Logo

১ ভাদ্র ১৪৩৩

×

Follow Us

ছবিঘর

মেহেদী হকের কার্টুন

ব্যক্তি বা দল নয়, প্রবণতার প্রকাশ

সিরাজুল ইসলাম আবেদ

Icon

সিরাজুল ইসলাম আবেদ

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬, ১০:৩৫ এএম

একটি রাজনৈতিক কার্টুনের আয়ু কখনও কখনও একটি সংবাদ শিরোনামের চেয়েও দীর্ঘ হয়। কারণ সংবাদ আমাদের জানায় কী ঘটেছে, আর কার্টুন আমাদের ভাবতে বাধ্য করে—কেন ঘটেছে, কীভাবে ঘটেছে এবং এর ভেতরে লুকিয়ে থাকা অসংগতি কোথায়। রাষ্ট্র, রাজনীতি, ক্ষমতা, মতাদর্শ কিংবা জনতার আবেগ—কোনোটিই একজন প্রকৃত রাজনৈতিক কার্টুনিস্টের জন্য নিষিদ্ধ অঞ্চল নয়। বরং সেখানেই তার কাজের শুরু।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক কার্টুনের ইতিহাস খুব দীর্ঘ নয়, কিন্তু সাহসী। সেই ধারার গুরুত্বপূর্ণ শিল্পীদের একজন মেহেদী হক। প্রায় তিন দশক ধরে তিনি কার্টুন এঁকে চলেছেন; দৈনিক সংবাদপত্র, সাময়িকী এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই তার রেখা সময়ের সঙ্গে কথোপকথন করেছে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক কার্টুন এঁকেছেন, পাশাপাশি কমিকস, ব্যঙ্গচিত্র ও কার্টুনশিল্পের বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

২০২৪ সালের জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি সন্ধিক্ষণ। সেই সময়ের গণআন্দোলন, রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, মানুষের ক্ষোভ, স্বপ্ন, রক্ত, শোক এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা—সবই শিল্পীদের মতো কার্টুনিস্টদেরও গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। মেহেদী হকও তার ব্যতিক্রম নন। আন্দোলনের দিনগুলোতে তিনি যেমন রাষ্ট্রীয় সহিংসতা, দমননীতি ও ক্ষমতার ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক কার্টুন এঁকেছেন, তেমনি পরবর্তী সময়ে নতুন বাস্তবতার ভেতরেও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ব্যঙ্গ করেছেন, অস্বস্তি সৃষ্টি করেছেন।

সম্প্রতি জুলাইকে কেন্দ্র করে তার একটি কার্টুনকে ঘিরে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। একদল মানুষ মনে করেছেন, সেই কার্টুনে জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যক্তি বা নেতৃত্বকে ব্যঙ্গ করা হয়েছে। মতভেদ, সমালোচনা কিংবা পাল্টা ব্যাখ্যা—এসব গণতান্ত্রিক সমাজের স্বাভাবিক অনুষঙ্গ। কিন্তু মতের জবাব যদি গালি, ব্যক্তিগত আক্রমণ, চরিত্রহনন কিংবা শিল্পীকে ভয় দেখানোর চেষ্টায় পরিণত হয়, তখন সেটি আর শিল্পের সমালোচনা থাকে না; সেটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিসরকে সংকুচিত করার প্রবণতা হয়ে ওঠে।

একজন রাজনৈতিক কার্টুনিস্টের দায় কোনো পক্ষের মুখপাত্র হওয়া নয়। তার দায় হলো ক্ষমতার ভাষা, জনতার উন্মাদনা, রাজনৈতিক ভণ্ডামি এবং সামাজিক বৈপরীত্যকে প্রশ্ন করা। এই প্রশ্ন অনেক সময় ক্ষমতাসীনকে অস্বস্তিতে ফেলে, আবার কখনও আন্দোলনের নায়ককেও। কারণ ব্যঙ্গের লক্ষ্য ব্যক্তি নয়; ব্যঙ্গের লক্ষ্য আচরণ, প্রবণতা, অসঙ্গতি এবং ক্ষমতার রূপ।

মেহেদী হকের ২০২৪ থেকে বর্তমান সময়ের কার্টুনগুলো একসঙ্গে দেখলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—তিনি কোনো একক রাজনৈতিক শিবিরের কার্টুনিস্ট নন। শেখ হাসিনার সরকারের কর্তৃত্ববাদ, রাষ্ট্রীয় দমন, দুর্নীতি কিংবা রাজনৈতিক সহিংসতা যেমন তার তুলিতে এসেছে, তেমনি পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা, আন্দোলনের নেতৃত্ব, ধর্মীয় উগ্রতা, সামাজিক ভণ্ডামি কিংবা জনমতের অসঙ্গতিও তার কার্টুনের বিষয় হয়েছে। তিনি ব্যক্তি নয়, প্রবণতাকে আঁকেন; দল নয়, সময়কে ধারণ করেন।

এখানে মূলত ২০২৪ সালের জুলাই থেকে বর্তমান পর্যন্ত সময়ের উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক কার্টুনগুলো একত্র করা হয়েছে। ঘটনার পরম্পরা ধরে রাখতে ২০১৮ সাল থেকে ২৩ সাল পর্যন্ত সময়েরও কিছু কার্টুন রাখা হয়েছে।
কর্মক্ষেত্র সূত্রে মেহেদী হকের অধিকাংশ কার্টুনই প্রকাশ পেয়েছে ইংরেজি সংবাদ পত্র ‘নিউ এজ’-এ। এ ছাড়াও কিছু পত্রিকা এবং শিল্পীর ফেসবুক পেইজে প্রকাশিত কার্টুনও রয়েছে এখানে। প্রতিটি কার্টুন একটি নির্দিষ্ট দিনের প্রতিক্রিয়া, আবার একই সঙ্গে বৃহত্তর সময়ের দলিলও। কোনো কার্টুনের সঙ্গে একমত হওয়া বাধ্যতামূলক নয়; বরং একটি কার্টুন তার কাজ তখনই সম্পন্ন করে, যখন সেটি দর্শককে ভাবায়, অস্বস্তিতে ফেলে, তর্কের জন্ম দেয়।

আজকের বাংলাদেশে রাজনৈতিক অবস্থান প্রায়ই মানুষের পরিচয়ের একমাত্র মানদণ্ড হয়ে উঠছে। এমন এক সময়ে একজন কার্টুনিস্ট যদি সব পক্ষকেই প্রশ্ন করেন, তবে তিনি প্রায় অনিবার্যভাবেই সব পক্ষেরই সমালোচনার মুখোমুখি হবেন। ইতিহাস বলছে, স্বাধীন শিল্পচর্চার মূল্য প্রায়সই এভাবেই দিতে হয়েছে।

তাই এটি শুধু মেহেদী হকের কার্টুনের অ্যালবাম নয়। এটি একটি অস্থির সময়ের ভিজ্যুয়াল ডায়েরি; যেখানে ক্ষমতা বদলেছে, স্লোগান বদলেছে, নায়ক বদলেছে, কিন্তু প্রশ্ন করার প্রয়োজন বদলায়নি। কারণ রাজনৈতিক কার্টুনের সবচেয়ে বড় শক্তি কোনো পক্ষকে জেতানো নয়; তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—ক্ষমতা, জনপ্রিয়তা কিংবা আবেগ—সবকিছুর ওপর সমানভাবে হাসতে পারা।

সময়ের বিচার শেষ পর্যন্ত আদালতে নয়, ইতিহাসে হয়। আর ইতিহাস যখন তার দলিল খোঁজে, তখন সংবাদপত্রের শিরোনামের পাশে একটি ছোট্ট কার্টুনও অনেক সময় পুরো সময়টাকেই সংজ্ঞায়িত করে।

মন্তব্য করুন

Logo