মাহতাব উদ্দীন আহমেদ
প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৬, ০১:৫২ পিএম
গণসংহতি আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য এবং বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের সাবেক সভাপতি ফিরোজ আহমেদের গত ১৯ জুলাই দৈনিক প্রথম আলোয় ‘চব্বিশের কাঠগড়ায় প্রগতিশীল রাজনীতি’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখেন। লেখাটি নিয়ে ইতোমধ্যেই বিভিন্ন পত্রিকায় লিখিতভাবে কিংবা কেউ পডকাস্টে, কেউ সমাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। উভয়পক্ষের বক্তব্য পর্যালোচনা করে মাহতাব উদ্দীন আহমেদ-এর এই লেখার অবতারণা।
এটা পরিস্কার ফিরোজ আহমেদ সুনির্দিষ্ট কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সুনির্দিষ্ট কয়েকটি ভগ্নাংশ নিয়ে সমালোচনা করার বদলে পুরো প্রগতিশীল রাজনীতিকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়ে একটা কাণ্ডজ্ঞানহীন কাজ করেছেন। এটা ইচ্ছাকৃত নাকি অনিচ্ছাকৃত সেই আলাপ এখানে অবান্তর। মানস চৌধুরী যথার্থই বলেছেন যে এটার পরিণতি কি সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। অভিপ্রায় না। পরিণতি হল এটাই যে ফিরোজ আহমেদের ওই লেখা স্রেফ ডানপন্থীদেরকেই শক্তিশালী করায় নিয়োজিত হয়েছে। তার লেখায় দুই একটা বিষয়ে যে সারবত্তা নেই তা নয়। আছে। কিন্তু তিনি এত বড় বড় ভুল তথ্যে ভরা, অতিসরলীকৃত লেখা লিখেছেন যে তার লেখায় সামান্য যতটুকু সারবত্তা ছিল সেটাও এখন অপ্রধান হয়ে পড়েছে।
কিন্তু সমস্যা হল বেশিরভাগ প্রতিক্রিয়াতেই যেভাবে ডিফেন্ড করা হয়েছে গণঅভ্যুত্থানে বামপন্থীদের বা প্রগতিশীলদের ভূমিকার, সেটিও অত্যন্ত অসম্পূর্ণ। সংগঠন করা বামপন্থীদের প্রত্যেকেই বামপন্থী দলগুলো কি কি করেছে তার ফিরিস্তি দিয়েই ক্ষান্ত হয়েছেন। দেখা যাচ্ছে, ফিরোজ আহমেদ কিংবা তার লেখার প্রতিক্রিয়া দেয়া বিভিন্ন সংগঠনের সদস্য বামপন্থী বন্ধুরা উভয়পক্ষই প্রগতিশীল রাজনীতি তথা খোদ রাজনীতি জিনিসটার একটা খুবই সংকীর্ণ ধারণার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছেন। উভয়পক্ষই রাজনীতি বলতে কেবল সংগঠন যারা করে তাদের ভূমিকাকেই প্রধান বিবেচনা করেছেন। অথচ রাজনীতি বিষয়টা এতটা সংকীর্ণ না। রাজনীতির দুইটা অংশ থাকে। একটা অংশ হল চিন্তা-আইডিয়া-বক্তব্য বা এজেন্ডা। আরেকটা হল মাসল পাওয়ার বা সাংগঠনিক শক্তি। এমন হওয়ার কোন আবশ্যকতা নেই একই মতাদর্শের রাজনীতির এই দুই অংশই একই সময়ে সমানভাবে শক্তিশালী থাকবে। বরং আমদের দেশে পরিস্থিতিটা উল্টো বামপন্থী বা প্রগতিশীল রাজনীতির ক্ষেত্রে।
এখানে বামপন্থী বা প্রগতিশীলদের সবচেয়ে বড় অংশই কোন বামদল করেন না বর্তমানে। এই মানুষেরা হয়তো কোন এককালে কোন সংগঠন করতেন, কিংবা কখনোই নানান কারণে কোন দলের সদস্য হন নাই। কিন্তু তাতেই বামপন্থীদের এই সবচেয়ে বড়ো অংশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, দর্শন প্রচার থেমে নেই। কখনোই ছিল না। এই দলহীন বামপন্থীদের অসংগঠিত মূল ফোর্সসহ মাসল পাওয়ারহীন সংগঠিত বামপন্থীদের যেসব অংশ আছে তাদের সকলের কাজের কারণেই জনমানসের ভিতরে বামপন্থী চিন্তার শেকড় আসলে অনেক গভীর, কিন্তু সমস্যা হল বেশিরভাগ মানুষ তার চিন্তাধারায় যে বামপন্থী চিন্তার ছাপ আছে সেটা টের পান না। আরও পরিস্কার করে বললে বলতে হয় যে তাকে টের পেতে দেয়া হয় না। তার কাছে বক্তব্যটা যায় ঠিকই। কিন্তু সেই বক্তব্য আসলে কাদের সেটা আর তাকে জানতে দেয়া হয় না।
একই রকমভাবে সংগঠন করা বামপন্থীরা বা প্রগতিশীলরা নিজেরাও সবসময় এতটা সচেতন থাকেন না যে জনমানসের মধ্যে থাকা কোন কোন বক্তব্যটা আসলে বামধারার বক্তব্য। কিন্তু তাতেই বামপন্থা বা প্রগতিশীলতার শেকড়টা নাই হয়ে যায় না। শেকড়টা নাই হয়ে যায় না বলেই বাংলাদেশের এমন কোন সফল গণআন্দোলন বা গণঅভ্যুত্থান নেই যেটা বামপন্থীদের সমর্থন ছাড়া হয়েছে। বামপন্থী চিন্তার মানুষদের সমর্থন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবারের অভ্যুত্থানেও। যদি তারা না থাকতো তাহলে এই আন্দোলনকে বিএনপি জামাতের আন্দোলন বলে অতীতের মতোই সাইজ করে দিতে আওয়ামী লীগ পারত। পারে নাই তার একমাত্র কারণ বামপন্থী চিন্তা কিংবা প্রগতিশীল চিন্তার মানুষদের অংশগ্রহণ। কিন্তু এই যে বেশিরভাগ মানুষ কোনটা বামপন্থী চিন্তা এই ব্যাপারে অবগত নন, তারই সুযোগ নেয় ডানপন্থীরা। তারা বামপন্থীদের বক্তব্য, ধারণাগুলোকে চুরি করে এবং নিজেদের মাসল পাওয়ার দিয়ে সেটার বিকৃত ব্যাখ্যা তৈরি করে।
একটু দেখা যাক গণঅভ্যুত্থানের সময়কার সবচেয়ে জনপ্রিয় ধারণাগুলোর মধ্যে কোনগুলো আসলে বামপন্থী চিন্তা:
• বৈষম্য নিরসনের দাবি– একটা সলিড বামপন্থী চিন্তা।
• ফ্যাসিবাদের উচ্ছেদ– ফ্যাসিবাদ শব্দটারে এদেশে পরিচিতই করিয়েছে এদেশের বামপন্থীরা।
• ভারতের রাষ্ট্রীয় আগ্রাসনের বিরোধিতা – এইটারে সবচেয়ে স্পেসিফিকভাবে নিষ্ঠার সাথে একটা ন্যারেটিভ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে প্রথম বামপন্থীরাই, যেটাকে বিকৃত করে নিছক ভারতবিদ্বেষের ন্যারেটিভ পরবর্তীতে সাজায় ডানপন্থীরা।
• বিকল্প কে, তুমি, আমি, আমরা – অর্থাৎ জনগণ। এটাও সলিড বামপন্থী চিন্তা।
• দেশটা কারো বাপের না – পরিস্কার বামপন্থী চিন্তা
• রাষ্ট্র সংস্কার - এটাও বামপন্থী চিন্তারই ছোট অংশ। কারণ রাষ্ট্র যে জনগণের নয় বামপন্থীরা এই প্রচারই সারাজীবন ধরে দিয়ে আসছে।
• প্রাণ-প্রকৃতির সুরক্ষা – বামপন্থী চিন্তা
• সকল প্রকার সাম্রাাজ্যবাদ বিরোধিতা – বামপন্থী চিন্তা
• সবার আগে বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ – বামপন্থী চিন্তা
• সংবিধান ছুঁড়ে ফেলে জনতার জন্য গণতান্ত্রিক সেকুলার সংবিধান লিখতে হবে – বামপন্থী চিন্তা এটাই ছিল।
• দেশীয় সক্ষমতার বিকাশ – বামপন্থী চিন্তা
• নির্বাচন দিয়ে হবে না, গণঅভ্যুত্থান লাগবে – এই চিন্তাও বামপন্থীদের মধ্য থেকেই আসে।
ফলে দেখা যাচ্ছে গণঅভ্যুত্থানের সবকয়টি কোর আইডিয়াই আসলে বামপন্থী রাজনীতির দল করা বা দল না করা প্রচারকদের কাছ থেকে এসেছে। তারা যেখানটায় মার খেয়েছেন এবং খাচ্ছেন সেটা হল তাদের সাংগঠনিক দুর্বলতা অর্থাৎ মাসল পাওয়ার না থাকা। কিন্তু আবারও বলি মাসল পাওয়ার না থাকা দিয়ে বামপন্থী রাজনীতির শক্তিকে বোঝা যাবে না। তার সবচেয়ে বড় শক্তিটা কোন দল করে না, অসংগঠিত। ফিরোজ আহমেদ যদি বামপন্থী রাজনীতির এই মাসল পাওয়ার কেন বাড়ছে না সেটা নিয়ে পর্যালোচনা করতেন তাহলে এটা নিয়ে হয়তো কোন বিতর্কই আসত না। বিতর্কটা আসার মূল কারণ সাবেক বামপন্থী তিনি তাদের ঘোষিত অবামপন্থী অবস্থান থেকে গোটা বামপন্থী বা প্রগতিশীল রাজনীতিটাকেই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। নেতৃত্বের সমস্যা নিয়ে তিনি আলাপ করতে পারতেন। কিন্তু নেতৃত্বের সমস্যা থাকা আর খোদ রাজনীতিটার সমস্যা থাকা এক কথা না। ফিরোজ আহমেদ এটা ভুলে গেলেন কীভাবে?
দ্বিতীয়ত, ফিরোজ আহমেদ এবং তার লেখার প্রতিক্রিয়াদাতারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই জনগণের এজেন্সি জিনিসটাকে উপেক্ষা করেছেন। এক্ষেত্রেও অভিপ্রায় কি ছিল তাদের এটা মুখ্য নয়। কিন্তু এর পরিণতি হল - যে জনগণ জুলাই এনেছিল তার কর্তৃত্বটাকেই হাওয়া করে দেয়া। পুরো জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আসলে সত্যিকারের পথপ্রদর্শক ছিল জনগণ। জুলাইয়ে কোন রাজনৈতিক দলেরই, তা সেটি বাম হোক কি ডান, কারোরই কোন বেইল আসলেই ছিল না রাস্তায়। সেটা বামপন্থীদের নেতৃত্বে দ্রোহযাত্রা হোক কিংবা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ডাকা লং মার্চ এর সময় হোক। পুরো জিনিসটা লিড দিয়েছে আসলে একদম আপামর জনতা। রাজনৈতিক দলগুলো থেকে জনগণের সামষ্টিক চেতনা এক্ষেত্রে অগ্রসর ছিল চিন্তায়, বেপরোয়া ভূমিকায়।
ফিরোজ আহমেদ যে ১৯ জুলাইয়ের গণতন্ত্র মঞ্চের প্রোগ্রাম নিয়ে এত কথা বললেন আর তার প্রতিক্রিয়ায় অন্যরা অন্যান্য প্রোগ্রামের কথা বললেন, তারা উভয় পক্ষই উল্লেখ করতে ব্যর্থ হলেন যে তখন আসলে লিটারেলি যুদ্ধ চলছিল রাস্তায়। খালি হাতে বন্দুকের সাথে যুদ্ধ। ১৯ জুলাই আমি যে জনগণের সাথে বনশ্রীতে ছিলাম, সেই জনগণ এমন এক যুদ্ধের মধ্যে তখন যে যুদ্ধের খবর মিডিয়াতেও আসে নাই। মিডিয়া কিছুই জানতো না কি হচ্ছিল বনশ্রীতে। খালি হাতে, ইট হাতে গোটা বনশ্রী যে যুদ্ধটা করল ওইদিন সেই যুদ্ধের মধ্যে কোথায় কে “প্রতিবাদ সমাবেশ” করতে গিয়ে পুলিশ আর ছাত্রলীগের কাছে মার খেল সেটা এতটাই অকিঞ্চিৎকর ছিল যে এসব নিয়ে মানুষ মাথাই ঘামায়নি। কারণ এদিকে একের পর এক মানুষ গুলি খেয়ে মরছিল।
বামপন্থী ও শিল্পীদের আয়োজনে কারফিউ ভাঙা গানের মিছিল মানুষকে ভীষণ অনুপ্রাণিত করেছিল মনে আছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে তখন দেশের অন্যান্য প্রান্তে গুলি খেয়ে মানুষ মরছে প্রতিদিন। অনুপ্রাণিত করা আর গুলিটা খাওয়া এই দুইএর মধ্যে আমি গুলি খাওয়াটাকেই এগিয়ে রাখব সবসময়। একই ঘটনা দ্রোহযাত্রার দিনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কিংবা ৩ আগস্ট শহীদ মিনারে নাহিদদের ডাকা সমাবেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কোন কিছুই মানুষের গুলির সামনে বুক পেতে দেয়ার সমান না! ফলে প্রতিক্রিয়া দেয়ার আলাপগুলোতেও ডিফেন্ড করতে গিয়ে যখন শহীদের শাহাদাতের থেকে, জনগণের নেয়া সম্মিলিত প্রচেষ্টার থেকে, বেপরোয়া লড়াইয়ের থেকে কর্মসূচী বড় হয়ে ওঠে সেই এপ্রোচে জনগণের কর্তৃত্বটি ঢাকা পড়ে যায় অনিচ্ছাকৃতভাবেই। জনগণ পুরো গণঅভ্যুত্থানে কোন কর্মসূচীর ধার ধারে নাই। তারা যেখানেই আক্রান্ত হয়েছে সেখানেই প্রতিরোধ গড়েছে। ফলে এটা মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে ফিরোজ আহমেদ এবং তার লেখার প্রতিক্রিয়াদাতা উভয় পক্ষের বক্তব্যতেই নিজে নিজ সাংগঠনিক প্রচেষ্টাকে জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টার উর্ধ্বে তুলে ধরার একটা অসতর্কতাপ্রসূত প্রবণতা বিদ্যমান।
শেষ যে কথাটা বলতে চাই, ৫ আগস্টের পরে এই যে জনতার নেতৃত্বে ঘটা জুলাই অভ্যুত্থানের সফল সমাপ্তির পর ডানপন্থী, মধ্যপন্থী, অবামপন্থী রাজনৈতিক দলের নেতারা বঙ্গভবন টু সেনাপ্রধান দৌড়াদৌড়ি করলেন অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের জন্য এই অধিকার আপনাদের কি কেউ দিয়েছিল? জনগণের মতামত নেয়ার কোন ব্যবস্থা কি আপনারা করেছিলেন? করেন নাই। পুরা জুলাইয়ে যেই জনতা সবকয়টা রাজনৈতিক দলকে নেতৃত্ব দিল, ৫ আগস্টের পরে সেই জনতার উপরে আপনারা আপনাদের নেতৃত্ব চাপায়া দিলেন। জুলাইয়ের জনতার সাথে সবচেয়ে অগণতান্ত্রিক কাজটা তখনি হয়েছিল।
মন্তব্য করুন

