ইরানের কিংবদন্তি ফাইটার পাইলট মেজর জেনারেল হোসেইন খালাতবারি
যুদ্ধে খালাতবারির মানবিকতা ও আজকের নির্মম বৈপরীত্য
সাঈদ হাসান
প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬, ০২:৩০ পিএম
ইরাক-ইরান যুদ্ধ (১৯৮০–১৯৮৮) ছিল আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম রক্তক্ষয়ী সংঘাত। আট বছরের সেই যুদ্ধে লাখো মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। কিন্তু সেই ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও কিছু ঘটনা মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। তেমনই এক ঘটনার নায়ক ছিলেন ইরানের কিংবদন্তি ফাইটার পাইলট মেজর জেনারেল হোসেইন খালাতবারি, যিনি ইরানে ‘হোসেইন দ্য মাভেরিক’ নামেও পরিচিত।
সত্তরের দশকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রশিক্ষণ নেওয়া এই দক্ষ পাইলট ইরানি বিমানবাহিনীর এফ-৪ ফ্যান্টম-২ যুদ্ধবিমান উড়াতেন। ইরান–ইরাক যুদ্ধের শুরুর দিকে তাঁকে এবং তাঁর স্কোয়াড্রনকে ইরাকের আল-আমারাহ শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সেতু ধ্বংস করার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
ভারী বিমানবিধ্বংসী গোলাবর্ষণের মধ্য দিয়ে লক্ষ্যবস্তুর কাছে পৌঁছে খালাতবারি একটি অপ্রত্যাশিত দৃশ্য দেখতে পান। সেতুটির ওপর দিয়ে তখন অসংখ্য বেসামরিক যানবাহন চলাচল করছে।
সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে তখন বোমাবর্ষণ করাই ছিল সবচেয়ে নিরাপদ এবং কার্যকর সিদ্ধান্ত। কিন্তু হোসেইন খালাতবারি ও তাঁর সহ-পাইলট জাফারি অন্য পথ বেছে নেন। বেসামরিক মানুষের জীবনকে অগ্রাধিকার দিয়ে তাঁরা প্রবল ঝুঁকি নিয়ে আকাশে চক্কর দিতে থাকেন। ইরাকি বাহিনীর অবিরাম গোলাবর্ষণের মধ্যেও তাঁরা অপেক্ষা করেন, যতক্ষণ না সেতুটি সম্পূর্ণভাবে যানবাহন ও সাধারণ মানুষশূন্য হয়।
সব গাড়ি পার হয়ে যাওয়ার পর তাঁরা খালি সেতুটিতে নিখুঁতভাবে বোমাবর্ষণ করেন এবং সফলভাবে মিশন সম্পন্ন করেন।
১৯৮৫ সালে এক আকাশযুদ্ধে নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত হোসেইন খালাতবারি বহু সাহসী অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন। তবে আল-আমারাহ সেতুর ঘটনাটি শুধু তাঁর সামরিক দক্ষতার নয়; যুদ্ধক্ষেত্রেও মানবিকতা, সংযম এবং যুদ্ধনীতির প্রতি শ্রদ্ধার এক বিরল উদাহরণ হিসেবে আজও স্মরণীয়।
সম্প্রতি ইরানের গারিবেহ সেতুর একটি ছবি দেখে এই ঘটনাটিকে আবার সামনে এনেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার সময় সেতুটির ওপর দিয়ে বেসামরিক যানবাহন চলাচল করছিল। ছবিতে সেতু বা তার আশপাশে কোনো সামরিক উপস্থিতিও চোখে পড়েনি।
যুদ্ধের বাস্তবতা সব সময় নির্মম। তবে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও যুদ্ধনীতির অন্যতম মৌলিক নীতি হলো—সামরিক লক্ষ্যবস্তু এবং বেসামরিক ব্যক্তি বা স্থাপনার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করা এবং বেসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতি যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা।
হোসেইন খালাতবারির সেই সিদ্ধান্ত আজও তাই শুধু একটি সামরিক অভিযানের গল্প নয়; এটি মনে করিয়ে দেয়, যুদ্ধের মধ্যেও মানবিকতা হারিয়ে যেতে বাধ্য নয়।
মন্তব্য করুন

