Logo

৪ কার্তিক ১৪৩৩

×

Follow Us

প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে হারিয়ে যাওয়া শিশুরা কোথায় যাচ্ছে!

মত-দ্বিমত

প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে হারিয়ে যাওয়া শিশুরা কোথায় যাচ্ছে!

দীপু মাহমুদ

Icon

দীপু মাহমুদ

প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৫৯ পিএম

ময়মনসিংহের ঝাপারকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ক্লাসে ৩০ জুলাই দুপুরে বসে ছিল মাত্র ১০ জন শিশু। একটি শ্রেণিকক্ষ যে এমন ছোট্ট হয়ে যেতে পারে, সেটাই যেন আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার বড় সংকেত। সেই বিদ্যালয়ে শিক্ষক থাকার কথা ছয়জন, আছেন মাত্র দুজন। ময়মনসিংহ জেলার ১৮৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন জরাজীর্ণ। ২৭টি বিদ্যালয়ে এখনো টিনশেড ভবনে পাঠদান চলছে। আর পুরো জেলায় এক বছরের ব্যবধানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কমেছে ১ লাখ ১২ হাজার ৭৪৬ জন। 

এটাকে কি শুধু ময়মনসিংহের ঘটনা বলা যায়! মোটেই তেমন নয়। বরং ময়মনসিংহের ঘটনাটি জাতীয় একটি বড় সংকটের ছোট্ট উদাহরণ মাত্র।

সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী ছিল ১ কোটি ৬ লাখ ৯ হাজার ৫২ জন। ২০২৬ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৯৯ লাখ ২৩ হাজার ৮২২ জনে। অর্থাৎ মাত্র এক বছরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে কমেছে ৬ লাখ ৮৫ হাজার ২৩০ জন শিক্ষার্থী। 

ছয় লাখ ৮৫ হাজার- সংখ্যাটি কাগজে লিখলে একটি পরিসংখ্যান। কিন্তু এটাকে যদি ছয় লাখ ৮৫ হাজার শিশুর মুখ হিসেবে দেখি, তাহলে প্রশ্নটি ভয়াবহ হয়ে ওঠে: এই শিশুরা কোথায় গেল?

কেউ অন্য স্কুলে গেছে, কেউ কিন্ডারগার্টেনে, কেউ মাদ্রাসায়। কেউ হয়তো পরিবারের সঙ্গে অন্য এলাকায় চলে গেছে। কিন্তু সবাই যে অন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গেছে, তা নয়। একটি অংশ স্কুল থেকে ঝরে পড়েছে; একটি অংশ শিশুশ্রমে ঢুকে পড়ার ঝুঁকিতে আছে। ময়মনসিংহের মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানেও এমন চিত্র উঠে এসেছে- অভিভাবকেরা সন্তানদের মাদ্রাসা, ইবতেদায়ি মাদ্রাসা, কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি বিদ্যালয়ে নিচ্ছেন; আবার কিছু শিশু শ্রমে যুক্ত হচ্ছে বা পরিবারের সঙ্গে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। 

এখানেই জাতীয় উদ্বেগের জায়গাটি সবচেয়ে গভীর। কারণ, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ৬ লাখ ৮৫ হাজার কমেছে- এর অর্থ এই নয় যে ৬ লাখ ৮৫ হাজার শিশুই স্কুল ছেড়ে কাজে গেছে। এমন কোনো নির্ভরযোগ্য জাতীয় পরিসংখ্যান এখনো পাওয়া যায়নি। কিন্তু একই সময়ে দেশে শিশুশ্রমের পরিস্থিতি যে উদ্বেগজনক দিকে যাচ্ছে, তার শক্ত প্রমাণ আছে।

ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর MICS 2025-এর প্রাথমিক ফল অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে শিশুশ্রমে যুক্ত হওয়ার হার বেড়ে হয়েছে ৯ দশমিক ২ শতাংশ; ২০১৯ সালে এই হার ছিল ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। ইউনিসেফ বলছে, এর ফলে আগের তুলনায় প্রায় ১২ লাখ বেশি শিশু শিশুশ্রমের ঝুঁকিতে পড়েছে। 

অর্থাৎ একদিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশু কমছে, অন্যদিকে শিশুশ্রমের হার বাড়ছে। এই দুই প্রবণতাকে পরস্পরের কারণ হিসেবে সরাসরি ঘোষণা করার মতো প্রমাণ আমাদের হাতে নেই। কিন্তু তাদের একই সময়ে, একই সমাজে ঘটে চলা ঘটনাকে উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই।

বিশেষ করে ছেলেদের ক্ষেত্রে সম্পর্কটি আরও স্পষ্ট। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (CPD) উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, আর্থিক চাপের কারণে শিশুশ্রম বাড়ায় ছেলেদের স্কুল থেকে ঝরে পড়ার হার বেশি। ২০২৫ সালে ২০২৪ সালের তুলনায় প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীসংখ্যা কমেছে ৭ শতাংশ। 

অর্থাৎ, আমাদের সামনে শুধু ‘স্কুলে ভর্তি’ নিয়ে সমস্যা নেই; সমস্যা হচ্ছে শিশু স্কুলে টিকে থাকছে কিনা।

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার সাফল্য আমরা দীর্ঘদিন ধরে মূলত ভর্তি ও বিদ্যালয়ে প্রবেশের হার দিয়ে বিচার করেছি। কিন্তু একজন শিশু স্কুলে ভর্তি হলো, তারপর ধীরে ধীরে অনুপস্থিত হতে থাকল, শেষে আর ফিরল না- এই অদৃশ্য যাত্রাপথটি আমরা কতটা অনুসরণ করেছি?

ময়মনসিংহের চিত্রটি এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য যথেষ্ট। জেলায় ২০২১ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিল প্রায় ৫ লাখ ৪৮ হাজার। ২০২২ সালে তা নেমে যায় ৪ লাখ ২৭ হাজারে। পরে কিছুটা বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৫ সালে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৩৮ হাজার ৫৬৮ জনে। কিন্তু ২০২৬ সালে আবার তা নেমে এসেছে ৪ লাখ ২৫ হাজার ৮২২ জনে। এক বছরে পতন ১ লাখ ১২ হাজার ৭৪৬। শুধু তা-ই নয়, জেলায় প্রাথমিক পর্যায়ে ঝরে পড়ার হার ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ; গফরগাঁওয়ে প্রায় ৪ দশমিক ৬ শতাংশ এবং তারাকান্দায় ৪ শতাংশ। 

গফরগাঁওয়ের ছবিটিও আমাদের ভাবায়। ২০২০ সালে সেখানে প্রাথমিক শিক্ষার্থী ছিল ৬০ হাজার ৮১৫ জন; ২০২৬ সালে তা কমে হয়েছে ৩৫ হাজার ২৭ জন। 

এত শিশু কমে যাওয়ার পেছনে কি শুধু জনসংখ্যাগত পরিবর্তন দায়ী? নিশ্চয়ই পুরো ব্যাখ্যা সেখানে নেই।

আরেকটি জাতীয় প্রবণতাও এখানে বিবেচনায় নিতে হবে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থী কমেছে ২০ লাখ ৭১ হাজার। একই সময়ে সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে শিক্ষার্থী কমলেও মাদ্রাসা শিক্ষায়, বিশেষ করে কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী বাড়ছে।

এর অর্থ এই নয় যে মাদ্রাসায় যাওয়া শিশুরা শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে চলে যাচ্ছে। বরং এটা অভিভাবকদের পছন্দের পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। অনেক পরিবার মনে করছে, সাধারণ বিদ্যালয়ের তুলনায় মাদ্রাসায় পড়াশোনার পাশাপাশি থাকা-খাওয়ার খরচ কম, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা পাওয়া যায় এবং নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য আবাসিক মাদ্রাসা এক ধরনের নিরাপদ আশ্রয়ের ভূমিকা পালন করে। 

অন্যদিকে কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি বিদ্যালয়ের প্রতিও অভিভাবকদের আকর্ষণ বাড়ছে। ফলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কমার প্রতিটি ঘটনাকে ‘ঝরে পড়া’ বলে দেখাও ভুল হবে।

কিন্তু এখানেই সরকারের দায়িত্ব আরও বাড়ে। কারণ, শিক্ষার্থী কমছে- কিন্তু কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে- এই প্রশ্নের উত্তর রাষ্ট্রের কাছে থাকা উচিত।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর বলছে, শিক্ষার্থী কমার কারণ যাচাই করতে গবেষণা ও মনিটরিং করা হচ্ছে; উপস্থিতি বাড়াতে মিড ডে মিল, বিনা মূল্যে পোশাকসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। 

এসব উদ্যোগ প্রয়োজনীয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শিশু চলে যাওয়ার পর তাকে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা কোথায়?

একজন শিশুর অনুপস্থিতি তিন দিন, সাত দিন বা এক মাস হলে বিদ্যালয়ের শিক্ষক কি বাড়িতে যান? পরিবার কেন শিশুকে স্কুলে পাঠাচ্ছে না- তার কারণ কি নথিভুক্ত হয়? শিশু কি কাজে গেছে? পরিবার কি অন্য জেলায় চলে গেছে? অন্য স্কুলে ভর্তি হয়েছে? মাদ্রাসায় গেছে? নাকি কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই নেই?

প্রত্যেক শিশুর জন্য যদি এমন একটি ‘ট্র্যাকিং ব্যবস্থা’ না থাকে, তাহলে জাতীয় পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যা দেখাবে; শিশুর জীবন দেখাবে না।

এ ক্ষেত্রে ময়মনসিংহের আরেকটি তথ্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংকট আছে; একটি বিদ্যালয়ে অনুমোদিত ছয়টি পদের বিপরীতে শিক্ষক মাত্র দুজন। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষকের পক্ষে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি, অনুপস্থিতি, পারিবারিক অবস্থা ও ঝরে পড়ার ঝুঁকি নিয়মিত অনুসরণ করা কঠিন। 

অথচ প্রাথমিক বিদ্যালয় শুধু পড়াশোনার জায়গা নয়; এটা রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সুরক্ষা কাঠামোগুলোর একটি। একজন শিশু নিয়মিত স্কুলে থাকলে তার সঙ্গে শিক্ষক, সহপাঠী, বই, খেলাধুলা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক পরিবেশের একটি সম্পর্ক তৈরি হয়। স্কুল থেকে বেরিয়ে গেলে সেই সুরক্ষার অনেকগুলো স্তর একসঙ্গে দুর্বল হয়ে যায়।

বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের শিশুর ক্ষেত্রে ঝুঁকিটি বেশি। পরিবারের আয় কমে গেলে প্রথমে হয়তো স্কুলের খরচ বাঁচানোর কথা মনে হয়, পরে শিশুকে কাজে পাঠানোর সিদ্ধান্ত আসে। আর একবার শিশুর হাতে উপার্জনের টাকা এলে তাকে আবার স্কুলে ফেরানো কঠিন হয়ে পড়ে।

এই কারণেই শিশুশ্রম শুধু শ্রম মন্ত্রণালয়ের সমস্যা নয়; এটা শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, সমাজকল্যাণ ব্যবস্থা এবং স্থানীয় প্রশাসনেরও সমস্যা।

আইএলওর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ ২০২২-এ প্রায় ১৭ লাখ শিশু শিশুশ্রমে যুক্ত থাকার তথ্য পাওয়া যায়; এর মধ্যে প্রায় ১১ লাখ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমে ছিল।  ২০২৫ সালের MICS-এর নতুন তথ্য সেই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়েছে।

তাই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হচ্ছে হারিয়ে যাওয়া শিশুর হিসাব করা।

২০২৫ থেকে ২০২৬- সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে যে ৬ লাখ ৮৫ হাজার শিশু কমেছে, তাদের প্রত্যেকের গন্তব্য জানা দরকার। কতজন অন্য বিদ্যালয়ে গেছে, কতজন মাদ্রাসায়, কতজন কিন্ডারগার্টেনে, কতজন পরিবারের সঙ্গে স্থানান্তরিত হয়েছে, কতজন ঝরে পড়েছে এবং কতজন কাজে যুক্ত হয়েছে- এ তথ্য ছাড়া ‘শিক্ষার্থী কমেছে’ বলা অসম্পূর্ণ।

একই সঙ্গে প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা শিশুর তালিকা তৈরি করা প্রয়োজন। বিদ্যালয়, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা প্রশাসন ও সমাজসেবা ব্যবস্থাকে যুক্ত করে ‘কোনো শিশু অদৃশ্য নয়’- এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

শিক্ষার মানও এখানে বড় বিষয়। অভিভাবক যদি মনে করেন, সরকারি স্কুলে সন্তান যথেষ্ট শিখছে না, তাহলে তারা অন্য বিকল্প খুঁজবেন। সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো আমাদের ইতিমধ্যেই দেখিয়েছে, প্রাথমিক পর্যায়ে শেখার ঘাটতি গুরুতর। তাই শুধু বিদ্যালয়ে শিশুকে ধরে রাখলেই হবে না; বিদ্যালয়টিকে তার কাছে অর্থবহ, নিরাপদ ও কার্যকর করে তুলতে হবে।

ময়মনসিংহের সেই তৃতীয় শ্রেণির ১০জন শিশুকে তাই কেবল একটি ছোট শ্রেণিকক্ষের ১০ জন শিক্ষার্থী হিসেবে দেখা যাবে না। তাদের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে একটি বড় প্রশ্ন- আমরা কি জানি, গত এক বছরে আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে হারিয়ে যাওয়া লাখ লাখ শিশুর কী হয়েছে?

যদি না জানি, তবে এখনই জানতে হবে।কারণ একজন শিশু স্কুল থেকে হারিয়ে যাওয়ার অর্থ শুধু একটি নাম উপস্থিতির খাতা থেকে মুছে যাওয়া নয়। তার অর্থ হতে পারে- একজন শিশুর শিক্ষা থেমে যাওয়া, শৈশব ছোট হয়ে যাওয়া, কিংবা তার হাতে বইয়ের বদলে শ্রমের বোঝা উঠে যাওয়া।

ছয় লাখ ৮৫ হাজার কোনো নিছক সংখ্যা নয়। তারা ছয় লাখ ৮৫ হাজার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ। রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব হলো- তাদের একজনকেও অদৃশ্য হতে না দেওয়া।

মন্তব্য করুন

Logo