবাসার পাশাপাশি নিজেদেরও একটি প্রশ্ন করা দরকার। আমরা কবে এমন একজন মেসি তৈরি করব, যার জন্য অন্য দেশের মানুষ পতাকা ওড়াবে? কবে আমাদের কোনো ফুটবলার এমন খেলবেন যে আর্জেন্টিনার কোনো শিশু তাঁর জার্সি পরে ঘুমাবে? কবে বাংলাদেশের কোনো খেলোয়াড়ের নাম শুনে পৃথিবীর অন্য প্রান্তের মানুষ বলবে, ‘ওহ, বাংলাদেশ!’ আমরা জানি না। সম্ভবত উত্তরটি আরও বহু, বহু বছর দূরে।

তবু আজ মেসিকে বিদায় জানাতে গিয়ে মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথের সেই প্রশ্ন—‘পরাণে ভালোবাসা কেন গো দিলে, রূপ দিলে না যদি বিধি হে!’ আমরা মেসিকে ভালোবাসা দিয়েছি। বিনিময়ে তিনি আমাদের দিয়েছেন স্বপ্ন। আর স্বপ্নের বাজারে এর চেয়ে বড় লেনদেন আর কী হতে পারে?

মেসি এখন মাঠ ছাড়বেন। তাঁর পায়ের জাদু ধীরে ধীরে স্মৃতিতে পরিণত হবে। নতুন ছেলেরা আসবে। নতুন পতাকা উঠবে। নতুন তারকা জন্ম নেবে। কিন্তু আমাদের প্রজন্মের কাছে মেসি থেকে যাবেন এক অদ্ভুত সময়ে জন্ম নেওয়া এক অদ্ভুত মানুষ হিসেবে। যে মানুষটি শিখিয়েছেন, ছোট শরীর বড় স্বপ্নকে আটকাতে পারে না। যে মানুষটি শিখিয়েছেন, বারবার হারলেও ফিরে আসা যায়। যে মানুষটি শিখিয়েছেন, ঈশ্বরের মতো পূজিত হয়েও মানুষ হয়ে কাঁদা যায়। আর সবচেয়ে বড় কথা, তিনি শিখিয়েছেন—রূপকথা বলে কিছু হয়।

শুধু রূপকথারও শেষ পৃষ্ঠা আছে। তাই বিদায়, লিওনেল মেসি। তোমার আন্তর্জাতিক ফুটবল শেষ হতে পারে, কিন্তু আমাদের ফুটবল-কৈশোরের যে অধ্যায় তুমি লিখে দিয়েছ, তার শেষ হবে না। আমরা হয়তো আর তোমাকে বিশ্বকাপের মাঠে দেখতে পাব না। কিন্তু কোনো এক গভীর রাতে পুরোনো কোনো ভিডিওতে তোমার পায়ের কাছে বলটা ছুটতে দেখব। দেখব, তুমি কয়েকজন খেলোয়াড়কে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যাচ্ছ। আর তখন আবার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করবে—অসম্ভব বলে সত্যিই কিছু নেই। কারণ পৃথিবীতে একদিন একজন মেসি ছিল!

মন্তব্য করুন

Logo