Logo

১২ শ্রাবণ ১৪৩৩

×

Follow Us

দক্ষতা না মানবিকতা—কেন এই মিথ্যা দ্বন্দ্ব?

মত-দ্বিমত

দক্ষতা না মানবিকতা—কেন এই মিথ্যা দ্বন্দ্ব?

বাংলা, ইতিহাস ও দর্শনের অনার্স কোর্স বাতিলের প্রস্তাব এবং কিছু কথা

Icon

শাহেদ কায়েস

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ১২:০৫ এএম

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে—এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। বিশ্ব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের কাজের ধরন পাল্টে দিচ্ছে, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি বহু পেশাকে বিলুপ্ত করে নতুন পেশার জন্ম দিচ্ছে, সাইবার নিরাপত্তা ও তথ্যপ্রযুক্তি বৈশ্বিক অর্থনীতির কেন্দ্রে চলে এসেছে। এই বাস্তবতায় শিক্ষা যদি সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে না চলে, তাহলে একটি জাতি পিছিয়ে পড়বে।

সেই অর্থে সরকার ২০২৮ সাল থেকে নতুন শিক্ষাক্রম চালুর যে উদ্যোগ নিয়েছে, সেই সিদ্ধান্তকে অবশ্যই স্বাগত জানাই। এসব উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী এবং প্রশংসার দাবিদার। ক্রীড়া, সংস্কৃতি, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার সিকিউরিটি, আউটসোর্সিং, বিদেশি ভাষা শিক্ষা—এসব বিষয়ের অন্তর্ভুক্তি সময়ের দাবি। আমরা চাই আমাদের তরুণরা দক্ষ হোক, কর্মক্ষম হোক, বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম হোক। 

কিন্তু একই সঙ্গে শোনা যাচ্ছে যে, বাংলা, ইতিহাস, দর্শনসহ কয়েকটি মানবিক বিষয়ে অনার্স কোর্স বাতিল বা অন্য বিষয়ের সঙ্গে একীভূত করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। ৯ জুন ২০২৬ তারিখে দৈনিক ইত্তেফাক-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, “দেশের উচ্চশিক্ষাকে কর্মমুখী করতে শিক্ষা কাঠামোতে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নতুন খসড়া মডেল অনুযায়ী বাংলা, ইতিহাস, দর্শনসহ প্রায় ৬ বিষয়ের অনার্স কোর্স বাতিল করা হচ্ছে।”

এখন প্রশ্ন জাগে—আমরা কি দক্ষ মানুষ তৈরি করতে গিয়ে মানুষ তৈরির শিক্ষাকেই দুর্বল করে ফেলছি? আমরা কি দক্ষতা অর্জনের পথে হাঁটতে গিয়ে নিজেদের আত্মাকেই বিসর্জন দিতে যাচ্ছি? কারণ শিক্ষা কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নের উপকরণ নয়, শিক্ষা একটি জাতির আত্মপরিচয় নির্মাণের প্রধান মাধ্যম। শিক্ষা মানুষকে শুধু চাকরি পাওয়ার যোগ্য করে না; শিক্ষা মানুষকে মানুষ করে তোলে। আজকের বিতর্কটি তাই কেবল কয়েকটি বিভাগের অস্তিত্বের প্রশ্ন নয়। এটি আমাদের স্মৃতি, ভাষা, সংস্কৃতি, চিন্তা, মূল্যবোধ এবং ভবিষ্যৎ নাগরিকত্বের প্রশ্ন।

শিক্ষা কি কেবল চাকরির জন্য?

বর্তমান সময়ে শিক্ষার আলোচনায় একটি শব্দ খুব বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে—“এমপ্লয়েবিলিটি” বা কর্মসংস্থানের উপযোগিতা। নিঃসন্দেহে শিক্ষা এমন হতে হবে যাতে একজন শিক্ষার্থী জীবিকা অর্জন করতে পারে। কিন্তু শিক্ষার উদ্দেশ্য কি কেবল চাকরি পাওয়া? যদি তাই হতো, তাহলে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, নৃবিজ্ঞান কিংবা শিল্পকলার বিভাগ বহু আগেই বন্ধ করে দিত। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা। হার্ভার্ড, অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, ইয়েল, স্ট্যানফোর্ড কিংবা টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো আজও মানবিক বিদ্যাকে সমান গুরুত্ব দিয়ে যাচ্ছে। কারণ তারা জানে, প্রযুক্তি মানুষকে দক্ষ করে, কিন্তু মানবিক শিক্ষা মানুষকে মানুষ করে।

একজন প্রকৌশলী সেতু নির্মাণ করতে পারেন, কিন্তু সেই সেতু কার জন্য, কেন এবং কী সামাজিক প্রভাব তৈরি করবে—সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে প্রয়োজন ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান ও দর্শনের। একজন সফটওয়্যার প্রকৌশলী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করতে পারেন, কিন্তু সেই প্রযুক্তি মানবকল্যাণে ব্যবহৃত হবে নাকি মানুষের স্বাধীনতা হরণ করবে—সেই নৈতিক প্রশ্নের উত্তর প্রযুক্তি একা দিতে পারে না।

ভাষার জন্য জীবন দেওয়া জাতি

বাংলাদেশ পৃথিবীর একমাত্র রাষ্ট্র, যার জন্মের ইতিহাস ভাষার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসের দিকে তাকালেই বোঝা যায় কেন বাংলা বিষয়টি অন্য সব দেশের ভাষা বিভাগের মতো একটি সাধারণ একাডেমিক বিষয় নয়। 

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন কেবল একটি ভাষাগত আন্দোলন ছিল না, এটি ছিল সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। রাষ্ট্রের ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তরুণেরা বলেছিল—আমাদের ভাষা আমাদের পরিচয়, আমাদের আত্মা। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বাররা কোনো চাকরির জন্য জীবন দেননি। তারা ভাষার মর্যাদার জন্য জীবন দিয়েছিলেন। সেই ভাষাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে বাঙালির জাতীয়তাবাদ, সাংস্কৃতিক চেতনা এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় এসেছে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, তারপর একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা।  

আজ যদি আমরা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বাংলা শিক্ষাকে সংকুচিত করি, তাহলে তা কেবল একটি বিষয়ের সংকোচন হবে না, এটি আমাদের জাতীয় স্মৃতিরও সংকোচন হবে। বাংলা ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি আমাদের জাতিসত্তার কেন্দ্রবিন্দু। যে জাতির রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাস ভাষার সঙ্গে জড়িত, সেই জাতির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য শিক্ষাকে দুর্বল করার চিন্তা গভীরভাবে উদ্বেগজনক।

বাংলা বিভাগ শুধু কবিতা, গল্প, উপন্যাস বা প্রবন্ধ-নিবন্ধ পড়ায় না। এটি ভাষার বিবর্তন, সংস্কৃতির ইতিহাস, লোকসাহিত্য, ভাষাবিজ্ঞান, অনুবাদ, সাহিত্যতত্ত্ব, সাংস্কৃতিক চেতনা এবং জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্ন নিয়ে কাজ করে। আজ যদি বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে উচ্চতর গবেষণা কমে যায়, তাহলে আগামী প্রজন্মের জন্য বাংলা ভাষাকে ডিজিটাল যুগে টিকিয়ে রাখার কাজ কে করবে? বাংলা ভাষার করপাস তৈরি করবে কে? বাংলা অভিধানের নতুন সংস্করণ নির্মাণ করবে কে?  আমাদের ভাষার ইতিহাস, লোক-ঐতিহ্য, পুঁথি সাহিত্য, আঞ্চলিক ভাষা, মৌখিক সংস্কৃতি এবং সমকালীন সাহিত্য নিয়ে গবেষণা করবে কারা? বাংলা বিভাগ দুর্বল হলে একদিন আমরা বুঝতে পারব—প্রযুক্তি আছে, কিন্তু ভাষার ভেতরের মানুষটি হারিয়ে গেছে।

মুক্তিযুদ্ধ ও ইতিহাসের প্রয়োজন

ইতিহাস আসলে একটি জাতির সম্মিলিত স্মৃতি। স্মৃতি হারিয়ে ফেললে মানুষ যেমন নিজের পরিচয় ভুলে যায়, ইতিহাস হারালে জাতিও নিজের পথ হারায়। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়-এর অধ্যাপক স্পেনীয়-মার্কিন দার্শনিক, প্রাবন্ধিক, কবি এবং ঔপন্যাসিক জর্জ সান্তায়না বলেছিলেন, “যারা অতীতকে স্মরণ করতে পারে না, তারা সেই অতীত পুনরাবৃত্তি করতে বাধ্য হয়।” 

বাংলাদেশের ইতিহাস কোনো সাধারণ ইতিহাস নয়। এই ইতিহাসে রয়েছে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্রের সংগ্রাম, কৃষক বিদ্রোহ, সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ এবং অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগ। আজও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিভ্রান্তি, অপপ্রচার এবং ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা দেখা যায়। সাম্প্রদায়িক রাজনীতি অতীতকে নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করতে চায়। 

এই পরিস্থিতিতে দক্ষ ইতিহাসবিদ, গবেষক এবং শিক্ষক তৈরি করা কি কম গুরুত্বপূর্ণ? যে জাতি তার অতীতকে ভুলে যায়, সে জাতি ভবিষ্যৎ নির্মাণেও ব্যর্থ হয়। ইতিহাস আমাদের শেখায় কোন ভুলের কারণে সমাজ বিপর্যস্ত হয়েছে, কোন আদর্শ মানুষকে এগিয়ে নিয়েছে এবং কোন পথ ধ্বংসের দিকে নিয়ে গেছে। এই সময়ে দক্ষ ইতিহাসবিদ, গবেষক এবং শিক্ষক তৈরির প্রয়োজন কমে যায়নি, বরং বহুগুণ বেড়েছে। ইতিহাসের অনার্স কোর্স সংকুচিত করা মানে জাতির স্মৃতিশক্তিকে দুর্বল করা।

দর্শন: অদৃশ্য কিন্তু অপরিহার্য

বাংলাদেশে দর্শনকে প্রায়ই অপ্রয়োজনীয় বিষয় হিসেবে দেখা হয়। কারণ আমাদের সমাজে শিক্ষার মূল্যায়ন প্রায়শই চাকরির বাজার দিয়ে করা হয়। কিন্তু একটু ভেবে দেখুন—মানুষকে চিন্তা করতে শেখায় কে? সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়, স্বাধীনতা-দায়িত্ব, ব্যক্তি-রাষ্ট্র—এসব মৌলিক প্রশ্ন নিয়ে ভাবতে শেখায় কে? সক্রেটিস এথেন্সের পথে পথে ঘুরে মানুষকে প্রশ্ন করতে শিখিয়েছিলেন। সেই প্রশ্ন করার অপরাধেই তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। এরিস্টটল যুক্তির ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন। আধুনিক বিজ্ঞানের বীজ লুকিয়ে ছিল তার চিন্তার মধ্যেই।

হেগেল ইতিহাসকে দেখেছিলেন ক্রমাগত পরিবর্তনের প্রক্রিয়া হিসেবে। তার চিন্তা আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তা ও ইতিহাসচর্চাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। বার্ট্রান্ড রাসেল যুক্তি, বিজ্ঞান, মানবতাবাদ এবং স্বাধীন চিন্তার পক্ষে আজীবন সংগ্রাম করেছেন। এই চিন্তাবিদদের অবদান ছাড়া আধুনিক সভ্যতাকে কল্পনা করা যায় না। আজ আমরা সামাজিক মাধ্যমে যে অসহিষ্ণুতা, গুজব, মব মানসিকতা, ঘৃণা এবং যুক্তিহীন উন্মাদনা দেখি, তার একটি কারণ সমালোচনামূলক চিন্তার অভাব। দর্শন সেই চিন্তার ভিত্তি তৈরি করে।

অনেকেই মনে করেন এআই-এর যুগে সাহিত্য, ইতিহাস কিংবা দর্শনের গুরুত্ব কমে যাবে। বাস্তবে ঘটছে ঠিক উল্টোটা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের অনেক কাজ করে দিতে পারে। এমনকি যুদ্ধক্ষেত্রেও সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যবহৃত হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো— একটি এআই যদি ভুল সিদ্ধান্ত নেয়, তার দায় কার? একটি অ্যালগরিদম যদি বৈষম্যমূলক আচরণ করে, তাকে কীভাবে বিচার করা হবে? মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহারের সীমা কোথায়? যন্ত্রের সিদ্ধান্ত কি মানুষের নৈতিক বিচারের বিকল্প হতে পারে? এসব প্রশ্ন প্রযুক্তির নয়, এগুলো মূলত দর্শন ও নীতিশাস্ত্রের প্রশ্ন।

আজ বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এআই এথিকস বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করছে। হার্ভার্ড, অক্সফোর্ড, এমআইটি—সবখানেই প্রযুক্তির পাশাপাশি নীতিশাস্ত্র ও মানবিক বিদ্যার গুরুত্ব বাড়ছে। আমরা যখন এআই শিক্ষা চালুর কথা বলছি, তখন একই সঙ্গে দর্শনের অনার্স কোর্স দুর্বল করার কথা বলছি—এটি এক ধরনের আত্মবিরোধিতা।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘সভ্যতার সংকট’-এ লিখেছিলেন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি মানুষের নৈতিক অগ্রগতির নিশ্চয়তা দেয় না। বিশ শতকের ইউরোপ ছিল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উন্নত। কিন্তু সেই ইউরোপই দুটি বিশ্বযুদ্ধের জন্ম দিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ তাই শিক্ষা ও মানবিকতার সমন্বয়ের ওপর জোর দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ শিক্ষা সম্পর্কে বলেছিলেন, শিক্ষা মানুষের মুক্তির পথ। তিনি এমন শিক্ষার কথা বলেছেন, যা মানুষকে কেবল কর্মী নয়, চিন্তাশীল ও সৃজনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। শান্তিনিকেতনের শিক্ষা দর্শন ছিল প্রকৃতি, শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞান ও মানবিকতার সমন্বয়।

অন্যদিকে নজরুল আমাদের শিখিয়েছেন মানুষের মর্যাদা, সাম্য এবং প্রতিবাদের শিক্ষা।
“গাহি সাম্যের গান—
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।” এই মানবিক বোধই একটি জাতিকে সভ্য করে। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে বাদ দিয়ে যেমন বাংলা সংস্কৃতিকে বোঝা যায় না, তেমনি মানবিক বিদ্যাকে দুর্বল করে একটি সুস্থ সমাজ নির্মাণও সম্ভব না। প্রযুক্তি আমাদের শক্তিশালী করতে পারে, কিন্তু মানবিকতা না থাকলে সেই শক্তি ধ্বংসের কারণও হতে পারে।

দক্ষতা বনাম মানবিকতা: একটি ভ্রান্ত বিতর্ক

আসলে সমস্যা হচ্ছে আমরা শিক্ষাকে প্রায়ই একটি মিথ্যা দ্বন্দ্বের মধ্যে ফেলে দিই, যেন প্রযুক্তি ও মানবিকতা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী, যেন একজন শিক্ষার্থীকে হয় ইতিহাস পড়তে হবে, নয়তো প্রযুক্তি; হয় দর্শন, নয়তো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। হয় বাংলা, নয়তো সাইবার সিকিউরিটি। কিন্তু আধুনিক বিশ্ব এভাবে কাজ করে না।
বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে সফল উদ্ভাবনগুলো প্রযুক্তি ও মানবিকতার সংযোগস্থলেই জন্ম নিয়েছে। স্টিভ জবস একবার বলেছিলেন, প্রযুক্তি একাই যথেষ্ট নয়, প্রযুক্তির সঙ্গে মানবিকতার মিলনই আমাদের হৃদয় স্পর্শ করে। বাংলাদেশেরও সেই পথেই হাঁটা উচিত।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কার প্রয়োজন—এ বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। প্রযুক্তি, কারিগরি শিক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার সিকিউরিটি, ফ্রিল্যান্সিং এবং বিদেশি ভাষা শিক্ষা অবশ্যই সম্প্রসারিত হওয়া উচিত। কিন্তু সেই প্রয়োজন পূরণ করতে গিয়ে বাংলা, ইতিহাস ও দর্শনের মতো মৌলিক বিষয়কে দুর্বল করা হবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। 

বাংলা, ইতিহাস ও দর্শনের অনার্স কোর্স বাতিল না করে এগুলোকে আরও আধুনিক করা যেতে পারে।  বাংলা বিভাগের সঙ্গে ডিজিটাল হিউম্যানিটিজ, অনুবাদবিদ্যা, কনটেন্ট ইন্ডাস্ট্রি এবং ভাষা প্রযুক্তির সংযোগ তৈরি করা যেতে পারে। ইতিহাস বিভাগের সঙ্গে আর্কাইভ ব্যবস্থাপনা, হেরিটেজ ম্যানেজমেন্ট, তথ্য বিশ্লেষণ এবং ডিজিটাল ইতিহাস যুক্ত করা যেতে পারে। দর্শনের সঙ্গে এআই এথিকস, বায়ো-এথিকস, প্রযুক্তির নৈতিকতা, জননীতি এবং সমালোচনামূলক চিন্তার কোর্স সংযুক্ত করা যেতে পারে। এভাবে মানবিক বিদ্যা ও প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটালে শিক্ষার্থীরা যেমন কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ পাবে, তেমনি জাতিও তার বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি হারাবে না। 

আমাদের প্রয়োজন এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে প্রযুক্তির সঙ্গে মানবিকতার, দক্ষতার সঙ্গে প্রজ্ঞার, কর্মসংস্থানের সঙ্গে নাগরিকতার এবং উন্নয়নের সঙ্গে সংস্কৃতির সমন্বয় ঘটবে। কারণ শেষ পর্যন্ত একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে সে কতজন প্রোগ্রামার তৈরি করেছে তার ওপর নয়, বরং সে কতজন চিন্তাশীল, মানবিক এবং দায়িত্বশীল মানুষ তৈরি করতে পেরেছে তার ওপর।

একটি জাতি শুধু জিডিপি দিয়ে মহান হয় না। একটি জাতি মহান হয় তার ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস, সংস্কৃতি, স্মৃতি এবং চিন্তার গভীরতা দিয়ে। বাংলাদেশ যদি সত্যিই একটি জ্ঞানভিত্তিক, সৃজনশীল এবং মানবিক রাষ্ট্রে পরিণত হতে চায়, তাহলে তাকে প্রযুক্তির পাশাপাশি মানবিক বিদ্যাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি চাকরির নয়, প্রশ্নটি সভ্যতার। 

আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে মানুষ দক্ষ কিন্তু ইতিহাসহীন, প্রযুক্তিবিদ কিন্তু মানবিকতাহীন, কর্মক্ষম কিন্তু চিন্তাশূন্য? নাকি আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে প্রযুক্তির সঙ্গে সংস্কৃতি, দক্ষতার সঙ্গে প্রজ্ঞা, উন্নয়নের সঙ্গে মানবিকতা এবং কর্মসংস্থানের সঙ্গে নাগরিক চেতনার সমন্বয় ঘটবে? সিদ্ধান্তটি আজ আমাদেরই নিতে হবে। কারণ দক্ষ কর্মী তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু মানুষ তৈরি করা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

শাহেদ কায়েস: কবি ও প্রাবন্ধিক

মন্তব্য করুন

Logo