Logo

১ ভাদ্র ১৪৩৩

×

Follow Us

স্পেনের শাসকের বিরুদ্ধে গভীর চক্রান্ত

দশদিগন্ত

চিউতায় অভিবাসী ঢল

স্পেনের শাসকের বিরুদ্ধে গভীর চক্রান্ত

Icon

সাঈদ হাসান

প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৩১ পিএম

স্পেনের চিউতা সমুদ্র উপকূলবর্তী এক ছোট ছিটমহল। সেখানকার মোট লোকসংখ্যা ৮৩ হাজার। সেখানে ১-২দিনে ঢেউয়ের মত ঢুকে পড়েছে ৫০-৬০ হাজার মরোক্কান। স্পেনের মার্কিন বিরোধী শাসককে বেকায়দায় ফেলতে পরিকল্পিতভাবে এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে।

প্রথমত বলা জরুরি যে পনেরো শতকে যখন প্রথমবারের মতো কাগজেকলমে চিউতার উল্লেখ পাওয়া যায়, তখন থেকে আজ অবধি এই ভূখণ্ড কখনো মরক্কোর ছিল না। এটা প্রথমে ছিল পর্তুগালের, পরে পর্তুগাল ও স্পেন একীভূত হওয়ার পর চিউতা হয় স্পেনিশ রাজতন্ত্রের শাসনাধীন এলাকা। এরপর পর্তুগালের একটি রাজবংশ বিদ্রোহ ঘোষণা করে পর্তুগালকে স্পেন থেকে স্বাধীন করার পর পুরনো সবকটি পর্তুগিজ টেরিটরি পর্তুগালের প্রতি বশ্যতা স্বীকার করলেও চিউতা স্পেনে থাকার পক্ষে ভোট দেয় এবং এখনও আছে। এখন হঠাৎ স্পেনের বিরুদ্ধে মরক্কোর সাহস বেড়ে গেল কেন এবং চিউতায় গতকালের আগ্রাসন কেন ঘটেছে তা ভালোভাবে বুঝতে হলে একটু পেছনে তাকানো জরুরি।

প্রথম পর্ব: ২০২০ - ২০২১ ট্রাম্প, নেতানিয়াহু এবং মরক্কোর নেতারা

১০ ডিসেম্বর, ২০২০

মরক্কোর জনসাধারণের সিংহভাগের মনে হতাশা ও উদ্বেগ সৃষ্টি করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে মরক্কোর নেতারা ইজরায়েলকে স্বীকৃতি দিতে সম্মত হয়েছেন। এর সাথে সঙ্গতি রেখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জানায় যে তারা পশ্চিম সাহারার (যেটার অংশবিশেষ নিয়ে আলজেরিয়ার সঙ্গে মরক্কোর বিরোধ রয়েছে, আর কিছু অংশে চলছে আরব গোত্রগুলোর স্বাধীনতা আন্দোলন) ওপর মরক্কোর দাবিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিচ্ছে।

১১ডিসেম্বর, ২০২০

ট্রাম্প প্রশাসন মরক্কোর কাছে ১০০ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের অস্ত্র বিক্রি করে, যা আবারও বহু মরক্কোবাসীর জন্য হতাশাজনক ছিল।

তারা ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুকে সম্প্রসারণবাদী মানসিকতা সম্পন্ন নির্দয় ও নীতিহীন নেতা হিসেবে বর্ণনা করে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

১৫ জানুয়ারি, ২০২১

মরক্কোর রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ হোয়াইট হাউস সফর করে এবং ট্রাম্পকে অর্ডার অফ মুহাম্মদ সম্মাননায় ভূষিত করে। বিনিময়ে ট্রাম্প রাজাকে লেজিওন অফ মেরিট (চিফ কমান্ডারের মর্যাদা) প্রদান করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জানায় যে সেই ভূখণ্ডের ওপর মরক্কোর দাবি জোরদার করতে পশ্চিম সাহারার দাখলায় একটি কনস্যুলেট স্থাপন করা হবে।

১৭ মে, ২০২১

স্পেন সাহারার একটি স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠীর অসুস্থ নেতাকে সেদেশের হাসপাতালে চিকিৎসার অনুমতি দিলে মরক্কো সরকার স্পেনের উপর চাপ সৃষ্টি করতে তাদের সীমান্ত নিরাপত্তা শিথিল করে দেয় এবং প্রায় ৮ হাজার অভিবাসী হঠাৎ করে চিউতায় প্রবেশ করে।স্প্যানিশ ভূখণ্ডে কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষদের ঢোকার ছবিগুলো সংবাদমাধ্যমে ফলাও প্রচার করা হয় এবং তা সমগ্র ইউরোপ ও যুক্তরাজ্য জুড়ে অভিবাসী-বিরোধী ও মুসলিম-বিরোধী মনোভাব ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে তুলতে সাহায্য করে।

২৪ নভেম্বর ২০২১

মরক্কো ও ইজরায়েল একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। ইউনিফর্ম পরা ইজরায়েলের সৈন্যরা প্রথমবারের মতো মরক্কো সফর করে।

দ্বিতীয় পর্ব: ২০২৩ থেকে ২০২৫: মরক্কোতে ইজরায়েলের আরও বড় ইস্যু হয়ে ওঠা

১৭ জুলাই ২০২৩

ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদকে লেখা এক চিঠিতে পশ্চিম সাহারার ওপর মরক্কোর সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে নেয়। চিঠিতে নেতানিয়াহু বলে যে ওই অঞ্চলে মরক্কোর দাবি শক্তিশালী করতে পশ্চিম সাহারার দাখলা শহরে ইজরায়েল একটি কনস্যুলেট খোলার পরিকল্পনা করছে। এই চুক্তিগুলো ট্রাম্প, নেতানিয়াহু এবং মরক্কোর নেতৃত্বের মধ্যে ঐক্যকে মজবুত করে – যদিও উত্তর আফ্রিকার এই দেশটির সাধারণ জনগণ তা মেনে নেয়নি।

৫ এপ্রিল, ২০২৫

ইজরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে এক বিশাল প্রতিবাদ বিক্ষোভে হাজার হাজার মরক্কোবাসী রাজপথে নেমে আসে। মিছিলকারীরা গাযযায় ইজরায়েলের ব্যাপক হামলা ও সহিংসতা বন্ধের দাবি জানায়।

৮ এপ্রিল, ২০২৫

মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর পশ্চিম সাহারার ওপর মরক্কোর সার্বভৌমত্বের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতির কথা পুনর্ব্যক্ত করে একটা বিবৃতি প্রকাশ করে।

৯ অক্টোবর, ২০২৫

স্পেন জানায় যে ন্যাটোর নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী তারা অস্ত্র ও সামরিক খাতে অতিরিক্ত অর্থ (জিডিপির ৫%) ব্যয় করবে না। ট্রাম্প স্পেনকে ন্যাটো থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দেয়।

তৃতীয় পর্ব: ২০২৬: ইরানের ওপর হামলায় স্পেনের বিরোধিতায় ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর গোস্বা

৩ এপ্রিল, ২০২৬

ইজরায়েলের কারাগারে আটক ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিধান রেখে ইজরায়েলের পার্লামেন্টে একটি নতুন আইন পাসের নিন্দা জানাতে মরক্কোর হাজার হাজার মানুষ মিছিল করেন।

২ মার্চ ২০২৬

স্পেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের রোটা এবং মোরোন সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করার অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানায়। তারা উল্লেখ করে যে ইরানের ওপর মার্কিন-ইজরায়েলি একতরফা হামলা জাতিসংঘের নীতিমালার স্পষ্ট লঙ্ঘন।

৩ মার্চ, ২০২৬

ট্রাম্প ঘোষণা করে যে ইরানে হামলায় সহায়তা করতে অস্বীকৃতি জানানো এবং অস্ত্র ও সামরিক খাতে সরকারি অর্থ ব্যয় দ্বিগুণ করতে রাজি না হওয়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্র স্পেনের সাথে সমস্ত বাণিজ্য বন্ধ করে দেবে।

২৪ এপ্রিল ২০২৬

পেন্টাগনের একটি ফাঁস হওয়া ইমেলে প্রকাশ পায় যে, ইরানে হামলায় কোনো ভূমিকা রাখতে অস্বীকৃতি জানানোয় স্পেনকে ন্যাটো থেকে বরখাস্ত করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র অভ্যন্তরীণভাবে আলোচনা করছে।

২৬ এপ্রিল ২০২৬

স্পেনের অধীনে থাকা চিউতা ও মেলিলা দ্বীপের ওপর মরক্কোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে ইজরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র কি কি সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে, সে বিষয়ে একটি নিবন্ধ খুব গুরুত্ব দিয়ে ছাপানো হয় ইজরায়েলের অন্যতম প্রভাবশালী ও রক্ষণশীল প্রচারমাধ্যম ওয়াইনেটে।

২৭ জুলাই ২০২৬

স্পেনের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের ক্ষোভ যত বাড়তে থাকে, মরক্কোর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ রহস্যজনকভাবে তত শিথিল হয়ে পড়ে। আনুমানিক ৫০ হাজার থেকে ৬০ হাজার অবৈধ অভিবাসনপ্রত্যাশী চিউতায় প্রবেশ করে। বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমগুলো আবারও ইউরোপের কন্টিনেন্টাল সীমান্তে কৃষ্ণাঙ্গ যুবকদের ঢোকার ছবিতে ভরে যায়। প্রচারণার এই প্যাটার্ন ২০২১ সালের ১৭ মের অদ্ভুত পুনরাবৃত্তি।

১ আগস্ট ২০২৬

যারা চিউতায় প্রবেশ করেছিল তাদের বেশিরভাগকেই দ্রুত মরক্কোতে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তবে স্পেনের নেতৃত্ব ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে। স্পেনসহ সমগ্র ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যে অভিবাসী-বিরোধী মনোভাব তীব্র হয়ে উঠেছে। ইউরোপে ও সমগ্র পাশ্চাত্যে মুসলিম-বিরোধী ক্ষোভও বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।


মন্তব্য করুন

Logo