Logo

১ ভাদ্র ১৪৩৩

×

Follow Us

প্রতিষ্ঠান ছোট হলে আম্মাররা বড় হয়

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সালাহউদ্দিন আম্মারের নেতৃত্বে লাইব্রেরিতে ঢুকে শিক্ষার্থীদের উপর হামলা

মত-দ্বিমত

প্রতিষ্ঠান ছোট হলে আম্মাররা বড় হয়

ড. লুবনা ফেরদৌসী

Icon

ড. লুবনা ফেরদৌসী

প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৬, ০৩:৩৯ পিএম

একটা সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রনেতারা লাইব্রেরিতে যেতেন বই নিতে। এখন খবরের শিরোনাম দেখে মনে হয়, লাইব্রেরিতে তাঁরা অভিযানে যান।
আমরা ছোটবেলায় শুনতাম, বিশ্ববিদ্যালয় হলো মুক্তবুদ্ধির জায়গা। এখানে যুক্তি দিয়ে মানুষকে পরাজিত করতে হয়, লাঠি দিয়ে নয়; বিতর্ক দিয়ে মতের বিরোধিতা করতে হয়, মব দিয়ে নয়। এখন মনে হচ্ছে, সেই সিলেবাসটা নীরবে বদলে গেছে। নতুন কোর্সের নাম: How to Become More Powerful Than the Institution।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে এই সময়ের ঘটনাগুলো কোনো একক ছাত্রনেতার গল্প নয়। এগুলো শুধু একজন ‘আম্মার’-এর গল্পও নয়। এগুলো এমন এক রাষ্ট্রের গল্প, যেখানে প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে নিজের কর্তৃত্ব হারাচ্ছে, আর ব্যক্তি ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানের জায়গা দখল করছে।

আমরা ভুল প্রশ্ন করতে অভ্যস্ত। আমরা জিজ্ঞেস করি, আম্মার এমন হলো কেন? অথচ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রশ্ন হওয়া উচিত, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন পরিবেশ তৈরি হলো কীভাবে, যেখানে একজন ছাত্রনেতার নাম শুনে প্রশাসন অস্বস্তিতে পড়ে, শিক্ষকরা কথাবার্তা মেপে বলেন, আর আইন নিজের পথ খুঁজে পায় না?

কোনো মানুষ একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে মব জাস্টিসের প্রতীক হয়ে ওঠে না। তাকে তৈরি করা হয়। প্রতিদিন একটু একটু করে—প্রতিটি নীরবতা, প্রতিটি অমীমাংসিত তদন্ত, প্রতিটি দায়হীনতার মাধ্যমে। প্রতিবার যখন প্রশাসন ভাবে, ‘এখন না, পরে দেখা যাবে’, তখনই ভবিষ্যতের আরেকজন অনানুষ্ঠানিক শাসকের ভিত্তিপ্রস্তর বসে যায়।

আমরা ব্যক্তি দেখি, প্রতিষ্ঠান দেখি না। অথচ সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, ব্যক্তি প্রায়ই প্রতিষ্ঠানের উপসর্গ, কারণ নয়। ম্যাক্স ভেবার রাষ্ট্রকে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন বৈধ বলপ্রয়োগের একচেটিয়া কর্তৃত্ব হিসেবে। বিশ্ববিদ্যালয় সেই নীতিরই ক্ষুদ্র সংস্করণ। সেখানে শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব প্রশাসনের, বিচার করার দায়িত্ব নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের, আর আইন প্রয়োগের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। যখন এই কর্তৃত্ব দুর্বল হয়ে যায়, তখন সেই শূন্যস্থান কখনো খালি থাকে না। খুব দ্রুত সেটি দখল করে নেয় ব্যক্তি, দল বা মব।

এই কারণেই আম্মার কী করেছে, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো—সে কেন বিশ্বাস করতে পারল যে, সে এটা করতে পারবে? এই ‘পারব’ মানসিকতা কোনো ব্যক্তিগত সাহসের ফল নয়। এটি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার সবচেয়ে নির্ভুল সূচক।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসও এই শিক্ষা দেয়। বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বহুবার সহিংসতার কেন্দ্র হয়েছে। আশির দশক থেকে শিবিরের বিরুদ্ধে টেন্ডন কেটে দেওয়ার রাজনীতি, প্রতিপক্ষের ওপর সংঘবদ্ধ হামলা, অস্ত্রের ব্যবহার এবং ক্যাম্পাসে সশস্ত্র আধিপত্যের অভিযোগ বহুবার উঠে এসেছে। পরবর্তী দশকগুলোতে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে অন্য ছাত্রসংগঠনও একই সংস্কৃতি অনুসরণ করেছে। এখানে সমস্যা শুধু একটি সংগঠনের নয়; সমস্যা হলো, ক্ষমতা যখন প্রতিষ্ঠানকে প্রতিস্থাপন করে, তখন প্রায় সব সংগঠনই একই ভাষা শিখে ফেলে।

এই কারণেই আমি ব্যক্তি নয়, দূষিত সংস্কৃতিকে ভয় পাই। কারণ ব্যক্তি বদলায়, সংস্কৃতি থেকে যায়। আজ যদি একজন ছাত্রনেতা লাইব্রেরিতে ঢুকে নিজের রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষকে শাস্তি দেওয়ার নৈতিক অধিকার অনুভব করে, তাহলে আগামীকাল আরেকজন অন্য মতাদর্শ নিয়ে একই কাজ করবে।

তখন শুধু মুখ বদলাবে, মব একই থাকবে। আর এই ঘটনাগুলো ঘটছে এমন এক সময়ে, যখন বলা হচ্ছে, ছাত্রসংসদ পুনরুদ্ধার হয়েছিল শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব, গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ এবং জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার আশায়।
দ্য ডেইলি স্টার ও নিউ এজ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো দেখলাম। আম্মারের এই বেপরোয়া হয়ে ওঠার সঙ্গে এমন একটি পরিবেশের চিত্র উঠে এসেছে, যেখানে শিক্ষকরা নাকি নিজেদের কথাও সাবধানে বলেন, তদন্ত কমিটি মাসের পর মাস ঝুলে থাকে, প্রশাসন ঘটনার পর প্রতিক্রিয়া জানায়, কিন্তু আগেভাগে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট—যেখানে প্রতিষ্ঠান দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমানভাবে কাজ করে, সেখানে ব্যক্তি এত সহজে প্রতিষ্ঠানের বিকল্প হয়ে উঠতে পারে না।

কিন্তু সরকারের নীরবতাও এখানে রাজনৈতিক। গণতন্ত্রে নীরবতা অনেক সময় বক্তব্যের চেয়েও শক্তিশালী। রাষ্ট্র যদি স্পষ্টভাবে না বলে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়, তাহলে সেই নীরবতা ধীরে ধীরে এক ধরনের রাজনৈতিক বার্তায় পরিণত হয়—যতক্ষণ তুমি আমাদের জন্য অস্বস্তিকর নও, ততক্ষণ তোমার জন্য নিয়মও অস্বস্তিকর হবে না। এভাবেই Rule of Law ধীরে ধীরে Rule of Influence-এ পরিণত হয়।

দুঃখজনক হলো, ছাত্রসংসদের ধারণাটাই বদলে যাচ্ছে। ছাত্রদের আবাসন, গবেষণা, মানসিক স্বাস্থ্য, স্বাস্থ্যসেবা, একাডেমিক স্বাধীনতা, লাইব্রেরি, ল্যাব, ইন্টারনেট, শিক্ষার মান—এসব প্রশ্ন পেছনে চলে যাচ্ছে। সামনে চলে আসছে শক্তি প্রদর্শন, রাজনৈতিক লেবেলিং, শত্রু চিহ্নিত করা এবং কে কাকে ক্যাম্পাস থেকে সরাবে—এই প্রতিযোগিতা।

একটা সময় ছাত্রনেতারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনীতি করতেন। এখন কখনো কখনো মনে হয়, বিশ্ববিদ্যালয়টাই ছাত্রনেতাদের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভবিষ্যতের মঞ্চ হয়ে যাচ্ছে।

ব্যঙ্গচিত্রে কাঁধে আঁকা রাইফেলটি নিয়ে আপত্তি তুলেছেন অনেকে। কিন্তু ব্যঙ্গচিত্রের কাজই হলো ক্ষমতার প্রতীক আঁকা। ভিডিওতে যদি হাতে কোদালও থাকে, কিন্তু সেই কোদাল যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, প্রশাসন এবং ভয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে, তাহলে শিল্পীর আঁকা রাইফেল বাস্তবের চেয়েও সত্য হতে পারে। কারণ শিল্প ক্ষমতার মনস্তত্ত্ব আঁকে।

তবে কার্টুনটির সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ অবশ্য বন্দুক নয়। সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ হলো পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট ছোট অস্পষ্ট মানুষের অবয়ব। ওরা প্রশাসন, ওরা নীরব শিক্ষক, ওরা তদন্ত কমিটি। ওরা সেই রাষ্ট্র, যারা দাঁড়িয়ে দেখছে, কিন্তু এগিয়ে আসছে না। এই কারণেই কার্টুনটি একজন আম্মারের ছবি নয়; এটি বাংলাদেশের দুর্বল প্রতিষ্ঠানের প্রতিকৃতি।

একজন আম্মার গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সংকট নয়। সবচেয়ে বড় সংকট হলো এমন এক রাষ্ট্র, যেখানে একজন আম্মারের জন্ম নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক শর্ত ধীরে ধীরে তৈরি হয়ে যায়। ইতিহাসে কোনো ব্যক্তিই প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বড় নয়।

কিন্তু প্রতিষ্ঠান যদি ছোট হয়ে যায়, তাহলে ইতিহাস বারবার নতুন নতুন আম্মার তৈরি করে। আর তখন সমস্যা আর কোনো এক ব্যক্তির থাকে না। সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়—বিশ্ববিদ্যালয় এখনও বিশ্ববিদ্যালয় আছে, নাকি ধীরে ধীরে শক্তিশালীদের ব্যক্তিগত রাজত্বে পরিণত হচ্ছে?

ড. লুবনা ফেরদৌসী: শিক্ষক ও গবেষক

মন্তব্য করুন

Logo