সি এস ইমতিয়াজ
প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬, ০২:৪১ পিএম
দিল্লির যন্তর মন্তরের একটি তাঁবুর ভেতরে উনষাট বছরের একজন মানুষ শুয়ে আছেন। আজ তাঁর না-খাওয়ার উনিশতম দিন।[শেষ খবর: সোনম ওয়াংচুককে পুলিশ জোর করে হাসপাতালে উঠিয়ে নিয়ে গেছে]
সোনম ওয়াংচুক। লাদাখের প্রকৌশলী ও শিক্ষা-সংস্কারক। জনপ্রিয় চলচ্চিত্র থ্রি ইডিয়টস-এর ফুংসুক ওয়াংড়ু চরিত্রটি নির্মিত হয়েছিল তাঁকে অনুপ্রেরণা করেই।
গত ২৮ জুন থেকে তিনি অনির্দিষ্টকালের অনশনে। তিনি একা নন। একই ক্যাম্পে আরও কয়েকজন তরুণ অনশন করছেন। তাঁদের একজন গত সোমবার জ্ঞান হারিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
তাঁবুর চারপাশে প্রতিদিন কয়েক শ মানুষ অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেন। সন্ধ্যা নামলে সেই সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যায়। বর্ষার বৃষ্টির মধ্যেও সপ্তাহের পর সপ্তাহ তাঁরা খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছেন।
তাঁদের একটাই দাবি—ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ভারতের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম—সবখানেই এই অনশন আলোচনার বিষয়। বিরোধী নেতারাও প্রকাশ্যে ওয়াংচুককে অনশন ভাঙার আহ্বান জানিয়েছেন।
কিন্তু যার পদত্যাগ দাবি করা হচ্ছে, সেই মন্ত্রী এবং তাঁর মন্ত্রণালয়? উনিশ দিন পেরিয়ে গেলেও একটি মন্তব্যও করেনি।
গত ৩ মে ভারতে অনুষ্ঠিত হয় মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা নিট-ইউজি। পরীক্ষার্থী ছিল ২২ লাখ ৭৯ হাজার। পরীক্ষা কেন্দ্র সাড়ে পাঁচ হাজারেরও বেশি; ভারতের বাইরে দোহা, দুবাই, সিঙ্গাপুর ও কাঠমান্ডুতেও পরীক্ষা নেওয়া হয়।
অথচ সারা দেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে মেডিকেল আসন এক লাখ ত্রিশ হাজারেরও কম। অর্থাৎ প্রতি সতেরো জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে সুযোগ পাবে মাত্র একজন।
ছবি: প্রশ্ন ফাঁসের বিরুদ্ধে ভারতে আন্দোলন চলছে পরীক্ষার আগেই হাতে লেখা একটি ‘গেস পেপার’ ঘুরে বেড়াচ্ছিল। পরীক্ষা শেষে দেখা গেল, সেই গেস পেপারের সঙ্গে আসল প্রশ্নপত্রের মিল অস্বাভাবিকভাবে বেশি। রাজস্থান পুলিশের তদন্তে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে থাকে প্রশ্নফাঁসের জাল।
মাত্র নয় দিনের মাথায়, ১২ মে, পুরো পরীক্ষাই বাতিল ঘোষণা করা হয়।
তদন্তভার যায় সিবিআইয়ের হাতে। গ্রেপ্তার হন খোদ পরীক্ষা পরিচালনাকারী সংস্থা এনটিএর কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী। পুনের এক রসায়নের প্রভাষককে শনাক্ত করা হয় মূল অভিযুক্ত হিসেবে।
তদন্তকারীদের হিসাবে, ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র কোচিং সেন্টার ও দালালচক্রের মাধ্যমে ১০ থেকে ২৫ লাখ রুপিতে বিক্রি হয়েছে।
এই দামেরও একটি অর্থনীতি আছে।
ভারতে সরকারি মেডিকেল কলেজে পড়ার খরচ তুলনামূলকভাবে নামমাত্র। একই ডিগ্রি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিতে খরচ পড়ে প্রায় এক কোটি রুপি।
অর্থাৎ একটি সরকারি মেডিকেল আসনের বাজারমূল্য কার্যত এক কোটি রুপি। সেখানে ১০ লাখ রুপির প্রশ্নপত্র সেই এক কোটির সুযোগের ডিসকাউন্ট টিকিট। যত দিন একটি সরকারি আসনের আর্থিক মূল্য এত বিপুল থাকবে, তত দিন প্রশ্নপত্রেরও বাজার থাকবে।
কিন্তু বাতিলের প্রকৃত মূল্য চুকিয়েছে অন্যরা।
ঘোষণার পর অন্তত চারজন পরীক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। তাঁদের একজন রাজস্থানের ২১ বছরের প্রদীপ কুমার। উত্তরপত্র মূল্যায়নের পর তাঁর নম্বর ছিল সাড়ে ছয়শোর বেশি। সরকারি মেডিকেলে ভর্তি প্রায় নিশ্চিত ছিল। দিনমজুর বাবা ছেলের কোচিংয়ের জন্য পৈতৃক জমি বিক্রি করে পাঁচ লাখ রুপিরও বেশি খরচ করেছিলেন।
এ ঘটনাও বিচ্ছিন্ন নয়।
বিরোধী দল ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের হিসাব বলছে, গত এক দশকে ভারতে অন্তত ৮৯টি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। পুনঃপরীক্ষা নিতে হয়েছে ৪৮ বার।
এর মধ্যেই রাজস্থানের এক মন্ত্রী প্রকাশ্যে মন্তব্য করেন, প্রশ্নফাঁস তেমন বড় কোনো বিষয় নয়।
এভাবেই জন্ম হয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র—সংক্ষেপে সিজেপি।
মে মাসে, প্রশ্নফাঁস-কাণ্ডের উত্তপ্ত সময়ে, ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এক শুনানিতে বেকার তরুণদের একাংশকে ‘তেলাপোকা’র সঙ্গে তুলনা করেন। মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বোস্টন ইউনিভার্সিটির ছাত্র অভিজিৎ দিপ সেই গালিকেই রাজনৈতিক পরিচয়ে রূপ দেন। জন্ম হয় সিজেপির।
দলের আত্মপরিচয়—অলস, বেকার এবং ‘চিরকাল-সঠিক’ মানুষদের প্রতিনিধি।
কয়েক দিনের মধ্যেই ইনস্টাগ্রামে তাদের অনুসারীর সংখ্যা দুই কোটির বেশি ছাড়িয়ে যায়।
তবে আসল ঘটনা ঘটেছে অনলাইনে নয়, মাঠে।
দিল্লির যন্তর মন্তরে শুরু হয় তাদের অবস্থান কর্মসূচি, যা এখনো চলছে। দলটির কোনো আনুষ্ঠানিক কাঠামো নেই, নেই কমিটি, নেই তহবিল। সমর্থকেরা নিজেদের খরচে দিল্লিতে আসেন, তাঁবুতে থাকেন, কর্মসূচিতে অংশ নেন।
পুলিশের ব্যারিকেড রয়েছে, তবে এখন পর্যন্ত এই অবস্থান কর্মসূচি জোর করে তুলে দেওয়ার চেষ্টা হয়নি।
আয়োজকদের ভাষায়, আন্দোলনের দাবি এখন শুধু একজন মন্ত্রীর পদত্যাগে সীমাবদ্ধ নেই। বিষয়টি গিয়ে ঠেকেছে আরও বড় প্রশ্নে—পরীক্ষা ব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, রাজনীতি ও সংবাদমাধ্যম; অর্থাৎ যেসব প্রতিষ্ঠানের ওপর ছাত্রসমাজের আস্থা ভেঙে পড়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতে।
সরকারের প্রতিক্রিয়াটিও নথিভুক্ত করে রাখা দরকার।
বাতিল হওয়া নিট পরীক্ষার পুনঃপরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় ২১ জুন। তার আগে টেলিগ্রামে নতুন করে প্রশ্নফাঁসের গুজব ছড়িয়ে পড়লে সরকার ১৬ থেকে ২২ জুন পর্যন্ত সারা ভারতে টেলিগ্রাম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখে। মেসেজ সম্পাদনার সুবিধাও ৩০ জুন পর্যন্ত সীমিত রাখা হয়। টেলিগ্রাম আদালতে গিয়েও স্বস্তি পায়নি।
অন্যদিকে পুনঃপরীক্ষার প্রশ্নপত্র নিরাপদে কেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয় ভারতীয় বিমানবাহিনীকে।
হিসাবটা পাশাপাশি রাখুন।
যে রাষ্ট্র একটি প্রশ্নপত্রের খাম নিরাপদ রাখতে পারেনি, সেই রাষ্ট্র এক সপ্তাহের জন্য ১৪০ কোটিরও বেশি মানুষের ব্যবহৃত একটি যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করে দিতে পারে। অর্থাৎ সমস্যাটি সক্ষমতার নয়; অগ্রাধিকারের।
রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত প্রশ্নপত্র পাহারা দিতে শিখেছে, কিন্তু পরীক্ষার্থীকে নয়।
এই আন্দোলনে সোনম ওয়াংচুকের যোগ দেওয়াই ঘটনাটিকে জাতীয় সংবাদ থেকে আন্তর্জাতিক আলোচনায় নিয়ে গেছে। কেন, তা বুঝতে হলে তাঁর নিজের ইতিহাসটাও জানা দরকার। নইলে এই অনশনের ওজন ধরা যায় না।
ওয়াংচুক লাদাখের মানুষ। ২০১৯ সালে জম্মু ও কাশ্মীর ভেঙে লাদাখকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ঘোষণার পর থেকেই সেখানকার প্রধান দুটি দাবি—পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা এবং সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের সুরক্ষা। যাতে জমি, চাকরি ও পরিবেশের ওপর স্থানীয় মানুষের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত হয়।
এই দাবিতে ওয়াংচুক ২০২৪ সালের মার্চে ২১ দিনের অনশন করেন। একই বছরের অক্টোবরে দিল্লিতেও আরেক দফা অনশন পালন করেন।
ছবি: অনশনে শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুক২০২৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর লেহতে সেই আন্দোলনের একটি বিক্ষোভ সহিংস হয়ে ওঠে। গুলিতে চারজন নিহত হন, আহত হন পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ৪৫ জন। ওয়াংচুক শুরু থেকেই অহিংস আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন। তাঁর স্ত্রীর ভাষ্যমতে, সহিংসতার ঘটনাও তিনি প্রকাশ্যে নিন্দা করেছিলেন।
তবু দুই দিন পর জাতীয় নিরাপত্তা আইনে তাঁকেই ‘প্রধান উসকানিদাতা’ হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়। যে আইনে কোনো বিচার ছাড়াই একজন মানুষকে এক বছর পর্যন্ত আটক রাখা যায়। তাঁকে লাদাখ থেকে প্রায় বারোশো কিলোমিটার দূরের রাজস্থানের যোধপুর কারাগারে পাঠানো হয়।
একই সময়ে লাদাখে কারফিউ জারি হয়, ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শতাধিক তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সরকারের বক্তব্য ছিল, পরিস্থিতি শান্ত।
ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমোর জবাব ছিল একটি বাক্য—‘কবরস্থানের নীরবতা আর মন্দিরের শান্তি এক জিনিস নয়।’
চলতি বছরের ১৪ মার্চ, সুপ্রিম কোর্টে শুনানির কয়েক দিন আগে সরকার নিজেই তাঁর আটকাদেশ প্রত্যাহার করে। ফলে কোনো বিচার ছাড়াই তিনি প্রায় ছয় মাস কারাগারে কাটান।
এই মানুষটি জানেন ভারতে প্রতিবাদের মূল্য কত। সেই মূল্য তিনি নিজের জীবন দিয়েই পরিশোধ করেছেন। তবু মুক্তি পাওয়ার সাড়ে তিন মাসের মাথায় তিনি আবার অনশনে বসেছেন। এবার নিজের লাদাখের দাবিতে নয়, রাজস্থান, বিহার ও উত্তরপ্রদেশের সেই ছেলেমেয়েদের জন্য, যাদের অধিকাংশের সঙ্গেই তাঁর কখনো দেখা হয়নি।
কেন অনশন?
এপি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তাঁর উত্তর ছিল মাত্র একটি বাক্য—‘অনশন না করলে বিকল্প কী? রাস্তায় দাঙ্গা? সেটা তো আমরা চাই না।’
এই একটি বাক্যের মধ্যেই অনশনের পুরো রাজনীতি লুকিয়ে আছে।
আদালতের দরজায় জাতীয় নিরাপত্তা আইন। রাস্তায় নামলে গুলি কিংবা গ্রেপ্তারের আশঙ্কা। সংসদের দরজায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার পাহারা। সব পথ একে একে বন্ধ হয়ে গেলে অহিংস প্রতিবাদের শেষ আশ্রয় হয়ে ওঠে এমন একটি জায়গা, যার ওপর রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই। সেটা নিজের শরীর।
এখানে দুটি বিষয় আলাদাভাবে উল্লেখ করা দরকার।
প্রথমত, ওই চারটি আত্মহত্যার জন্য শুধু প্রশ্নফাঁসকে দায়ী করলে বাস্তবতাকে সরলীকরণ করা হবে। ভারতে ছাত্র আত্মহত্যা বহুদিন ধরেই একটি গভীর সামাজিক সংকট। জাতীয় অপরাধ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বছরে প্রায় ১৪ হাজার শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন ৩৮ জন।
প্রশ্নফাঁস এই সংকটের জন্ম দেয়নি; অনেকের ক্ষেত্রে সেটিই ছিল শেষ ধাক্কা।
দ্বিতীয়ত, আন্দোলনের দাবিটিও আপাতদৃষ্টিতে সীমিত—একজন মন্ত্রীর পদত্যাগ।
কিন্তু একজন মন্ত্রী চলে গেলে আরেকজন আসবেন। সতেরো জনে একজনের সুযোগের সেই বাস্তবতা বদলাবে না। সরকারি মেডিকেলের আসনের অস্বাভাবিক অর্থনৈতিক মূল্যও বদলাবে না। প্রশ্নপত্রের কালোবাজারও হয়তো থাকবে।
তবু ছোট দাবিরও গুরুত্ব আছে। কারণ এমন একটি দাবিও যদি আদায় হয়, তাহলে অন্তত এটুকু প্রমাণ হয় যে জবাবদিহি এখনো পুরোপুরি মৃত হয়ে যায়নি।
এবার বাংলাদেশের কথায় আসা যাক।
আবেদ আলীর নাম মনে আছে? বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সাবেক গাড়িচালক। ২০২৪ সালের ৭ জুলাই একটি বেসরকারি টেলিভিশনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে আসে, বছরের পর বছর ধরে তাঁর নেতৃত্বে একটি চক্র নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বিক্রি করেছে।
তখন যা জানা গিয়েছিল, তা ছিল হিমশৈলের চূড়ামাত্র। পুরো চিত্রটি সামনে আসে চলতি বছরের ১৮ মে আদালতে জমা দেওয়া ৪১ পৃষ্ঠার চার্জশিটে। সেখানে বলা হয়, চক্রটির সূচনা ১৯৯৭ সালে। ওই বছরের ২ ডিসেম্বর আবেদ আলী পিএসসিতে গাড়িচালক হিসেবে যোগ দেন। কমিশনের সদস্যদের গাড়ি চালানোর সুবাদে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে তাঁর অবাধ যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হয়।
প্রথম দিকে ব্যবসা ছিল ডামি পরীক্ষার্থী সরবরাহের। একজন প্রকৃত পরীক্ষার্থীর পরিবর্তে দুইজন ভুয়া পরীক্ষার্থী বসিয়ে দেওয়া হতো। বিনিময়ে নেওয়া হতো এক থেকে দেড় লাখ টাকা। এভাবে চলেছে ২০০৫ সাল পর্যন্ত।
এরপর শুরু হয় সরাসরি প্রশ্নপত্র বেচাকেনা।
সিআইডির ভাষ্য অনুযায়ী, অন্তত ৩০টি নিয়োগ পরীক্ষা, এমনকি ৪৫তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষাও এই চক্রের আওতায় আসে। পদ্ধতিটিও ছিল সুসংগঠিত। পরীক্ষার আগের রাতে ভাড়া করা বাড়ি বা ‘বুথে’ পরীক্ষার্থীদের জড়ো করে ফাঁস হওয়া উত্তর মুখস্থ করানো হতো।
চার্জশিটে আসামি ৫৫ জন। গ্রেপ্তার ৩৬ জন। তালিকায় পিএসসির কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী, ব্যবসায়ী, ছাত্র এবং দালাল—সবাই আছেন।
কিন্তু এই দীর্ঘ কাহিনির সবচেয়ে অস্বস্তিকর তারিখটি ২০১৪ সালের ২২ এপ্রিল। সেদিন একটি নন-ক্যাডার নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তরপত্র সরবরাহের অভিযোগে আবেদ আলীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। অভিযোগ প্রমাণিতও হয়। চাকরিচ্যুত করা হয় তাঁকে। অর্থাৎ রাষ্ট্র তাঁকে চিনেছিল। অপরাধের প্রমাণও পেয়েছিল। শাস্তিও দিয়েছিল। তারপরও একই চক্র আরও এক দশক সক্রিয় ছিল।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ পলিটেকনিকের জুনিয়র ইনস্ট্রাক্টর নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নও ফাঁস হয়।
চার্জশিট অনুযায়ী, পরীক্ষার দুই দিন আগে পিএসসির এক অফিস সহায়কের কাছ থেকে প্রশ্ন সংগ্রহ করে অন্তত ৪০ জন পরীক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। লেনদেন হয় প্রায় ৮০ লাখ টাকা।
প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ধরা পড়ে। সিআইডি তদন্ত করে। আসামিদের কেউ কেউ আদালতে দায় স্বীকার করে জবানবন্দিও দেন। তারপরও ২০২৫ সালের ২৩ জানুয়ারি পিএসসি সেই পরীক্ষার ফল প্রকাশ করে। তিন হাজার ৫৩৪ জনের নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি হয়।
এখানেই দুই দেশের পার্থক্যটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ভারত ২২ লাখ মানুষের একটি পরীক্ষা মাত্র নয় দিনের মধ্যে বাতিল করেছে। তদন্ত দিয়েছে সিবিআইকে। আর সেই তদন্ত ও জবাবদিহির দাবিতে একজন উনষাট বছরের মানুষ উনিশ দিন ধরে অনশন করছেন, দেশ-বিদেশের ক্যামেরার সামনে।
ছবি: বাংলাদেশে প্রশ্ন ফাঁসের একজন হোতা আবেদ আলীআমরা প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার পরও সেই পরীক্ষার ফল প্রকাশ করেছি। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে খবর হয়েছিল, আবেদ আলীর মাধ্যমে যারা বিসিএস ক্যাডার হয়েছেন, তাঁদের তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু সেই তালিকা আজও প্রকাশিত হয়েছে—এমন খবর পাওয়া যায়নি।
তারিখগুলোর দিকেও একবার তাকানো যাক।
আবেদ আলীর ঘটনা প্রকাশ্যে আসে ২০২৪ সালের ৭ জুলাই। 'রাজাকার' মন্তব্য আসে ১৪ জুলাই। মাঝখানে মাত্র সাত দিন। যে প্রজন্ম কোটা সংস্কারের দাবিতে রাস্তায় নেমেছিল, তাদের হাতে তখন আরেকটি প্রমাণও ছিল—রাষ্ট্র নিজেই পরীক্ষা নামের সামাজিক চুক্তি ভেঙে ফেলতে পারে।
তাই যন্তর মন্তরের সেই তাঁবুগুলো আমাদের কাছে একেবারে অচেনা কোনো দৃশ্য নয়।
গল্পটা প্রায় একই। পার্থক্য এই—তাদের মঞ্চে এখনো একজন মানুষ না খেয়ে শুয়ে আছেন। আর আমাদের মঞ্চে বহু প্রতীক্ষিত সেই তালিকাটি এখনো কোনো ড্রয়ারের ভেতরেই রয়ে গেছে।
মন্তব্য করুন

