Logo

১০ ভাদ্র ১৪৩৩

×

Follow Us

ভারতে নির্বাচনী রাজনীতির নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ

দশদিগন্ত

প্রশান্ত কিশোরের জয়

ভারতে নির্বাচনী রাজনীতির নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ

Icon

সাঈদ হাসান

প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬, ১০:২৩ এএম

ভারতের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। বিহারের বাঁকিপুর আসনের উপনির্বাচনে প্রায় ২০ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয় পেয়েছেন প্রশান্ত কিশোর। এটি বিজেপি নেতা নীতিন নায়েকের পারিবারিক আসন। নীতিন নায়েক ও তাঁর বাবা প্রায় তিন দশক ধরে এই আসন থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হয়ে আসছেন। ফলে এই জয়কে অনেকেই বিহারের রাজনীতিতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখছেন। কেউ কেউ এর পেছনে সাম্প্রতিক জেন-জি আন্দোলনের প্রভাবও খুঁজে পাচ্ছেন। আবার অনেকের মতে, বিধায়ক হিসেবে প্রশান্ত কিশোরের এই যাত্রা অচিরেই তাঁকে মুখ্যমন্ত্রীর অন্যতম শক্তিশালী দাবিদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। তবে তাঁর এই নির্বাচনী সাফল্যের ইতিবাচক ও নেতিবাচক—দুই ধরনের প্রভাবই থাকতে পারে।

প্রশান্ত কিশোর বা ‘পিকে’—ভারতের রাজনীতিতে একসময় নামটি ছিল নিখাদ পর্দার আড়ালের সমীকরণ। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদীর জাতীয় রাজনীতিতে উত্থান এবং বিজেপির ঐতিহাসিক জয়ের পেছনে তাঁর কৌশলগত ভূমিকার মধ্য দিয়েই তিনি আলোচনায় আসেন। এরপর বিহারে মহাগঠবন্ধনের হয়ে নীতিশ কুমার ও লালু প্রসাদের রাজনৈতিক সমঝোতা, পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দিদিকে বলো’ কর্মসূচি কিংবা ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের সুসংগঠিত প্রচার—সব ক্ষেত্রেই তিনি প্রচলিত রাজনৈতিক কৌশলের বাইরে গিয়ে আধুনিক ব্র্যান্ডিং, ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং কর্পোরেট ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন পদ্ধতি প্রয়োগ করেন।

এক অর্থে তিনি রাজনীতিকে শুধু আদর্শিক লড়াইয়ের ক্ষেত্র হিসেবে না দেখে ডেটা-নির্ভর ও ইভেন্টকেন্দ্রিক এক ধরনের ‘কর্পোরেট মডেলে’ রূপ দিয়েছেন। অনেকের মতে, ভারতের নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রচারের বাণিজ্যিকীকরণ বা অতিরিক্ত প্যাকেজিংয়ের অন্যতম প্রধান কারিগরও তিনি। কিন্তু দীর্ঘদিনের সেই পর্দার আড়ালের নির্বাচনী কৌশলবিদ যখন নিজেই সরাসরি রাজনীতিতে নামেন, ‘জন সুরাজ’ প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলে গোটা বিহার চষে বেড়ান, তখন বিষয়টির চরিত্রই বদলে যায়। আর উপনির্বাচনে তাঁর এই জয় প্রশ্ন তোলে—এই পরিবর্তন ভারতের রাজনীতির জন্য কী বার্তা বহন করছে?

প্রথম দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, বিহার বা জাতীয় রাজনীতিতে নতুন কোনো তৃতীয় শক্তির উত্থান আরজেডি কিংবা কংগ্রেসের মতো বিরোধী দলগুলোর ভোটব্যাংকে ভাগ বসাবে, যার সুবিধা পেতে পারে বিজেপি। কিন্তু বাস্তবের সমীকরণ এতটা সরল নাও হতে পারে।

প্রশান্ত কিশোরের মূল রাজনৈতিক পুঁজি ধর্মীয় বা জাতিগত মেরুকরণ নয়; তাঁর প্রচারের কেন্দ্রবিন্দু প্রশাসনিক দক্ষতা, কর্মসংস্থান, শিক্ষা এবং বিহারের উন্নয়ন। সুশাসনের এই এজেন্ডাই এতদিন বিজেপির অন্যতম প্রধান ব্র্যান্ড পজিশনিং ছিল—সরকারে গিয়ে তারা সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সফল হোক বা না হোক। যদি নতুন কোনো রাজনৈতিক শক্তি একই জায়গায় দাঁড়িয়ে তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে পারে, তাহলে সেটি বিজেপির জন্য কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। কারণ এতে বিজেপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ব্র্যান্ডিংয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা প্রশ্নের মুখে পড়বে।

আবার অন্য দিকও রয়েছে। নীতিশ কুমার কিংবা লালু পরিবারের বিকল্প হিসেবে যদি একজন অরাজবংশীয়, ডেটা-নির্ভর নেতা উঠে আসেন, তাহলে নীতিশ-পরবর্তী বিহারে বিজেপির জন্য আঞ্চলিক দলগুলোর ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর সুযোগও তৈরি হতে পারে। ফলে প্রশান্ত কিশোরের উত্থান বিজেপির জন্য তাৎক্ষণিক বড় ক্ষতির কারণ না হলেও, দীর্ঘমেয়াদে তাদের ঐতিহ্যগত ভোটভিত্তিতে সূক্ষ্ম চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
তবে প্রশান্ত কিশোরের উত্থান ঘিরে সবচেয়ে বড় বিতর্কটি গণতন্ত্রের ‘কর্পোরেটাইজেশন’ বা বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে। যখন নির্বাচনী রাজনীতিতে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, পেশাদার জনসংযোগ প্রতিষ্ঠান এবং মার্কেটিং এজেন্সিগুলো মুখ্য হয়ে ওঠে, তখন রাজনীতির প্রাণ—মতাদর্শিক লড়াই কিংবা তৃণমূলের মানুষের আবেগ—ক্রমেই ম্লান হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। রাজনীতি তখন সাধারণ কর্মীদের হাতছাড়া হয়ে বড় বাজেট, পেশাদার জরিপ এবং জনসংযোগ প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে। এতে গণতন্ত্রের অন্তর্নিহিত প্রাণশক্তি দুর্বল হয়ে শুধু একটি আকর্ষণীয় ‘প্যাকেজড প্রোডাক্ট’-এ পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

তবে অন্য দৃষ্টিকোণও রয়েছে। অনেকে এটিকে রাজনীতিতে পেশাদারিত্বের বিকাশ বলেই দেখেন। ভারতের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে জাতপাত, ধর্মীয় আবেগ এবং পরিবারতন্ত্রের আবর্তে ঘুরপাক খেয়েছে, এখনো খাচ্ছে। সেখানে ডেটা ব্যবহার করে মানুষের বাস্তব সমস্যা—যেমন স্বাস্থ্য, শিক্ষা বা কর্মসংস্থান—চিহ্নিত করা এবং সেই অনুযায়ী নীতি প্রণয়নের চেষ্টা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত হতে পারে। প্রশান্ত কিশোর যদি শুধু রাজনৈতিক কৌশল বিক্রি না করে নিজেই জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে মাঠে নামেন, তাহলে সেটি পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোকেও নিজেদের কর্মদক্ষতা বাড়াতে বাধ্য করতে পারে।

তাই প্রশান্ত কিশোরের রাজনৈতিক আবির্ভাবকে সাদা-কালো দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করা কঠিন। একদিকে এটি রাজনীতিতে পুঁজি, প্রযুক্তি ও কর্পোরেট সংস্কৃতির ক্রমবর্ধমান প্রভাবের প্রতিফলন, যা সাধারণ রাজনৈতিক কর্মীদের জন্য পরিসর সংকুচিত করতে পারে। অন্যদিকে, প্রথাগত আবেগ, ধর্ম বা জাতপাতের রাজনীতির বাইরে এসে ডেটা, পরিকল্পনা ও প্রশাসনিক সক্ষমতার মতো বিষয়কে সামনে আনার যে চেষ্টা তিনি করছেন, তার গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করে ভোটারদের একটি অংশও এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি হিসাব-নিকাশ করে সিদ্ধান্ত নিতে আগ্রহী।

সব মিলিয়ে, একে গণতন্ত্রের মৃত্যু কিংবা কোনো মহাবিপ্লব—কোনোটিই বলা যাবে না। বরং বলা যায়, ভারতের নির্বাচনী রাজনীতি একটি নতুন পর্বে প্রবেশ করছে, যেখানে আবেগ ও মতাদর্শের পাশাপাশি কর্মদক্ষতা, নীতিনির্ধারণের সক্ষমতা এবং পেশাদার রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনাও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। শেষ পর্যন্ত এই ধারা গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করবে, নাকি তাকে কেবল একটি ঝকঝকে কর্পোরেট প্রদর্শনীতে পরিণত করবে—তার উত্তর নির্ভর করবে ‘জন সুরাজ’-এর মতো উদ্যোগগুলো ভবিষ্যতে কতটা জনমুখী ও নীতিনিষ্ঠ রাজনীতি ধরে রাখতে পারে, তার ওপর।

মন্তব্য করুন

Logo