সাবরিনা শারমিন
প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬, ০৯:২৯ এএম
বাংলাদেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সংস্কারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমরা যখন স্কুল-কলেজে পড়তাম, তখনও প্রতি বছর নতুন নতুন নীতি, পদ্ধতি ও মূল্যায়ন ব্যবস্থার পরিবর্তন দেখেছি; বর্তমান সময়েও সেই ধারার খুব একটা ব্যতিক্রম ঘটেনি। কিন্তু প্রশ্ন হলো – এই চলমান পরিবর্তনগুলো কি সত্যিই একটি কার্যকর, টেকসই ও স্থিতিশীল শিক্ষাকাঠামো তৈরি করতে পারছে? নাকি আমরা বারবার একটি দীর্ঘমেয়াদী, বাস্তবসম্মত ও সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছি?
সম্প্রতি উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষা চলাকালে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও উদ্ভূত পরিস্থিতি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার বিদ্যমান সংকটকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। অথচ বিভিন্ন পর্যায় থেকে প্রায়ই দায় চাপানো হচ্ছে শিক্ষার্থীদের ওপর। তারা পড়াশোনায় অমনোযোগী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্ত, পরীক্ষাবিমুখ, অটোপাসপ্রত্যাশী বলে দোষারোপ করা হচ্ছে। অথচ ঢালাওভাবে শিক্ষার্থীদেরকে দোষারোপ শিক্ষাক্ষেত্রের কাঠামোগত সমস্যাগুলোকে আড়াল করছে।
বাস্তবতা হলো, একজন কিশোর বা তরুণ সাধারণত কোনো কারণ ছাড়া রাজপথে নামে না। তাদের উদ্বেগ ও অসন্তোষের পেছনে থাকে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও দীর্ঘদিনের জমে থাকা সমস্যা। কিন্তু এসব সমস্যার কথা বলবার জন্য শিক্ষার্থীদের সামনে কার্যকর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম নেই।
বারবার পদ্ধতিগত পরিবর্তন, নীতিনির্ধারনী সিদ্ধান্তের অনিশ্চয়তা, শ্রেণীকক্ষে মানসম্মত পাঠদানের ঘাটতি, প্রশ্নপত্রের ভুল, মানহীন পাঠ্যপুস্তক, শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপকে গুরুত্ব না দেওয়া, সামাজিক বিদ্রুপ এবং কর্তৃপক্ষের পর্যাপ্ত সংবেদনশীলতার অভাব – এসব বিষয় যখন একসঙ্গে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, তখন প্রতিবাদের পথই তাদের কাছে একমাত্র দৃশ্যমান মাধ্যম হয়ে ওঠে।
শিক্ষাক্ষেত্রের বর্তমান সংকটকে কেবল শিক্ষার্থীদের ‘অমনোযোগ’ বা ‘উচ্ছৃঙ্খলতা’ হিসেবে দেখলে সমস্যার প্রকৃত কারণ আড়ালেই থেকে যাবে। তাদের ’অটোপাসের প্রত্যাশী’ হিসেবে চিহ্নিত করে দায় এড়িয়ে যাওয়ার পরিবর্তে আমাদের ভাবতে হবে– এই অপরিণত বয়সের শিক্ষার্থীদের কি বারবার একটি দুর্বল শিক্ষাব্যবস্থার চাপ বহন করতে যেতে হবে, নাকি শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে তার সমাধান করা হবে?
এই নিবন্ধে শিক্ষাক্ষেত্রের কিছু বাস্তব সমস্যা ও প্রায়োগিক সীমাবদ্ধতার ওপর আলোকপাত করা হয়েছে, যা বর্তমান সংকটকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে সহায়তা করতে পারে।
নতুন পাঠ্যক্রম বনাম শিক্ষাদানের সক্ষমতা
আমরা প্রায়ই আন্তর্জাতিক মানের উন্নত কারিকুলাম প্রণয়নের চেষ্টা করি। কিন্তু সেই কারিকুলাম শ্রেণীকক্ষে কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা কতটা রয়েছে, তা নিয়ে পর্যাপ্ত বিশ্লেষণ করা হয় না।
শিক্ষক যদি নতুন কারিকুলাম বা শিখন-পদ্ধতি কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে না পারেন, তাহলে তার প্রভাব সরাসরি শিক্ষার্থীদের ওপর পড়ে। শ্রেণীকক্ষে পাঠ্যবিষয় বুঝতে ব্যর্থ হয়ে শিক্ষার্থীরা তখন বিকল্প হিসেবে কোচিং, প্রাইভেট টিউশন কিংবা গাইড বইয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
প্রশ্নপত্র ও পাঠ্যপুস্তকের মানসংকট
জাতীয় পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে ভুল থাকা একটি স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। পাঠ্যপুস্তকের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠাও এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়। জাতীয় কারিকুলামের অধীনে বাংলা মাধ্যমের পাশাপাশি ইংরেজি মাধ্যমেও একই পাঠ্যক্রম অনুসরণ করা হয়। কিন্তু ইংলিশ ভার্সনের অনেক পাঠ্যপুস্তক অনুবাদের ক্ষেত্রে ভাষাগত মান, যথার্থতা ও সম্পাদনার ঘাটতি স্পষ্ট।
ফলে শিক্ষার্থীদের অনেক সময় ভুল সংশোধন করে পড়তে হয়, অথবা ভুল তথ্য নিয়েই এগোতে হয়। এটি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতিফলন। পরীক্ষার শৃঙ্খলা ও নকল প্রতিরোধে কঠোরতার পাশাপাশি প্রশ্নপত্র ও পাঠ্যপুস্তকের মান নিশ্চিত করার বিষয়টিও কর্তৃপক্ষকে সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
করোনা-উত্তর শিক্ষার স্থবিরতা
করোনাকালে প্রায় দুই বছর অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা চালু থাকার পর শ্রেণীকক্ষে ফিরে ব্যাখ্যাভিত্তিক ও প্রাণবন্ত পাঠদানের যে চর্চা ছিল, তাতে এক ধরনের স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয় পক্ষই যেন আগের সেই স্বাভাবিক ও সক্রিয় শিক্ষার পরিবেশে পুরোপুরি ফিরতে পারেনি।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো বিষয় গভীরভাবে ব্যাখ্যা করার পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের গুগল (Google) বা ‘এআই (AI) ব্যবহার করে উত্তর খুঁজে নিতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। প্রযুক্তির ব্যবহার অবশ্যই আধুনিক শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ; কিন্তু তা যদি শিক্ষকের বিশ্লেষণধর্মী পাঠদান ও শিক্ষার্থীর নিজস্ব চিন্তাশক্তির বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে মৌলিক জ্ঞানের ভিত দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
একই সঙ্গে, করোনা-পরবর্তী সময়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে মনোসামাজিক সংকট (Psychosocial Crisis) তৈরি হয়েছে, তা উত্তরণে প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগও এখনো সীমিত।
ব্যবহারিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত বিজ্ঞান
বিজ্ঞান শিক্ষার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে ধারণা তৈরি করা। কিন্তু দেশের অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞান শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত ল্যাবরেটরি সুবিধা নেই। ফলে বিজ্ঞান শিক্ষা অনেক ক্ষেত্রেই তত্ত্ব ও মুখস্থনির্ভরতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে।
অনেক বেসরকারি স্কুল-কলেজে প্রতি বছর শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ল্যাব ফি নেওয়া হলেও বাস্তবে নিয়মিত ব্যবহারিক শিক্ষার সুযোগ দেওয়া হয় না। কিছু প্রতিষ্ঠানে আধুনিক সরঞ্জামসমৃদ্ধ ল্যাব থাকলেও তা অনেক সময় কেবল প্রদর্শন বা কর্তৃপক্ষের পরিদর্শনের জন্য ব্যবহৃত হয়; শিক্ষার্থীদের নিয়মিত হাতে-কলমে শেখার সুযোগ সীমিত থাকে।
বিজ্ঞানের মৌলিক বিষয়গুলো পরীক্ষাগারে অনুশীলনের সুযোগ না পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিষয়ভিত্তিক ধারণাগত স্পষ্টতা (conceptual clarity) তৈরি হয় না। ফলে ব্যবহারিক অধ্যায়গুলোও তাদের কাছে মুখস্থ করার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এর ফলে পরীক্ষায় কোনো বিষয় ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হলে তা শিক্ষার্থীদের অপ্রত্যাশিতভাবে কঠিন মনে হয়।
বিজ্ঞান শিক্ষাকে কার্যকর করতে হলে কেবল পাঠ্যসূচিতে ব্যবহারিক অধ্যায় অন্তর্ভুক্ত করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নিয়মিত ল্যাব ব্যবহারের সুযোগ এবং পর্যাপ্ত তদারকি।
মুখস্থনির্ভর প্রযুক্তি (আইসিটি) শিক্ষা
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (ICT) শিক্ষা আমাদের শিক্ষাক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে এর বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কম্পিউটারে কয়েক মিনিটে অনুশীলনের মাধ্যমে শেখা সম্ভব এমন অনেক বিষয় শিক্ষার্থীরা এখনো বই পড়ে, স্ক্রিনশট দেখে বা লিখে মুখস্থ করতে বাধ্য হচ্ছে।
অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ল্যাব থাকলেও শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ব্যবহারিক অনুশীলনের সুযোগ সীমিত। ফলে প্রযুক্তি শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য – দক্ষতা-ভিত্তিক সৃজনশীলতা, প্রোগ্রামিং, সমস্যা সমাধান, ও অন্যান্য ব্যবহারিক দক্ষতা উন্নয়ন হচ্ছে না।
অন্যদিকে, তরুণ প্রজন্মকে প্রায়ই ‘টিকটকার’ বা ‘সোশ্যাল মিডিয়া আসক্ত’ হিসেবে সমালোচনা করা হয়। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের ভাবতে হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রযুক্তির সৃজনশীল ও উৎপাদনশীল ব্যবহারের কতটুকু সুযোগ তৈরি করছে।
প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে ব্যবহারিক আইসিটি শিক্ষা, কোডিং ও ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ না থাকলে প্রযুক্তি অনেক শিক্ষার্থীর কাছে শেখার মাধ্যমের পরিবর্তে কেবল বিনোদনের মাধ্যম হিসেবেই থেকে যেতে পারে। আজকের প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে মুখস্থনির্ভর আইসিটি শিক্ষা শিক্ষার্থীদের সম্ভাবনাকে সীমিত করে দিচ্ছে।
কোচিং ও গাইড বইনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা
শ্রেণীকক্ষে মানসম্মত পাঠদানের ঘাটতির কারণে অনেক শিক্ষার্থী কোচিং সেন্টার, প্রাইভেট টিউশন ও গাইড বইয়ের ওপর ক্রমশ নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক কোচিং এবং সহায়ক বই ব্যবহারের চাপেও পড়তে হয়।
এই প্রবণতার সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক হলো - শিক্ষার্থীরা মূল পাঠ্যবই পড়া, নিজে চিন্তা করা এবং বিষয় বিশ্লেষণের পরিবর্তে নোট ও সাজেশনের ওপর নির্ভর করতে শেখে। এমনকি কিছু প্রতিষ্ঠানে শ্রেণীকক্ষে মূল পাঠ্যবইয়ের পরিবর্তে নির্দিষ্ট প্রকাশনীর সহায়ক বই ব্যবহারের প্রবণতাও দেখা যায়।
এর ফলে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল চিন্তা, বিশ্লেষণ ক্ষমতার ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বাধাগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে, কোচিংনির্ভর ব্যবস্থা আর্থিক সক্ষমতার ভিত্তিতে সমাজে শিক্ষাবৈষম্যও তৈরি করে। শিক্ষার মূল দায়িত্ব যদি শ্রেণীকক্ষের পরিবর্তে বাণিজ্যিক সহায়ক ব্যবস্থার ওপর চলে যায়, তাহলে একটি সমতাভিত্তিক ও মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে।
ভাষা শিক্ষার পুনর্বিন্যাস ও সিলেবাসের চাপ
প্রাথমিক থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে ভাষা শিক্ষা চললেও অনেক শিক্ষার্থী বাংলা ও ইংরেজিতে কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। এর দায় অনেক সময় শিক্ষার্থীদের ওপর চাপানো হলেও বাস্তবে এটি শিক্ষাদান পদ্ধতি, অনুশীলনের সুযোগ এবং মুল্যায়ন ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রচলিত পদ্ধতিতে অনেক সময় ভাষাশিক্ষা ব্যবাকরণ ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক প্রস্তুতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
তবে ভাষাশিক্ষার মূল দক্ষতা – শোনা, বলা, পড়া, ও লেখার সক্ষমতা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়েই শক্তিশালী করা প্রয়োজন। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে বিজ্ঞান বা ব্যবসায় শিক্ষার মতো বিভাগে শিক্ষার্থীদের যখন নিজ নিজ বিষয়ের পাঠ ও ব্যবহারিক কাজের চাপ থাকে, তখন অতিরিক্ত বিষয় ও বিস্তৃত সিলেবাসের ভার তাদের শেখার মানকে প্রবাহিত করতে পারে।
শিক্ষকদের দক্ষতা ও মর্যাদার সংকট
একটি মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো দক্ষ, প্রশিক্ষিত ও অণুপ্রাণিত শিক্ষক। কিন্তু আমাদের দেশে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা, উপযুক্ত বেতন কাঠামো এবং পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। এর ফলে মেধাবীদের একটি বড় অংশ এই পেশায় আকৃষ্ট হচ্ছে না।
একই সঙ্গে, আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতি, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং শিক্ষার্থীদের মনস্তাত্বিক প্রয়োজন সম্পর্কে শিক্ষকদের ধারাবাহিক প্রশিক্ষণেরও ঘাটতি রয়েছে। শুধু নতুন কারিকুলাম প্রণয়ন করলেই শিক্ষার মান পরিবর্তন সম্ভব নয়; সেই কারিকুলাম কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন প্রস্তুত ও দক্ষ শিক্ষক। শিক্ষকদের যথাযথ মূল্যায়ন, পেশাগত স্বাধীনতা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত না করে শিক্ষাব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা কঠিন।
রাজনীতি ও নীতিগত ধারাবাহিকতার অভাব
বাংলাদেশে শিক্ষা সংস্কারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো নীতির ধারাবাহিকতার অভাব। প্রায়ই দেখা যায়, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কারিকুলাম, মূল্যায়ন পদ্ধতি ও শিক্ষানীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ফলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে তৈরি হয় অনিশ্চয়তা ও বিভ্রান্তি।
শিক্ষাব্যবস্থা কোনো রাজনৈতিক মেয়াদের বিষয় নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় বিনিয়োগ। তাই শিক্ষা সংস্কারকে রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার ঊর্ধ্বে রেখে গবেষণা, বাস্তব অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে পরিচালনা করা প্রয়োজন। একটি স্থিতিশীল, যুগোপযোগী ও কার্যকর শিক্ষানীতি তৈরি করতে হলে নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং অংশীজনদের (stakeholders) সক্রিয় অংশগ্রহণও নিশ্চিত করতে হবে।
সমাধান ও করণীয়
শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত সিলেবাসের চাপ সৃষ্টি করে কিংবা পরীক্ষার কঠোরতা বাড়িয়ে শিক্ষার মান উন্নত করা সম্ভব নয়। শিক্ষার্থীরা এই সংকটের কারণ নয়; বরং তারা একটি দুর্বল শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। তাই পরিবর্তনের উদ্যোগ নিতে হবে শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত জায়গা থেকে।
শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি
শুধু আধুনিক কারিকুলাম তৈরি করলেই হবে না; তা বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও শিখন সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা, আর্থিক নিরাপত্তা এবং কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন ব্যবস্থাও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
ব্যবহারিক শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষায় ল্যাবরেটরি সুবিধা বাধ্যতামূলক করতে হবে। যেসব প্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞান বিভাগ রয়েছে, কিন্তু পর্যাপ্ত ব্যবহারিক সুবিধা নেই, তাদের সক্ষমতা উন্নয়নের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। ল্যাব ফি নেওয়ার পরও ব্যবহারিক শিক্ষা নিশ্চিত না করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষার অতি বাণিজ্যিকীকরণ রোধ
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শেখার পরিবেশ তৈরি করা, বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা নয়। কোচিংনির্ভরতা কমাতে শ্রেণীকক্ষে মানসম্মত পাঠদান, শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
ভাষা শিক্ষা ও পাঠ্যক্রমের পুনর্বিন্যাস
ভাষা শিক্ষাকে পরীক্ষাকেন্দ্রিক না রেখে ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের দিকে নিতে হবে। মাধ্যমিক পর্যায়েই ভাষার মৌলিক দক্ষতা নিশ্চিত করে উচ্চমাধ্যমিকে বিষয়ভিত্তিক গভীরতা ও দক্ষতা উন্নয়নে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য ও কাউন্সেলিং ব্যবস্থা
শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিত্বের বিকাশ, মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। পাশাপাশি, শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য, যোগাযোগ দক্ষতা ও সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়ে নিয়মিত সেশন আয়োজন করা যেতে পারে।
পরিশেষে, আমাদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষানীতি কোনো রাজনৈতিক বা সাময়িক এজেন্ডা নয়, এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভিত্তি। শিক্ষার্থীদের বারবার নীতিগত পরিবর্তনের পরীক্ষাগার হিসেবে ব্যবহার না করে তাদের প্রয়োজন, সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে সামনে রেখে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে।
একটি কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে কেবল পরীক্ষার ফলাফল বা সিলেবাসের কলেবর নয়, বরং শেখার মান, শিক্ষকের সক্ষমতা, ব্যবহারিক দক্ষতা এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। এখন এমন একটি শিক্ষানীতি প্রণয়নের সময় এসেছে, যা তরুণদের ওপর চাপ বাড়াবে না; বরং তাদের আত্মবিশ্বাসী, দক্ষ, সৃজনশীল ও ভবিষ্যৎ-উপযোগী নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে সহায়তা করবে।
লেখক: সাবরিনা শারমিন; উন্নয়ন কর্মী ও যোগাযোগ পেশাজীবী
ছবি: Sabrina Sharmin/AI
মন্তব্য করুন

