Logo

১ ভাদ্র ১৪৩৩

×

Follow Us

কমরেড মণি সিংহের জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা

এই দিনে

মানুষের মুক্তি ছিল তাঁর জীবনের অঙ্গীকার

কমরেড মণি সিংহের জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা

Icon

প্রীতিলতা রূপকথা

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬, ০৪:৪০ পিএম

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাসে অবিচ্ছেদ্দ অংশ তিনি। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম থেকে শুরু করে কৃষকের অধিকার, শ্রমিকের ন্যায্য দাবি, পাকিস্তানি শাসনের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ—প্রায় সাত দশকের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ গণআন্দোলনে তিনি ছিলেন দৃশ্যমান এক অগ্রসেনানী। যিনি ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য, পারিবারিক ঐশ্বর্য কিংবা নিরাপদ জীবন—সবকিছুর চেয়ে বড় করে দেখেছিলেন শোষিত মানুষের মুক্তির সংগ্রামকে। ক্ষমতা নয়, আদর্শ ছিল তাঁর রাজনীতির কেন্দ্র; মানুষের মুক্তিই ছিল তাঁর জীবনের অঙ্গীকার।

আজ ২৮ জুলাই। উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও প্রাণপুরুষ, মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টা এবং আজীবন সংগ্রামী বিপ্লবী কমরেড মণি সিংহের ১২৬তম জন্মবার্ষিকী।

১৯০১ সালের ২৮ জুলাই কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন মণি সিংহ। তাঁর বাবা কালী কুমার সিংহ ও মা সরলা দেবী। বাবার অকালমৃত্যুর পর মাত্র সাত বছর বয়সে মাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি চলে আসেন ময়মনসিংহের সুসং দুর্গাপুরে, যা বর্তমানে নেত্রকোনা জেলার অন্তর্গত। এই জনপদই পরবর্তীকালে তাঁর রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ, কৃষক আন্দোলনের বিকাশ এবং এক কিংবদন্তি সংগ্রামী নেতার উত্থানের সাক্ষী হয়ে ওঠে।

কৈশোরেই তিনি ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী সংগঠন ‘অনুশীলন’-এর সঙ্গে যুক্ত হন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি উপলব্ধি করেন, কেবল বিচ্ছিন্ন সশস্ত্র অভিযান নয়—জনগণকে সংগঠিত করেই সমাজের মৌলিক পরিবর্তন সম্ভব। ১৯২১ সালের অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনের অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক দর্শনকে নতুন ভিত্তি দেয়।

১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব তাঁর চিন্তাজগতে গভীর প্রভাব ফেলে। ১৯২৫ সালে বিপ্লবী নেতা গোপেন চক্রবর্তীর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর তিনি মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে নিজের রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেন। ১৯২৮ সাল থেকে কমিউনিস্ট পার্টির সার্বক্ষণিক কর্মী হিসেবে আত্মনিয়োগ করে তিনি শ্রমিক আন্দোলন, কৃষক সংগঠন এবং গণসংগ্রামের মধ্যেই নিজের জীবনকে সম্পূর্ণভাবে বিলিয়ে দেন।

মণি সিংহের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়গুলোর একটি টংকবিরোধী কৃষক আন্দোলন। জমিদারি শোষণের বিরুদ্ধে সুসং অঞ্চলের মুসলমান কৃষক, গারো ও হাজং জনগোষ্ঠীর লড়াইয়ে তিনি শুধু নেতৃত্বই দেননি; তাঁদের আস্থা, ভালোবাসা ও সংগ্রামের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। টংক আন্দোলন ছিল প্রান্তিক মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির পাশাপাশি নিপীড়িতের আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। আর সেই সংগ্রামের নেতৃত্বে ছিলেন কমরেড মণি সিংহ।

সংগ্রামের পথ তাঁর জন্য কখনোই সহজ ছিল না। ব্রিটিশ আমলে একাধিকবার কারাবরণ, অন্তরীণ জীবন, আত্মগোপন, পাকিস্তান আমলে দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় পলাতক জীবন, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং আইয়ুব খানের সরকারের ঘোষিত পুরস্কার—সবকিছুই ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অংশ। কিন্তু কোনো দমন-পীড়নই তাঁকে আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি।

১৯৫১ সালে আত্মগোপন অবস্থায় পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৬৫ সালে পুনরায় একই দায়িত্ব পান। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে মুক্তি লাভের পরও তাঁর সংগ্রাম থেমে থাকেনি; বরং বাংলাদেশের স্বাধীনতার লড়াইয়ে তিনি আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হন।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে রাজশাহী কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ গেরিলা বাহিনী গঠনে তাঁর নেতৃত্ব ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন আদায়েও তিনি বড় ভূমিকা রেখে ছিলেন।

স্বাধীনতার পরও মণি সিংহের সংগ্রাম থামেনি। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাজনৈতিক স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হবে, যখন প্রতিষ্ঠিত হবে গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং শোষণমুক্ত সমাজব্যবস্থা। সেই বিশ্বাস নিয়েই জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি মানুষের পক্ষে, বৈষম্যের বিরুদ্ধে এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের পক্ষে লড়াই চালিয়ে গেছেন।

১৯৮৪ সালে গুরুতর অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হলেও আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। ১৯৯০ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হয় তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনের পথচলা। পরে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করে।

মণি সিংহের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ইতিহাস কেবল ক্ষমতাবানদের হাতে রচিত হয় না; ইতিহাস লেখেন তাঁরা, যারা মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও মুক্তির জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেন। জন্মের ১২৬ বছর পরও কমরেড মণি সিংহ তাই শুধু একটি নাম নন; তিনি সংগ্রামের এক আলোকবর্তিকা, আদর্শের এক অনিঃশেষ উৎস এবং বাংলাদেশের প্রগতিশীল রাজনীতির এক অবিনাশী প্রেরণা।

 

মন্তব্য করুন

Logo