Logo

১৮ ভাদ্র ১৪৩৩

×

Follow Us

আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির আহ্বান

খোঁজ-খবর

আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির আহ্বান

ঢাকায় আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের সমাবেশে বক্তারা

Icon

কাভার স্টোরি প্রতিবেদন

প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৪৭ পিএম

আদিবাসীদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারসহ সাংবিধানিক ও আইনগত স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বক্তারা। একই সঙ্গে সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় ও ভূমি কমিশন গঠন, ভূমি ও সাংস্কৃতিক অধিকার নিশ্চিত এবং জাতিসংঘের আদিবাসীবিষয়ক ঘোষণাপত্র ও আইএলও কনভেনশন-১৬৯ অনুসমর্থনের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে গতকাল ৯ আগস্ট ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের উদ্যোগে আয়োজিত আলোচনা সভা, গণসমাবেশ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এসব দাবি জানানো হয়।
অনুষ্ঠানে মানবাধিকার ও নারী অধিকারকর্মী খুশী কবির, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) সহসভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য উষাতন তালুকদার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ুয়া, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম, এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, লেখক ও সাংবাদিক সোহরাব হাসান, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সারা হোসেনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।

সমাবেশে স্বাগত বক্তব্যে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, প্রায় তিন দশক ধরে আদিবাসীদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন চলছে। বাংলাদেশে ৪০ লাখের বেশি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভাষা, পরিচয়, ভূমি, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রকে তাঁদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হবে।

তিনি বলেন, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সহাবস্থানের কারণে বাংলাদেশ ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। এই বৈচিত্র্য দেশের শক্তি। তাই উন্নয়নের নামে আদিবাসীদের ভূমি দখল ও উচ্ছেদ বন্ধ করতে হবে। তাঁদের ভূমি ও সাংস্কৃতিক অধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

‘২৯ বছরেও চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয়নি’
উষাতন তালুকদার বলেন, বাংলাদেশ বহু ভাষা, বহু সংস্কৃতি ও বহু জাতিসত্তার দেশ। এই বৈচিত্র্য জাতীয় শক্তি হলেও আদিবাসী জনগণ এখনো সাংবিধানিক স্বীকৃতি, ভূমির অধিকার, ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের ক্ষেত্রে নানা সংকট ও বৈষম্যের মুখোমুখি। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও তাঁদের অনেক মৌলিক অধিকার পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি।
আদিবাসীদের ভূমির ওপর চিরায়ত ‘সমষ্টিগত মালিকানা’ আইএলও কনভেনশন-১০৭ ও ১৬৯-এ স্বীকৃত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ১৯৭২ সালে আইএলও কনভেনশন-১০৭ অনুসমর্থন করেছে। তবে কনভেনশন-১৬৯ অনুসমর্থন করা হয়নি। সরকারকে কনভেনশন-১০৭ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন এবং কনভেনশন-১৬৯ অনুসমর্থনের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

উষাতন তালুকদার বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ৩০ বছর পূর্ণ হতে চললেও এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। বর্তমান সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে ‘রেইনবো নেশন’ বা বৈচিত্র্যকে সম্মান করে এমন বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রতিফলন ঘটাতে হলে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন, আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং ভূমি, ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস শুধু আদিবাসীদের জন্য নয়; এটি ভূমিহীন, অধিকারবঞ্চিত ও নিপীড়িত সব মানুষের অধিকার ও মর্যাদার প্রতীক।

১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে রাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, দীর্ঘ ২৯ বছর পেরিয়ে গেলেও চুক্তিটির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয়নি।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলেও মন্তব্য করেন ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শান্তিরক্ষী বাহিনী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। একইভাবে দেশের অভ্যন্তরে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে শান্তি, সম্প্রীতি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় তারা ভূমিকা রাখবে—এটাই প্রত্যাশা। পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে সেনাবাহিনীকে ইতিবাচক ও কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।

‘স্বীকৃতি ছাড়া ভাষা-সংস্কৃতি রক্ষা কঠিন’
মানবাধিকার ও নারী অধিকারকর্মী খুশী কবির বলেন, প্রতিবছর আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রকে স্মরণ করিয়ে দিতে হয় যে বাংলাদেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠী রয়েছে এবং তাদের নিজস্ব অধিকার, পরিচয় ও মর্যাদা রয়েছে।

আদিবাসীদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষার অন্যতম প্রধান উপায় হলো তাঁদের স্বতন্ত্র জাতিসত্তার স্বীকৃতি দেওয়া উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভূমির ওপর তাঁদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে। এ কারণে আদিবাসীদের সাংবিধানিক ও আইনগত স্বীকৃতি অত্যন্ত জরুরি।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল কাফি রতন বলেন, স্বাধীনতার এত বছর পরও দেশের আদিবাসীরা তাঁদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত ও অধিকারহীন অবস্থায় রয়েছেন। ১৯৭১ সালে বৈষম্যহীন ও সাম্যভিত্তিক বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে দেশ স্বাধীন হলেও এখনো সব জনগোষ্ঠীর অধিকার সমানভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

তিনি বলেন, নিপীড়িত, নির্যাতিত ও বঞ্চিত মানুষের পক্ষে তাঁদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। আদিবাসীসহ সব নিপীড়িত জনগণের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যেই আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা জানান তিনি।

পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের সংকটের কথা
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সভাপতির অনুপস্থিতিতে তাঁর লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন পিসিজেএসএসের স্টাফ সদস্য ত্রিজিনাদ চাকমা। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, বাংলাদেশের পাহাড় ও সমতলের অধিকাংশ আদিবাসী জনগণ এখনো অস্তিত্বের হুমকির মধ্যে রয়েছেন।

এতে বলা হয়, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীরা ক্রমশ ভূমি হারাচ্ছেন এবং তাঁদের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত চুক্তির ২৯ বছর অতিক্রান্ত হতে চললেও এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে সরকারের সদিচ্ছার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
লিখিত বক্তব্যে সমতলের আদিবাসীদের পরিস্থিতি আরও নাজুক বলেও উল্লেখ করা হয়। ভূমি থেকে উচ্ছেদ, নারী নিপীড়ন, বৈষম্য ও বিচারহীনতার কারণে তাঁরা আরও প্রান্তিক হয়ে পড়ছেন বলে দাবি করা হয়। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আদিবাসী ছাত্র ও যুব সমাজকে ঐক্যবদ্ধ ও দৃঢ়ভাবে অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

আট দফা দাবি

সমাবেশ থেকে আদিবাসীদের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে আট দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—
১. আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারসহ আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হবে।
২. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করতে হবে এবং এ জন্য সময়সীমাভিত্তিক রোডম্যাপ ঘোষণা করতে হবে।
৩. সমতল অঞ্চলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় ও ভূমি কমিশন গঠন করতে হবে।
৪. আদিবাসীদের সম্পর্কে বিকৃত, খণ্ডিত বা মিথ্যা তথ্য প্রচারকারী গণমাধ্যম, মিডিয়া বা প্রতিষ্ঠান বন্ধের উদ্যোগ নিতে হবে।
৫. আদিবাসীদের ওপর সব ধরনের নিপীড়ন ও নির্যাতন বন্ধ এবং তাঁদের বিরুদ্ধে করা সব মিথ্যা মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে।
৬. জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ২০০৭ সালে গৃহীত আদিবাসীবিষয়ক ঘোষণাপত্র এবং আইএলও কনভেনশন-১৬৯ অনুসমর্থন করতে হবে। একই সঙ্গে আইএলও কনভেনশন-১০৭ বাস্তবায়ন করতে হবে।
৭. রাষ্ট্রীয়ভাবে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালন করতে হবে।
৮. সমতল ও পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের জন্য ৫ শতাংশ সংরক্ষিত কোটা যথাযথভাবে চালু ও বাস্তবায়ন করতে হবে।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জাসদের কেন্দ্রীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. মুশতাক হোসেন, বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্রনাথ, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের সহসাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রোবায়েত ফেরদৌস, লেখক ও গবেষক ইশিতা দস্তিদার এবং বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সহসাধারণ সম্পাদক ডা. গজেন্দ্রনাথ মাহাতোসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিরা।

মন্তব্য করুন

Logo