Logo

১০ ভাদ্র ১৪৩৩

×

Follow Us

জবারাণীদের গল্প, ফুলবাড়ী প্রতিরোধে ইজ্জতের বোধ যখন প্রাণশক্তি

ছবি : ফেসবুক

কাভার স্টোরি

ফুলবাড়ী দিবস

জবারাণীদের গল্প, ফুলবাড়ী প্রতিরোধে ইজ্জতের বোধ যখন প্রাণশক্তি

আনু মুহাম্মদ

Icon

কাভার স্টোরি ডেস্ক

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১১:৪১ পিএম

২০০৫- এবং তারপরেও এরকম গল্প অনেক তৈরি হয়েছে। এশিয়া এনার্জি ( তাড়া খাবার পর বদলানো নাম: গ্লোবাল কোল ম্যানেজমেন্ট বা জিসিএম) কোম্পানি  ঘুষ কর্মসূচি ফুলবাড়ী থেকে ঢাকা পর্যন্ত বিভিন্নভাবে ছড়ানো হয়েছিল। কথিত বিশেষজ্ঞগোষ্ঠীর মধ্যে অর্থনীতিবিদ, ভূতাত্ত্বিক, প্রকৌশলী, আইনজীবীদের গিলে ফেলার ব্যবস্থা হয়েছে প্রথমেই। বিভিন্ন রকম কনসালটেন্সি দিয়ে তাদের বশ করা হয়েছে। তাছাড়া বিভিন্ন অর্থকরী ব্যবস্থা করে সাংবাদিকদের মধ্যে একটা সমর্থকগোষ্ঠী তৈরি করা হয়েছে। সংবাদপত্রের মালিকদের সাথেও তারা একটা স্বার্থের সম্পর্ক তৈরি করেছে। মন্ত্রী-আমলাদের মধ্যেও তাই। সেজন্য এই ধ্বংসযজ্ঞের প্রকল্প বিরোধী কথাবার্তা আন্দোলনে বিশেষজ্ঞ বা শিক্ষিত মহলের যে মাত্রায় অংশগ্রহণ থাকা দরকার সেটা আমরা পাইনি।

নানাপ্রকার ঘুষের সুবিধাভোগী হিসেবে একজন আমলার হয়তো বিদেশে একটা বাড়ি হয়, একজন মন্ত্রীর হয়তো বিদেশে গোপন ব্যাংক ব্যালেন্স বাড়ে, একজন সাংবাদিকের হয়তো কিছু বিদেশ সফর হয়, একজন কনসালট্যান্ট-এর হয়তো আয় বাড়ে বা বিদেশ সফর হয়। কিন্তু এসব তুচ্ছ সুবিধার বদলে তারা দেশের যে কতোবড় সর্বনাশ করে, মানুষের বর্তমান আর ভবিষ্যৎ যে কীভাবে বিপর্যস্ত করে তা পরিমাপ করা কঠিন।

এশিয়া এনার্জি এবং তার পৃষ্ঠপোষকদের হয়তো ধারণা ছিলো যে, যে দেশে মন্ত্রী, বড় বড় আমলা, দামী দামী উকিল, বিশেষজ্ঞ কনসালট্যান্ট, সাংবাদিক ইত্যাদি কেনা সহজ, সে দেশে অঞ্চলের গরীব মানুষ কেনা যাবেনা, এটাতো হতেই পারেনা। মিডিয়া সাথে আছে, প্রচারণা সামনে আছে, কনসালট্যান্ট বুদ্ধিজীবী পকেটে আছে। আর কে ঠেকায়?

কিন্তু ঢাকা শহরের স্বচ্ছল অনেকবিশেষজ্ঞ’, আইনজীবী, পরিবেশবিদ, ভূতাত্ত্বিক, প্রত্নতত্ত্ববিদ, সাংবাদিককে কিনতে সক্ষম হলেও এশিয়া এনার্জি খনি এলাকায় একই কাজ করতে গিয়ে বারবার বাধা পেয়েছে। প্রত্যাখ্যান করেছে তারাই যারা অভাবগ্রস্ত, সামান্য টাকাও যাদের জন্য বিরাট প্রাপ্তি। যেখানে দেখি- অনেক স্বচ্ছল লোকের কাছে না হলেও গ্রামের এই গরীব মানুষদের কাছে টাকার চাইতে নিজের ইজ্জত অনেক বড়, নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থের চাইতে সমষ্টির স্বার্থ অনেক বড়। জবারাণীদের গল্প আমি ২০০৬ সালেই লিখেছিলাম, সবার মনোযোগে রাখা জরুরী বলে আবার এখানে রাখছি।

জবারাণী এক কিশোরী মেয়ের নাম। ফুলবাড়ী থানা শহর থেকে বেশ দূরে ওদের গ্রাম। ওর বাবা বিজয় আর মা ডালিমাবালার সংসার স্বছল তো নয়ই ন্যূনতম চাহিদা পূরণও তাদের পক্ষে কখনোই সম্ভব হয়নি। দিনমজুরি বিজয়ের পেশা। এই পেশায় কোন নিশ্চয়তা থাকে না, সবসময় কাজ থাকে না। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতো বিজয়ের জীবনও তাই অনিশ্চয়তাতেই কাটে বছরের বেশিরভাগ সময়, তাদের সবসময়ই বাস করতে হয় শীর্ণ সুতার উপর। একটু অসুস্থতা, কদিনের কাজের সংকট, জিনিষপত্রের দামবৃদ্ধি সবকিছুই তাদের জন্য একেকটি ঝড়ের মতো। খড়কুটোর মতো ভেসে যেতে হয়।

মানুষের প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করবার জন্য শয়তানদের কৌশল হল তার দুর্বল জায়গা খুঁজে বের করে সেখানে আঘাত করা। বিজয়ের দুর্বল জায়গায় ছিল তার মেয়ে। তখনও আসলে মেয়ের বিয়ের বয়স হয়নি। কিন্তু গ্রামে সেই মেয়ের বিয়ে নিয়েই অনেক কথা,
মেয়ের বিয়ের বয়স পার হয়ে গেল। এখনও কেন দাও না? পরে আর ছেলে কোথায় পাবা?’

বিজয় কথা বলে না, কিন্তু চিন্তা বাড়ে। মেয়ের বিয়ে নিয়ে বড় সমস্যা- ছোটখাটো ব্যবস্থা করলেও পণ মানে যৌতুক লাগবে। কোথায় পাবে সে টাকা? এমনিতেই তো ঋণ। এমন তো নয় যে, মেয়ের পড়াশোনা চালানো যাচ্ছে বা সহায়সম্বল  অনেক আছে!
এসব দুর্ভাবনা আর কানাকানির মধ্যেই একদিন বিজয় ডালিমার ভাঙা ঘরে এসে হাজির হলো এশিয়া এনার্জি বা কোম্পানির লোক। ভাঙাঘরের সামনে নানাকিছু জোড়াতালি দিতে তখন ব্যস্ত বিজয়। কোম্পানির লোক কাছে এসে ফিসফিস করে বিজয়কে বলে,
কি গো, মেয়ের বিয়া দিবা না?’
দিব তো, মুখের কথায় তো হবে না।তিক্ত কন্ঠে বলে বিজয়।
কোম্পানি তো তোমার কথা খুব ভাবে।
মানে?’
মানে আর কী? তোমার মেয়ের বিয়ে দিবা। আর ঘরটা ঠিক না করলেও তো চলে না। সে ব্যবস্থা করবে কোম্পানিই।
পরিস্কার করে বলো।
শোন তবে। কোম্পানি তোমার জন্য ৬০ হাজার টাকা বরাদ্দ করেছে। ২০ হাজার টাকা আজকেই পাবা। লোক দাঁড়িয়ে আছে সাইকেল নিয়ে একটু দূরে। বাকি টাকা পাবা পরে।

৬০ হাজার টাকা বিজয়ের জন্য অনেক অনেক টাকা। এই টাকা সারাজীবনেও তার পক্ষে জমানো সম্ভব না। কয়েক বছরের মোট আয়ের চাইতেও বেশি এই টাকা, অথচ এই টাকা এমনি এমনি পাওয়া যাচ্ছে। মেয়ের বিয়ে দেওয়া আর ঘর ঠিক করা দুটো জরুরী কাজই এতে হয়ে যায়। আর কোন পথও তো খোলা নাই।
হাতের কাজে আরও বেশি ব্যস্ত হয়ে গেল বিজয়। কয়েক মিনিট গেলো চুপচাপ। কোম্পানির লোক উৎসাহিত হয়ে বলে:
জীবনে এরকম সুযোগ দুইবার আসে না। আসে, বল?’
 বিজয়ের গলা উঠতে গিয়েও নামে। বলে,
তা কী করতে হবে আমার এর বদলে?’
কোম্পানির লোক হাঁফ ছেড়ে বাঁচে বলে,

তেমন কিছুই না। মিছিল টিছিলে যাওয়া বন্ধ  করবার দরকার  নাই। বন্ধ করলে আবার নানা কথা উঠবে। মিটিং এও যাও, তবে অত বেশি যাওয়ার দরকার নাই। আর মানুষ জনরে জড়ো করবার এত কাজ তোমার নেওয়ার দরকার কী? সেটা আর করবা না। আর মিটিং টিটিং এর খবর টবর একটু দিবা। এই তো।

আরও কয়েক মিনিট যায়। ঘরের বেড়ায় গুনা বাধাঁর কাজে বিজয়ের হাত একটু জোরে জোরে চলতে থাকে। তারপর তা থামে। বিজয় মুখ তুলে বলে,
বাড়ির উঠানে এসব কথা বললা। তোমারে তাই যা করার দরকার তা করতে পারলাম না। এবার তুমি তাড়াতাড়ি যাও। আমার মাথা কখন কী হয় বলতে পারি না।

কোম্পানির লোক কথার অর্থ বোঝার চেষ্টা করে। উঠে পড়বে নাকি আরেকবার বোঝাবে তা নিয়ে চিন্তা করতে করতে কিছু বলতে যেতেই ভাঙা ঘরের ওপার থেকে রণমূর্তি নিয়ে ছুটে আসে বিজয়ের বউ ডালিমাবালা। হাতে ঝাটা, মাটির দিকে নয় আকাশমুখি থেকে কোম্পানিমুখি হচ্ছে। বিজয়ের মতো ঠান্ডাভাবে নয়, চিৎকার তখন ডালিমার কন্ঠে, ক্রোধ শরীরের গতিতে:
গোলামের পুত গোলাম। নিজে গোলাম হইছস আমাদেরও গোলাম বানাইতে চাস। বাইর বাইর হ।

আর উপায় থাকে না কোম্পানির। ছুটে বের হয়ে যায়।

এরপর আর মেয়ের বিয়ে নিয়ে চিন্তা করবার ফুরসুৎ মেলেনি বিজয়ের। কারণ এই ঘটনার পর তার দায়িত্ব অনেক বেড়ে যায়। তার কাছে পরিষ্কার হয় যে, কোম্পানির মতলব খুব খারাপ, যে কোন সময় সবকিছু দখল করে সবার জন্য বিপদ ঘটাতে পারে। দালাল তৈরির চেষ্টা সফল হলে তো সর্বনাশ। লোক জড়ো করা, মিছিল মিটিং করা এসব কাজে বিজয়ের ব্যস্ততা বেড়ে গেল অনেক। ঘরে খাবার নেই। তারপরও বিজয়ের সাথে ডালিমাবালা জবারাণীও এসব কাজে নেমে পড়ে।

এরকম ঘটনা ফুলবাড়ী অঞ্চলে আরও অনেক ঘটেছে। কিছুটা স্বচ্ছল লোকজনদের ক্ষেত্রেও। হামিদপুর ইউনিয়নের একজন ছোট ব্যবসায়ী লাখ টাকার ব্যবসা প্রত্যাখ্যান করে নিজের পুঁজি ভেঙে টাকা খরচ করেছেন আন্দোলনের কাজে। এসময়েই এশিয়া এনার্জি এলাকায় বিশ্বকাপ ফুটবল দেখার জন্য রঙিন টিভি দিতে থাকে। গোটা ৩৫টি দেবার পর যে টিভিছাড়া মানুষদের আগ্রহভরে টিভি নেবার কথা তারাই পন্ড করে দিয়েছে এইদয়ারকার্যক্রম। ২৬ আগষ্টে কোম্পানি বিরোধী জমায়েতে গুলির পর থামার বদলে আন্দোলন যখন গণঅভ্যুত্থানের রূপ নেয় তখন এই অঞ্চলের মানুষ দালাল বলে পরিচিত ব্যক্তিদের বাসা থেকে এই টিভিগুলো বের করেন। ঘৃণা এতটাই যে, কোনো গরীব মানুষ যাদের জীবনেও এরকম রঙীন টিভি কেনার সাধ্য হবে না তারা কেউই এই টিভি ঘরে নেবার বিন্দুপরিমাণ আগ্রহ দেখাননি, বরঞ্চ সেগুলো সব টুকরো টুকরো ভেঙেছেন।

কোথা থেকে বিজয় ডালিমাবালার মতোগরীবমানুষদের এই তেজ আসে? দূর্বল অনাহারী শরীরের মানুষেরা কী করে এক বছরে যা তাদের আয় করা সম্ভব তার কয়েকগুণ বেশি অর্থ থু থু মেরে ঝাটা মেরে  উড়িয়ে দিতে পারে? ব্যাখ্যা একটাই, ইজ্জতের বোধ।

তাহলে শহরে, এই রাজধানী ঢাকায় যাদের সহায়সম্বল আছে, অনেক টাকা পয়সা আছে, কনসালট্যান্ট সাংবাদিক আমলা আইনজীবী মন্ত্রী, তাদের কাউকে কাউকে যে নানাজাতের কোম্পানি নাকে দড়ি দিয়ে অপকর্মে ব্যবহার করে তাদের ইজ্জতের বোধ কোথায় গেল?

ফুলবাড়ী গণঅভ্যুত্থান এই প্রশ্নটাই হাজির করে সবার সামনে, ঘৃণা আর ধিক্কার ছুঁড়ে দেয় বেইজ্জৎ অর্থবান ক্ষমতাবানভদ্রলোকদের উদ্দেশ্যে। এতো বছর পরেও!!

মন্তব্য করুন

Logo