Logo

১১ ভাদ্র ১৪৩৩

×

Follow Us

লাশ আছে, মামলা আছে, খুনি শুধু অলৌকিকভাবে উধাও!

মত-দ্বিমত

জুলাইয়ের বিচার

লাশ আছে, মামলা আছে, খুনি শুধু অলৌকিকভাবে উধাও!

চিররঞ্জন সরকার

Icon

চিররঞ্জন সরকার

প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬, ১০:৩১ এএম

বাংলাদেশে একসময় একটা প্রবাদ ছিল, ‘কাজির গরু কিতাবে আছে, গোয়ালে নেই।’ সময় বদলেছে। এখন সেই প্রবাদেরও আপডেট সংস্করণ দরকার। কারণ আমরা এমন এক যুগে এসে পৌঁছেছি, যেখানে লাশ আছে, ময়নাতদন্ত আছে, মামলা আছে, চার্জশিট আছে, আদালত আছে, আইনজীবী আছে, টকশো আছে, ফেসবুক লাইভ আছে, শুধু খুনিটাই নেই! যেন খুন করে সে সঙ্গে সঙ্গে আলাদিনের চেরাগ ঘষে অদৃশ্য হয়ে গেছে। 

সম্প্রতি 'কাভারস্টেরি' জুলাই অভ্যুত্থানের হত্যা মামলাগুলো নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনটি পড়তে পড়তে মনে হয়, যেন কোনো অপরাধ অনুসন্ধানের নথি নয়, বরং যুক্তিবিদ্যার ওপর নির্মিত এক কালো কৌতুকের স্ক্রিপ্ট পড়ছি। জুলাই-পরবর্তী হত্যা মামলাগুলো প্রতিবেদনে যেভাবে উঠে এসেছে, তাতে মনে হচ্ছে, আমাদের বিচারব্যবস্থা আর ফৌজদারি আইন নয়; বরং এটি এক বিশাল ম্যাজিক শো। প্রথম দৃশ্যে দর্শকদের সামনে লাশ হাজির করা হয়। দ্বিতীয় দৃশ্যে হাজার হাজার আসামির নাম ঘোষণা করা হয়। তৃতীয় দৃশ্যে আদালত জানতে চান, ‘খুন করেছে কে?’ তখন মঞ্চে নেমে আসে এমন এক নীরবতা, যেন সবাই একযোগে মিউট বাটন চাপিয়ে দিয়েছে।

ফৌজদারি আইনের ছাত্ররা জানে, একটি শক্তিশালী মামলার ভিত্তি হলো তথ্যসমৃদ্ধ এজাহার। কিন্তু আমাদের দেশে এজাহার এখন আর আইনি দলিল নয়; এটি এক ধরনের সৃজনশীল সাহিত্য। কেউ কেউ ছোটগল্প লেখেন, কেউ উপন্যাস লেখেন, আর আমাদের কিছু এজাহার রচয়িতা লেখেন মহাকাব্য। পার্থক্য শুধু একটাই, এখানে কল্পনার চরিত্রদের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। 

পুলিশের হিসাব বলছে, জুলাইকে ঘিরে মামলা হয়েছে প্রায় দুই হাজার। কিন্তু আসামির সংখ্যা? নামধারী প্রায় দেড় লাখ, অজ্ঞাতনামা আরও সাড়ে চার লাখ! শুনে মনে হয় না আমরা কোনো অপরাধের তদন্ত করছি; মনে হয় যেন জাতীয় আদমশুমারির বিকল্প প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।

ভাবুন তো, একটি মোড়ে একটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। কিন্তু মামলার জালে আটকা পড়েছেন এমন সংখ্যক মানুষ, যা দিয়ে একটি ছোটখাটো দেশের ভোটার তালিকা তৈরি করা যায়। তদন্ত কর্মকর্তার অবস্থা সেই জেলের মতো, যিনি পুঁটি মাছ ধরতে গিয়ে বঙ্গোপসাগর কাঁধে তুলে ফেলেছেন। এখন তিনি বসে বসে ছাঁকনি দিয়ে মানুষ ছেঁকে বের করছেন, কে খুনি, আর কে সেদিন পাশের দোকানে বসে চা খাচ্ছিল।

সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, এই বিশাল তালিকার মধ্যে প্রকৃত খুনি কোথায় হারিয়ে গেল, সেটাই আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ খড়ের গাদায় সূঁচ খোঁজা কঠিন, কিন্তু পুরো গাদাটাই যদি নকল সূঁচ দিয়ে বানিয়ে ফেলা হয়, তাহলে আসল সূঁচ আর কখনোই পাওয়া যায় না।

জুলাই আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠা মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের ঘটনাটিই ধরুন। তাঁর মৃত্যু দেশের কোটি মানুষ দেখেছে। ভিডিও দেখেছে, কান্না করেছে, ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। কিন্তু আদালত তো ফেসবুকের রিঅ্যাকশন গোনেন না। আদালত জানতে চান, কার বন্দুক? কোন গুলি? কে ট্রিগার টেনেছিল? কে নির্দেশ দিয়েছিল? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে গিয়ে পুরো আবেগের বেলুন থেকে বাতাস বেরিয়ে যাচ্ছে।

গণ-আবেগ আর বিচার এক জিনিস নয়। আদালতে ‘সবাই জানে’ বলে কোনো ধারা নেই। সেখানে প্রমাণ লাগে। আর প্রমাণের জায়গায় যদি শুধু রাজনৈতিক স্লোগান জমা দেওয়া হয়, তাহলে বিচার একসময় নাটকে পরিণত হবেই।

প্রথম একশো মামলার তদন্তেই দেখা গেল, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মামলায় তদন্তকারীরা আদালতে গিয়ে কার্যত বলছেন, ‘খুন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ নেই।’ এই দৃশ্য দেখে মনে হয়, খুনি যেন কোনো ভিনগ্রহের নাগরিক। পৃথিবীতে এসে গুলি চালিয়ে আবার ইউএফওতে উঠে বাড়ি ফিরে গেছে।

এজাহারের আরেকটি বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো, মানুষের সুপারম্যানে রূপান্তর। একই ব্যক্তি একই সময়ে উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, সবখানেই উপস্থিত! আইনস্টাইন যদি এসব এজাহার পড়তেন, তবে আপেক্ষিকতার তত্ত্ব নতুন করে লিখতে হতো। নাসা হয়তো আমাদের থানাগুলোতে গবেষণা কেন্দ্র খুলে ফেলত।

তদন্তকারীরা যখন মোবাইল টাওয়ার লোকেশন, সিসিটিভি ফুটেজ আর ডিজিটাল তথ্য মিলিয়ে দেখছেন, তখন আবিষ্কার করছেন, যাকে প্রধান খুনি বলা হয়েছে, তিনি সেদিন অন্য জেলায় পারিবারিক অনুষ্ঠানে বিরিয়ানি খাচ্ছিলেন। আরেকজন বিদেশে ছিলেন। তৃতীয়জন হাসপাতালে ভর্তি। কিন্তু মামলার কাহিনিতে সবাই একযোগে গুলি চালাচ্ছেন। এমন অলৌকিক ক্ষমতা যদি সত্যিই মানুষের থাকত, তবে পৃথিবীতে ট্রাফিক জ্যাম বলে কিছু থাকত না।

বাংলাদেশে গণ-আসামির সংস্কৃতি অবশ্য নতুন নয়। সরকার বদলায়, মামলার ভাষা বদলায়, কিন্তু অজ্ঞাতনামা আসামির সংখ্যা বদলায় না। বরং প্রতি রাজনৈতিক পালাবদলে এই সংখ্যার সঙ্গে নতুন নতুন রেকর্ড যুক্ত হয়। মনে হয়, ক্ষমতার চাবির সঙ্গে একটি ‘ম্যাস কপি-পেস্ট’ বাটনও হস্তান্তর করা হয়।

ফল কী? নিরপরাধ মানুষ বছরের পর বছর আদালতের সিঁড়ি ভাঙেন। উকিলের ফি দিতে জমি বিক্রি করেন। জামিনের জন্য জীবন কাটিয়ে দেন। আর প্রকৃত অপরাধী যদি তালিকার ভিড়ে হারিয়ে যায়, তবে সে নিশ্চিন্তে কোথাও বসে এই বিচার নাটক উপভোগ করে। 

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সংখ্যার রাজনীতি। এক হিসাব এক কথা বলছে, আরেক হিসাব আরেক কথা। কোথাও নিহতের সংখ্যা ৮৩৪, কোথাও প্রায় ১,৪০০। সাধারণ মানুষ ভাবছে, সত্যি কোনটি? কিন্তু সত্যের চেয়ে সংখ্যার রাজনৈতিক ব্যবহার যেন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আর সেই বহুল আলোচিত 'স্নাইপার' রহস্য? প্রথমদিকে এমনভাবে আলোচনা চলল, যেন হলিউডের নতুন থ্রিলার মুক্তি পেয়েছে। কিন্তু এতদিন পরও কোনো পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক প্রতিবেদন নেই, ব্যালিস্টিক বিশ্লেষণের স্পষ্ট ফল নেই। ফলে বিজ্ঞান নীরব, কিন্তু গুজব দিব্যি বেঁচে আছে।

সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি শুধু কয়েকটি দুর্বল মামলা নয়; সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার। কারণ বিচার কেবল শাস্তি দেওয়ার নাম নয়, সঠিক মানুষকে শাস্তি দেওয়ার নাম। নিরপরাধ মানুষ যদি বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় জুতোর তলা ক্ষয় করেন, আর প্রকৃত হত্যাকারী জনসমুদ্রের ভিড়ে নির্বিঘ্নে হেঁটে বেড়ায়, তাহলে আদালতের ভবন যতই উঁচু হোক, ন্যায়বিচারের ভিত্তিটাই ধসে পড়ে। তখন রায় লেখা হয় ঠিকই, কিন্তু মানুষের মনে প্রতিষ্ঠিত হয় একটাই শব্দ: অবিশ্বাস।

রাষ্ট্র অবশ্য আশাবাদী। রাষ্ট্রের মাইক্রোফোনে প্রতিদিন উচ্চারণ হয়, ‘বিচার চলছে, বিচার হচ্ছে, বিচার হবেই।’ কিন্তু আয়না বড় নিষ্ঠুর। সে করতালি দেয় না, স্লোগানও তোলে না। সে কেবল ধীরস্বরে একটি প্রশ্ন করে, ‘বিচার চলছে, ঠিক আছে। কিন্তু বিচারটা আসলে কার? প্রকৃত খুনির, নাকি কাগজে-কলমে বানানো হাজারো সুবিধাজনক আসামির?’

ইতিহাস আরও নির্মম। সে প্রেস ব্রিফিং পড়ে না, টকশোর চিৎকার শোনে না, ফেসবুকের হ্যাশট্যাগও গোনে না। ইতিহাসের কাছে কেবল একটাই প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ, শেষ পর্যন্ত সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, নাকি সুবিধাজনক গল্প?

হয়তো পঞ্চাশ বছর পরে কোনো গবেষক এই সময়ের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে থিসিস লিখবেন। তিনি বিস্মিত হয়ে দেখবেন—লাশের পরিচয় নিশ্চিত, মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত, মামলার সংখ্যা নিশ্চিত, আসামির সংখ্যাও বিপুল; শুধু নিশ্চিত করা যায়নি, ট্রিগারে আঙুল রেখেছিল কে। তাঁর গবেষণার উপসংহারে হয়তো লেখা থাকবে—

‘এই সময়ে রাষ্ট্র অসাধারণ দক্ষতায় মামলা করতে পেরেছিল, গ্রেপ্তার করতে পেরেছিল, চার্জশিট দিতে পেরেছিল এবং বছরের পর বছর বিচারও চালিয়ে যেতে পেরেছিল। কিন্তু যে মানুষটি ট্রিগার টেনেছিল, তিনি ছিলেন এতটাই অলৌকিক প্রতিভাধর যে তিনি এজাহার, তদন্ত, সাক্ষ্য, চার্জশিট এবং রাষ্ট্রের স্মৃতি, সবকিছুকেই সফলভাবে ফাঁকি দিয়েছিলেন। ফলে ইতিহাস বাধ্য হয়ে স্বীকার করল, এটি ছিল এমন এক বিচার, যেখানে লাশের পরিচয় শতভাগ নিশ্চিত ছিল, কিন্তু খুনির পরিচয় ছিল সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক।’

যদি এই গণ-আসামির মহোৎসব, প্রমাণহীন অভিযোগের বন্যা আর 'খুনিহীন হত্যাকাণ্ড'-এর আইনি নাট্যমঞ্চ এভাবেই চলতে থাকে, তবে একদিন হয়তো আমাদের আদালতের রায়ও ব্যঙ্গসাহিত্যের অমর দলিলে পরিণত হবে: ‘মামলার নথিপত্র, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও পারিপার্শ্বিক আলামত পর্যালোচনায় ইহা সন্দেহাতীতভাবে প্রতীয়মান হইল যে, মৃত্যু অত্যন্ত সফল ও সুনিপুণভাবে সংঘটিত হইয়াছিল। তবে দুঃখের বিষয়, মৃত্যুর সহিত কোনো হত্যাকারীর প্রত্যক্ষ সম্পর্ক স্থাপন করা যায় নাই। কারণ প্রকৃত খুনিকে শনাক্ত করিবার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ, প্রযুক্তি, দূরদৃষ্টি কিংবা ইচ্ছাশক্তি তদন্তকারী সংস্থার নিকট উপস্থিত ছিল না। অতএব, ন্যায়বিচারের স্বার্থে খুনিকে অনুপস্থিত রেখেই বিচারকার্য সমাপ্ত ঘোষণা করা হইল।’

সেদিন আদালতের এজলাসে হয়তো করতালি পড়বে না। কিন্তু ইতিহাস ঠান্ডা গলায় রায় লিখে রাখবে: এটি ছিল এমন এক যুগ, যেখানে সবচেয়ে নিরাপদ মানুষটি ছিল প্রকৃত খুনি; আর সবচেয়ে অনিরাপদ ছিল নিরপরাধ নাগরিক। কারণ সেখানে বিচার নয়, বিচার হওয়ার অভিনয়ই ছিল রাষ্ট্রের সবচেয়ে সফল প্রযোজনা।

চিররঞ্জন সরকার: কলামিস্ট ও উন্নয়নকর্মী

 

মন্তব্য করুন

Logo