এবং ইপ্সিতা
প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬, ০১:৫৭ পিএম
দিল্লীতে থাকলে ছাত্রদের খাবার বা জল দেওয়ার জন্য উপস্থিত থাকতাম। কিছু দিতে না পারলে অন্তত পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে যেতাম। ঠিক যেভাবে অভয়ার জন্য রাস্তায় নেমেছিলাম। মিছিল, হিউম্যান চেইন, রাত দখল... সবেতেই উপস্থিত ছিলাম, যদিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি-টবি দেওয়ার প্রয়োজন মনে করিনি। কিন্তু সেই অগাস্টের পর থেকে জন-গণ-মন কে ভয় পাই, কারণ রিড করতে পারিনা। তার আগেও দেখেছি লাল পতাকার ব্রিগেড দেখিয়ে বিদ্রোহের ন্যারেটিভ তৈরি করা কতটা ইমপ্র্যাকটিকাল ছিল। তারপর রাত দখল ওয়াজ এ মেজর মেজর ডিসইলিউশনমেন্ট। ওই ঘটনার পর দেখলাম আন্দোলন যেদিকে এগোলো সেটাও নির্দিষ্ট অভিমুখবিহীন, কোন পক্ষ যে কী চাইল, কিছুই বুঝতে পারলাম না। আজকে কাকিমাকে দেখি বক্তব্য রাখতে, যদিও তার মাথা মুন্ডুও কিছু বুঝিনা।
এর মধ্যে দেখেছেন? এই রাজ্যে এবং ভিন রাজ্যে উচ্চ মধ্যবিত্ত শহুরে জনগণের, তুলনায় কম আঁতে এবং গায়ে লাগা, শিক্ষকদের আন্দোলন, গাছ বাঁচানোর আন্দোলন, নদী বাঁচানোর আন্দোলন, পাহাড় বাঁচানোর আন্দোলন... এগুলো কোথাও গিয়ে পৌঁছচ্ছে না? কোথায় একটা পড়ছিলাম এই মুহূর্তে সারা দেশে নাকি খান দশেক আন্দোলন চলছে! সেসবের খবর আমাদের কাছে এসেও পৌঁছয় না... নিউজ চ্যানেলে তো না-ই, স্যোশাল মিডিয়ার ফিডেও না। আসলে সেসব আন্দোলনে মানুষকে ইমোশনাল করে তোলার মতো যথেষ্ট ড্রামা বা হাই পয়েন্ট নেই যে শত শত প্রোফাইলে ছড়িয়ে পড়বে। আমরা যারা কোনও না কোনও ভাবে পাবলিকের কনজিউম করার জন্য সিনেমা, নাটক, সিরিজ এসব লিখি বা বানাই, তারা জানি এঙ্গেজমেন্ট (এক্ষেত্রে শেয়ার করা) বিষয়টা কনজিউমারের সঙ্গে খাপে খাপ লাগা হাইপয়েন্টগুলোর উপরে কতটা নির্ভরশীল। নদী বাঁচানোর আন্দোলন কেনো ইন্টারনেটে বসবাসকারী জন-গণ-মনকে ছুঁতে পারে না তার অন্তত ৮টা কারণ দেখানো যায় স্টেপ বাই স্টেপ। কেন অভয়া বা ছাত্র আন্দোলন ছুঁয়ে যেতে পারছে সেটারও। একটু খেয়াল করে দেখুন, আরও বিস্তৃত এবং জন-গণ-মন এঙ্গেজকার্য-ব্যাপৃত ইমোশনাল হাইপয়েন্ট, ফুটবল ওয়ার্ল্ড-কাপ চলাকালীন কিভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় সোনমের অনশন নিয়ে কথা বলা হয়েছে অনেক কম!
খেয়াল করলে এও দেখবেন, মানুষ আজকাল স্টেটাস দেওয়াকে, শেয়ার করাকে অ্যাকশন হিসেবে দেখে, একটা মহাযজ্ঞে নিজের কন্ট্রিবিউশন বা ভূমিকা হিসেবে দেখে। দেখে কারণ এসব করেই তারা এক ধরনের ইমোশনাল গ্র্যটিফিকেশন খুঁজে পায়। ইমোশন ব্যাপারটা এই কারণেই পছন্দ করি না। আবেগ প্রতারক। আবেগ মাহুর্তিক। আবেগ দিক-ভ্রষ্টকারী। আবেগের বসে প্রতিবাদ কখন সেলিব্রেশন হয়ে যায় ধরতে পারা যায় না। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে এও, যে যেকোনও আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ার জন্য আবেগের সাহায্য নেওয়া ছাড়া কোনও উপায় নেই। মানুষ আর কিছুতেই অতটা প্রভাবিত হয় না, যতটা আবেগের দ্বারা হয়।
কিন্তু প্রতিবাদ যদি ফেসবুক শেয়ারে আটকে যায় এবং রেজ যদি ইনস্টাগ্রাম স্টেটাসে রিলিভ্ড হয়, তাহলে তো তা রাষ্ট্রকে সুবিধে করিয়ে দেওয়ার পদ্ধতি ছাড়া আর কিছু হয়ে ওঠে না, তাই না? আমরা যে আমাদের আবেগের চাবিকাঠি ফেসবুক ওয়াটসঅ্যাপ ইনস্টাগ্রাম আর ইউটিউবের হাতে দিয়ে বসে আছি, তা কি এসব জেনে? না, না জেনে?! একটা সুন্দর ভিজ্যুয়াল, পিছনে একটা উত্তেজক গান... ব্যাস... লাইক, শেয়ার, ক্যাপশন... এবং শেষ। বানিয়ে বলছি না, চারপাশে তাকালেই দেখবেন সকলে বিভিন্ন ছবি টবি পোস্ট করছে "নিদ্রিত ভারত জাগে" এই লাইনটি দিয়ে। নিদ্রিত ভারত কি সত্যিই জাগে? আপনি, আমি, পোস্টদাতা, লাইক দাতা সেই নিদ্রিত ভারতের অংশ নই? জীবন চর্চায়, মূল্যবোধে, বিচার বুদ্ধিতে, দৃষ্টি শক্তিতে কি আমরা এখনও নিদ্রিত নই? সব দেখে শুনেও যে আমরা বারবার তাকেই বেছে নি যে আমাদের পরোয়া করে না! ঠিক যেন উঠতি বয়সের আবেগতাড়িত মেয়েটি - যে আমাকে যত ইগনোর করবে, আমার তাকেই চাই! বহু মানুষকে হরদম দেখছি গাজা প্যালেস্টাইন ইরাক অ্যামেরিকা নিয়ে অনেক অনেক বুলি কপচিয়ে পার্সোনাল লাইফে চরম ইনসেনটিভ একটা জীবন কাটান। কী হবে তাদের এই ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্সের বিচক্ষণ পর্যালোচনা নিয়ে? জানা নেই আমার। কী হবে এই নিদ্রিত ভারত জেগে ওঠার ছবি পোস্টিয়ে? জানা নেই আমার। আজকাল খুব ক্লান্ত লাগে। মনে হয় খালটি কেটে কুমিরটি এনে ঘুম থেকে জেগে ওঠার একটা ভান চলছে!
তাও আমি আন্দোলনের বিপক্ষে নই। আমি চাই আন্দোলন হোক, বিফলে যাক, বিপথে যাক, ব্যর্থ হোক... তাও মানুষের মধ্যে যেন বিরুদ্ধ মত পোষণ করার ক্ষমতাটুকু থাকে। এতখানি দ্বিধা দ্বন্দ্বের রাস্তা-ঘাট, নদী-নালা এবং প্রাচীন ট্রামডিপো পেরিয়েও শুরুর কথাটাই বলতে ইচ্ছে করে - দিল্লীতে থাকলে ছাত্রদের খাবার বা জল দেওয়ার জন্য উপস্থিত থাকতাম। কিছু দিতে না পারলে অন্তত পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে যেতাম। ঠিক যেভাবে অভয়ার জন্য রাস্তায় নেমেছিলাম।
মন্তব্য করুন

