৩১২টি শূন্য পাস প্রতিষ্ঠান: ব্যর্থ কে, শিক্ষার্থী নাকি শিক্ষাব্যবস্থা!
দীপু মাহমুদ
প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬, ১২:৩২ এএম
নাজমা খাতুন ক্লাসে একা বসে আছে। বাইরে বৃষ্টি। ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার রুহিয়া এলাকার মাধবপুর বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের টিনের ছাউনি ভেদ করে পানি পড়ছে টুপটাপ করে। সামনে খোলা বই, পাশে খাতা। বিদ্যালয়ের নামের সঙ্গে ‘উচ্চবিদ্যালয়’ শব্দটি আছে, কিন্তু অবকাঠামো দেখে তা বিশ্বাস করা কঠিন। বিদ্যালয়ে মোট তিনটি কক্ষ-একটিতে অফিস, দুটিতে ক্লাস। জায়গা না হলে টিনের চাল দেওয়া খোলা ঘরে ক্লাস করতে হয়। বিদ্যালয়ে বিদ্যুৎ নেই, তাই ফ্যানও নেই।
নাজমার কয়েকজন বান্ধবী একে একে শহরের ভালো স্কুলে চলে গেছে। সেখানে বড় ভবন, প্রজেক্টর। নিজের স্কুলের সঙ্গে তুলনা করলে নাজমার লজ্জা লাগে। আর সবাই যে অন্য স্কুলে চলে গেছে, তা-ও নয়। কারও পড়াশোনা থেমে গেছে বাল্যবিবাহে, কারও স্কুলে আসা বন্ধ হয়েছে পরিবারের অভাবের কারণে, কেউ শ্রমে জড়িয়ে পড়েছে। এক একজন শিক্ষার্থী বিদ্যালয় থেকে হারিয়ে যায় আর ক্লাসের বেঞ্চ ফাঁকা হতে থাকে।
সুমনা আক্তার জানে, বৃষ্টি হলে এই স্কুলে ক্লাস করা যায় না। ছাউনি দিয়ে পানি পড়ে, বই-খাতা ভিজে যায়। বই নষ্ট হলে নতুন বই কেনার সামর্থ্যও সব সময় থাকে না। এভাবেই একটি স্কুল থেকে শিক্ষার্থী কমতে থাকে। কেউ চলে যায় ভালো স্কুলে, কেউ বিয়ের ঘরে, কেউ কাজের জায়গায়। যারা থেকে যায়, তাদের নিয়েই বিদ্যালয় ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়।
মাধবপুর বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে এবছর এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিল পাঁচজন। পরীক্ষার ফল প্রকাশে জানা গেল- বিদ্যালয়ের পাঁচজনের একজনও পাস করেনি। ফলাফলের খাতায় বিদ্যালয়ের পাশে লেখা হলো- শূন্য। কিন্তু সেই শূন্য কি শুধু পাঁচজন শিক্ষার্থীর! নাকি তার ভেতরে আছে বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া বই, ভালো স্কুলে চলে যাওয়া সহপাঠী, বাল্যবিবাহে থেমে যাওয়া শৈশব, অভাবের তাড়নায় শ্রমে হারিয়ে যাওয়া শিক্ষার্থী এবং একটি বিদ্যালয়ের দীর্ঘ অব্যবস্থার গল্প! কখনো পরীক্ষার ফলাফলের খাতায় সবচেয়ে ছোট সংখ্যাটির ভেতরেই থাকে সবচেয়ে বড় ঘটনা।
১২ জন শিক্ষার্থী, ১২ জন শিক্ষক- তবু সবাই ফেল।
১২ জন শিক্ষার্থী, ১২ জন শিক্ষক। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত একেবারে এক-এক। তবু এসএসসি পরীক্ষায় ওই ১২ জন শিক্ষার্থীর একজনও পাস করেনি। কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার তালতলা উচ্চবিদ্যালয়ের এই ফল প্রথম দেখায় বিস্মিত করে। শিক্ষকসংখ্যা বিবেচনায় নিলে এমন ফল হওয়ার কথা নয়। কিন্তু বিদ্যালয়টির বাস্তব চিত্র সামনে এলে বোঝা যায়, শিক্ষার সংকট শুধু শিক্ষকসংখ্যার অঙ্কে ধরা পড়ে না।
বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা নিয়মিত এলেও শিক্ষার্থীরা নিয়মিত আসে না। কেউ বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছে, কেউ কাজের জন্য ঢাকায় চলে গেছে। ভালো শিক্ষার্থীদের অনেকে আবার শহরের বিদ্যালয়ে চলে যায়। ফলে যে ১২ জন পরীক্ষায় বসেছে, তাদের পেছনে আছে অনিয়মিত উপস্থিতি, শেখার ঘাটতি, সামাজিক সংকট এবং দীর্ঘদিনের দুর্বল প্রস্তুতি। তালতলা উচ্চবিদ্যালয়ের ঘটনা তাই এবারের এসএসসি ফলাফলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। শিক্ষক আছেন, কিন্তু শিক্ষার্থী নিয়মিত শিখছে না- তাহলে ব্যর্থতার দায় কার!
এক বছরে শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠান বেড়েছে ১৭৮টি
তালতলা একা নয়। ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় দেশের ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করেনি। অথচ ২০২৫ সালে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ১৩৪টি। অর্থাৎ মাত্র এক বছরে শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠান বেড়েছে ১৭৮টি। শতকরা হিসাবে বৃদ্ধি প্রায় ১৩৩ শতাংশ। আরও পেছনে তাকালে চিত্রটি আরও উদ্বেগজনক। ২০২৪ সালে শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠান ছিল ৫১টি, ২০২৩ সালে ৪৮টি, ২০২২ সালে ৫০টি এবং ২০২১ সালে মাত্র ১৮টি। অর্থাৎ ২০২৪ সালের ৫১টি থেকে ২০২৬ সালের ৩১২টি- মাত্র দুই বছরে শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছয় গুণেরও বেশি হয়েছে। এটা আর কয়েকটি দুর্বল প্রতিষ্ঠানের বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে মনে হয় না। এটা শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরে জমে থাকা কোনো সমস্যার দৃশ্যমান প্রকাশ।
শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৭২.৪ শতাংশই মাদ্রাসা
৩১২টি শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২২৬টি মাদ্রাসা, ৫৭টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীন প্রতিষ্ঠান এবং ২৯টি কারিগরি প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৭২ দশমিক ৪ শতাংশই মাদ্রাসা। সাধারণ বোর্ডের প্রতিষ্ঠান ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ এবং কারিগরি প্রতিষ্ঠানের ৯ দশমিক ৩ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান আলাদা করে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। কারণ মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষকসংকট, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক, সাধারণ শিক্ষার বিষয়গুলোতে পাঠদানের মান, শিক্ষার্থীর উপস্থিতি, প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনা ও তদারকির মতো বিষয়গুলো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন আছে। তবে এখানে কোনো সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না যে মাদ্রাসা বলেই ফল খারাপ। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত- কেন শূন্য পাসের এত বড় অংশ মাদ্রাসায়! কোথায় তাদের কাঠামোগত দুর্বলতা! এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আলাদা অনুসন্ধান প্রয়োজন।
শুধু শূন্য পাস নয়, শতভাগ পাসের প্রতিষ্ঠানও কমেছে
শুধু শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠান বেড়েছে- এ তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার বিপরীত পরিসংখ্যানটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৪ সালে দেশের ২ হাজার ৯৬৮টি প্রতিষ্ঠান থেকে শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছিল। ২০২৫ সালে তা নেমে আসে মাত্র ৯৮৪টিতে। অর্থাৎ এক বছরেই শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমে গেছে ১ হাজার ৯৮৪টি। ২০২৩ সালে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠান ছিল ২ হাজার ৩৫৪টি, ২০২২ সালে ২ হাজার ৯৭৫টি। ২০২৬ সালে এই সংখ্যা আরও কমে ৬৬৯টি হয়েছে। একদিকে শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠান বেড়েছে আর অন্যদিকে শতভাগ পাসের প্রতিষ্ঠান কমেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ফলাফলের দুই প্রান্ত যেন আরও দূরে সরে যাচ্ছে। তাই প্রশ্ন শুধু ‘কতজন পাস করল’ সেটা নয়, কোন ধরনের প্রতিষ্ঠান ভালো করছে এবং কোন ধরনের প্রতিষ্ঠান ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছে- সেটাও দেখা জরুরি।
জাতীয় ফলাফলও বলছে, সংকট কেবল কয়েকটি বিদ্যালয়ে নয়
২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১১টি শিক্ষা বোর্ড মিলিয়ে পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। ২০২৫ সালে এই হার ছিল ৬৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরে পাসের হার কমেছে ৪ দশমিক ০৮ শতাংশ পয়েন্ট। নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এবার পাসের হার ৬৪ দশমিক ০৫ শতাংশ, গত বছর যা ছিল ৬৮ দশমিক ০৪ শতাংশ। জিপিএ-৫-এর সংখ্যাও কমেছে। সব বোর্ড মিলিয়ে এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন। সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৯ জন, যেখানে গত বছর ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার ১৮ জন। অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু ৩১২টি শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নয়। জাতীয় ফলাফলেও তার প্রতিফলন আছে।
ইংরেজি আর গণিতে দুর্বলতা কি আসল সমস্যার শেষ কথা!
ফল প্রকাশের পর শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইংরেজি আর গণিতে তুলনামূলক বেশি শিক্ষার্থী ফেল করায় সামগ্রিক পাসের হার কমেছে। এটা সত্য হলে পরবর্তী প্রশ্ন হওয়া উচিত- ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীরা এত দুর্বল কেন! শুধু ‘শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করেনি’ বললে উত্তরটি পাওয়া যাবে না। কারণ একজন শিক্ষার্থীর গণিতের ভিত্তি যদি প্রাথমিক স্তরেই দুর্বল হয়ে যায়, দশম শ্রেণিতে গিয়ে পরীক্ষার আগে তাকে কিছু প্রশ্ন অনুশীলন করিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করা কঠিন। একইভাবে পড়ার মৌলিক দক্ষতা দুর্বল থাকলে উচ্চতর শ্রেণিতে ইংরেজি শেখার ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি হবে। অর্থাৎ এসএসসির ফল অনেক সময় দশম শ্রেণির নয়, বহু বছর ধরে জমে থাকা শেখার ঘাটতির ফল।
শেখার ভিত্তিই যদি দুর্বল হয়, এসএসসিতে গিয়ে তার খেসারত দিতে হবে
ইউনিসেফের তথ্য থেকে এই সংকটের গভীরতা বুঝা যায়। বাংলাদেশে ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মাত্র ৫০ দশমিক ২ শতাংশের মৌলিক পড়ার দক্ষতা আছে। মৌলিক গণিতের দক্ষতা আছে মাত্র ৩৯ দশমিক ২ শতাংশের। অর্থাৎ প্রায় ৬০ শতাংশ শিশু মৌলিক গণিত দক্ষতাতেই পৌঁছাতে পারছে না। বিদ্যালয়ে প্রবেশের হার বাড়লেও শেখার ফল যে সেই অনুপাতে বাড়েনি, এই তথ্য তার বড় প্রমাণ। প্রাথমিক বিদ্যালয় শেষ করার হার যেখানে ৮৩ দশমিক ৭ শতাংশ, নিম্নমাধ্যমিক পর্যায় শেষ করার হার ৬৯ দশমিক ৩ শতাংশ এবং উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় শেষ করার হার মাত্র ৪৩ দশমিক ৯ শতাংশ। তাই এসএসসিতে কোনো শিক্ষার্থী ফেল করলে শুধু তার দশম শ্রেণির পড়াশোনাকে দায়ী করা যাবে না। প্রশ্ন করতে হবে- প্রাথমিক ও নিম্নমাধ্যমিক স্তরে সে কী শিখেছিল? কোথায় তার শেখার ঘাটতি তৈরি হয়েছিল?
তালতলার ১২ জনের গল্প আসলে শিক্ষাব্যবস্থার বাইরের গল্পও
তালতলা উচ্চবিদ্যালয়ের ১২ জন শিক্ষার্থীর কেউ পাস না করার পেছনে বিদ্যালয়ের ভেতরের দুর্বলতা যেমন আছে, তেমনি আছে বিদ্যালয়ের বাইরের বাস্তবতাও। শিক্ষার্থীদের অনিয়মিত উপস্থিতি, বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম, পরিবারের আর্থিক চাপ এবং ভালো শিক্ষার্থীদের অন্য বিদ্যালয়ে চলে যাওয়া- সবকিছু মিলেই একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ দুর্বল হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে না এলে শুধু শিক্ষককে দায়ী করা যায় না। আবার শিক্ষার্থী কেন বিদ্যালয়ে আসে না, সেই প্রশ্নের উত্তর না খুঁজে তাকে দায়ী করাও ন্যায্য নয়। শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সামাজিক বাস্তবতার এই যোগসূত্রটি আমাদের নীতিনির্ধারণে প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে।
চারজন পরীক্ষার্থী, চারজনই ফেল- কিন্তু কারণ কী!
কুড়িগ্রামের ব্রাহ্মণপাড়া উচ্চবিদ্যালয়ের ঘটনা আরও একটি দিক সামনে আনে। এসএসসি পরীক্ষায় সেখানে অংশ নিয়েছিল মাত্র চারজন শিক্ষার্থী। চারজনই ফেল করেছে। বিদ্যালয়ের শিক্ষক জানিয়েছেন, মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতি ভালো হয়নি। পঞ্চম শ্রেণি থেকে মাত্র পাঁচজন শিক্ষার্থী নিয়ে মাধ্যমিক পর্যায়ে ওঠা বিদ্যালয়টিতে একজন বিয়ে করে পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত ছিল চারজন পরীক্ষার্থী।
অন্যদিকে পাথরডুবি আদর্শ বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে ২৪৫ জন শিক্ষার্থী ও ১২ জন শিক্ষক-কর্মচারী থাকলেও এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় মাত্র চারজন। চারজনই ফেল করেছে। বিদ্যালয়টি এখনো এমপিওভুক্ত নয়, শিক্ষকরা বিনা বেতনে পড়ান। বাল্যবিবাহও সেখানে একটি বড় সমস্যা। তার মানে সব জায়গায় ‘শূন্য পাস’ অর্থ একই রকম নয়। কোথাও শিক্ষার্থীই নেই, কোথাও শিক্ষক নেই, কোথাও সামাজিক সংকট, কোথাও অর্থনৈতিক সংকট।
৩১২টি প্রতিষ্ঠানের পেছনে হয়তো ৩১২টি আলাদা সংকট
এই কারণেই শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানগুলোকে এক ছাঁচে বিচার করা বিপজ্জনক। কোথাও শিক্ষার্থীর উপস্থিতি কম। কোথাও বাল্যবিবাহ। কোথাও শিশুশ্রম। কোথাও ভালো শিক্ষার্থীরা অন্যত্র চলে যাচ্ছে। কোথাও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নেই। কোথাও প্রতিষ্ঠানটি আর্থিকভাবে দুর্বল। কোথাও ব্যবস্থাপনার সমস্যা। কোথাও হয়তো পাঠদানের মানই প্রশ্নবিদ্ধ। অর্থাৎ ৩১২টি শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের পেছনে ৩১২টি আলাদা গল্প থাকতে পারে। তাই ফল প্রকাশের পর শুধু তালিকা তৈরি করে প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যর্থ ঘোষণা করলে সমস্যার সমাধান হবে না। বরং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতার কারণ আলাদা করে চিহ্নিত করতে হবে।
শিক্ষকসংকটও বাস্তব- দেশে ৯২ হাজারের বেশি পদ শূন্য
শিক্ষকের দায় নিয়ে প্রশ্ন উঠবে, সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু শিক্ষকসংকটও যে বাস্তব, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। এপ্রিল ২০২৬-এ সংসদে শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশের সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মিলিয়ে ৯২ হাজার ৮১টি শিক্ষক পদ শূন্য। এর মধ্যে এমপিওভুক্ত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ৭৭ হাজার ২২৭টি, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২ হাজার ৮৪২টি এবং কারিগরি শিক্ষায় ৮ হাজার ৭৭০টি শিক্ষক পদ শূন্য। তাই কোনো বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় শিক্ষক না থাকলে সেই বিদ্যালয়ের খারাপ ফলের দায় শুধু শিক্ষার্থীর ওপর চাপানো যায় না। রাষ্ট্রেরও প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে।
শিক্ষক থাকলেই ভালো ফল হয় না
তালতলা উচ্চবিদ্যালয় আমাদের অন্য সত্য দেখায়। সেখানে ১২ জন শিক্ষক, ১২ জন পরীক্ষার্থী। তবু কেউ পাস করেনি। অর্থাৎ শুধু শিক্ষকসংখ্যা দিয়ে শিক্ষার মান নিশ্চিত করা যায় না। শিক্ষক আছেন কি না, তার পাশাপাশি দেখতে হবে- শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসে কিনা, শিক্ষক নিয়মিত পাঠদান করেন কিনা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পারস্পরিক যোগাযোগ কেমন, শিক্ষার্থীর শেখার ঘাটতি চিহ্নিত করা হয় কিনা, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ফলাফলের ভিত্তিতে কোনো পদক্ষেপ নেয় কিনা। শিক্ষার মান আদতে একটি ব্যবস্থার ফল। সেখানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, পরিবার, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা, সমাজ এবং রাষ্ট্র- সব পক্ষের ভূমিকা আছে।
কঠোর মূল্যায়ন হয়েছে- কিন্তু সেটিই কি পুরো ব্যাখ্যা!
এসএসসির ফল আশানুরূপ না হওয়ার পর একটি ব্যাখ্যা সামনে আসে- পরীক্ষা এবার কঠোর হয়েছে, তাই পাসের হার কমেছে। কঠোর ও ন্যায্য মূল্যায়ন অবশ্যই প্রয়োজন। একজন শিক্ষার্থী যা জানে না, তাকে নম্বর দিয়ে পাস করিয়ে দেওয়া তার জন্যও ক্ষতিকর, শিক্ষাব্যবস্থার জন্যও। ২০২৫ সালে পাসের হার ৬৮ দশমিক ৩৪ শতাংশের আশপাশে নেমে যাওয়ার পর ২০২৬ সালে তা আরও কমে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ হওয়া, একই সময়ে শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠান ১৩৪ থেকে বেড়ে ৩১২ হওয়া- এসবকে শুধু কঠোর মূল্যায়ন দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। বরং কঠোর মূল্যায়ন যদি প্রকৃত শেখার অবস্থা প্রকাশ করে থাকে, তাহলে আমাদের আতঙ্কিত না হয়ে জানতে হবে- শিক্ষার্থীরা শিখছে না কেন?
বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রমকে শিক্ষা থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই
তালতলা, পাথরডুবি কিংবা কুড়িগ্রামের অন্য বিদ্যালয়গুলোর ঘটনায় বুঝা যায়, শিক্ষার্থীর বিদ্যালয়ে থাকা শুধু বিদ্যালয়ের বিষয় নয়। গতবছর ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের একটি সমীক্ষায় এসএসসি পরীক্ষায় অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৪১ শতাংশ বিবাহিত পাওয়া গিয়েছিল। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের ৯ দশমিক ২ শতাংশ শিশুশ্রমে যুক্ত।
একজন শিশুর স্কুলে না থাকার পেছনে যদি বিয়ে বা শ্রমের মতো সামাজিক কারণ থাকে, তাহলে শুধু বিদ্যালয়কে দায়ী করে সমাধান সম্ভব নয়। শিক্ষা নীতির সঙ্গে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, শিশুশ্রম বন্ধ এবং দরিদ্র পরিবারের সামাজিক সুরক্ষাকেও যুক্ত করতে হবে।
এমপিও বাতিল নয়, আগে দরকার কারণ খুঁজে বের করা
শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি অযৌক্তিক নয়। একটি প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর শিক্ষার্থীদের কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা দিতে ব্যর্থ হলে জবাবদিহি অবশ্যই থাকতে হবে।কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে কেউ পাস করেনি বলেই শুধু এমপিও বাতিল করা হলে সমস্যার সমাধান হবে কি! একটি বিদ্যালয় বন্ধ হলে সেখানে পড়া শিশুদের কী হবে? তারা কি সহজেই অন্য বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারবে? নাকি বিদ্যালয় বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের শিক্ষাজীবন আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে? তাই প্রয়োজন প্রতিষ্ঠানভিত্তিক একাডেমিক নিরীক্ষা। প্রতিটি শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানে দেখতে হবে- কতজন পরীক্ষার্থী ছিল, উপস্থিতি কেমন, কোন বিষয়ে কতজন ফেল করেছে, শিক্ষকসংখ্যা ও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক কত, বিদ্যালয়ত্যাগের হার কত, বাল্যবিবাহ বা শিশুশ্রম আছে কিনা, বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কেমন। তারপর প্রয়োজন হবে remedial বা catch-up education- যে শিক্ষার্থী যে জায়গায় পিছিয়ে আছে, তাকে সেখান থেকেই এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে।
৩১২টি শূন্য পাস প্রতিষ্ঠান আসলে ৩১২টি সতর্কসংকেত
এসএসসির ফল প্রকাশের দিন আমরা সাধারণত জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে আলোচনা করি, পাসের হার নিয়ে হিসাব করি, কে ভালো করল আর কে খারাপ করল- তা নিয়ে কথা বলি। কিন্তু এবারের ফলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি হয়তো লুকিয়ে আছে ওই ৩১২টি প্রতিষ্ঠানে, যেখান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করেনি। ২০২১ সালে এমন প্রতিষ্ঠান ছিল ১৮টি। ২০২৪ সালে ৫১টি। ২০২৫ সালে ১৩৪টি। এবার ৩১২টি। একই সময়ে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠান ২০২৪ সালের ২ হাজার ৯৬৮টি থেকে ২০২৬ সালে নেমে এসেছে ৬৬৯টিতে। জাতীয় পাসের হারও ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। দেশে ৯২ হাজারের বেশি শিক্ষক পদ শূন্য। ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মাত্র ৫০ দশমিক ২ শতাংশের মৌলিক পড়ার দক্ষতা আছে এবং গণিতে আছে মাত্র ৩৯ দশমিক ২ শতাংশের। এই সব পরিসংখ্যানকে পাশাপাশি রাখলে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে যায়, তা হচ্ছে- এসএসসির ফল শুধু পরীক্ষার্থীর ফল নয়, এটা শিক্ষাব্যবস্থারও ফল। তাই প্রশ্নটি হওয়া উচিত নয় শুধু- ‘কে ফেল করল?’ প্রশ্ন হওয়া উচিত- ‘কেন ফেল করল?’
আর তার পরের প্রশ্ন- ‘আমরা আগে থেকে তা বুঝতে পারলাম না কেন?’
একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ফেল করলে তার ব্যক্তিগত দায় থাকতে পারে। কিন্তু যদি একটি বিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থী ফেল করে, যদি এমন বিদ্যালয়ের সংখ্যা এক বছরে ১৩৪ থেকে ৩১২-তে উঠে যায়, যদি জাতীয় পাসের হারও কমে যায়, তাহলে বিষয়টি আর শুধু শিক্ষার্থীর ব্যর্থতা থাকে না। তখন প্রশ্নটি শিক্ষাব্যবস্থার দিকে ফিরে আসে। আমরা চাইলে ৩১২টি প্রতিষ্ঠানকে ব্যর্থ বলে চিহ্নিত করতে পারি। চাইলে শিক্ষককে দায়ী করতে পারি, শিক্ষার্থীকে দায়ী করতে পারি, অভিভাবককে দায়ী করতে পারি। কিন্তু তাতে সমস্যার সমাধান হবে না।
কারণ শূন্য পাসের একটি বিদ্যালয়ের পেছনে থাকতে পারে বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম, দারিদ্র্য, শিক্ষকসংকট, অনিয়মিত উপস্থিতি, শেখার ঘাটতি, দুর্বল ব্যবস্থাপনা কিংবা এসবের সম্মিলিত প্রভাব। তাই দরকার শাস্তির আগে কারণ শনাক্ত করা। দরকার শূন্য পাসের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে আলাদাভাবে পরীক্ষা করা। দরকার শিক্ষকসংকট দূর করা, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও একাডেমিক তদারকি বাড়ানো, শেখার ঘাটতি পূরণে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া এবং বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা সামাজিক কারণগুলো মোকাবিলা করা।
একজন শিশু এসএসসি পরীক্ষায় ফেল করেছে মানে সে শেষ হয়ে যায়নি। বরং তখনই শিক্ষাব্যবস্থার দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। যে শিশু পিছিয়ে পড়েছে, তাকে আরও পিছনে ঠেলে দেওয়া নয়, তাকে ধরে তোলা- এটাই একটি ন্যায্য শিক্ষাব্যবস্থার কাজ।
এসএসসির ফল তাই শুধু ফলাফল নয়, একটি এলার্ম বা হুইসেল। সেখানে এবার ৩১২টি প্রতিষ্ঠানের শূন্যতা দেখা যাচ্ছে। এলার্ম বন্ধ করে শূন্যতা দূর হবে না। বরং এলার্ম যা জানাচ্ছে সেটা স্বীকার করে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সেই জায়গাগুলো মেরামত করতে হবে, যেখানে শিশুর শেখার পথটি মাঝপথে থেমে যাচ্ছে।
আমাদের জানতে হবে, ব্যর্থ কে- শিক্ষার্থী, নাকি শিক্ষাব্যবস্থা? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো একক নয়। কিন্তু ৩১২টি শূন্য পাস প্রতিষ্ঠান আমাদের অন্তত এটুকু বলছে- দায় শুধু শিক্ষার্থীর নয়।
মন্তব্য করুন

