রাশিয়া প্লিসেটস্ক সামরিক মহাকাশ কেন্দ্র থেকে সয়ুজ-২.১বি রকেটের মাধ্যমে কয়েকটি সামরিক স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করে, যেগুলোর নাম দেওয়া হয় কসমস-২৬১০ থেকে কসমস-২৬১৪
মহাকাশে কি নতুন ছায়াযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে?
সাঈদ হাসান
প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬, ০৭:২৮ পিএম
ভূপৃষ্ঠের যুদ্ধ কি এবার সত্যিই মহাশূন্যে ছড়িয়ে পড়ছে? সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা বিশ্লেষণ করলে উত্তর অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মহাকাশে ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে স্যাটেলাইট ধ্বংসের প্রকাশ্য যুদ্ধ এখনো শুরু না হলেও, এক ধরনের মহাকাশীয় ‘ছায়াযুদ্ধ’ বা গ্রে জোন ট্যাকটিকস ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত চলতি বছরের ১৭ এপ্রিল। রাশিয়া প্লিসেটস্ক সামরিক মহাকাশ কেন্দ্র থেকে সয়ুজ-২.১বি রকেটের মাধ্যমে কয়েকটি সামরিক স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করে, যেগুলোর নাম দেওয়া হয় কসমস-২৬১০ থেকে কসমস-২৬১৪। শুরুতে স্যাটেলাইটগুলো ভিন্ন কক্ষপথে অবস্থান করলেও ১৪ থেকে ২০ মে-র মধ্যে এগুলো হঠাৎ নিজেদের গতি ও কক্ষপথ পরিবর্তন করতে শুরু করে। স্যাটেলাইটের কক্ষপথের কৌণিক অবস্থান (ইনক্লিনেশন) পরিবর্তন করতে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি প্রয়োজন হয়। সাধারণ গবেষণামূলক কাজের জন্য কোনো দেশ অকারণে এমন ব্যয়বহুল কৌশল গ্রহণ করে না।
মহাকাশ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ইন্টেগ্রিটির আইএসআর ও কমসপিওসির তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া তাদের এই স্যাটেলাইটগুলোর কক্ষপথ পরিবর্তন করে ফিনল্যান্ডের মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ICEYE-এর রাডার স্যাটেলাইট আইসাই এক্স-৩৬-এর একই অরবিটাল প্লেনে নিয়ে আসে।
আইসাই স্যাটেলাইটটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি সিন্থেটিক অ্যাপারচার রাডার (এসএআর) স্যাটেলাইট, যা দিন-রাত, এমনকি ঘন মেঘের মধ্য দিয়েও পৃথিবীর উচ্চমানের ছবি তুলতে সক্ষম। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক ইউক্রেনীয় বাহিনীকে গোয়েন্দা তথ্য ও মানচিত্র সরবরাহ করছে, যা যুদ্ধক্ষেত্রে রুশ সেনাদের অবস্থান শনাক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
গত ২৯ মে রাশিয়ার কসমস-২৬১৪ স্যাটেলাইটটি আইসাই এক্স-৩৬-এর মাত্র ১৩ থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরত্বে চলে আসে। মহাকাশের বিশালতা এবং প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ২৮ হাজার কিলোমিটার গতিতে চলমান দুটি বস্তুর ক্ষেত্রে এই দূরত্ব অত্যন্ত কম এবং ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি নিছক কাকতালীয় নয়। বরং প্রতিপক্ষের স্যাটেলাইটকে খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ, প্রয়োজন হলে তার সিগন্যাল জ্যাম করা কিংবা মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরির কৌশল হিসেবেই রাশিয়া এই পদক্ষেপ নিয়েছে।
প্রশ্ন উঠতেই পারে—তাহলে কি যুদ্ধ সত্যিই মহাকাশে পৌঁছে গেছে? সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো—হ্যাঁ, তবে সেটি এখনো সরাসরি ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ নয়; বরং এক ধরনের ছায়াযুদ্ধ। প্রচলিত যুদ্ধে যেমন ক্ষেপণাস্ত্র বা বোমার আঘাতে প্রতিপক্ষের সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করা হয়, মহাকাশে এখনো কোনো দেশ অন্য দেশের কার্যকর স্যাটেলাইট ধ্বংস করেনি। কারণ একটি স্যাটেলাইট ধ্বংস হলে লাখ লাখ স্পেস ডেব্রিস বা মহাকাশ বর্জ্য তৈরি হতে পারে, যা দীর্ঘ সময়ের জন্য পুরো মহাকাশ পরিবেশকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে। তাই আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে মহাকাশকে ব্যবহার করা হচ্ছে আরও সূক্ষ্ম ও কৌশলী উপায়ে।
প্রথমত, সাইবার আক্রমণ ও সিগন্যাল জ্যামিং। ২০২২ সালে ইউক্রেনে হামলার পরপরই রাশিয়ার পক্ষ থেকে ভিয়াস্যাট স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কে বড় ধরনের সাইবার হামলা চালানো হয়। বর্তমানে জিপিএস সিগন্যাল জ্যাম করা কিংবা ইলন মাস্কের স্টারলিংক ইন্টারনেট সেবায় বিঘ্ন সৃষ্টি করা অনেক সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে প্রায় নিয়মিত ঘটনা।
দ্বিতীয়ত, বাণিজ্যিক স্যাটেলাইটও এখন সামরিক লক্ষ্যবস্তু। আগে মূলত রাষ্ট্রীয় সামরিক স্যাটেলাইট যুদ্ধের অংশ ছিল। এখন ম্যাক্সার, প্ল্যানেট ল্যাবস কিংবা আইসাইয়ের মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইউক্রেনকে গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য দিচ্ছে। ফলে মস্কো আনুষ্ঠানিকভাবেই ঘোষণা দিয়েছে, ইউক্রেনকে সহায়তা করা যেকোনো বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট তাদের কাছে ‘বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তু’।
তৃতীয়ত, মহাকাশে প্রতিপক্ষকে অনুসরণ বা অরবিটাল স্টকিং। রাশিয়ার কসমস স্যাটেলাইটের সাম্প্রতিক ঘটনাকে বলা হয় রঁদেভু অ্যান্ড প্রক্সিমিটি অপারেশনস (আরপিও)। এই কৌশলে প্রতিপক্ষের স্যাটেলাইটের খুব কাছাকাছি নিজের স্যাটেলাইট অবস্থান করানো হয়, যাতে প্রয়োজন হলে সেটিকে পর্যবেক্ষণ, জ্যাম কিংবা অন্য উপায়ে নিষ্ক্রিয় করার সুযোগ তৈরি থাকে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ক্ষেপণাস্ত্রের বিস্ফোরণ এখনো মহাকাশে না ঘটলেও স্যাটেলাইটের কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তন, সিগন্যাল জ্যামিং, সাইবার হামলা এবং গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে আধুনিক যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ইতোমধ্যেই পৃথিবীর গণ্ডি পেরিয়ে মহাশূন্যে বিস্তৃত হয়েছে। আগামী দিনের ভূরাজনীতিতে মহাকাশ আর শুধু বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের ক্ষেত্র নয়, বরং ক্রমেই পরিণত হচ্ছে পরাশক্তিগুলোর নতুন প্রতিযোগিতা ও নীরব সংঘাতের মঞ্চে।
মন্তব্য করুন

