Logo

১১ ভাদ্র ১৪৩৩

×

Follow Us

শিক্ষক রাজনীতির রঙের খেলা

মত-দ্বিমত

শিক্ষক রাজনীতির রঙের খেলা

চিররঞ্জন সরকার

Icon

চিররঞ্জন সরকার

প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৬, ০৬:২২ পিএম

‘ঝাঁঝরা বলে সুইকে, তোর পাছায় বড় একখান ছ্যাদা।’ এই প্রবাদটি বাংলার লোকজ প্রজ্ঞার এক অনবদ্য সৃষ্টি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ঘটনাটি শুনে প্রবাদটির কথাই সবার আগে মনে পড়ে। যে সংগঠন নিজেও বহু বছর ধরে শিক্ষক রাজনীতির মাঠে সমান উৎসাহে খেলেছে, তারাই আজ প্রতিপক্ষকে রাজনীতি করার অপরাধে নিষিদ্ধ করতে বলছে। যেন ঝাঁঝরাই সুইকে ছিদ্রের নৈতিকতা শেখাচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আবারও বিশ্বকে নতুন এক রাজনৈতিক তত্ত্ব উপহার দিল। এতদিন পৃথিবীর রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা গণতন্ত্র, বহুদলীয় ব্যবস্থা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সহনশীলতা, রাজনৈতিক বহুত্ববাদ—এসব পুরোনো বিষয় নিয়ে মাথা ঘামিয়েছেন। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতির নবতর দর্শন তাঁদের সমস্ত গবেষণাকে এক লহমায় পুরোনো করে দিয়েছে। এখানে এখন গণতন্ত্রের সংজ্ঞা খুবই সহজ। আমি থাকলে গণতন্ত্র, তুমি থাকলে ষড়যন্ত্র। আমার সংগঠন থাকলে বহুদলীয় পরিবেশ, তোমার সংগঠন থাকলে জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি। আর আমি ক্ষমতায় এলে তোমাকে নিষিদ্ধ করাই হলো সহনশীলতার সর্বশেষ সংস্করণ।

এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের সাম্প্রতিক উদাহরণ হলো বিএনপি-জামায়াতপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দলের দাবি। তাঁদের মতে, আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন নীল দলের সমস্ত কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে হবে। কারণ, নীল দল নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি করেছে। অভিযোগটি শুনে রাজনৈতিক ব্যঙ্গকাররাও কয়েক মিনিট নীরব হয়ে যান। কারণ, এমন নিখাদ কৌতুক লেখার মতো প্রতিভা তাঁদেরও নেই। যে দেশে শিক্ষক সংগঠনের নামই রাজনৈতিক পরিচয়ের রঙে বিভক্ত, সেখানে একটি রাজনৈতিক শিক্ষক সংগঠন আরেকটি রাজনৈতিক শিক্ষক সংগঠনকে রাজনীতি করার অপরাধে নিষিদ্ধ করার দাবি তুলেছে। যুক্তির এই সৌন্দর্য দেখে অ্যারিস্টটল বেঁচে থাকলে সম্ভবত আবার দর্শন পড়তে ভর্তি হতেন।

খবরটি শুনে নীল দলের নেতারা নাকি প্রথমে ভেবেছিলেন এটি কোনো ব্যঙ্গাত্মক ফেসবুক পোস্ট। পরে বুঝলেন, বিষয়টি সত্যি। তখন তাঁরা নাকি একে একে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের দিকে তাকাতে শুরু করেন। এতদিন তাঁরা ভাবতেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি, শিক্ষক নিয়োগ, প্রশাসনিক কমিটি, সিন্ডিকেট, সিনেট, উপাচার্য নির্বাচন, প্রভাব, পদ-পদবি—সবই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ। আজ হঠাৎ জানতে পারলেন, এগুলো আসলে ভয়ংকর অপরাধ ছিল। শুধু অপরাধটি চোখে পড়েনি, কারণ তখন তাঁদের হাতে ছিল ক্ষমতার টর্চলাইট। আলোটা ঘুরে অন্যদিকে যেতেই দেখা গেল, পুরো ইতিহাসটাই নাকি অপরাধের আলোকচিত্র।

তবে সাদা দলের নৈতিক অবস্থান সত্যিই প্রশংসনীয়। পৃথিবীতে এমন নির্মল মানুষ খুব কমই দেখা যায়। তাঁরা যেন সদ্য ধোয়া সাদা অ্যাপ্রনের মতো পবিত্র। তাঁদের রাজনৈতিক জীবনে ক্ষমতার কোনো গন্ধ ছিল না, কোনো দলীয় হিসাব ছিল না, কোনো প্রশাসনিক প্রভাব ছিল না—এমনটাই অন্তত তাঁদের বক্তব্য শুনে মনে হয়। তাঁরা বুঝি সারাজীবন গবেষণাগারে বসে কেবল মাইক্রোস্কোপে গণতন্ত্রের জীবাণু খুঁজেছেন। রাজনৈতিক সভা, শিক্ষক সমিতির নির্বাচন, প্রশাসনিক লবিং—এসব শব্দের সঙ্গে তাঁদের পরিচয় ঘটেছে সম্ভবত গত সপ্তাহে। নইলে একটি রাজনৈতিক সংগঠনকে নিষিদ্ধ করার দাবি তাঁরা এত নিষ্পাপ মুখে কীভাবে তুলতে পারেন?

ছোটবেলায় পড়েছিলাম, ‘আমরা ভালো লক্ষ্মী সবাই,/তোমরা ভারি বিশ্রী।/তোমরা খাবে নিমের পাঁচন,/আমরা খাব মিশ্রি।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতিও যেন ঠিক এই ছড়ার আধুনিক সংস্করণ। আমরা রাজনীতি করলে সেটি গণতন্ত্র, তোমরা রাজনীতি করলে সেটি অপরাধ। আমাদের সংগঠন থাকবে, তোমাদের সংগঠন থাকবে না। আমাদের রঙ পবিত্র, তোমাদের রঙ বিপজ্জনক।

অবশ্য নীল দলেরও অতীত খুব একটা নিরামিষ নয়। ক্ষমতার দিনগুলোতে তাঁদের অনেকেই বিশ্বাস করতেন, বিশ্ববিদ্যালয় হলো এমন এক বাগান, যেখানে শুধু নীল ফুল ফুটবে। অন্য রঙের ফুল ফুটতে চাইলে প্রথমে তাকে আগাছা ঘোষণা করতে হবে। নিয়োগ থেকে পদোন্নতি, কমিটি থেকে প্রশাসন—সবখানেই রঙের গুরুত্ব ছিল গবেষণার বিষয়ের চেয়েও বেশি। তখন সাদা দল অভিযোগ করত, বিশ্ববিদ্যালয় দলীয়করণের শিকার। আজ দৃশ্যপট পাল্টেছে। এখন সাদা দল বলছে, দলীয় রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। তবে শর্ত একটাই—বন্ধ হবে শুধু প্রতিপক্ষের রাজনীতি। নিজেদেরটা আপাতত গবেষণার স্বার্থে চালু থাকবে।

এ যেন ক্রিকেট ম্যাচে ব্যাটিং করা দল ঘোষণা দিল, এখন থেকে ক্রিকেটে ব্যাট ব্যবহার নিষিদ্ধ। কারণ ব্যাট দিয়ে রান করা অনৈতিক। তবে যেহেতু তারা ইতোমধ্যে তিনশ রান তুলে ফেলেছে, তাই নতুন নিয়ম প্রতিপক্ষের ইনিংস থেকেই কার্যকর হবে। গণতন্ত্রের এই নমনীয় নিয়মাবলি দেখে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটিও হয়তো নতুন খেলার কথা ভাবতে পারে। নাম হতে পারে—‘ক্ষমতা বদল অলিম্পিয়াড’। যেখানে প্রতিযোগীরা পালাক্রমে একে অন্যকে নিষিদ্ধ করবে, আর বিচারকরা নম্বর দেবেন কে কত সুন্দর ভাষায় গণতন্ত্র রক্ষা করতে পারলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন ধীরে ধীরে এক অভিনব গবেষণাগারে পরিণত হয়েছে। এখানে গবেষণার বিষয় আর পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন বা ইতিহাস নয়। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা হলো—ক্ষমতায় থাকলে নীতির সংজ্ঞা কী, আর ক্ষমতা হারালে সেই একই নীতির নতুন সংজ্ঞা কীভাবে লিখতে হয়। একটি দল যখন ক্ষমতায় থাকে, তখন বিরোধী মত হলো বিশৃঙ্খলা। আর ক্ষমতা বদল হলে ঠিক একই অভিধান থেকে শব্দগুলো উল্টো অর্থে ব্যবহার করা হয়। শুধু প্রচ্ছদের রঙ পাল্টায়, ভেতরের ভাষা একই থাকে।

সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, এই পুরো নাটকে শিক্ষকতা যেন পার্শ্বচরিত্র। গবেষণা কোথায়, পাঠদান কোথায়, আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনা কোথায়, শিক্ষার্থীদের বৌদ্ধিক বিকাশ কোথায়—এসব প্রশ্ন এখন এতটাই অপ্রাসঙ্গিক যে, এগুলো করলে মানুষ সন্দেহের চোখে তাকায়। মনে হয়, আপনি নিশ্চয়ই কোনো গোপন এজেন্ডা নিয়ে এসেছেন। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার কথা বলা মানে যেন রাজনীতির মূল কাহিনি নষ্ট করে দেওয়া। এখানে এখন গবেষণার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কে কোন রঙের শিক্ষক, কে কোন তালিকায়, কে কোন প্যানেলে, আর কে পরবর্তীকালের প্রশাসনিক চেয়ারের সম্ভাব্য যাত্রী।

শিক্ষার্থীরাও অবশ্য কম আনন্দে নেই। তাঁরা এখন নতুন একটি ঐচ্ছিক কোর্স চালুর দাবি তুলতে পারেন—‘রঙতত্ত্ব ও ক্ষমতার বিবর্তন’। প্রথম অধ্যায়ে থাকবে, ক্ষমতায় থাকলে বিরোধী মতকে কীভাবে অসাংবিধানিক প্রমাণ করতে হয়। দ্বিতীয় অধ্যায়ে থাকবে, ক্ষমতা হারানোর পর কীভাবে একই যুক্তি উল্টো দিকে প্রয়োগ করতে হয়। তৃতীয় অধ্যায়ে থাকবে, গণতন্ত্র শব্দটি ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে নিষিদ্ধ করার উন্নত কৌশল। আর চূড়ান্ত পরীক্ষায় প্রশ্ন থাকবে—‘আপনি ক্ষমতায় এসেছেন। প্রতিপক্ষকে নিষিদ্ধ করার জন্য অন্তত পাঁচটি গণতান্ত্রিক যুক্তি লিখুন।’

এই নাটকের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, কেউই আয়নার সামনে বেশিক্ষণ দাঁড়াতে চায় না। কারণ আয়না বড় নিষ্ঠুর। সেটি রঙ দেখে না, শুধু মুখ দেখায়। নীলের মুখও দেখায়, সাদার মুখও দেখায়। আর সেই মুখে বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা ক্ষমতার ধুলোও স্পষ্ট দেখা যায়। তাই আয়নাকে এড়িয়ে চলাই নিরাপদ। তার চেয়ে প্রতিপক্ষকে নিষিদ্ধ করার দাবি তোলা অনেক সহজ। এতে নিজের অতীত নিয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় না।

আসলে এই নিষিদ্ধ করার সংস্কৃতি শুধু একটি সংগঠনকে লক্ষ্য করে নয়; এটি ধীরে ধীরে চিন্তার জায়গাকেই সংকুচিত করে। আজ নীল দল নিষিদ্ধ হবে, কাল অন্য কেউ হবে, পরশু আরেকজন। শেষে দেখা যাবে, বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো দল নেই, কোনো বিরোধিতা নেই, কোনো বিতর্ক নেই। শুধু থাকবে একদল মানুষ, যারা প্রতিদিন একে অন্যকে অভিনন্দন জানাবে—’অভিনন্দন, আমরা সফলভাবে গণতন্ত্রকে একদলীয় শান্তিতে রূপান্তর করেছি।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ। এখানেই প্রশ্ন করার সাহস জন্ম নেওয়ার কথা, মতের ভিন্নতা সহ্য করার সংস্কৃতি গড়ে ওঠার কথা, যুক্তির সঙ্গে যুক্তির লড়াই হওয়ার কথা। কিন্তু যদি সেই বিশ্ববিদ্যালয়েই প্রতিটি নতুন ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর প্রথম রাজনৈতিক স্বপ্ন হয়ে দাঁড়ায় প্রতিপক্ষকে নিষিদ্ধ করা, তাহলে সেটি আর বিদ্যাপীঠ থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে ক্ষমতার রঙ বদলের প্রদর্শনী। সেখানে নীল সাদা হয়, সাদা নীল হয়, কিন্তু সংস্কৃতি বদলায় না। শুধু নিষিদ্ধের তালিকায় নাম বদলায়।

সম্ভবত এ কারণেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন সত্যিই একটি বিশ্বমানের গবেষণাগার। এখানে গণতন্ত্রের নতুন সূত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। সূত্রটি খুব সংক্ষিপ্ত—ক্ষমতায় থাকলে আমি বিশ্ববিদ্যালয়, ক্ষমতা হারালে আমি ভুক্তভোগী, আর ক্ষমতায় ফিরে এলে তুমি নিষিদ্ধ। এই সূত্রের সৌন্দর্য হলো, এর কোনো শেষ নেই। শুধু রঙ বদলায়, সংলাপ বদলায়, বক্তা বদলায়। কিন্তু মঞ্চ, নাটক আর করতালির শব্দ একই থেকে যায়।

চিররঞ্জন সরকার: কলামিস্ট ও উন্নয়নকর্মী

মন্তব্য করুন

Logo