ছবিঃ প্রথম আলো
প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬, ০৯:২৩ পিএম
সম্প্রতি ‘দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট’-এর সম্পাদকীয়তে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্যের এক চাঞ্চল্যকর ও চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে। নেপাল থেকে বাংলাদেশে আমদানিকৃত প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৮.৩৫ টাকা। পরিসংখ্যান বলছে, এই দর ভারত থেকে বাংলাদেশে আমদানি করা চড়া দামের বিদ্যুতের তুলনায় প্রায় ৭৮% সস্তা! এই বিপুল খরচের ব্যবধান স্পষ্ট করে দেয় যে, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে নেপাল থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানি করা বাংলাদেশের জন্য কতটা জরুরি ও লাভজনক।
নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানি বেশ কয়েকটি কারনে বাংলাদেশের জন্য লাভজনক
বিপুল ব্যয় সংস্থান ও সাশ্রয়
বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত বিদ্যুৎ উৎপাদন ও আমদানির খরচ বাড়ছে, যার বোঝা পড়ছে সাধারণ গ্রাহক ও শিল্পখাতের ওপর। ভারত থেকে বিদ্যুৎ কিনতে যে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হচ্ছে, নেপালের জলবিদ্যুৎ তার চেয়ে প্রায় ৭৮% কম খরচে পাওয়া সম্ভব। এটি দেশের অর্থনৈতিক চাপ অনেকাংশে কমিয়ে আনবে।
সবুজ ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি
নেপালের ৪,২০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুতের প্রায় পুরোটাই পরিবেশবান্ধব জলবিদ্যুৎ। কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং টেকসই উন্নয়নের বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এই জলবিদ্যুৎ বাংলাদেশে ক্লিন এনার্জির চাহিদা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
একক বাজারের ওপর নির্ভরতা হ্রাস
একমাত্র ভারতের ওপর জ্বালানি আমদানির জন্য নির্ভরশীল থাকা বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। নেপালের মতো বিকল্প উৎসের সাথে সরাসরি বা ত্রিপক্ষীয় সংযোগ তৈরি হলে বাংলাদেশের দরকষাকষির শক্তি বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।
কিন্তু ভারতের ভূ-রাজনৈতিক কৌশল ও অসহযোগিতা এক্ষেত্রে বড় বাধা
নেপাল ও বাংলাদেশের মধ্যে বিদ্যুৎ বাণিজ্যের বিশাল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও মাঝখানে ভৌগোলিক বাধা হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে ভারতের শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেনস নেক’। ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে নেপালের বিদ্যুৎ বাংলাদেশে পাঠাতে হলে ভারতীয় গ্রিড ব্যবহার করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। কিন্তু এই সুযোগটিকেই ভারত এক ধরনের ভূ-রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
সীমাবদ্ধ সঞ্চালন অনুমতি
সম্প্রতি নেপাল, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে প্রতীকী মাত্র ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অথচ কাঠমান্ডুর হাজার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উদ্বৃত্ত রয়েছে এবং ঢাকার হাজার হাজার মেগাওয়াটের ঘাটতি রয়েছে। ভারত তার নিজস্ব গ্রিড ব্যবহারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর ও সীমিত সুযোগ দিচ্ছে, যার ফলে বাণিজ্য বাড়ানো যাচ্ছে না।
ভূ-রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা
নেপাল ও বাংলাদেশ সরাসরি লাভজনক বাণিজ্যে লিপ্ত হলে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের একক আধিপত্য বা 'জ্বালানি মোড়লত্ব' বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ভারত চায় বাংলাদেশ তাদের চড়া দামের কয়লা ও জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত বিদ্যুৎ এবং ভারতীয় পাওয়ার প্ল্যান্ট (যেমন- আদানি পাওয়ার) থেকেই বিদ্যুৎ কিনুক।
সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক শর্তাবলী
ভারত নিজস্ব বিদ্যুৎ নীতিমালার মাধ্যমে এমন সব শর্ত জুড়ে দিয়েছে, যেখানে চীনা অর্থায়ন বা চীনা ঠিকাদার দ্বারা নির্মিত নেপালি বিদ্যুত কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এটি কার্যত সরাসরি নেপাল-বাংলাদেশ অবাধ বাণিজ্যের পথ রুদ্ধ করে দেয়।
শেষ কথা
নেপালের বিশাল জলবিদ্যুৎ সম্ভাবনা এবং বাংলাদেশে বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা—এই দুইয়ের মেলবন্ধন পুরো অঞ্চলের অর্থনীতির চিত্র বদলে দিতে পারে। কিন্তু ভারতের ভূ-রাজনৈতিক অসহযোগিতা এবং সঞ্চালন করিডোর নিয়ে অনীহার কারণে সস্তা ও পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বাংলাদেশের জনগণ।
বাংলাদেশের উচিত নেপাল ও আঞ্চলিক সহযোগীদের সাথে সমন্বিত কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে একটি উন্মুক্ত 'ডেডিকেটেড ট্রানজিট করিডোর' বা ত্রিপক্ষীয় নীতি বাস্তবায়নে ভারতকে রাজি করানো, অথবা, ভারত সহযোগিতা না করলে বিকল্প পথ খোঁজা। কেবল তবেই দেশ সস্তা ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের কাঙ্ক্ষিত সুফল লাভ করতে পারবে।
মন্তব্য করুন

