যে যেখানে লড়ে যায়, আমাদেরই লড়া…
মাহা মির্জা
প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬, ০২:৫৩ পিএম
আমি জুলাই নিয়ে কিছু লিখতে পারিনা। স্মৃতিচারণ করা একটা ক্লান্তিকর ব্যাপার। সেই ক্লান্তির সঙ্গে যোগ হয় গ্লানি, যখন ধাক্কাধাক্কি করে প্রমাণ দিতে হয়, আমিও ছিলাম।
সত্যি বলবো, এই জুলাইতে আমার ভিতরে কিছু নাড়া দেয়নি। অথবা আমি নিজেই চাইনি, নাড়ানাড়িটা হোক। কিছু মুহূর্ত, কিছু মেমোরিজ বেশি নাড়াচাড়া করতে মন চায়না। কে যেন লিখেছিলো (খুব সম্ভবত দোলা), কিছু স্মৃতি আছে যত্ন করে আলমারিতে তুলে রাখতে হয়। মায়ের পুরানো সুতির শাড়ির মতো। মাঝে মাঝে বের করে ঘ্রান নিতে হয়।
আজকাল কেউ যখন ডাকে, জুলাই নিয়ে কিছু বলেন, বিবমিষা লাগে। কি বলবো? একটা বিপুলা বিক্ষুব্ধ ঢেউয়ের স্রোতে আমরা কি আলাদা করে কেউ ছিলাম? এতগুলো কিশোরের মৃত্যুর ভার বইতে না পেরে কাঁদতে কাঁদতে রাস্তায় নেমে এসেছিলো কত হাজার বিচিত্র মানুষ।
জুলাইকে আমার ফুরাতে ইচ্ছা করে না। ক্লেইম, রিক্লেইম, রিভিজিট, থিওরাইজ কিছুই করতে ইচ্ছা করে না। বরং রেখে দিতে ইচ্ছা করে। পুরানো চিঠির মতো। পুরানো ক্যাসেটের মতো। ধুলা পড়ুক। কোনোদিন মন চাইলে তালা দেয়া বাক্স থেকে বের করে দেখবো। লিখবো।
আজকেও হয়তো কিছু লিখতাম না। কিন্তু আজকে হঠাৎ মন কেমন করছে। পৃথিবীর এ প্রান্তে ও প্রান্তে, যেকোনো প্রান্তে ১৮ বছর বয়স যার, তাকে মিছিলে যেতে দেখলে, মার খেতে দেখলে, গর্জন করতে দেখলে, আমাদের বাচ্চাগুলোর কথা মনে পড়ে। আহারে, কত প্রাণ, কত উচ্ছাস নিয়ে রাস্তায় নেমেছিল একটা গোটা প্রজন্ম।
লেখা আছে অশ্রুজলে। ...
আমার হঠাৎ শুভর কথা মনে পড়লো। শুভর সঙ্গে দেখা হয়েছিল চট্টগ্রামে। কালো চশমা পড়া শুভ। চবির বাংলা বিভাগের ছাত্র ছিল। পাশাপাশি বসে ছিলাম অনেক ক্ষণ। এক মঞ্চে। কী কথা বলবো আর বুঝে উঠতে পারছিলাম না। আলাপ হলো সন্ধ্যা নামার পর। বিদায় নেবার সময় বোকার মতো বলে ফেললাম, শুভ আমাকে ফেইসবুকে এড করে নাও। যোগাযোগ থাকবে। শুভ খুব শান্ত গলায় বললো, ম্যাম আমি তো আর ফেসবুক ইউজ করতে পারিনা।
আমার মনে হলো, হে আল্লাহ, তুমি মাটি দুই ভাগ করে দাও। আমি ঢুকে যাই। আমি এটা কি বললাম! কি করে বললাম! হাউ ইনসেন্সিটিভ অফ মি!
আজকে দেখলাম নাসিরুদ্দিন শাহ বলছে, সাবকুছ ইয়াদ রাখা যায়েগা। এভরিথিং ইউল বি রিমেম্বারড।
হঠাৎ ধাক্কা লাগলো। আমরাও তো বলেছি এইসব কথা। খুব ঘাড় ফুলিয়ে। আজকে মনে হলো, আমরা কি আসলেও মনে রেখেছি? শুভকে? অথবা অন্য আরো ৭০০ জনকে? বুলেটবিদ্ধ চোখগুলো কেমন আছে? আমি তো মনে রাখিনি। আসলে লাইনটা হয়তো এরকম হওয়ার কথা ছিল: সাবকুছ বেচ দেয়া যায়েগা—Everything will be sold...
আজকে সারাদিন ধরে ভারতের বন্ধুদের পোস্ট করা ছবিগুলো দেখছি, আর গলার কাছে দলা পাকাচ্ছে। কি যেন একটা মিল। সেই চাহনি, সেই তীব্রতা, সেই চলে যাওয়া বাচ্চাগুলো ...
আহা... আমাদের কিশোরবেলা নাড়িয়ে দেয়া সেই গানটার মতো...
যে যেখানে লড়ে যায়, আমাদেরই লড়া...
জীবনের কথা বলা, গানের মহড়া...
যেন সব্বার জন্যে, সব্বার জন্যে।
মন্তব্য করুন

