Logo

১১ শ্রাবণ ১৪৩৩

×

Follow Us

যে মানুষটি স্বাধীনতার ভার কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন

তাজউদ্দীন আহমদের ১০১তম জন্মবার্ষিকী। সংগৃহীত ছবি

দিন-প্রতিদিন

তাজউদ্দীন আহমদ

যে মানুষটি স্বাধীনতার ভার কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন

Icon

প্রীতিলতা রূপকথা

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬, ০১:৩৩ পিএম

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম তথা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব তাজউদ্দীন আহমদ। দায়িত্ববোধ, দূরদর্শিতা ও আত্মত্যাগের এক অনন্য উদাহরন তিনি। ইতিহাসের কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের কণ্ঠস্বরের চেয়ে তাদের নীরবতা অনেক বেশি শক্তিশালী। তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে তিনি জনসমুদ্র মাতানো বক্তা ছিলেন না, কিন্তু নীরবে সংগ্রামের রূপরেখা তৈরিতে তাঁর অবদান প্রবাদসম। পাকিস্তানী বাহিনীর আক্রমণে পুরো জাতি যখন দিশেহারা ঠিক তখন তিনিই হয়ে উঠেছিলেন আমাদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আশ্রয়।

আজ তাজউদ্দীন আহমদের ১০১তম জন্মবার্ষিকী। গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি জাতির এই সূর্যসন্তানকে, যিনি ১৯৭১ সালে জাতির সবচেয়ে সংকটময় সময়ে দৃঢ় নেতৃত্ব দিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে সুসংগঠিত করেছিলেন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রভিত্তি নির্মাণে রেখেছিলেন অবিস্মরণীয় অবদান।

১৯২৫ সালের ২৩ জুলাই গাজীপুর জেলার কাপাসিয়ার দরদরিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তাজউদ্দীন আহমদ। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ছিলেন প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ছয় দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান—প্রতিটি গণতান্ত্রিক সংগ্রামে তিনি ছিলেন সামনের সারির সংগঠক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা হিসেবে তিনি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ভিত্তি সুদৃঢ় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

তবে, তাজউদ্দীন আহমদের প্রকৃত নেতৃত্বের পরিচয় ফুটে ওঠে ১৯৭১ সালে। ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে পাকিস্তানি বাহিনী জেনোসাইডের সূচনাতেই কার্যত নেতৃত্বশূন্য হয়ে পরি আমরা । বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তার হন, যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, চারদিকে অনিশ্চয়তা। এমন এক ভয়াবহ পরিস্থিতিতে অসাধারণ রাজনৈতিক বিচক্ষণতা, সাহস এবং দূরদর্শিতার পরিচয় দেন তাজউদ্দীন আহমদ। জীবনবাজি রেখে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন, আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে উদ্যোগ নেন এবং মুক্তিযুদ্ধকে একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অধীনে পরিচালনার পথ তৈরি করেন।

মাত্র ২০ দিনের ব্যবধানে ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় (বর্তমান মুজিবনগর) স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি এবং তাঁর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি করে তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ইতিহাসে এটি শুধু একটি সরকার গঠনের ঘটনা নয়; এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধকে আন্তর্জাতিকভাবে বৈধতা দেওয়া, যুদ্ধ পরিচালনায় রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা এবং স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রিক পরিচয় নিশ্চিত করার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীর সংগঠন, সেক্টরভিত্তিক যুদ্ধ পরিচালনা, শরণার্থীদের সহায়তা, আন্তর্জাতিক জনমত গঠন, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা—সবকিছুই একটি সুসংহত পরিকল্পনার মাধ্যমে পরিচালিত হতে শুরু করে। তিনি জানতেন, শুধু যুদ্ধে জিতলেই হবে না; যুদ্ধ পরিচালনার জন্য প্রয়োজন একটি কার্যকর রাষ্ট্রীয় কাঠামো। সেই উপলব্ধিই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল।
তিনি ছিলেন দৃঢ়, কিন্তু বিনয়ী। আপসহীন, কিন্তু অহংকারহীন। ক্ষমতার চেয়ে দায়িত্বকে বড় মনে করতেন। ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার চেয়ে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিতেন। রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং প্রশাসনিক সক্ষমতার বিরল সমন্বয় ছিল তাঁর মধ্যে।

স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী হিসেবে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের কঠিন দায়িত্ব পালন করেন। ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে প্রশাসন সচল করা, অর্থনীতি পুনর্গঠন, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন, পুনর্বাসন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মতো দুরূহ কাজগুলোয় তিনি গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব দেন।

কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের এক নির্মম সত্য হলো—যাঁরা দেশর জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, তাঁদের অনেকেই প্রাপ্য সম্মান জীবদ্দশায় পাননি। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতার সঙ্গে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় তাজউদ্দীন আহমদকে। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি এক গভীরতম শোকাবহ অধ্যায়। তাঁর মৃত্যু শুধু একজন নেতার মৃত্যু ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্রচিন্তা, নৈতিক রাজনীতি এবং দূরদর্শী নেতৃত্বের ওপর এক ভয়াবহ আঘাত।

আজ, স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে যখন আমরা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাই, তখন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাজউদ্দীন আহমদের অবদান। তিনি ছিলেন সেই মানুষ, যিনি সংকটের মুহূর্তে নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন সেই রাষ্ট্রনায়ক, যিনি ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার ঊর্ধ্বে উঠে একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক স্থপতিদের অন্যতম এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রশাসনিক ভিত্তি নির্মাণের প্রধান কারিগরদের একজন।

তাজউদ্দীন আহমদের ১০১তম জন্মবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। স্বাধীনতার এই মহানায়ক শুধু ইতিহাসের পাতায় নন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের এক চিরন্তন আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবেন।

মন্তব্য করুন

Logo