Logo

১ ভাদ্র ১৪৩৩

×

Follow Us

যে জুলাইয়ে শিশুরাও রক্ষা পায়নি

মত-দ্বিমত

যে জুলাইয়ে শিশুরাও রক্ষা পায়নি

দীপু মাহমুদ

Icon

দীপু মাহমুদ

প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬, ০৯:২৩ পিএম

জুলাই ২০২৪ বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন এক মাস, যার স্মৃতি শুধু রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের কারণে নয়, শিশুদের রক্তাক্ত উপস্থিতির কারণেও দীর্ঘদিন বয়ে বেড়াতে হবে। জাতির সবচেয়ে বেদনাদায়ক মুহূর্তগুলোর একটি হলো, যখন তার শিশুরাও সহিংসতার হাত থেকে নিরাপদ থাকে না। যে বয়সে একজন শিশুর হাতে থাকার কথা ছিল বই, খেলনা কিংবা স্বপ্নের রঙতুলি, সেই বয়সেই অনেক শিশু হারিয়েছে জীবন।

জুলাইয়ের সেই দিনগুলোতে নিহত শিশুরা কোনো সংঘাতের পক্ষ ছিল না। তারা কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়নি, কোনো ক্ষমতার লড়াইয়ে অংশ নেয়নি। তারা ছিল পরিবারের আদরের সন্তান, কারও ভাই-বোন, কারও ভবিষ্যতের স্বপ্ন। কিন্তু সহিংসতার নির্মমতা তাদেরও স্পর্শ করেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর সহিংসতায় নিহতদের মধ্যে শতাধিক শিশুর তথ্য উঠে এসেছে। এই সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি নাম, একটি মুখ, একটি পরিবার এবং একটি অসমাপ্ত জীবন।

একজন শিশুর মৃত্যু শুধু একটি প্রাণের অবসান নয়; এটি একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলে দেয়। যে পরিবারটি একজন শিশুকে ঘিরে আগামী দিনের স্বপ্ন দেখছিল, তাদের সেই স্বপ্নও একই সঙ্গে থেমে যায়। একজন বাবা-মায়ের কাছে সন্তান হারানোর শোকের কোনো পরিমাপ নেই। রাষ্ট্রের হিসাবের খাতায় হয়তো সেটি একটি সংখ্যা, কিন্তু একটি পরিবারের কাছে সেটি সারাজীবনের শূন্যতা।

সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, অনেক শিশু এমন সময়ে মারা গেছে, যখন তারা কোনো সংঘাতের অংশই ছিল না। কেউ নিজের ঘরের ভেতরে ছিল, কেউ পরিবারের সঙ্গে ছিল, কেউ জানালার পাশে দাঁড়িয়েছিল, কেউ মায়ের কাছে আশ্রয় নিয়েছিল। যে ঘর শিশুর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা হওয়ার কথা, সেই ঘরও কোনো কোনো পরিবারের জন্য নিরাপত্তা দিতে পারেনি।

নারায়ণগঞ্জের ছোট্ট রিয়া গোপের কথা মনে পড়ে। বাবার কাছাকাছি থাকা অবস্থায় গুলির আঘাতে তার জীবন থেমে যায়। যে শিশুর পৃথিবী তখনো শুরুই হয়নি, যে হয়তো জানত না বাইরে কী ঘটছে, তাকেও দিতে হয়েছে সহিংসতার সবচেয়ে নির্মম মূল্য।

চার বছর বয়সী আবদুল আহাদের মৃত্যুও আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করে। শিশু, যে রাজনীতি বোঝে না, সংঘাত বোঝে না, তার জীবন কেন এমন ঘটনার কাছে হার মানবে? শিশুর মৃত্যুর সঙ্গে কোনো যুক্তি, কোনো ব্যাখ্যা, কোনো রাজনৈতিক ভাষ্যই সমান হতে পারে না।

উত্তরার কিশোরী নাইমা সুলতানার গল্পও একই বেদনার। তার সামনে ছিল দীর্ঘ জীবন, অসংখ্য সম্ভাবনা। কিন্তু একটি গুলি মুহূর্তেই থামিয়ে দিয়েছে সেই ভবিষ্যৎ। এমন প্রতিটি মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়- সহিংসতার সবচেয়ে বড় মূল্য দেয় তারা, যারা এর জন্য সবচেয়ে কম দায়ী।

তবে ক্ষতি শুধু তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, যারা প্রাণ হারিয়েছে। যারা বেঁচে গেছে, তাদের অনেকের মনেও রয়ে গেছে ভয়, আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার স্মৃতি। গুলির শব্দ, রক্তাক্ত দৃশ্য, স্বজন হারানোর কষ্ট কিংবা চারপাশের অস্থিরতা শিশুর মানসিক বিকাশে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ শুধু শারীরিক নিরাপত্তার বিষয় নয়; এটা মানসিক নিরাপত্তারও বিষয়।

রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব হলো মানুষের জীবন রক্ষা করা। আর সেই মানুষ যদি একজন শিশু হয়, তবে সেই দায়িত্ব আরও বেশি। কারণ একজন শিশু নিজের নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিজে করতে পারে না। সে নির্ভর করে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের ওপর। তাই কোনো রাজনৈতিক অস্থিরতা, আইনশৃঙ্খলার সংকট কিংবা সংঘাতের ব্যাখ্যা দিয়ে শিশুর মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না।

জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে প্রতিটি শিশুর জীবন, বিকাশ ও নিরাপত্তার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থকে সব সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে রাখার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশ এই সনদের রাষ্ট্রপক্ষ। অর্থাৎ শিশুদের সুরক্ষা শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, এটা আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের অংশ।

আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের মূলনীতিও একই কথা বলে। জেনেভা কনভেনশন এবং সংশ্লিষ্ট নীতিগুলো বেসামরিক মানুষের, বিশেষ করে শিশুদের সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দেয়। কোনো সংঘাতেই শিশুদের ক্ষতির শিকার হওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। একজন শিশুর জীবন কখনোই কোনো রাজনৈতিক বা কৌশলগত হিসাবের অংশ হতে পারে না।

বাংলাদেশের সংবিধানও রাষ্ট্রকে নাগরিকের জীবন ও মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব দিয়েছে। সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে আইনের সুরক্ষা এবং ৩২ অনুচ্ছেদে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ১৫ ও ১৭ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের জনকল্যাণমূলক দায়িত্ব এবং শিশুদের বিকাশের নীতিগত অঙ্গীকার রয়েছে। শিশু আইন, ২০১৩-তেও শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ রক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তাই জুলাইয়ের শিশু হত্যার প্রশ্ন শুধু আবেগের নয়; রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়ের প্রশ্ন। যেকোনো রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করা নয়; বরং কেন এমন ঘটনা ঘটল, কোথায় সুরক্ষা ব্যবস্থা ব্যর্থ হলো এবং ভবিষ্যতে কীভাবে তা ঠেকানো যাবে- সেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা।

নিহত শিশুদের পরিবার জানতে চায়- কীভাবে তাদের সন্তান মারা গেল, কারা দায়ী, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কারণ শিশুর পরিবারের কাছে ন্যায়বিচার মানে শুধু শাস্তি নয়; সত্য জানা, মর্যাদা পাওয়া এবং ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবারকে একই যন্ত্রণা বহন করতে না হওয়া।

জবাবদিহি ছাড়া কোনো সমাজ এগিয়ে যেতে পারে না। বিচার মানে প্রতিশোধ নয়; বিচার মানে সত্য প্রতিষ্ঠা, দায় নির্ধারণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা। যদি শিশু হত্যার মতো ঘটনা ভুলে যাওয়া হয়, তবে সেই ভুলের মূল্য ভবিষ্যতের শিশুরাও দিতে পারে।

এই বিষয়ে রাজনৈতিক বিভাজনের কোনো সুযোগ নেই। নিহত শিশুরা কোনো দলের ছিল না। তাদের রক্তের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। একজন শিশুর মৃত্যু সব পক্ষের জন্যই মানবিক পরাজয়।

সভ্য সমাজের একটি বড় পরীক্ষা হলো, সে সবচেয়ে দুর্বল মানুষটির প্রতি কতটা দায়িত্বশীল। শিশুরা সেই পরীক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়; রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।

জুলাই ২০২৪ আমাদের সামনে কঠিন শিক্ষা রেখে গেছে। রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি শুধু তার ক্ষমতা প্রয়োগে নয়; রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি হলো সে কতটা দুর্বলতম নাগরিককে রক্ষা করতে পারে। যে রাষ্ট্র তার শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে, সেই রাষ্ট্রই প্রকৃত অর্থে মানবিক রাষ্ট্র।

যে জুলাইয়ে শিশুরাও রক্ষা পায়নি, সেই জুলাইকে শুধু শোকের স্মৃতি হিসেবে রেখে দিলে চলবে না। এই স্মৃতি থেকে নিতে হবে অঙ্গীকার- আর কোনো শিশুর জীবন যেন কোনো সংঘাতের মূল্য না হয়। কারণ শিশুর জীবন শুধু তার পরিবারের নয়; সেটা জাতির ভবিষ্যৎ।

মন্তব্য করুন

Logo