শাহেদ কায়েস
প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬, ০৪:৩৪ পিএম
সমাজ পরিবর্তনের ইতিহাসে বড় বড় আন্দোলনের কথা আমরা জানি। কিন্তু সব পরিবর্তন মিছিল, স্লোগান কিংবা রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্য দিয়েই আসে না। কখনও একটি গান, একটি হাসি, একটি নাচ কিংবা একটি মাত্র বাক্যও মানুষের চেতনার ভেতর গভীর আলোড়ন তুলতে পারে।
গত কয়েক দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচিত তিনটি ঘটনা আমাদের সেই কথাই আবার মনে করিয়ে দিয়েছে। তিনজন সাধারণ মানুষ তাঁদের স্বাভাবিক আচরণ, সাহস এবং মানবিক অবস্থানের মাধ্যমে এমন এক সামাজিক বার্তা দিয়েছেন, যা আমাদের সময়ের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
অনেক দিন ধরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে আমরা ঘৃণা, বিভাজন, অপপ্রচার এবং চরিত্রহননের উর্বর ক্ষেত্র হিসেবে দেখে আসছি। অ্যালগরিদমের যুগে উত্তেজনাপূর্ণ, আক্রমণাত্মক কিংবা বিভ্রান্তিকর বিষয় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে অনেক সময় মনে হয়, ইতিবাচকতা যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখিয়ে দিয়েছে, বিদ্বেষ যত দ্রুত ছড়ায়, মানুষের সংহতিও তত দ্রুত গড়ে উঠতে পারে। বরং ইতিবাচক অবস্থান যদি মানুষের হৃদয় স্পর্শ করে, তাহলে তা আরও শক্তিশালী সামাজিক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।
সিলেটের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিক বিউটি পালের ঘটনাটি তারই একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। বৃষ্টিভেজা প্রকৃতির মাঝে একটি জনপ্রিয় গানের সঙ্গে ধারণ করা একটি সাধারণ ভিডিওকে বিকৃত শিরোনাম দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর শুরু হয় নৈতিকতার নামে ব্যক্তিগত আক্রমণ, কটূক্তি এবং অপপ্রচার। এমন দৃশ্য আমাদের কাছে নতুন নয়। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, পোশাক, চলাফেরা কিংবা সাংস্কৃতিক প্রকাশকে ঘিরে সামাজিক বিচার যেন এক ধরনের নিয়মে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এবার ঘটেছে ভিন্ন কিছু। হাজার হাজার মানুষ একই গান ব্যবহার করে নিজেদের ভিডিও প্রকাশ করেছেন। তাঁরা কাউকে গালাগাল করেননি, পাল্টা অপমান করেননি, হুমকিও দেননি। তাঁরা সংস্কৃতিকেই প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। একটি গান হয়ে উঠেছে ব্যক্তিস্বাধীনতার পক্ষে সংহতির প্রতীক। এই প্রতিক্রিয়া প্রমাণ করেছে, ইতিবাচক সাংস্কৃতিক প্রতিরোধও জনমত গঠনে অসাধারণ শক্তি রাখে। এই ঘটনাটি আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও ভাবতে শেখায়। সমাজে যখন নৈতিকতার নামে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা সংকুচিত করার চেষ্টা হয়, তখন তার জবাবও নৈতিক ও সৃজনশীল উপায়ে দেওয়া সম্ভব। প্রতিহিংসা দিয়ে প্রতিহিংসাকে পরাজিত করা যায় না। কিন্তু সৌন্দর্য, শিল্প এবং সংহতি অনেক সময় ঘৃণার সবচেয়ে কার্যকর জবাব হয়ে ওঠে।
কুড়িগ্রামের শিক্ষিক কণিকা দাসের ভিডিও-ও একইভাবে মানুষের হৃদয় জয় করেছে। টিফিনের বিরতিতে ছাত্রীদের সঙ্গে তাঁর আনন্দময় নৃত্য অনেকেই দেখেছেন, শেয়ার করেছেন এবং প্রশংসা করেছেন। এই প্রশংসা শুধু একটি ভিডিওর জন্য নয়; বরং শিক্ষা সম্পর্কে আমাদের ধারণারও একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রতিফলন। আমাদের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষককে এমন একটি আনুষ্ঠানিক চরিত্র হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে, যিনি সব সময় কঠোর, দূরত্ব বজায় রাখা এবং আবেগহীন থাকবেন। অথচ আধুনিক শিক্ষা সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলে। একজন ভালো শিক্ষক শুধু পাঠ্যবই পড়ান না; তিনি শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলেন, আনন্দময় পরিবেশ তৈরি করেন এবং শেখাকে জীবন্ত করে তোলেন। কণিকা দাস সেই মানবিক শিক্ষকের প্রতিচ্ছবিই সামনে এনেছেন। তাঁর ভিডিওতে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না, ছিল না জনপ্রিয় হওয়ার চেষ্টা। ছিল একজন শিক্ষকের সঙ্গে তাঁর শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক সম্পর্কের একটি সুন্দর মুহূর্ত। মানুষের বিপুল ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে দিয়েছে, সমাজ এখন এমন শিক্ষককেই বেশি আপন করে নিতে চায়, যিনি জ্ঞান দেওয়ার পাশাপাশি আনন্দও ভাগ করে নিতে পারেন।
তৃতীয় ঘটনাটি হয়তো সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত, কিন্তু সবচেয়ে গভীর। ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একটি ঘটনার প্রতিবাদে এক কিশোরের বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। নিজের পরিচয় জানতে চাইলে সে বলেছিল, ‘আমি মানুষ। এটাই আমার প্রথম পরিচয়।’ এই একটি বাক্য যেন আমাদের সময়ের অসংখ্য বিভাজনের বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ। ধর্ম, বর্ণ, জাতি, ভাষা, মতাদর্শ কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে মানুষকে মানুষ থেকে আলাদা করার প্রবণতা বিশ্বজুড়েই বেড়েছে। এমন সময়ে একজন কিশোর যখন নিজের প্রথম পরিচয় হিসেবে মানুষ হওয়ার কথা বলে, তখন সেটি শুধু একটি ব্যক্তিগত মত নয়; বরং মানবিক মূল্যবোধের একটি শক্তিশালী ঘোষণা।
এই তিনটি ঘটনাকে যদি আমরা একসঙ্গে দেখি, তাহলে একটি বড় সামাজিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সাধারণ মানুষ এখন কেবল দর্শক হয়ে থাকতে চান না। তাঁরা অন্যায় দেখলে প্রতিক্রিয়া জানাতে চান। তবে সেই প্রতিক্রিয়া সব সময় সংঘাতের ভাষায় নয়; অনেক ক্ষেত্রেই তা আসে সংস্কৃতি, সহমর্মিতা এবং মানবিক সংহতির মাধ্যমে।
আরও একটি বিষয় এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয়। আমাদের সমাজে প্রায়ই অভিযোগ করা হয়, বুদ্ধিজীবীরা নীরব, সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব দুর্বল কিংবা সমাজের, রাষ্ট্রের নানা সংকটে, সাধারণ মানুষের সমস্যায় কেউ কথা বলেন না। সেই শূন্যতার মধ্যেই অনেক সময় সাধারণ মানুষ নিজেরাই নতুন ভাষা তৈরি করেন। বিউটি পালের পাশে দাঁড়ানো হাজারো মানুষ, কণিকা দাসকে অভিনন্দন জানানো অসংখ্য দর্শক কিংবা অচেনা কিশোরের বক্তব্যকে ছড়িয়ে দেওয়া সাধারণ ব্যবহারকারীরা দেখিয়ে দিয়েছেন, সমাজের ইতিবাচক শক্তি এখনও হারিয়ে যায়নি। অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে, সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখনও গুজব, ঘৃণা এবং সংগঠিত অপপ্রচারের বড় ক্ষেত্র। আজ যাঁরা প্রশংসা পাচ্ছেন, কাল অন্য কেউ একইভাবে আক্রমণের শিকার হতে পারেন। তাই ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মানকে সামাজিক অভ্যাসে পরিণত করতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোরও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি সভ্য সমাজের পরিচয় নির্ধারিত হয় সে কত দ্রুত কাউকে দোষী বানাতে পারে, তা দিয়ে নয়; বরং কত দ্রুত অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানবিকভাবে দাঁড়াতে পারে, তা দিয়ে। সাম্প্রতিক এই তিনটি ঘটনা সেই মানবিক শক্তিরই পরিচয় বহন করে। অন্ধকার সময়ে আশার আলো হয়ে ওঠেন সাধারণ মানুষই। ইতিহাসের বড় পরিবর্তনের পেছনেও অনেক সময় এমন অসংখ্য নামহীন মানুষের অবদান থাকে। একজন শিক্ষকের পাশে দাঁড়ানো হাজারো মানুষ, আরেকজন শিক্ষকের আনন্দকে সম্মান জানানো সমাজ এবং একজন কিশোরের কণ্ঠে উচ্চারিত মানবতার ঘোষণা আমাদের নতুন করে বিশ্বাস করতে শেখায়, বিদ্বেষ যতই উচ্চকিত হোক, সংহতির শক্তি তার চেয়ে অনেক বড়। এই বিশ্বাসই ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় আশা। কারণ ঘৃণা মানুষকে বিভক্ত করে, কিন্তু সংস্কৃতি, সাহস এবং মানবিকতা মানুষকে একত্রিত করে। আর যে সমাজ একত্রিত হতে জানে, সেই সমাজই শেষ পর্যন্ত অন্ধকারকে পরাজিত করে।
শাহেদ কায়েস: কবি, প্রাবন্ধিক ও অধিকারকর্মী
মন্তব্য করুন

