সিরাজুল ইসলাম আবেদ
প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬, ১১:৫২ এএম
প্রতিবেদনটি যখন লিখতে বসেছি তখন আমার সামনে আজকের(২৫ জুন) সংবাদপত্রের খবর, গ্রেপ্তারের পরদিন কারাগারে যুবলীগ নেতার মৃত্যু। পরিকল্পিতভাবে হত্যার দাবি পরিবারের। গতকালের সংবাদপত্রে খবর ছিল, রাজধানীর ধানমন্ডি বত্রিশ নম্বরের বঙ্গবন্ধু ভবনের সামনে জামায়াতের কর্মসূচি চলাকালে হামলা চালিয়ে চার সাংবাদিককে আহত করেছে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা।
পত্রিকার পাতা উল্টালে এমন মৃত্যু, হামলা, মব সহিংসতাÑ প্রায় প্রতিদিনের সংবাদ শিরোনাম। এরমধ্যে ২৬ জুন পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নির্যাতনবিরোধী দিবস।
প্রতিবছর ২৬ জুন বিশ্বজুড়ে দিনটি পালিত হয়। এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; বরং নির্যাতনের শিকার লাখো মানুষের প্রতি সংহতি, ন্যায়বিচারের দাবি এবং মানব মর্যাদা রক্ষার এক বৈশ্বিক অঙ্গীকারের দিন। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই আইন, সংবিধান এবং আন্তর্জাতিক চুক্তিতে নির্যাতন নিষিদ্ধ হলেও বাস্তবতা হলো—আজও বহু মানুষ রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, জিজ্ঞাসাবাদ, যুদ্ধ, সশস্ত্র সংঘাত কিংবা নিরাপত্তার অজুহাতে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। মানবসভ্যতা যত আধুনিক হয়েছে, মানবাধিকারের ধারণাও তত বিস্তৃত হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে নির্যাতনের রূপও হয়েছে আরও জটিল, আরও অদৃশ্য। শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি এখন মানসিক নির্যাতন, গুম, অমানবিক আটক, দীর্ঘ সময় একাকী কারাবাস, যৌন সহিংসতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর নিপীড়নের মতো ঘটনাও আন্তর্জাতিক উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। আর সেই জায়গা থেকেই ২৬ জুনের বাধবাধকতা।
কেন ২৬ জুন
১৯৮৪ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ নির্যাতন এবং অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক ও অবমাননাকর আচরণ বা শাস্তির বিরুদ্ধে কনভেনশন গ্রহণ করে। ১৯৮৭ সালের ২৬ জুন যা কার্যকর হয়। ১৯৯৭ সালে এই দিনটিকেই জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক নির্যাতনবিরোধী দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।
কনভেনশনের মূল বার্তা হলো—কোনো অবস্থাতেই নির্যাতন গ্রহণযোগ্য নয়। যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান কিংবা জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন—কোনো কিছুই নির্যাতনকে বৈধতা দিতে পারে না। আন্তর্জাতিক আইনের ভাষায়, নির্যাতন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ অপরাধ।
মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন
মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রের ৫ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “কাউকে নির্যাতন বা নিষ্ঠুর, অমানবিক কিংবা অবমাননাকর আচরণ বা শাস্তির শিকার করা যাবে না।”
নির্যাতনের উদ্দেশ্য সাধারণত তথ্য আদায়, স্বীকারোক্তি আদায়, ভয় সৃষ্টি, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন অথবা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে শাস্তি দেওয়া। কিন্তু বাস্তবে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ। নির্যাতনের ফলে একজন মানুষ শারীরিকভাবে পঙ্গু হয়ে যেতে পারেন, মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারেন, এমনকি সারাজীবনের জন্য ট্রমায় আক্রান্ত হতে পারেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্যাতনের ক্ষত অনেক সময় শরীরের ক্ষতের চেয়েও গভীর হয়। একজন নির্যাতিত ব্যক্তি বছরের পর বছর দুঃস্বপ্ন, বিষণ্নতা, উদ্বেগ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং আত্মবিশ্বাসহীনতায় ভুগতে পারেন। অনেক পরিবারও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বহন করে।
প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ
সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদে অনুসারে বাংলাদেশ স্পষ্টভাবে নির্যাতন ও অমানবিক আচরণ নিষিদ্ধ করেছে। বলা হয়েছে, কাউকে নির্যাতন বা নিষ্ঠুর, অমানবিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড বা আচরণের শিকার করা যাবে না। জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী কনভেনশনেরও সদস্য বাংলাদেশ। এছাড়া ২০১৩ সালে “নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন” প্রণয়ন করা হয়। এই আইনকে মানবাধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, আইন প্রণয়ন হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখনো নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। হেফাজতে নির্যাতন, আটক ব্যক্তিদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায়ের অভিযোগ এবং কিছু ক্ষেত্রে হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন সময় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যুর উদ্বেগ এখনো কাটেনি
নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর মানুষের মধ্যে যখন নতুন করে প্রত্যাশা জন্মে নির্যাতন, হত্যা, হেফাজতে মৃত্যু ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণে আসবে; তখন প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা নতুন করে শঙ্কা তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক নির্যাতনবিরোধী দিবস ২০২৬ এমন এক সময় পালিত হচ্ছে, যখন দেশে মানবাধিকার, হেফাজতে মৃত্যু এবং নির্যাতনের প্রশ্ন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বলছে, জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত মব সহিংসতা ও গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ৮৯ জন। একই সময়ে ২৩৯ নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ৮৫ জনকে। ধর্ষণ-সংক্রান্ত ঘটনায় ২৬ নারী ও শিশুকে হত্যা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ মাসে এক হাজার ৩৫ নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৪৫১ শিশু ও ৫৮৪ নারী। ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২৫০ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৮ জনকে। এছাড়া বিভিন্ন কারণে ২৩৭ নারী ও শিশু হত্যার শিকার হয়েছেন।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, এসব পরিসংখ্যান কেবল নথিভুক্ত ঘটনার চিত্র তুলে ধরে। সামাজিক লজ্জা, ভয় এবং বিচার না পাওয়ার আশঙ্কায় অনেক ঘটনাই প্রকাশ্যে আসে না। ফলে নারী ও শিশু নির্যাতনের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কারাহেফাজতে মৃত্যু
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত সারাদেশে কারা হেফাজতে মারা গেছেন ৫২ জন। তাদের মধ্যে বিচারাধীন বন্দি বা হাজতি ৩৩ জন; সাজাপ্রাপ্ত বন্দি বা কয়েদি ১৯ জন। মৃত্যুর পেছেনে নির্যাতন ও চিকিৎসায় অবহেলার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন এমএসএফর জানুয়ারি ২০২৬-এর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শুধু জানুয়ারি মাসেই ১৫ জনের জেল হেফাজতে মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে গণপিটুনিতে ২১ জন নিহত হওয়ার ঘটনাও নথিভুক্ত করা হয়। এমএসএফের তথ্য অনুযায়ী, শুধু মে মাসে সারাদেশে কারা হেফাজতে ৭ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩ জন কয়েদি এবং ৪ জন হাজতি ছিলেন। আর এইসব মৃত্যু বিচারবহির্ভূত সহিংসতার বিস্তার সম্পর্কে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
গুম, নির্যাতন ও জবাবদিহির প্রশ্ন
২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা বাংলাদেশে গুমের শিকার ব্যক্তিদের জন্য সত্য উদ্ঘাটন, বিচার এবং ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানায়। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, অনুসন্ধান কমিশনের নথি অনুযায়ী ২৫১ জন ব্যক্তি এখনো নিখোঁজ, আর ১,২৮২ জন ব্যক্তি গুম বা অবৈধ আটকের পর ফিরে এসেছেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয় যে, গুমের ঘটনাগুলোর সঙ্গে প্রায়ই শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ জড়িত ছিল।
একই সময়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০২৬ সালের বাংলাদেশবিষয়ক প্রতিবেদনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গ্রেপ্তার, দীর্ঘদিন বিচার ছাড়া আটক রাখা এবং জামিন বঞ্চনার মতো বিষয়গুলো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানবাধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে এখনো কার্যকর জবাবদিহির ঘাটতি রয়ে গেছে।
হেফাজতে ৩৯ জনের মৃত্যু কিংবা কয়েক মাসে একাধিক নির্যাতনজনিত মৃত্যুর ঘটনা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। কিন্তু এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই ঘটনাগুলোর কতগুলো নিরপেক্ষ তদন্তের মুখোমুখি হয়েছে, কতজন ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার পেয়েছে, এবং কতজন দায়ী ব্যক্তি আইনের আওতায় এসেছে?
মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নির্যাতন কেবল কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ নয়; এটি আইনের শাসন, বিচারব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তির বিরুদ্ধে আঘাত। তাই নির্যাতনের প্রতিটি অভিযোগকে গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।
বিশ্বজুড়ে নির্যাতনের বর্তমান চিত্র
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন বলছে, বিশ্বের অনেক দেশেই নির্যাতন চলমান বাস্তবতা। যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চল, স্বৈরশাসিত রাষ্ট্র, সংঘাতপূর্ণ এলাকা এবং দুর্বল বিচারব্যবস্থার দেশগুলোতে এর মাত্রা তুলনামূলক বেশি।
মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকার কিছু অঞ্চল, লাতিন আমেরিকার ও এশিয়ার কিছু রাষ্ট্রে আটক ব্যক্তিদের ওপর নির্যাতন, জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায় এবং বিচারবহির্ভূত দমন-পীড়নের অভিযোগ নিয়মিত। যুদ্ধক্ষেত্রে বন্দিদের ওপর নির্যাতন, যৌন সহিংসতা এবং অমানবিক আচরণের ঘটনাও উঠে এসেছে বিভিন্ন সময়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের আরেকটি বিষয় হলো অভিবাসী, শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীদের প্রতি অমানবিক আচরণ। যুদ্ধ, জলবায়ু সংকট বা রাজনৈতিক নিপীড়নের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষ অনেক সময় সীমান্ত, আটককেন্দ্র বা ট্রানজিট ক্যাম্পে মানবেতর পরিস্থিতির শিকার হন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের নামে দীর্ঘ সময় আটক, গোপন বন্দিশালা এবং আইনবহির্ভূত জিজ্ঞাসাবাদের অভিযোগও রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে, নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, কিন্তু তা এইসব ক্ষেত্রে উপেক্ষিতই হয়েছে। চলতি বছরের শুরুতেই ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলা এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করে তুলে নেওয়া শুধু মানবাধিকার লংঘনই নয়, আন্তর্জাতিক আইনেরও লঙ্ঘন।
নির্যাতনের শিকারদের ন্যায়বিচার ও পুনর্বাসন
নির্যাতনবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসন। অনেক সময় নির্যাতনের ঘটনা প্রমাণ করা কঠিন হয়। আবার অনেক দেশে বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ ও জটিল হওয়ায় ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন।
জাতিসংঘ বলছে, নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের শুধু চিকিৎসা নয়, তাদের আইনি সহায়তা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক পুনর্বাসন এবং ক্ষতিপূরণের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। কারণ নির্যাতনের ক্ষতি কেবল ব্যক্তিগত নয়; এটি পরিবার ও সমাজকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নির্যাতনের শিকারদের জন্য পুনর্বাসন কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। সেখানে চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, সমাজকর্মী এবং আইনজীবীরা সমন্বিতভাবে কাজ করেন। আমাদের মতো দেশে সেটা বোধহয় দিবা স্বপ্নের সমতুল্য।
বড় চ্যালেঞ্জ, বিচারহীনতার সংস্কৃতি
নির্যাতন বন্ধের পথে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো বিচারহীনতা। যখন কোনো অপরাধের জন্য দায়ীদের শাস্তি হয় না, তখন একই ধরনের অপরাধ পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি বাড়ে। বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে নির্যাতনের অভিযোগ তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় নানা জটিলতা রয়েছে। অনেক ভুক্তভোগী ভয়, সামাজিক চাপ কিংবা নিরাপত্তাহীনতার কারণে অভিযোগই করতে পারেন না। অন্যদিকে অভিযুক্তরা যদি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হন, তাহলে বিচার প্রক্রিয়া আরও কঠিন হয়ে ওঠে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার পান না। আর ক্ষমতার পালাবদলে অপরাধী যখন মুক্ত হয়ে যায়, তখন তারা দ্বিগুণ উৎসাহে নিজ জগতে বিচরণ শুরু করে।
নির্যাতনের নতুন রূপ
বর্তমান বিশ্বে নির্যাতন শুধু লাঠি, বেত বা শারীরিক আঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে নিপীড়নের ধরনও বদলেছে। অনলাইন নজরদারি, ডিজিটাল হয়রানি, মানসিক চাপ সৃষ্টি, দীর্ঘ সময় বিচ্ছিন্ন রাখা, ঘুম বঞ্চিত করা, সামাজিকভাবে অপমান করা কিংবা পরিবারের সদস্যদের হুমকি দেওয়ার মতো কর্মকাণ্ডও এখন অনেক ক্ষেত্রে নির্যাতনের পর্যায়ে চলে গিয়েছে। বিশেষ করে নারী, শিশু, জাতিগত সংখ্যালঘু, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, শরণার্থী এবং রাজনৈতিকভাবে দুর্বল জনগোষ্ঠী নির্যাতনের ঝুঁকিতে বেশি থাকে।
মানবতার পক্ষে অবস্থান
নির্যাতনবিরোধী দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানবাধিকার কেবল আইনগত বিষয় নয়; এটি নৈতিকতারও প্রশ্ন। কোনো ব্যক্তি অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত হলেও তার মানবিক মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। আইনের শাসনের অন্যতম মৌলিক নীতি হলো—অপরাধ প্রমাণের আগে কেউ অপরাধী নয়।
যে সমাজে নির্যাতনকে স্বাভাবিক মনে করা হয়, সেখানে আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে। বিপরীতে যে সমাজ মানব মর্যাদাকে সম্মান করে, সেখানে ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়। নেলসন ম্যান্ডেলা একবার বলেছিলেন, “কোনো জাতিকে সত্যিকার অর্থে জানতে চাইলে দেখতে হবে তারা তাদের সবচেয়ে দুর্বল মানুষদের সঙ্গে কেমন আচরণ করে।” এই উক্তি আজও সমান প্রাসঙ্গিক।
কারাগারে থাকা ব্যক্তি, রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বী, শরণার্থী, সংখ্যালঘু কিংবা যে কোনো দুর্বল মানুষের প্রতি আচরণই একটি রাষ্ট্রের মানবিকতার প্রকৃত মানদণ্ড। নির্যাতন কোনো রাষ্ট্র, ধর্ম, মতাদর্শ বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের বৈধ হাতিয়ার হতে পারে না। সভ্যতার অগ্রযাত্রা তখনই অর্থবহ হবে, যখন প্রতিটি মানুষ ভয়মুক্তভাবে বাঁচতে পারবে, যখন কোনো বন্দিশালার অন্ধকারে কিংবা কোনো জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষে আর কোনো মানুষের আর্তনাদ শোনা যাবে না।
মন্তব্য করুন

