Logo

১৮ ভাদ্র ১৪৩৩

×

Follow Us

ইতিহাসের গায়ে সাম্প্রদায়িক ক্ষোভের আতর

ছবিঃ উইকিপিডিয়া থেকে সংগৃহীত

মত-দ্বিমত

ইশরাত মঞ্জিল, মধুর ক্যান্টিন এবং ভুক্তভোগিতার বয়ানে ১৯৭১-এর পুনর্লিখন

ইতিহাসের গায়ে সাম্প্রদায়িক ক্ষোভের আতর

ড. লুবনা ফেরদৌসী

ড. লুবনা ফেরদৌসী

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৩৯ পিএম

ইতিহাসের নতুন নিয়ম বোধহয় খুব সহজ। আগে নিজের পছন্দের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তটি নিন, তারপর তিনশ বছরের ইতিহাস থেকে সুবিধামতো চার-পাঁচটি ঘটনা তুলে আনুন, এনে একটা ভারী ইংরেজি শব্দ, ধরুন, “genealogical site”, যোগ করে দিন। আর মাঝখানের একশ বছর বাদ পড়ে গেলে চিন্তার কিছু নেই, সেখানে “মুসলমানদের অপমান” বসিয়ে দিলেই causal explanation সম্পূর্ণ।

ইশরাত মঞ্জিল নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থান। তার ইতিহাস সংরক্ষণ করা উচিত, যথাযথভাবে স্মরণ করা উচিত, এমনকি তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরে মিউজিয়াম বা হ্যারিটেজ সাইট করার দাবিও একেবারে যৌক্তিক হতে পারে। 

কিন্তু এই পোস্টটাতে সমস্যা ইশরাত মঞ্জিলের গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করায় না; সমস্যা হলো সেই ইতিহাসকে এমনভাবে সাজানো, যেন জায়গাটি ছিল ‘মুসলমান রাজনৈতিক জাগরণের পবিত্র ভূমি’, আর ১৯৭১-এর পর মুক্তিযুদ্ধের সরকার পরিকল্পিতভাবে সেখানে মধুর ক্যান্টিন বানিয়ে মুসলমানদের ইতিহাসের ওপর ‘পান খেয়ে থুতু’ ফেলেছে। এই ড্রামাটিক গল্পটির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, ইতিহাস নিজেই গল্পটির সঙ্গে সহযোগিতা করছে না।

ছবিঃ অনলাইন থেকে সংগৃহীত

আর তার চেয়েও বড় সমস্যা হলো, পোস্টটি ইশরাত মঞ্জিল, শাহবাগের বৃহত্তর নবাব এস্টেট এবং বর্তমান মধুর ক্যান্টিনকে প্রায় একই স্থানিক পরিসর হিসেবে ব্যবহার করেছে। ইতিহাস এখানে শুরুতেই একটু স্থাপত্যগত দুর্ঘটনায় পড়েছে।

প্রথমে ভবনটি ঠিক করে নেওয়া যাক। বাংলাপিডিয়ায় খুব স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ইশরাত মঞ্জিল ছিল শাহবাগের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দোতলা প্রাসাদগুলোর একটি এবং ১৯০৬ সালের অল ইন্ডিয়া মুসলিম এডুকেশন সোসাইটি কনফারেন্সের প্রতিনিধিদের সেখানে অভ্যর্থনা জানানো হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান মধুর ক্যান্টিনের ভবনটি ছিল নবাবদের শাহবাগ বাগানবাড়ি কমপ্লেক্সের জলসাঘর বা স্কেটিং প্যাভিলিয়ন। ইশরাত মঞ্জিলের স্থানে পরে হোটেল শাহবাগ নির্মিত হয়, ১৯৬৫ সালে ভবনটি আইপিজিএমআর-এর জন্য সরকারি অধিগ্রহণে আসে এবং মুক্তিযুদ্ধের পর প্রতিষ্ঠানটি সেখানে কার্যক্রম স্থানান্তর করে। সুতরাং, “মুক্তিযুদ্ধের সরকার ইশরাত মঞ্জিলকে মধুর ক্যান্টিন বানিয়ে মুসলমানদের অপমান করল”, এই গল্পটি শুরুতেই ভুল ভবনে ঢুকে পড়েছে।


মধুর ক্যান্টিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৬৭
ছবিঃ রশিদ আহমেদ 

ঘটনাক্রমও গল্পটিকে বাঁচাতে পারছে না। মধুর ক্যান্টিন ১৯৭১ সালের পর মুক্তিযুদ্ধের সরকারের হঠাৎ আবিষ্কার না। মধুসূদন দে-র পরিবারের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিনের সম্পর্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুর যুগ থেকেই। আদিত্য চন্দ্র দে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে ক্যাম্পাসে খাবারের ব্যবসা শুরু করেন ১৯২১ সালে। পরে তাঁর ছেলে মধুসূদন দে ১৯৩০-এর দশক থেকে এর দায়িত্বে ছিলেন। মধুর ক্যান্টিন পাকিস্তান আমলেই রাজনৈতিক কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল।

পরবর্তী সময়ে ক্যান্টিনটি বর্তমান জায়গায় স্থানান্তরিত হয়। আর বর্তমান ভবনটির নিজের ইতিহাসও দারুণ। বর্তমান মধুর ক্যান্টিনের ভবনটিকে বাংলাপিডিয়া জলসাঘর বা Skating Pavilion হিসেবে এবং দ্যা ডেইলি স্টারের ঐতিহাসিক বিবরণ এটাকে Durbar Hall, skating rink ও ballroom হিসেবে বর্ণনা করেছে। সুতরাং, “মুসলিম রাজনৈতিক জাগরণের পবিত্র দরবার” বলার আগে এটাও মনে রাখা ভালো যে একই স্থাপত্যে নবাবরা রাজনৈতিক আলোচনা যেমন করেছেন, স্কেটিংও করেছেন।

ভাষা আন্দোলন, ১৯৪৯ সালের বিশ্ববিদ্যালয় কর্মচারীদের আন্দোলন এবং ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানসহ বিভিন্ন আন্দোলনে এই ক্যান্টিন ছাত্ররাজনীতির মিটিং পয়েন্ট ছিল। তারপর আসে ১৯৭১।

মধুসূদন দেকে মুক্তিযুদ্ধের সরকার এনে এখানে বসায়নি। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ২৫-২৬ মার্চের হত্যাযজ্ঞে তাঁর বাড়িতে হামলা চালায়; তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যা করে এবং তাঁকে ধরে নিয়ে জগন্নাথ হলের মাঠে হত্যা করে। যুদ্ধের পরে তাঁর ছেলে অরুণ কুমার দে ক্যান্টিন পরিচালনার দায়িত্ব নেন। যে মধুর ক্যান্টিনকে এখন “মুসলমানদের ইতিহাস অপমান করার মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী প্রকল্প” হিসেবে হাজির করা হচ্ছে, সেই ক্যান্টিনের মালিক নিজেই পাকিস্তানি সামরিক হত্যাযজ্ঞের শিকার। ইতিহাস মাঝে মাঝে প্রোপাগান্ডার প্রতি সত্যিই নির্মম।

“এখানেই বঙ্গভঙ্গের দাবি করা হয়”, এই দাবিটিও ক্রনোলজির পরীক্ষায় টেকে না। বাংলাপিডিয়া দেখাচ্ছে, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ছিল দীর্ঘদিনের colonial administrative restructuring-এর ফল এবং লর্ড কার্জনের সরকারের উদ্যোগে কার্যকর হয়েছিল। বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হয় ১৬ অক্টোবর ১৯০৫।পরিকল্পনাটি ব্রিটিশ প্রশাসনের ভেতরে আরও আগে থেকে বিবেচিত হচ্ছিল; ১৯০৩ সালে প্রস্তাব সামনে আসে, ১৯০৪ সালে লর্ড কার্জন পূর্ববঙ্গ সফর করেন এবং ১৯০৫ সালের জুলাইয়ে চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত ঘোষিত হয়। 

এমনকি নবাব সলিমুল্লাহও প্রথমদিকে প্রস্তাবটির সমালোচনা করেছিলেন; বৃহত্তর পরিকল্পনার সুবিধাগুলো স্পষ্ট হওয়ার পর মুসলিম নেতৃত্বের বড় অংশ বঙ্গভঙ্গের সমর্থক হয়। অথচ আলোচিত ঢাকার সম্মেলন ১৯০৬ সালের। Genealogy দিয়ে অনেক কিছু করা যায়, কিন্তু ১৯০৬ কে ১৯০৫-এর আগে পাঠানো যায় না।

বঙ্গভঙ্গের প্রকৃত ইতিহাস বরং আরও আকর্ষণীয়। পূর্ববঙ্গ দীর্ঘদিন কলকাতাকেন্দ্রিক প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর তুলনায় অবহেলিত ছিল; নতুন প্রদেশে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় মুসলিম সমাজের বড় অংশ সেখানে শিক্ষা, প্রশাসন ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখেছিল। একই সঙ্গে কলকাতার শিক্ষিত হিন্দু মধ্যবিত্তের বড় অংশ বঙ্গভঙ্গকে বাংলা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের ওপর আঘাত হিসেবে দেখেছিল। কিন্তু ছবিটা নিখুঁত ‘হিন্দু বনাম মুসলমান’ও ছিল না। 

বাংলাপিডিয়ার বিশদ ইতিহাসে দেখা যায়, শুরুতে মুসলিমদের মধ্যেও বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা ছিল এবং খাজা আতিকুল্লাহসহ কয়েকজন বিশিষ্ট মুসলিম নেতা পরবর্তীতেও বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই জটিলতাটাই ইতিহাস। আর জটিলতাটা প্রোপাগান্ডার সবচেয়ে বড় শত্রু।

একই সমস্যা “এখানেই মুসলিম লীগের জন্ম, যার ফলে ভারত ভাগ”, এই বাক্যেও। “ভারত ভাঙার প্ল্যান” কথাটা একই উদ্দেশ্যবাদী ফাঁদ। ঢাকায় ১৯০৬ সালে অল-ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা উপমহাদেশের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কিন্তু মুসলিম লীগ জন্মাল, তাই ভারত ভাগ হলো, এভাবে ৪১ বছরের ইতিহাসকে একটি সরল তীরচিহ্নে নামিয়ে আনা হলো retrospective history বা পশ্চাদ্দৃষ্ট ইতিহাস। ১৯০৬ সালের মানুষকে ১৯৪৭ সালের পরিণতি জানিয়ে দেওয়া যায় না। ইতিহাসের চরিত্রদের কাছে আমাদের মতো উইকিপিডিয়ার শেষ প্যারাগ্রাফ ছিল না।

১৯০৬ সালের লীগের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আর ১৯৪০-এর লাহর প্রস্তাব পরবর্তী পাকিস্তান আন্দোলন এক জিনিস ছিল না। মাঝখানে রয়েছে পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী, লাখনৌ চুক্তি, খিলাফত, প্রাদেশিক রাজনীতি, ১৯৩৭-এর নির্বাচন, কংগ্রেস-লীগ দ্বন্দ্ব, জিন্নাহর রাজনৈতিক রূপান্তর, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ১৯৪০-এর দশকের গণ রাজনীতি এক বিশাল ইতিহাস। ফলাফল জানা আছে বলে অতীতের প্রতিটি ঘটনাকে সেই ফলাফলের অনিবার্য পূর্বধাপ বানিয়ে দেওয়া ইতিহাসচর্চা বলে না; একে উদ্দেশ্যবাদী ইতিহাস বলে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও মুসলিম নেতৃত্বের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, ১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারি নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী ও এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের সঙ্গে দেখা করে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানায়। ২ ফেব্রুয়ারি সরকার এ বিষয়ে ঘোষণা দেয়; ২৭ মে নাথান কমিটি গঠিত হয়। এমনকি নাথান কমিটিতেই মুসলিম ও হিন্দু উভয় সদস্য ছিলেন: রাশবেহারী ঘোষ , এস . সি . বিদ্যাভূষণ , ললিত মোহন চ্যাটার্জি , আনন্দ চন্দ্র রায় এর পাশাপাশি নওয়াব আলী চৌধুরী , নওয়াব সিরাজুল ইসলাম, মুহাম্মদ আলী প্রমুখ।

১৯১৭ সালে নওয়াব আলী চৌধুরী Imperial Legislative Council-এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য প্রস্তাব তোলেন; পরে বিষয়টি স্যাডলার কমিশনের বিবেচনায় যায়। ১৯২০ সালে Dacca University Act পাস হওয়ার পর ১৯২১ সালের ১ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা শুরু করে। পূর্ববঙ্গের মুসলিম নেতৃত্বের অবদান বাস্তব এবং গুরুত্বপূর্ণ। তাদের কৃতিত্ব প্রতিষ্ঠা করার জন্য কাল্পনিক অপমানের ইতিহাস বানানোর প্রয়োজন নেই। সত্য ইতিহাসই যথেষ্ট শক্তিশালী।

সমস্যা শুরু হয় যখন সেই সত্য থেকে একটি সম্পূর্ণ আলাদা গল্প বানানো হয়:  “মুসলমানদের রাজনৈতিক জাগরণের এই পবিত্র জায়গাটিকে ১৯৭১ এর পরে মুক্তিযুদ্ধের সরকার পান-সিগারেটের দোকান, মধুর ক্যান্টিন বানিয়েছে” এবং তারপর লেখক নিজেই সরকারের মনের কথাও লিখে দেন: “যেখানে বসে তোরা ভারত ভাঙার প্ল্যান করেছিলি, সেখানে আমরা এখন বিড়ি খেয়ে ছাই ফেলি।” কিন্তু ইতিহাসে ঘটনার পাশাপাশি তারিখও থাকে।

ইতিহাসে কালানুক্রম শুধু তারিখের ব্যাপার না।কালানুক্রম কার্যকারণ সম্পর্ককে রক্ষা করে। কোন ঘটনা আগে, কোনটি পরে, কোন রাজনৈতিক ধারণা কখন তৈরি হলো, কখন বদলালো, এগুলো বাদ দিলে ইতিহাস খুব দ্রুত মাইথোলজি হয়ে যায়।
এখানে একটা সত্যিকারের ইতিহাস আছে। কিন্তু এই পোস্ট সেই ইতিহাসকে “মুসলমানদের পবিত্র রাজনৈতিক স্পেস বনাম মুক্তিযুদ্ধের মুসলিম-বিদ্বেষী রাষ্ট” এই নতুন দ্বৈত বিভাজনে ঢুকিয়ে দিয়েছে।

আর এখানেই ‘genealogical site’ কথার আসল আইরনি। সত্যিকারের genealogy করলে জায়গাটির শুধু নিজের পছন্দের পূর্বপুরুষদের রাখা যায় না। তাহলে শাহবাগের নবাবি জলসাঘরের ইতিহাসও রাখতে হবে, মুসলিম শিক্ষাসংস্কারের ইতিহাসও রাখতে হবে, মুসলিম লীগও থাকবে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাও থাকবে। 

কিন্তু তারপর থামা যাবে না…….
ভাষা আন্দোলন থাকবে, ঊনসত্তর থাকবে, মধুসূদন দে থাকবেন, ২৫ মার্চ থাকবে, মুক্তিযুদ্ধ থাকবে, পরবর্তী স্বৈরাচারবিরোধী ছাত্ররাজনীতিও থাকবে। Genealogy মানে ইতিহাসকে নিজের সুবিধামতো ১৯০৬ সালে ফ্রিজ করে রাখা না।
যার কারণে “genealogical site” যেটাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর্গুমেন্ট হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হচ্ছে পোস্টটাতে আমার কাছে সেটাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে না। আসল পলিটিক্স এই লাইনে- “মুসলমানদের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাকে অপমানিত করা।”

এবং ঠিক এই জায়গাতেই ইতিহাসভিত্তিক যুক্তি শেষ হয়ে পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি শুরু হয়েছে। একটা পুরোনো স্থাপনার ব্যবহার বদলেছে। অতএব মুসলমানদের অপমান করা হয়েছে। একটা ক্যান্টিন সেখানে রাজনৈতিক গুরুত্ব অর্জন করেছে, অতএব মুক্তিযুদ্ধের রাষ্ট্র মুসলিম ইতিহাসের ওপর প্রতিশোধ নিয়েছে। 

কিন্তু মাঝখানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটি কোথায়? অভিপ্রায়ের প্রমাণ কোথায়? কোন সরকারি নথিতে বলা হয়েছে এই পরিবর্তনের উদ্দেশ্য মুসলিম ইতিহাসকে অপমান করা? কোন ক্যাবিনেট পেপার? কোন গেজেট? কোন নথিপত্র? 
কোনো প্রমাণ ছাড়া একটা গোটা রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য আবিষ্কার করে ফেলা ফ্যাব্রিকেশন, মনগড়া উদেশ্য আরোপ।

By A.M.R. - Own work, CC BY 2.5, https://commons.wikimedia.org/w/index.php?curid=1069781

তবে এটা ভুক্তভোগিতার রাজনীতির খুব পরিচিত ব্যাকরণ। প্রথমে অতীতের একটি বাস্তব বঞ্চনার অভিযোগ বা ক্ষতি নির্বাচন করুন। তারপর তার চারপাশের জটিল ইতিহাস সরিয়ে ফেলুন। এরপর ঘটনাটিকে একটি গোটা ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপমান হিসেবে পুনর্গঠন করুন। সবশেষে বর্তমান প্রজন্মকে বলুন, “দেখো, তোমাদের ইতিহাসকে ইচ্ছাকৃতভাবে অপমান করা হয়েছে।” তখন হেরিটেজ আর হেরিটেজ থাকে না; সেটা অভিযোগ তৈরির রাজনৈতিক অবকাঠামো হয়ে ওঠে।
মুক্তিযুদ্ধের সরকার নাকি ঢাকায় ‘২০৮ মুসলমান জাতীয় বীরের’ নামে থাকা রাস্তা, লেন ও সরণীর নাম পরিবর্তন করেছে। এত নির্দিষ্ট একটি সংখ্যা দেখলে আমার ঐতিহাসিকের সহজতবোধ (historian instinct) একটু অন্যভাবে কাজ করে। আমি প্রথমে বিস্মিত হই না, আমি ফুটনোট খুঁজি।

২০৮ জন কারা? ২০৮টি রাস্তার আগের নাম কী ছিল? নতুন নাম কী রাখা হয়েছিল? কোন বছরে পরিবর্তন করা হয়েছিল? কোন পৌরসভা বা সরকারি গেজেটে সিদ্ধান্তটি আছে? এবং নামগুলো কি সত্যিই তাঁদের মুসলমান পরিচয়ের কারণে পরিবর্তন করা হয়েছিল?

কারণ এখানে দুটি সম্পূর্ণ আলাদা প্রস্তাবনা একসঙ্গে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এক, স্বাধীনতার পরে পাকিস্তান আমলের বা ঔপনিবেশিক আমলের বিভিন্ন রাস্তার নাম পরিবর্তন হয়েছিল। দুই, সেই নাম পরিবর্তনের উদ্দেশ্য ছিল “মুসলমান জাতীয় বীরদের” স্মৃতি মুছে ফেলা। প্রথমটি সত্য হলেও দ্বিতীয়টি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সত্য হয় না। দ্বিতীয় দাবিটির জন্য আলাদা করে অভিপ্রায়ের প্রমাণ (evidence of intent) প্রয়োজন।

স্বাধীনতার পরে রাষ্ট্রের স্থান-নাম পরিবর্তন কোনো বাংলাদেশি ব্যতিক্রমও না। নতুন রাষ্ট্রগুলো প্রায় নিয়মিতভাবেই কলোনিয়াল এবং পূর্ববর্তী রেজিম এর symbolic geography পুনর্গঠন করে। 

ভারত করেছে, পাকিস্তান করেছে, আফ্রিকার পোস্টকলোনিয়াল রাষ্ট্রগুলো করেছে, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার পরে পূর্ব ইউরোপ করেছে। বাংলাদেশও পাকিস্তানি রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত বহু নাম পরিবর্তন করেছে। সেই নাম পরিবর্তনের রাজনীতি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করা যায়, কোন স্মৃতি রাখা হলো, কোনটি বাদ পড়ল, কেন পড়ল, সেটা গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার বিষয়। কিন্তু উপনিবেশমুক্তি বা রেজিম চেঞ্জের নাম পরিবর্তনকে প্রমাণ ছাড়া “মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ” বলা সম্পূর্ণ অন্য দাবি।
এখানে একটা ধারণাগত চালাকিও লক্ষ্য করার মতো। ‘পাকিস্তানি’, ‘মুসলিম লীগপন্থী’, ‘ঔপনিবেশিক আমলের মুসলিম অভিজাত’ এবং ‘মুসলমান’, চারটি আলাদা ঐতিহাসিক শ্রেণিকে এক শব্দে গলিয়ে দেওয়া হচ্ছে: মুসলমান।

ফলে কোনো পাকিস্তানি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নাম সরানো হলে সেটি হয়ে যায় ‘একজন মুসলমান জাতীয় বীরের নাম মুছে দেওয়া’; কোনো নবাবি স্থাপনার ব্যবহার বদলালে হয়ে যায় ‘মুসলমানদের ঐতিহাসিক স্থান অপমান’; পাকিস্তানবিরোধী ছাত্ররাজনীতির স্মৃতি সেখানে জায়গা পেলে হয়ে যায় “মুসলিম ইতিহাসের ওপর বিড়ির ছাই”।

এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ Rhetorical maneuver বা বক্তব্য উপস্থাপনের কৌশল। কারণ একবার পাকিস্তান, মুসলিম লীগ, মুসলিম এলিট এবং মুসলিম পরিচয়কে একই ঐতিহাসিক শ্রেণি বানিয়ে ফেলতে পারলে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিচ্ছেদকেও ধীরে ধীরে ‘মুসলমানদের বিরুদ্ধে’ সংঘটিত একটি সাংস্কৃতিক প্রকল্প হিসেবে পুনর্লিখন করা সম্ভব হয়।
বাংলাদেশের জন্ম পাকিস্তানের মুসলমানদের বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধের মাধ্যমে হয়নি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল পাকিস্তানি রাষ্ট্র ও সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে, যে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াই করা বাঙালিদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান ছিলেন। তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এম মনসুর আলী, এ এইচ এম কামারুজ্জামান, এম এ জি ওসমানী মুসলমান ছিলেন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে নিহত অসংখ্য বাঙালি মুসলমান ছিলেন। ভাষা আন্দোলন ও ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের ছাত্র-জনতার বড় অংশও মুসলমান ছিলেন। তাঁরা কি মুসলমানদের ‘বংশানুক্রমিকের’ বাইরে?

তাহলে ‘মুসলমানদের ঐতিহাসিক জায়গা’ একদিকে আর ‘মুক্তিযুদ্ধের সরকার’ অন্যদিকে, এই দ্বৈততা দাঁড় করাতে গেলে মাঝখান থেকে বাঙালি মুসলমানের বিশাল রাজনৈতিক ইতিহাস, তাঁদের মুক্তিযুদ্ধের এজেন্সিও অদৃশ্য হয়ে যায়।
যে ভুক্তভোগিতার বয়ান মুসলমানদের ইতিহাস ‘রক্ষা’ করতে এসেছে, প্যারাডক্সিক্যালি সেটিই বাঙালি মুসলমানদের বিশাল একটা ইতিহাস মুছে ফেলছে।

এ কারণেই স্মৃতির ইতিহাস নিয়ে কাজ করতে গেলে একটা পার্থক্য অত্যন্ত জরুরি: স্মৃতি হারানো আর স্মৃতিকে ইচ্ছাকৃতভাবে অপমান করা এক জিনিস না। কোনো ঐতিহ্যবাহী কাঠামো অবহেলায় নষ্ট হয়ে যেতে পারে। নগরায়ণের কারণে তার ফাংশন বদলাতে পারে। রাষ্ট্র কোনো সময় একটি ঐতিহাসিক স্তরকে অন্যটির তুলনায় বেশি গুরুত্ব দিতে পারে। কিন্তু সেখান থেকে ‘রাষ্ট্র মুসলমানদের অপমান করতে চেয়েছিল’ বলতে গেলে প্রবণতাটির জন্য  প্রমাণ প্রয়োজন।

আর সেই জায়গাতেই “যেখানে বসে তোরা ভারত ভাঙার প্ল্যান করেছিলি, সেখানে আমরা এখন বিড়ি খেয়ে ছাই ফেলি”, বাক্যটির চিন্তাগত সমস্যা সবচেয়ে স্পষ্ট। বাক্যটি ক্যাচি, উসকানিমূলক এবং ফেসবুক-ফ্রেন্ডলি। শুধু একটাই সমস্যা, মুক্তিযুদ্ধের সরকার কথাটা বলেছে এমন কোনো এভিডেন্স নাই।

নিজে একটি সংলাপ লিখলাম। সেটি রাষ্ট্রের মুখে বসালাম।
তারপর নিজের লেখা সংলাপকেই রাষ্ট্রের মুসলিমবিদ্বেষী তৎপরতার এভিডেন্স বানালাম। এটা ইতিহাসচর্চা হলে ঐতিহাসিক সংরক্ষণাগারের (historical archive) কাজ সত্যিই অনেক সহজ হয়ে যেত।

এই পোস্টটির আসল রাজনৈতিক তাৎপর্য হল একটি বৃহত্তর বয়ান তৈরিতে। সেই বয়ান বলে: মুসলমানরা একসময় রাজনৈতিকভাবে জেগেছিল; তারা প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছিল; তারপর একটি ভারতঘেঁষা বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র এসে সেই মুসলিম অতীত মুছে দিয়েছে, অপমান করেছে, তার জায়গায় নিজের কালচারল সিম্বল বসিয়েছে।

এই গল্পটি প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে ১৯৭১ এর অর্থও বদলে যায়। তখন মুক্তিযুদ্ধ আর সামরিক দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক অধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণের সংগ্রাম থাকে না; সেটিকে ধীরে ধীরে একটি মুসলিম রাজনৈতিক উত্তরাধিকার থেকে বিচ্যুতি হিসেবে পড়ানো যায়।

তখন দ্বন্দ্ব আর পাকিস্তানি সামরিক রাষ্ট্র বনাম বাঙালির গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট নয়। দ্বন্দ্ব হয়ে যায়, ‘মুসলিম অতীত’ বনাম ‘বাঙালি সংস্কৃতি’। এটাই ইতিহাসের নির্বাচিত ব্যবহারের রাজনৈতিক শক্তি। কিন্তু বাস্তব ইতিহাস এত সুন্দর দ্বৈততা মানে না। একজন বাঙালি মুসলমান একই সঙ্গে মুসলমান হতে পারেন, বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলন করতে পারেন, পাকিস্তান আন্দোলনের কোনো পর্যায়কে সমর্থন করতে পারেন, আবার কয়েক দশক পরে পাকিস্তানি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেও অস্ত্র ধরতে পারেন। মানুষের রাজনৈতিক পরিচয় ইতিহাসের সঙ্গে বদলায়। এই পরিবর্তনটাই ইতিহাস।

ইশরাত মঞ্জিলের ইতিহাস সংরক্ষণ করুন, জাদুঘর বানান। মুসলিম লীগের জন্মের ইতিহাসও সংরক্ষণ করুন। নবাব সলিমুল্লাহর ভূমিকা যথাযথভাবে লিখুন। পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের শিক্ষাগত ও রাজনৈতিক বঞ্চনার ইতিহাসও বলুন। এগুলো বাংলাদেশের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। 
কিন্তু তারপর ১৯৪৮ ও বলুন। ১৯৫২ বলুন। ১৯৬৯ বলুন।
মধুসূদন দে-কে বলুন। ২৫ মার্চ বলুন। ১৯৭১ বলুন।

যে বয়ান ১৯০৬ সালের স্মৃতিকে পবিত্র করে, কিন্তু ১৯৫২, ১৯৬৯ ও ১৯৭১ এর স্মৃতিকে “পান-সিগারেট আর থুতু”য় নামিয়ে আনে, সেটা genealogy করছে না। সেটা ইতিহাসের পারিবারিক অ্যালবাম থেকে নিজের পছন্দের রাজনৈতিক পূর্বপুরুষদের রেখে বাকিদের মুখ কাঁচি দিয়ে কেটে ফেলছে।

এটা ইতিহাস উদ্ধার না, ইতিহাস দখল। অতীতকে বর্তমানের সাম্প্রদায়িক ক্ষোভের কাঁচামাল বানানো। আর ইতিহাসের গায়ে যতই তাত্ত্বিক ইংরেজি শব্দের আতর মাখানো হোক, selective memory, victimhood আর প্রোপাগান্ডার দুর্গন্ধ তাতে ঢাকা পড়ে না।

মন্তব্য করুন

Logo